kalerkantho


মজার গণিত আসছে

মজায় মজায় গণিত শেখানোর কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ গণিত সমিতি ও ব্যাকবোন লিমিটেড। প্রাথমিকভাবে ঢাকায় এক হাজার ২০০ ও পরে সারা দেশের স্কুল-কলেজের প্রায ৩৬ হাজার শিক্ষককে দেওয়া হবে প্রশিক্ষণ। এরপর শিখবে তোমরাও। জানাচ্ছেন আরাফাত শাহরিয়ার

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



মজার গণিত আসছে

গণিতের কথা শুনেই জ্বর জ্বর ভাব? অথচ হাতের কাছেই সব সমাধান। প্রযুক্তি থাকলে গণিতের জটিল সমীকরণও হয়ে যায় জলের মতো। তবে এর জন্য জানা চাই মজার টিপস। আর সেগুলোই জানবেন রাজধানীর প্রায় এক হাজার ২০০ শিক্ষক। প্রযুক্তি ব্যবহার করে গণিতের কঠিন সমস্যার সহজ সমাধানের টেকনিক শিখবেন তাঁরা। আর তাঁরা শিখলেই তো তোমাদের শেখাতে পারবেন ক্লাসে।

কর্মসূচির লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে এক হাজার ২০০ কর্মশালার মাধ্যমে সারা দেশের ৩৬ হাজার গণিত শিক্ষককে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া। এ কর্মসূচির কেতাবি নাম ‘ম্যাথ স্কিল আপ ট্রেনিং প্রগ্রাম উইথ টেকনোলজি’। বাংলাদেশ গণিত সমিতি ও ই-লার্নিং কনটেন্ট ডেভেলপিং প্রতিষ্ঠান ব্যাকবোন ফাউন্ডেশনের এ কর্মসূচিতে পৃষ্ঠপোষকতা করছে জাপানের ক্যাসিও কম্পিউটার লিমিটেড।  

মজায় মজায় গণিত
১৫ ও ১৬ সেপ্টেম্বর প্রশিক্ষণ কর্মশালা হয়ে গেল রাজধানীর গুলশানের হোটেল গ্র্যান্ড ওরিয়েন্টালে। প্রতি শুক্র ও শনিবার বসছে প্রযুক্তির মাধ্যমে গণিত শেখার আসর। কর্মশালার প্রতিপাদ্য ‘অ্যাডপ্ট টেকনোলজি অ্যান্ড এনহান্স ম্যাথ কমপিটেনসি’। কর্মশালায় গণিত শিক্ষকদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে আরো আকর্ষণীয় ও বোধগম্যভাবে উপস্থাপন করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। গণিত শেখানোর সহজ উপায় বাতলে দিচ্ছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষকরা। কর্মশালার প্রশিক্ষক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের প্রভাষক মো. আরিফুল কবীর জানান, সহজভাবে গণিত শেখানোর নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে কর্মশালায়।

বাংলাদেশ গণিত সমিতির সম্পাদক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহীদুল ইসলাম মনে করেন, ‘প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকরা প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের গণিত বোঝাতে, গণিত ভীতি দূর করতে এবং গণিতকে ভিন্ন মাত্রায় ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন।’

যা শেখানো হয়
পুরো প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি পরিচালিত হয় মাল্টিমিডিয়া প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে। আয়োজক প্রতিষ্ঠান ব্যাকবোন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল মতিন শেখ জানান, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কিভাবে স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের পাঠ্য বইয়ের গণিত সমাধান করা যায়, এ বিষয়ে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষকরা শিখলে ক্লাসে ছাত্রদেরও শেখাতে পারবেন, এই কারণে শিক্ষকদের বেছে নেওয়া। সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরের বিভিন্ন অপশন ব্যবহার করে সহজভাবে সংখ্যা ও তার উপস্থাপন, ফাংশন, ম্যাট্রিক্স, ভেক্টর, অসমতা, সমীকরণ, ক্যালকুলাস, পরিসংখ্যানসহ বিভিন্ন সমস্যার সমাধান শেখানো হচ্ছে। উদাহরণসহ শেখানো হচ্ছে ব্যবহারিক নানা বিষয়। ক্যালকুলেটরে স্প্রেডশিড ও কিউআর কোড ধারণাটি একদম নতুন। স্প্রেডশিডের মাধ্যমে ক্লাসের শিক্ষার্থীদের ফলাফল গণনা করা যাবে। কিউআর কোডের মাধ্যমে দেখা যাবে বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যার লেখচিত্র। এসব খুঁটিনাটি ধারণা দেওয়া হচ্ছে। যেকোনো সমীকরণ কিভাবে ক্যালকুলেটরের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়, কিভাবে তাদের লেখচিত্র পাওয়া যায় অর্থাত্ ক্যালকুলেটরকে শুধু একটি গণনাযন্ত্র না রেখে কিভাবে একটি গণিত বিশ্লেষক যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, সেটিই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য।

গণিতের নতুন কৌশল শিখতে ক্লাস করছেন শিক্ষকরাই
শিক্ষকরা বলছেন
আদমজী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মো. সোহেল রানা জানান, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পাঠ্য বইয়ের বিভিন্ন গাণিতিক সমস্যার সহজ সমাধান শিখতে পেরেছেন তাঁরা। এবার তা উপস্থাপন করবেন ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে। ঢাকার আব্দুল খালেক মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আতিয়া বিলকিস জানান, ‘পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা গণিতে ভয় পায়। ক্লাসে শেখাতে পারলে তারা ক্যালকুলেটর ব্যবহারের মাধ্যমে গেমসের মতো করে আনন্দের সঙ্গে খুব সহজে গণিত সমাধান করতে পারবে ও গণিতের প্রতি আগ্রহী হবে। প্রশিক্ষণটি খুবই কাজের।’

ঢাকা ন্যাশনাল কলেজের শিক্ষক ছাদেকুর রহমান মনে করেন, ‘অল্প সময়ে গণিতের ক্যালকুলেশন করার ক্ষেত্রে এই প্রশিক্ষণটি কাজে লাগবে। এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আমাদের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাকে আরো শাণিত করবে।’

ঢাকার রামপুরার আল ফুরকান ইংলিশ হাই স্কুলের শিক্ষক নাঈমা আফরীন মনে করেন, ‘বাচ্চাদের গণিতে আত্মবিশ্বাস বাড়াতে এই ধরনের প্রশিক্ষণ স্কুলপর্যায়ে করলে আরো ভালো হয়।’

আলাদা প্রশ্নোত্তর পর্ব না থাকলেও পুরো কর্মশালায় প্রশ্নবাণে ব্যস্ত রেখেছেন প্রশিক্ষকদের। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া শিক্ষকরা বলেছেন, গণিত অনেকের কাছে একঘেয়ে হলেও ক্যালকুলেটরের এত ব্যাপক ব্যবহার জেনে তারা যারপরনাই খুশি।

গুণীজন বলেন
প্রথম দিন প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সনদ ও পুরস্কার বিতরণ করেন বাংলাদেশ গণিত সমিতির সভাপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক সাজেদা বানু। দ্বিতীয় দিন প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান। অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল হাকিম খান, ক্যাসিও জাপানের বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাইতো মিউওয়া। অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘ক্লাসের অনেকের কাছে গণিতে ৩৩ পাওয়াটাই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আবার আমরা কেউ কেউ ১০০ নম্বরই পেতাম। স্কুলে একজন গণিত শিক্ষককে পেয়েছিলাম, তিনি আমাদের চমত্কার কিছু ফর্মুলা শিখিয়েছিলেন। মজার মজার অঙ্ক শেখাতেন তিনি। কোনো সংখ্যাকে ৯৯ দিয়ে গুণ করা কত্ত কঠিন। এই কঠিন বিষয়টিকে তিনি সহজভাবে শেখাতেন এভাবে, সংখ্যাটিকে প্রথমে ১০০ দিয়ে গুণ করে পরে একটি সংখ্যা বাদ দাও। কত্ত সহজ হয়ে গেল। অঙ্ক শিখতে হবে আনন্দের সঙ্গে। প্রযুক্তির সাহায্যে গণিত আরো আনন্দময় হতে পারে।’

আয়োজকদের কথা
ড. মো. শহীদুল ইসলাম জানান, প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে গণিত শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা। প্রশিক্ষণ পাওয়ার পর শিক্ষকরা প্রযুুক্তি ব্যবহার করে ছাত্র-ছাত্রীদের সহজ নিয়মে গণিত বোঝাতে ও গণিতকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন।

আব্দুল মতিন শেখ বলেন, ‘বাংলাদেশে গণিত শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার উত্সাহিত করা এবং পর্যায়ক্রমে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণিত শিক্ষকদের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর প্রশিক্ষণ দিতে চাই আমরা। আমাদের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের গণিত ভীতি দূর করা।’

অংশ নিতে চাইলে
এখন থেকে প্রতি শুক্র ও শনিবার এই কর্মশালা হবে। বিনামূল্যের এ কর্মশালায় অংশ নেওয়া শিক্ষকদের একটি ক্যাসিও ক্লাসওয়াইজ সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর ও তা ব্যবহারের ওপর বাংলায় লেখা একটি বই দেওয়া হবে। কর্মশালায় অংশ নিতে পারবেন স্কুল-কলেজের গণিত শিক্ষকরা। অংশ নিতে www.classwizbd.com ওয়েব ঠিকানায়  রেজিস্ট্রেশন করতে হবে।


মন্তব্য