kalerkantho


বটমূলে বর্ষবরণের ৫০ বছর

রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে এবার। এ উপলক্ষে লিখেছেন ছায়ানটের সহসভাপতি ও নজরুলসংগীত শিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল

১৪ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



বটমূলে বর্ষবরণের ৫০ বছর

বাংলা ১৪২৩ বর্ষবরণ। ছবি : কালের কণ্ঠ

১৯৬১ সালে রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবর্ষ পালনের উদ্যোগ নেন কয়েকজন বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিমনা গুণীজন। কিন্তু পাকিস্তান সরকারের একটা অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল যে রবীন্দ্রনাথ আমাদের কবি নন, সুতরাং তাঁর জন্মশতবর্ষ পালন আমাদের উচিত নয়।

এ নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করে সে সময়কার সংস্কৃতিকর্মীরা রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী পালন করেছিল। তাঁদের মধ্যে তখন একটা ভাবনা জাগ্রত হলো—আজ রবীন্দ্রনাথের ওপর আঘাত এসেছে, আগামী দিনে বাঙালি সংস্কৃতিতে বাধা আসতে পারে। ছোট ছোট পরিসরে গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন হতে থাকে ঘরে ঘরে, বিভিন্ন জায়গায়। আসরে দেখা যেত শিল্পীর অনেক অভাব। চিন্তা আসে নতুন শিল্পী তৈরির। তারই প্রতিফলন ঘটে ছায়ানট সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৩ সালের পহেলা বৈশাখের দিন এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম কয়েক বছর দিনটিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হিসেবেই পালন করা হতো। সবাই ভাবলেন, এটাকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মধ্যে না রেখে আমরা বরং পহেলা বৈশাখটা পালন করি। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ছায়ানট স্কুলেই অনুষ্ঠান পালন করা হতো। সে সময় বোটানিস্ট ডক্টর নওয়াজিশ আলী রমনা পার্কের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। তাঁর কাজ-কারবার গাছপালা নিয়ে। সুন্দর ছবিও তুলতেন। তিনি একদিন বললেন, ‘আমি একটা জায়গা দেখেছি রমনা পার্কে। আমরা যদি প্রকৃতির কাছে থেকে একটা গাছের নিচে পহেলা বৈশাখ পালন করতে পারি তাহলে খুব ভালো হয়। তাঁর কথা শুনে ছায়ানটের লোকজন সেই গাছটা দেখতে গেল। সেটা আসলে পাকুড়গাছ। বটগাছ হিসেবে প্রচারণাটা হয়েছে বলে পরে আমরা সেটা শোধরাইনি। আর বটগাছ থেকেই বটমূল, আজকের রমনা বটমূল। পাকুড়গাছ অবশ্য বটগাছ পরিবারেরই একটি গাছ। ছায়ানটের লোকজন গাছ দেখে এসে পরিকল্পনাটা চূড়ান্ত করে। সিদ্ধান্ত হয় শুধু মিষ্টি বিতরণ নয়, গানে গানে নতুন বছর পালন করা হবে। অনুষ্ঠান শুরু হবে প্রভাতের একেবারে শুরুর দিকে। আর এ ব্যাপারটি শুরু হলো ১৯৬৭ সালে। ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি আমরা যে বাঙালি সে বিষয়টি খুব বড়ভাবে দেখা দিল। পহেলা বৈশাখ এই ব্যাপারটিকে আরো বেগবান করল। প্রথম দিকে ছয়-সাত শ লোক হতো। ধীরে ধীরে স্বাধিকার আন্দোলনসহ নানা কিছু শুরু হলো। এর ফলে আমাদের একটি রোলিং পয়েন্ট হয়ে গেল বটমূল। আমাদের যে নিজস্ব পরিচয় আছে সেটা প্রকাশ করার জন্য এ অনুষ্ঠানে শত শত লোক আসতে শুরু করল। সেখান থেকে হাজার হাজার, তারপর এখন লাখ লাখ মানুষের সমাগম। প্রতিবছরই অনুষ্ঠানটি সাজানো হয় একটি নির্দিষ্ট থিম নিয়ে। রবীন্দ্র, নজরুল, ডি এল রায়, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত প্রমুখের গানের সঙ্গে থাকে লোকসুরের গান, উদ্দীপনামূলক গান, মুক্তিযুদ্ধের গান প্রভৃতি। যে বছর যে থিম নেওয়া হয় সে থিমকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো হয় পুরো আয়োজন। এখনো পর্যন্ত সেই ভঙ্গিটা আমরা মেনে চলছি। যাঁরা আমাদের বাংলা সংস্কৃতি, বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করে গেছেন তাঁদের প্রায় সবাইকে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়। সব ধর্মের মানুষের নিজ নিজ উৎসব আছে। উৎসবগুলো সেই সেই সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পহেলা বৈশাখ এমন একটি উৎসব, যেখানে আমরা ধর্ম-বর্ণ, ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ ভুলে বাঙালি হিসেবে এক হয়ে রমনা বটমূলে হাজির হই। এই উৎসবে কেন যাই? কারণ আমি যে বাঙালি তার জানান দিই। এখন তো বটমূলের আদলে বিশ্বের অনেক দেশের প্রবাসী বাঙালিরা পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন। মোগল আমল থেকেই কিন্তু পহেলা বৈশাখ পালিত হচ্ছে। সে সময় হালখাতা, মিষ্টি বিতরণ—এগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গানে গানে পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপনের কৃতিত্ব ছায়ানটকে এককভাবে দেওয়া যায়। মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিবছরই রমনা বটমূলে এই অনুষ্ঠান করে আসছে ছায়ানট। ১৯৬৭ সালে আমার বয়স ছিল ৯ বছর। তখন ছায়ানটে ছিলাম না। ১৯৬৮ সালে তত্কালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে ছোটদের নিয়ে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে নাম লেখাই। সেখানে আমি পুরস্কার পাই। তখন মনে হলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেওয়া দরকার। পরের বছরই ছায়ানটে ভর্তি হই। জাতীয় নির্বাচন শুরু হয়ে গেল, তারপর তো মুক্তিযুদ্ধ! দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সাল থেকে আবার যাওয়া শুরু করি। সে সময় কোরাস গানে দু-একটা জায়গায় গাওয়ার সুযোগ পেতাম। ১৯৭৫ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য চলে যাই বিদেশে। ১৯৮৫ সালে ফিরে এসেই প্রথম একক গান গাওয়ার সুযোগ পাই। তার পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিবছরই গাইছি। ২০০১ সালে বোমা হামলার মাধ্যমে এ আয়োজনকে চিরতরে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল একটি মহল। এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড এমন একটি উৎসবে হতে পারে আমরা কখনো কল্পনাও করিনি। ছোটখাটো আরো কিছু আঘাত আমাদের ওপর এসেছে। কিন্তু আমরা কখনো পিছু হটিনি। বোমা হামলার পর আমরা যখন শিল্পীদের সঙ্গে যোগাযোগ করি তাঁরা বলেছিলেন, শিশুরাসহ আমরা আবারও বটমূলে বসব। আমরা ভীত নই। আমরা এই হত্যাকাণ্ডকে ধিক্কার দিই। শিল্পী, অভিভাবক, শ্রোতা সবার সাহস আর আন্তরিকতায় এই আয়োজন থেমে যায়নি। পরের বছর আবার যখন অনুষ্ঠান শুরু হয়, শুরুতে মানুষ একটু কম ছিল, কিন্তু বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগের মতোই লোকসমাগম হতে থাকে। সেদিন আমরা এই বার্তাটিও পৌঁছে দিতে সক্ষম হই, আমাদের এই অনুষ্ঠান চলবেই। সংস্কৃতিকে ঘিরে আমাদের যে বন্ধন এটা অনেক শক্তিশালী। এটাকে ভেঙে না দিতে পারলে আমাদেরকে দমাতে পারবে না। এ জন্য একটা গ্রুপ ছায়ানট সম্পর্কে অনেক উল্টাপাল্টা কথা ছড়ায়। তারা বলে ছায়ানট নাকি সূর্য পূজা করে! আরো নানা কুসংস্কার। কিন্তু তারা সার্থক হয়নি। এ বছর এ আয়োজনের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে। এটা আমাদের জন্য অনেক গৌরবের, আনন্দের। এবারের আয়োজনেও থাকছে বৈচিত্র্য। আশা করছি, উৎসবটা বেশ আনন্দের সঙ্গেই করতে পারব। কিন্তু বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিরাপত্তা নিয়েই আপাতত এই অনুষ্ঠান করতে হবে। ১৯৬৭-তে যেভাবে মুক্ত আকাশের নিচে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই এ অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল খুব দ্রুত আমরা সেই পরিস্থিতে ফিরে যেতে পারব বলে আমার বিশ্বাস। আমরা সেই উজ্জ্বল সময়ের প্রতীক্ষায়।

 

অনুলিখন : রবিউল ইসলাম জীবন


মন্তব্য