kalerkantho

কাজের মানুষ

কাজ আপনার, পুরস্কার অন্যের

১১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কাজ আপনার, পুরস্কার অন্যের

কাজের দিকে নজর দেওয়ার আগে এবার কিছুটা সময় দিন নিজের দিকে। আর দেখুন, কিভাবে আপনার কাজের পুরস্কার পাচ্ছে আরেকজন। আপনার জন্য রইল দশ পরামর্শ—

 

এক.

আপনি কাজ শেষ করেই অন্য কাজে মন দিন। শেষ করা কাজের রেশ ধরে অন্য কেউ তখনো বসে আছে আপনার অজ্ঞাতে। আপনি টের পাচ্ছেন না। কারণ আপনি তখন আর পূর্ববর্তী কাজের মধ্যে নেই। অন্য কাজ নিয়ে মগ্ন হয়ে পড়েছেন। তাহলে আপনার জন্য প্রথম পরামর্শ হচ্ছে, আপনি যে কাজটিই করছেন না কেন, তা শেষ করার পর কাজটি নিজ হাতে জমা দিন। আপনার সুপারভাইজর বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট করুন, মতামত নিন, ভালো-মন্দ নিয়ে আলোচনা করুন, আশপাশের দু-একজন জানুক কাজটি আপনি করেছেন।

 

দুই.

আপনি কি জানেন, কাজ শেষে আপনার জন্য কোনো স্বীকৃতি রাখা আছে কি না? ধরুন, কাজটি ভালোভাবে করতে পারলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসবেন। কিংবা আপনার পদোন্নতি নির্ভর করছে এই কাজটির ওপর। অথবা আপনার এই কাজটি আপনার পারফরম্যান্স প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। এই যে একটি কাজের নানামুখী প্রভাব, আপনার কি ধারণা আছে, আপনার কাজ কোথায় কোথায় প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে? ধারণা না থাকলে এখন থেকে কাজ শুরু করার আগেই বিষয়গুলোর দিকে নজর দিন।

 

তিন.

আপনি যে কাজটি করছেন, সেটি আসলে কার জন্য করছেন? প্রতিষ্ঠানের জন্য নিজ উদ্যোগে করছেন, নাকি আপনার বস আপনাকে করতে বলেছেন তাই। আপনার বস তারপর এ সম্পন্ন কাজের ফলাফল দিয়ে কী করবেন, সে সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা নেই। কাজটি করতে হবে বলে সবার মতো আপনিও দিনের পর দিন করে যাচ্ছেন। আসলে কী করছেন আপনি, কেন করছেন, কার জন্য করছেন, কাজের ফলাফল আসলে কে চেয়েছেন, মোট কথা উেস কে আছেন, যাঁর আদেশে বা যাঁর প্রয়োজনে আপনি এই কাজটি করছেন, তা জানা দরকার।

 

চার.

আপনার সঙ্গে আপনার পদমর্যাদার সহকর্মী ছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আপনার আলাপ কেমন? যদি শুধু সৌজন্য আলাপের মধ্যে এ সম্পর্ক বজায় থাকে, তাহলে আপনার আরো উদ্যমী হতে হবে। তাঁদের সঙ্গে আরো ভালো সম্পর্ক তৈরিতে মনোযোগ দিন। দেখা হলে কাজ নিয়ে আলাপ করার প্রসঙ্গ তৈরি করুন। অপ্রাসঙ্গিকভাবে আলাপ করা ঠিক হবে না। আপনার কাজ নিয়ে পরামর্শ বা মতামত জানতে চাইতে পারেন। প্রতিষ্ঠানের চলমান ঘটনা নিয়ে আলাপ করতে পারেন। এ সম্পর্ক আপনার কাজ সম্পর্কে অন্যকে জানানোর দরজা খুলে দেবে। ফলে চাইলেই সহজে কেউ আপনার কাজ নিজের নামে চালাতে সাহস পাবে না।

 

পাঁচ.

প্রতিদিন ডেইলি অ্যাক্টিভিটি রিপোর্ট লিখুন। মানে প্রতিদিন কী কী কাজ করলেন, তার একটি সংক্ষিপ্ত ও চটজলদি প্রতিবেদন তৈরি করুন, যা পরবর্তী সময়ে অন্তত আপনাকে মনে করিয়ে দেবে, ওই বিশেষ দিনে আপনি কী কী কাজ করেছিলেন। প্রতিবেদন তৈরির কাজটি একঘেয়ে মনে হতে পারে। দীর্ঘদিন চলমান রাখা জটিল; কিন্তু একবার অভ্যাসে পরিণত করতে পারলে সুফল পাবেন। যদি কখনো আপনি আপনার কাজ নিয়ে অন্য কারো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, তাহলে এই পুরনো প্রতিবেদনের ফাইলটি আপনাকে তথ্য সরবরাহ করে জোরালো বক্তব্য প্রদানে সাহায্য করবে। ডেইলি অ্যাক্টিভিটি রিপোর্ট ভয়ংকর শক্তিশালী এক হাতিয়ার।

 

ছয়.

ডেইলি অ্যাক্টিভিটি রিপোর্ট লিখে নিজের কাছে রেখে দেবেন না। প্রথমত, আপনার সুপারভাইজরের বরাবর প্রতিদিন রিপোর্ট জমা দিন। তা না পারলে প্রতি সপ্তাহের শেষে এবং তা-ও যদি না পারা যায়, তাহলে প্রতি মাসের শেষে একবার জমা দিন। এই কৌশল আপনাকে সহকর্মীদের দিকটা সামলাতে সাহায্য করবে; কিন্তু আপনার বসই যখন আপনার কৃতিত্ব পুরোপুরি নিজে নিতে চাইবেন, তখন? ফলে চেষ্টা করুন (প্রাসঙ্গিক এবং নিজেকে নিরাপদ রেখে) কিভাবে আপনার কাজের মাসিক প্রতিবেদনের একটা কপি আরো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানো যায়।

 

সাত.

শুনতে কিছুটা চটকদার মনে হতে পারে; কিন্তু যেখানে নিজের কাজের পুরস্কার চুরি হওয়ার ভয়, সেখানে নিজের ঢাক পেটানোয় লজ্জার কিছু নেই। কাজটি শুরু করার আগে কিছুটা সময় নিন। ভাবুন, কাজটি কিভাবে করলে সঠিক লোকটি জানবে যে কাজটি আপনি করেছেন। এই সঠিক লোকটি আসলে কে? আপনাকে ভুল সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না। আইডিয়াটা বা উদ্যোগটা যে আসলে আপনার, সেটা কাকে জানানো দরকার। সে ব্যক্তি কি আপনার বস, নাকি তাঁর বস, নাকি আরো ওপরের কেউ? প্রাসঙ্গিকতা মাথায় রেখে কাজটি অল্প গতিতে এগিয়ে নিন। এরই মধ্যে নিজের কাজ ও নিজের আইডিয়া বা উদ্যোগ নিয়ে প্রচারকার্য অব্যাহত রাখুন। মনে রাখবেন, সারাক্ষণ নিজের ঢোল নিজে পেটানো কেউ পছন্দ করে না। তাই আপনাকে নিজের প্রচার চলমান রাখার সময়ই খেয়াল রাখতে হবে যে তা শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করছে কি না।

 

আট.

প্রতিষ্ঠানের কোনো অনুষ্ঠানে আপনার কী বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ আসে? আপনি কি প্রতিষ্ঠানের মাসিক নিউজ লেটারে বা বনভোজন সাময়িকীতে লেখার সুযোগ পান? উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে বেশ কায়দা করে এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করুন। আপনার বক্তব্যে সহকর্মী, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উচিত প্রশংসা করুন; কিন্তু কায়দা করে নিজের শ্রেষ্ঠ অবদানগুলোর কথা শৈল্পিক উপায়ে উপস্থাপন করতে ভুলবেন না। যাদের জানা প্রয়োজন, তারা জানুক, আপনার অবদান কোথায় কোথায় ছিল?

 

নয়.

এই একই উপায়ে আপনার চোখের সামনে যদি আপনার বস আপনার কাজকে নিজের কাজ বলে দাবি করে বসে? তাহলে জনসমক্ষে এর প্রতিবাদ করবেন কী করে? আর প্রতিবাদ করলে তো আপনি অনেকেরই রোষানলে পড়তে পারেন। সুতরাং সতর্ক অবস্থান আগে থেকেই আপনাকে নিতে হবে। আপনার ঊর্ধ্বতন কেউ আপনার আগেই যদি একবার দাবি করে বসে যে অমুক আইডিয়াটা আমার ছিল বা অমুক কাজটি আমি করেছি। তাহলে আপনার জায়গা থেকে তেমন কিছুই করার থাকবে না। দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে এর থেকে একমাত্র উদ্ধারের উপায় হলো, যদি অন্য কেউ আপনার হয়ে ভিন্নমত পোষণ করে। তবে সবচেয়ে ভালো হয়, আপনার কাজ কাউকে নিজের বলে দাবি করার সুযোগ না দেওয়া। আপনি কাজ শেষ করে জমা দেওয়ার আগেই আপনার প্রচারকার্য শেষ করুন।

 

দশ.

যারা আপনার কৃতিত্ব চুরি করতে চায়, তারা আপনার এসব আত্মরক্ষার কৌশল মোটেই পছন্দ করবে না। যারা আপনার কাজের পুরস্কার চুরি করতে চায়, তারা আপনার আশপাশেই আছে। ফলে আপনার প্রতিরক্ষার ভিত্তি তৈরি করতে হবে চতুর্দিকে। নিজে কী ভাবছেন, কী পরিকল্পনা করছেন, কী হতে যাচ্ছে—এ বিষয়ে সবার সঙ্গে আলাপ করবেন না। যা-ই করবেন, অনেকবার ভেবেচিন্তে করুন। নিজের সম্পর্কে বা নিজের কাজ সম্পর্কে কখনো বাড়িয়ে বলবেন না। আপনি যা সবার কাছে বলছেন, তা যেন আস্থা অর্জন করতে পারে। তাহলেই নিজের কাজের পুরস্কার পাবেন।

 

মন্তব্য