kalerkantho


অন্য কোনোখানে

মণিপুরিদের রথযাত্রায়

১৬ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



মণিপুরিদের রথযাত্রায়

১৪ জুলাই হয়ে গেল এবারের রথযাত্রা আর উল্টো রথযাত্রা হবে ২২ জুলাই। ঢাকার সায়েদাবাদ, ফকিরাপুল, রাজারবাগ ও মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে গ্রিনলাইন, শ্যামলী, এনা, হানিফ বা বিআরটিসি বাসে অথবা ট্রেনে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে সকালে আন্ত নগর পারাবাত, দুপুরে জয়ন্তিকা ও কালনি এবং রাতে উপবন ছোটে সিলেটের পথে। সেখান থেকে রিকাবীবাজার রথের মেলায় যেতে রিকশায় নেবে ৬০ টাকা, সিএনজিতে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।

 

সুমন্ত গুপ্ত

 

আমার অফিস সহকারী ড্যানি শর্মা একজন মণিপুরি। আষাঢ় মাস এলেই ওর কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পাই সিলেটে মণিপুরি সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা দেখতে যাওয়ার। প্রায় ১৯৬ বছর ধরে নাকি এই রথযাত্রা উত্সব চলে আসছে। পাপী মানুষ বলেই কি না সময় করে উঠতে পারছিলাম না। অবশেষে গত বছর একটা ছুটির ব্যবস্থা করা গেল। ভ্রমণসঙ্গী মাকে নিয়ে রাতে রওনা হলাম সিলেটের উদ্দেশে। অনেক অপেক্ষা করিয়ে রাত সাড়ে ১১টায় ট্রেন ছাড়ল। আর পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল ৯টা। ততক্ষণে পেটে শুরু হয়ে গেছে রাম-রাবণের যুদ্ধ। সেটা থামাতে সোজা চলে গেলাম সিলেটের বিখ্যাত পাঁচ ভাই রেস্তোরাঁয়। ওখানে রুটি আর সবজি দিয়ে সেরে নিলাম সকালের পেটপুজো। ওখান থেকে গিয়ে উঠলাম আমাদের অস্থায়ী ডেরায়। সেখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে পরে বের হব রথযাত্রা দেখতে। বিশ্রাম নিতে গিয়ে গেলাম ঘুমিয়ে। ঘুম ভাঙল মায়ের ডাকাডাকিতে। ড্যানির ফোন। ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে ড্যানি বলে উঠল, ‘স্যার, দুপুর ২টার মধ্যে রওনা দেবেন। না হলে রাস্তার জ্যামে পরতে হবে। দেরি হবে পৌঁছাতে।’ কথা শেষ করে ঘড়ির দিকে তাকাতেই দেখি দুপুর ১টা বাজতে চলল। এখনই বের হতে হবে। কিন্তু বাদ সাধল আকাশ। ওর মন ভালো না। খানিক পরই শুরু হলো ইঁদুর-বিড়ালের বৃষ্টি। আধা ঘণ্টা পর আকাশের মন ভালো হতে লাগল। কমে এলো বৃষ্টি। আর এই সুযোগে বেরিয়ে পড়লাম। তিন চাকায় চেপে চললাম সিলেট শহরের কেন্দ্রবিন্দু রিকাবীবাজারের দিকে। জিন্দাবাজার পেরিয়ে চৌহাট্টায় পৌঁছার পর সড়কে বেশ জ্যাম দেখতে পেলাম। দূর থেকেই দেখা পেলাম কাঙ্ক্ষিত রথগুলোর। ওতে আসীন আছেন প্রভু জগন্নাথ, মাঝখানে তাঁর বোন সুভদ্রা এবং বাঁয়ে বলরাম। শত শত পুণ্যার্থী রথ টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। দূর থেকেই প্রণাম করলাম। এদিকে আমাদের চালক মশাই বললেন, ‘সামনেই মেলা বসেছে। আজ এই সড়কে জ্যাম থাকবেই। হেঁটে গেলে অনেক আগেই কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যাবেন।’ আমরাও তথাস্তু বলে পদব্রজে রওনা করলাম। শত শত মানুষের সঙ্গে হেঁটে চলছি। কিছুদূর যেতেই মেলার দেখা পেলাম। রাস্তার দুই পাশে মেলা বসেছে। আর মেলাকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে পুরো এলাকা। ছোট ছোট দোকানে ছোট থেকে বড়দের ভিড়। আছে মাটির খেলনা, লেইস-ফিতা, আসবাবপত্র, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী, কাঠের সামগ্রী, হস্তশিল্প, কারুপণ্য, তামা, কাঁসা, লোহা—এককথায় কী নেই! কাপড় দিয়ে তৈরি পুতুল নিয়ে বসেছেন এক বিক্রেতা। তাঁকে ঘিরে আছে ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে। শহুরে জীবনে এমন পুতুলের দেখা পাওয়া ভার। আমাদের পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য সপ্তকের জন্য একটা পুতুল কেনা হলো।

হঠাৎ করে মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে ড্যানি বলে উঠল, ‘স্যার, কী চলে এসেছেন? আরেকটু পরই মূল অনুষ্ঠান শুরু হবে। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলে আসুন।’ মানবজট পেরিয়ে অনেক কষ্টে শেষ পর্যন্ত মূল অনুষ্ঠানস্থলের কাছে পৌঁছালাম। ড্যানি আগে থেকেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমাদের নিয়ে গেল মূল অনুষ্ঠানস্থলে। একটি মাঠের ভেতর অনেক রথ। রথগুলো কাঠের তৈরি। উচ্চতা প্রায় ২০-২৫ ফুটের মতো হবে। প্রতিটি রথ বেশ সুন্দর করে সাজানো। রথের চাকাগুলো কোনোটি কাঠের আবার কোনোটি কংক্রিটের। চারপাশে ধূপকাঠির মোহনীয় গন্ধ। শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঢাক তো বেজেই চলছে। এ এক অন্য রকম পরিবেশ। এখানেই দেখা হয়ে গেল সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, কবি এ কে শেরামের সঙ্গে। সিলেটে মণিপুরিদের রথযাত্রা অনুষ্ঠান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে বাংলাদেশ, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা উত্সব সাড়ম্বরে পালন করে। এক সপ্তাহ পর উল্টোরথ উত্সব হয়ে থাকে। রথযাত্রা অনুষ্ঠান সনাতন ধর্মাবলম্বী গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী মণিপুরিদের এক প্রধানতম অনুষ্ঠান। সিলেট শহরে বারোটি মনিপুরীপাড়া আছে। প্রতিটি মনিপুরীপাড়া থেকে নির্ধারিত দিনে শ্রী শ্রী জগন্নাথদেব, সুভদ্রা, বলরামসহ অন্যান্য দেব-দেবীর বিগ্রহ দিয়ে সাজানো রথ টেনে নিয়ে আসা হয় রিকাবীবাজারের এই জায়গায়। তারপর একসঙ্গে আরতিসহ পূজার সব আচার-অনুষ্ঠান শেষ করে সন্ধ্যার আগেই আবার রথ ফিরে যায় নিজ নিজ মন্দির প্রাঙ্গণে। ফেরা (উল্টো) রথ বা পুণ্যযাত্রার দিনও একইভাবে রথ টানা হয়। তা ছাড়া রথযাত্রার ১০ দিন ধরে প্রতিটি মনিপুরীপাড়ার মন্দিরে রাতে বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং পাড়ার সবাইকে খিচুড়ি মহাপ্রসাদ দিয়ে আপ্যায়িত করার প্রথা অনেক কাল থেকেই চলে এসেছে। সেই ধারা এখনো চলছে।’

শেরাম মশাই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার আহ্বান জানালেন। তাঁর কথায় সায় দিয়ে এগিয়ে গেলাম রথের দিকে। এত ভিড়ের মধ্যেও প্রতিটি রথ দেখার চেষ্টা করলাম। পূজা-অর্চনা শুরু হয়েছে। প্রতিটি রথের মূল পুরোহিতরা একত্র হয়ে পূজা শুরু করেছেন। মন্ত্র উচ্চারণের শব্দ আমাদের বিমোহিত করল। শুরু হলো মঙ্গল আরতি। চারপাশে বেজে উঠল খোল, করতালের ধ্বনি। অসাধারণ পরিবেশ। সবাই প্রার্থনায় মগ্ন। শামিল হলাম সবার সঙ্গে। মঙ্গল আরতির পর লুট (ভক্তদের উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া নানা রকম খাদ্যসামগ্রী) দেওয়া হলো। সবাই লুটের প্রসাদ গ্রহণ করল। এর পর দেওয়া হলো জগন্নাথদেবের প্রসাদ। ভক্তি ভরে তা গ্রহণ করলাম। ড্যানি আবার জগন্নাথদেবের গলা থেকে ফুলের মালা এনে দিল। এসবের এক ফাঁকে দেখা পেয়ে গেলাম রথযাত্রা উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নৃপেন্দ্র সিংহের সঙ্গে। তাঁর কাছে জানতে চাইলাম সিলেটে মণিপুরিদের এই রথযাত্রার শুরুর ইতিহাসের কথা। তিনি বললেন, ‘কবে থেকে কিভাবে শুরু হয়েছিল এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। তবে শ্রী অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধির লেখা ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ বইয়ে উল্লিখিত একটি ঘটনা থেকে সুস্পষ্ট হয় বেশ আগে থেকেই এই অনুষ্ঠান প্রচলিত ছিল। ১৮২২ বা ১৮২৩ সালের দিকে ভারতের মণিপুর রাজ্যের রাজা গম্ভীর সিংহের সঙ্গে অনেক মণিপুরি প্রজা সিলেট শহর এবং পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসতি স্থাপন করেছিলেন। সেই সময়ে রাজা গম্ভীরসিংহ যেখানেই যেতেন সঙ্গে করে তাঁদের রাজপরিবারের কুলদেবতা শ্রীগোবিন্দজির বিগ্রহ নিয়ে যেতেন। এখানে মন্দির তৈরি করে রাজকুলদেবতা শ্রীগোবিন্দজির নিয়মিত পূজা-অর্চনার পাশাপাশি রথযাত্রা, রাস পূর্ণিমার মতো ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন রাজা। এসবই পরে প্রচলিত প্রথায় পরিণত হয়। সিলেটের যে এলাকায় রাজা বসতি স্থাপন করেন সেই এলাকাটি এখনো ‘মণিপুরি রাজবাড়ি’ নামে পরিচিত। আজ সময়ের পরিক্রমায় দীর্ঘ ১৯৬ বছর ধরে আয়োজিত হয়ে আসছে এই রথযাত্রার অনুষ্ঠান। এদিকে রথগুলোর নিজ দেবতা গৃহে ফেরার সময় হয়ে এলো। সবাই রথ নিয়ে ফিরে চলল দেবতা গৃহের উদ্দেশে। আমরাও রথের পেছনে পেছনে রওনা হলাম। শুধু তা-ই নয়, পুণ্য লাভের আশায় রথের দড়ি ধরেও টানলাম। কথিত আছে, রথের দড়ি ধরে টানলে স্বর্গ লাভের পথ প্রশস্ত হয়। রথ টানা শেষ হলে আবার রথের মেলা ঘুরে দেখতে গেলাম। এদিকে আমার পেটে আবার রাম-রাবণের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এবার পেটে কিছু দিতেই হবে। মেলায়ই পেয়ে গেলাম নিমকি, কাটাগজা, খাজা, খইসহ আরো অনেক খাবার। সেসব ভরপেট খেয়ে বাড়ি ফেরার পথ ধরলাম।

ছবি : লেখক



মন্তব্য