kalerkantho


অন্য কোনোখানে

লাউড়ের গড়ের শিমুলবাগানে

শিমুল খালেদ   

৫ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



লাউড়ের গড়ের শিমুলবাগানে

রাতটা বড় আপুর বাসায় কাটিয়ে পরের দিন সকাল সকাল সিলেট শহরের টিলাগড় থেকে বেরিয়ে পড়লাম। বন্ধু হারুনকে সঙ্গে করে পৌঁছলাম কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডে। দিনটা ছুটির। স্বাভাবিকভাবেই রাস্তাঘাট তুলনামূলকভাবে ফাঁকা। আমাদের বাস ছুটে চলেছে হাওরের দেশ সুনামগঞ্জের পানে। দিগন্ত বিস্তৃত হাওরের বিশালতা। চোখের দৃষ্টির পরিসীমা যেতে যেতে একসময় আটকে যায় হাওরের সীমাহীন প্রান্তরে। কোথাও চোখে পড়ে হিজল করচের বন। শুকনো মৌসুম বলে এদের জৌলুস খুব একটা নেই। তবে ভরা বর্ষায় এরাই হয়ে যায় হাওরের প্রাণ। বাস থামে হাসন রাজার শহর সুনামগঞ্জের প্রবেশমুখে। বাঁ পাশের পথটা সুরমা নদীর ওপর দিয়ে চলে গেছে আমাদের গন্তব্য তাহিরপুর উপজেলার দিকে। আর ডান দিকের পথ গেছে সুনামগঞ্জ শহরে। অটোরিকশায় সেতু পার হওয়া যায়। তবে আমরা হেঁটেই পার হলাম। এই সুরমা বিশাল এক নদী। সিলেট শহরে দেখা সুরমা ভাটির পানে চলতে চলতে এখানে এসে গায়ে-গতরে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। নদীর ওপাশ থেকে একটা সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে চলে যাই হারুনের বাড়ি হালাবাদী গ্রামে। এরই মধ্যে দুপুর গড়িয়েছে। ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া সেরে একটা মোটরসাইকেল ভাড়া করে বের হয়ে পড়ি। গন্তব্য যাদুকাটা নদী পার হয়ে লাউড়ের গড়ের শিমুলবাগান। সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের তুলনায় হারুনদের এলাকা তুলনামূলক উঁচু। গ্রামজুড়ে সারি সারি বাঁশের বন। হারুন জানায়, তাদের এলাকায় কখনো বন্যা হয় না। গ্রাম পেরিয়ে আঁকাবাঁকা পথের দুই পাশে ফসলের ক্ষেত। মৌসুমি তরিতরকারির সঙ্গে গম আর তরমুজের ক্ষেত। মাঠে পড়ে আছে রসে টইটম্বুর বড় বড় তরমুজ।

একসময় পৌঁছে যাই যাদুকাটা নদীতে। স্রোতস্বিনী যাদুকাটার বুকে মানুষের কর্মচাঞ্চল্য চোখে পড়ার মতো। মাছ ধরা, বালু উত্তোলন আর বালু ভরা নৌকার ছুটে চলা। খেয়া নৌকায় পার হলাম যাদুকাটা। নদীর বালুকাময় চর পেরিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেলাম লাউড়ের গড়ের শিমুলবাগানে। চারপাশে শত শত শিমুলের গাছ। ফুলে ফুলে রাঙানো যাদুকাটার তীর। গাছে গাছে প্রস্ফুটিত শিমুলের রক্তিম আলো। ফুলে ফুলে পাখিদের চঞ্চল ওড়াউড়ি।

লাউড়ের গড়ের এই শিমুলবাগানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাহিরপুরের উত্তর বাদাঘাট ইউনিয়নের প্রয়াত চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীনের নাম। প্রায় দেড় দশক আগে শৌখিন মানুষটি সত্তরেরও অধিক বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছিলেন এই শিমুলবাগান। শিমুলবাগানটি এখন দেখাশোনা করেন প্রয়াত জয়নুল আবেদীনের ছেলে একই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন।

শিমুলবাগানের এলাকাটির আছে প্রাচীন ইতিহাসও। একসময় এই এলাকায় ছিল প্রাচীন লাউড় রাজ্য। কালক্রমে সেই রাজ্য আর নেই। তবে তার স্মৃতি বহন করছে লাউড়ের গড় নামটি। পুরো বাগান ঘুরে-ফিরে দেখতে থাকি। এরই মধ্যে আরেক বন্ধু তাহের খবর পেয়ে তার বাইক নিয়ে চলে এসেছে। শিমুলবাগানের মাঝের অংশে লেবুর বাগান। থোকায় থোকায় সাদা লেবু ফুল ফুটে আছে। মৌ মৌ ঘ্রাণে ভরে গেছে চারপাশ। শুনতে পেলাম ভোমরার গুঞ্জন।

শিমুলবাগানের প্রবেশপথ ছাড়া পুুরো বাগান বাঁশ আর কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা। বাগানের এক পাশে পানির ট্যাংকের টাওয়ার। সেটার চূড়ায় চড়ার জন্য রয়েছে সিঁড়ি। একেবারে খাড়া সেই সিঁড়ি। দেখেই বোঝা যায় এই সিঁড়ি বেয়ে ওঠা ঝুঁকির কাজ। তবে ওপর থেকে পাখির চোখে পুরো শিমুলবাগান দেখা আর ছবি তোলার নেশায় চড়ে বসি সেই সিঁড়িতে। সত্যিই ওখান থেকে বাগান অন্য রকম লাগল।

এই শিমুলবাগান থেকে কিছুটা দূরে বালুচর পেরিয়ে দেখার মতো আরেকটি জায়গা হচ্ছে বিরল জাতের এক বাঁশের বাগান। সেটা পেরিয়ে নীলাদ্রি লেক। ওখানে যাওয়ার জন্য টেকেরঘাটের পথ ধরি। মারাম নদীর শুকনো বালুচর পেরিয়ে পেয়ে গেলাম সেই বাঁশের বাগান। বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে পথের ফাঁকফোকর পেরিয়ে পাকা রাস্তায় এসে পড়ি। বেলা পড়ে যাচ্ছে বলে দ্রুত ছুটতে থাকে আমাদের বাহনগুলো। বাঁ পাশে বিস্তৃত সমভূমি আর ডানের মেঘালয়ের সুউচ্চ পাহাড়শ্রেণি দেখতে দেখতে আমাদের বাইকগুলো থামে নীলাদ্রিতে। নীল জলের নীলাদ্রি লেক, চোখ জুড়িয়ে দেওয়ার মতো তার রূপ। লেকটির পোশাকি নাম ‘শহীদ সিরাজ লেক’। তবে হালে এটি ‘নীলাদ্রি’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। লেকের অন্য পাশে পরিত্যক্ত দালানকোঠা আর যন্ত্রাংশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। দেখেই বোঝা যায়, একসময় এখানে মানুষের বেশ কর্মচাঞ্চল্য ছিল। আজ সেখানে নীরব নিস্তব্ধতা। পরিত্যক্ত দালানকোঠা আর যন্ত্রাংশগুলো যেন কালের সাক্ষী। নীলাদ্রি একসময় ছিল চুনাপাথরের খনি। এখান থেকে চুনাপাথর উত্তোলন করা হতো। তারপর একসময় খনিটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলে কালক্রমে পানি জমে সেটি লেকে পরিণত হয়। লেকে কয়েকটা নৌকা অর্ধেক ডুবিয়ে রাখা। কয়েকজন পর্যটককে ঘুরতে দেখলাম। লেক থেকে ফেরার পথে থামলাম বড়ছড়া বাজারে। তাহেরের বাড়ির পথ এখান থেকে অন্য দিকে। দেশি গরুর খাঁটি দুধে স্থানীয়ভাবে তৈরি রসগোল্লা দিয়ে সে আতিথেয়তা করে। আহ্ কী স্বাদ! মুখে যেন এখনো লেগে আছে। ও বিদায় নিলে আমরা তিনজন এক বাইকে চড়ে বসি।

শেষ বিকেলের ঝাপসা আলোয় মেঘালয় পাহাড়শ্রেণি যেন নীলচে রঙে সেজেছে। সুন্দর এক সুপারিবাগান পেছনে ফেলে সামনে পড়ে বারিক টিলা। টিলার মাথায় ট্রেইলের মতো এঁকেবেঁকে যাওয়া পথ। মাঝে দু-একটি বাড়ি চোখে পড়ে। টিলার মাঝখানে একটি গির্জা। ধবধবে সাদা, পরিচ্ছন্ন। বারিক টিলার উত্তর পাশে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া। তারপর ঢালু পথ পেরিয়ে বাইক এসে থামে টিলার পূর্ব পাশের শেষ প্রান্তে। এখানেই সীমান্ত পিলার। প্রান্তসীমা থেকে নিচে নেমে গেছে টিলার খাড়া দেয়াল। অনেক নিচে বয়ে চলেছে যাদুকাটা। হারুন জানায়, প্রতিবছর চৈত্র মাসের ১৩ তারিখে যাদুকাটার জলে হিন্দুদের তীর্থস্নান হয়, যা ‘পনাতীর্থ’ নামে পরিচিত। তখন নদীটিতে তীর্থযাত্রীদের ঢল নামে।

ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। আবছা আঁধারে দূর থেকে ভেসে আসা ফুরফুরে বাতাস শরীরে লাগে। আকাশের মিটমিটে তাঁরার মতো দূরের মেঘালয় পাহাড়েও একটা-দুটা করে বাতি জ্বলে উঠতে থাকে। দিনের বেলা বোঝা না গেলেও পাহাড়ি বসতিগুলো রাতের আঁধারে ঠিকই চেনা যায়। দূরে যাদুকাটার খেয়াঘাট থেকে পারাপারের হৈচৈয়ের শব্দ ভেসে আসে। টিলার শুকনো ঘাসে বসে পড়ি। যাদুকাটার চঞ্চল স্রোত, বারিক টিলার বাঁশবনের ফুরফুরে হাওয়া আর মেঘালয় পাহাড়ের বিশালতার গহিনে টিমটিমে বাতিরা যেন আমাদের সঙ্গী হয়ে রয়।

ছবি : লেখক

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে সুনামগঞ্জ শহর পর্যন্ত বাস চলাচল করে। ভাড়া সাড়ে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে। এ ছাড়া সিলেট পর্যন্ত ট্রেনে এসে বাকিটা পথ বাসেও যাওয়া যাবে। সুনামগঞ্জ শহর থেকে মোটরসাইকেল বা সিএনজি অটোরিকশাও পাওয়া যায়। থাকার জন্য তাহিরপর উপজেলা সদরে কিছু গেস্টহাউস আছে। তবে দিনে দিনেই সুনামগঞ্জ শহরে ফেরা যাবে


মন্তব্য