kalerkantho


আপনার শিশু

নবজাতকের দেখভাল

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



নবজাতকের দেখভাল

জন্ম থেকে ২৯ দিন বয়স পর্যন্ত শিশুকে নবজাতক বলা হয়। এই কদিন শিশুর যত্নে মনোযোগী ও সাবধান থাকতে হয়। নবজাতকের পরিচর্যার পরামর্শ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নবজাতক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মান্নান

 

জন্মের পর

পরিষ্কার এক টুকরা বড় কাপড়ের ওপর শিশুকে নিতে হবে। আরেকটি নরম, পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত কাপড় দিয়ে নবজাতকের সারা শরীর মুছে দিতে হবে। মাথা থেকে শুরু করে গলা, ঘাড় ও কাঁধ ভালোভাবে মুছে দিতে হবে। এরপর বুক, পেট, পিঠ, হাত ও পা ভালোভাবে মুছতে হবে। একইভাবে আরেকবার সারা শরীর মুছতে হবে। গা মোছানো শেষ হলে নবজাতককে পরিষ্কার সুতি নরম কাপড় বা কাঁথা দিয়ে মুুড়িয়ে দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে, কাঁথার কিছু অংশ যেন মাথার ওপরের দিকে ও কিছু অংশ নবজাতকের পায়ের নিচের দিকে বাড়তি থাকে। মাথার ওপরের কাপড়ের বাড়তি অংশ দিয়ে নবজাতকের মাথা কপাল পর্যন্ত ঢেকে দিতে হবে। একইভাবে পা দুটি ঢেকে দিতে হবে। এবার নবজাতকের শরীরের দুই পাশের বাড়তি কাপড় দিয়ে বুক ও পেট ভালোভাবে ঢেকে দিতে হব। শিশুকে গরম রাখা ও খাবারের জন্য মায়ের কোলে নিয়ে শাল দুধ খাওয়াতে হবে। ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ হবে শিশুর খাবার। মধু, মিছরি মেশানো পানি—কিছুই প্রয়োজন নেই। বুকের দুধের মধ্যে পানি, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, চর্বি—সবই রয়েছে। মিনারেলস, ভিটামিন—এসবও আছে।

 

শিশুর বিছানা

বাইরের বাতাস সরাসরি আসে—এমন ঘরে শিশুকে রাখা ঠিক নয়। জন্মের পর প্রথম এক সপ্তাহ শিশুকে যতটা সম্ভব সরাসরি আলো ও বাতাস থেকে আড়ালে রাখতে হবে। পাতলা সুতি কাপড়ে শিশুকে জড়িয়ে রাখতে হবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন ঘেমে না যায়। নবজাতকের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। তাই কেউ কোলে নিতে চাইলে হাত ধুয়ে তারপর কোলে নিতে হবে। ঘাড় শক্ত না হওয়া পর্যন্ত ঘাড়ের নিচে এক হাত রেখে কোলে নিতে হবে। ওপর-নিচ করার সময় মাথা ও ঘাড়ের নিচে হাত রাখতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে, তাঁর শরীরে যেন বেশি ঝাঁকুনি না লাগে। শিশুকে জাগাতে চাইলে পায়ের তলায় সুড়সুড়ি দিতে পারেন। হাত ধরে টেনে তুলবেন না; বরং পিঠের নিচে হাত দিয়ে তুলুন।

 

ত্বক ও চোখের যত্ন

প্রথম এক মাস শিশুর শরীরে কোনো ধরনের তেল, সাবান, পাউডার বা প্রসাধনী ব্যবহার না করাই ভালো। শীতের শুষ্ক আবহাওয়ার বেবি অয়েল লাগাতে পারেন। জন্মের সময় শিশু তার ত্বকে একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষাপ্রাচীর নিয়ে জন্মায়। পাতলা সাদাটে এই আবরণ শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ছয়-সাত দিনের মধ্যে এই আবরণ এমনিতেই পরিষ্কার হয়ে যায়। তার আগে সাবান বা অন্য কোনো পরিষ্কারক দিয়ে ঘষে এই আবরণ পরিষ্কার করবেন না। অত্যন্ত সংবেদনশীল অঙ্গ চোখ। তাই সকালে মুখমণ্ডল পরিষ্কার করার সময় সাবধানে চোখ পরিষ্কার করুন। কুসুম গরম পানিতে নরম সুতি কাপড় ভিজিয়ে মুখ ও চোখ পরিষ্কার করতে হবে। একবার যে কাপড় চোখ পরিষ্কার করার জন্য ব্যবহার করা হয়, তা না ধুয়ে দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা উচিত নয়।

 

গোসল

শিশু মায়ের গর্ভে উষ্ণতায় থাকে। বাইরের বাতাসের সঙ্গে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে। তাই জন্মের পর তৃতীয় বা চতুর্থ দিন শিশুকে গোসল করানো ভালো। পানির মধ্যে স্যাভলন, ডেটল ও অন্য কোনো অ্যান্টিসেপটিক মেশানো ক্ষতিকর। সাবান কিংবা যেকোনো ধরনের বেবিসোপ প্রথম কয়েক সপ্তাহ ব্যবহার না করা নতুন ত্বকের জন্য নিরাপদ। শুধু কুসুম গরম পানিতে আলতো হাতে শিশুর নাক, কান, কানের পাশ, দেহের ভাঁজ ও সারা শরীর ধুয়ে দিন। গোসলের পর সঙ্গে সঙ্গে নরম তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে জীবাণুমুক্ত করে নেওয়া পোশাক পরিয়ে দিন। সুস্থ শিশুকে হালকা গরম পানিতে নিয়মিত গোসল করানো ভালো। তবে অসুস্থ হলে ডাক্তারের পরামর্শে গোসল করান। গোসল করানো বারণ থাকলে নরম কাপড় ভিজিয়ে শরীর মুছে দিন।

 

শিশুর পোশাক

শিশুকে সুতি ও নরম জামাকাপড় পরাবেন। পোশাক ঢিলেঢালা হওয়া ভালো। শিশুর পোশাকে বোতাম বা হুক না লাগিয়ে ফিতা লাগান। শিশুর ব্যবহারের কাপড়চোপড় ধোয়ার সময় খেয়াল রাখবেন, যেন সাবান লেগে না থাকে। কারণ ক্ষারজাতীয় জিনিস শিশুর ত্বকের জন্য ক্ষতিকর।

 

চুল

জন্মের পর এক মাসের আগে শিশুর চুল কাটানোর কোনো প্রয়োজন নেই। প্রথম এক মাস শিশুর মাথায় ব্লেড বা রেজার ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। শীতকালে জন্ম নিলে গর্ভস্থ চুল ঠাণ্ডা থেকে অনেকখানি বাঁচায়। তবে ফাঙ্গাস, অ্যালার্জি বা অন্য কোনো ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে মাথায় খুশকি বা মাথার চামড়া উঠলে চিকিৎসকের পরামর্শমতো ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রথম এক মাস তেল বা শ্যাম্পু ব্যবহারের আগেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

 

নাভির যত্ন

নবজাতকের নাভি ফেলতে হয় না। এমনিতেই শুকিয়ে নিজে নিজেই পড়ে যায়। জন্মের পর থেকে প্রথম পাঁচ দিন একটু সতর্ক থাকতে হবে। সদ্য কাটা নাভি শরীরে জীবাণু প্রবেশের একটি সহজ পথ। তাই নাভি সব সময় শুষ্ক রাখুন। কোলে নেওয়া বা দুধ খাওয়ানোর সময় নাভিতে যেন আঘাত না লাগে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। নাভি দিয়ে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হলে বা চারপাশের ত্বক লালচে হলে বুঝতে হবে, নাভিতে সংক্রমণ হয়েছে। তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।



মন্তব্য