kalerkantho


অন্য কোনোখানে

দুই চাকায় লাদাখ

সাগর রশিদ

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



দুই চাকায় লাদাখ

সেপ্টেম্বরে ঢাকায় বেজায় গরম। প্রাণ যায় যায় আর কী! তো গরম থেকে বাঁচতে আমরা লাদাখ যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম। আর এই সময়টাই হচ্ছে লাদাখ যাওয়ার যথাযথ সময়। কেননা শীতকালে বরফ পড়ে, লাদাখে যাওয়ার রাস্তাঘাট পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

দিল্লি থেকে উড়োজাহাজে করে হাজির হলাম লাদাখ। ভোরের ফ্লাইট ইচ্ছা করেই নেওয়া হয়েছিল। বিমান থেকে অসাধারণ সব দৃশ্য দেখা যায়। মেঘ দেখতে দেখতে বিমান নামল বিমানবন্দরে। আকার খুবই ছোট। নামার পর বুঝতে পারলাম এটা অন্য এক পৃথিবী। বিশ্বাস হচ্ছিল না, এ রকম সুন্দর জায়গাও আছে পৃথিবীর এই প্রান্তে? বিমানবন্দর থেকে গাড়ি করে চলে গেলাম লেহ শহরে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে শহরটি ১০ হাজার ফুট উঁচুতে। ব্যাপারটি বোঝানোর জন্য একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। যেমন : সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ঢাকা হচ্ছে মাত্র ৬০ ফুট উঁচুতে। হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম নিলাম, তবে ঘুমালাম না। কেননা লাদাখে দিনে ঘুমানো নিষেধ, শরীরে অক্সিজেন লেভেল কমে যায়। সকালের নাশতা করলাম ম্যাগি নুডলস দিয়ে। লাদাখে এটাই নাকি জাতীয় খাবার। সব জায়গায় এটাই খেতে হয়। কিন্তু এই হোটেলে ম্যাগি নুডলসটা আমাদের জীবনে খাওয়া সবচেয়ে মজার ম্যাগি নুডলস ছিল। খাওয়াদাওয়া করে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম আশপাশটি ঘুরে দেখতে। লেহ শহরটি অনেক ছোট্ট আর মোবাইল নেটওয়ার্কও খুব একটা ভালো নয়। শুধু মার্কেটে ভালো নেটওয়ার্ক আছে, আর ইন্টারনেট বলতে গেলে ওই শহর পর্যন্তই। শহরের পাহাড়ের ওপর একটি মন্দির আছে। সেই পাহাড়ে ওঠানামা করতে হয় হেঁটে। শহরে একটা জাদুঘরও আছে। সন্ধ্যায় মার্কেটের একটি কার্ট থেকে রাতের খাবার নিলাম। আর ওটাই ছিল আমাদের লাদাখ ভ্রমণের শেষ নন-ভেজেটেরিয়ান খাবার। এর পরের সাত দিন উদরপূর্তি করতে হয়েছে নুডলস আর সবজি জাতীয় খাবার দিয়ে। খাওয়াদাওয়ার পর মোটরবাইক ভাড়া নিতে গেলাম লেহ মার্কেট থেকে। রয়েল এনফিল্ড বুলেট ৫০০ সিসি। তর সইছিল না। রাতেই ওটা দিয়ে শহরটা আরেকটু ঘুরে দেখলাম। তারপর বাইক নিয়ে চলে এলাম হোটেলে।

তার পরের দিন সকালে শুরু করলাম আমাদের জার্নি। তিনটি মোটরবাইকে আমরা ছয়জন আরোহী। দুই পাশে পাহাড়। পাহাড়কে সাপের মতো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওপরে উঠে গেছে রাস্তা। রাস্তার এক পাশে খাদ, শ খানেক ফুটের গভীরতা তো হবেই। আমাদের প্রথম স্টপেজ পড়ল ‘চাংলা পাসে’। চাংলা পাস হচ্ছে পৃথিবীর দ্বিতীয় উঁচু মটোরেবল রাস্তা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭ হাজার ফুট উঁচুতে। ওখানে খাবার বিরতি, যথারীতি সেই ম্যাগি নুডলস। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। বেশি বেশি করে পানি আর প্রয়োজনমতো ওষুধ খেয়ে শরীরের অক্সিজেন লেভেল মেইন্টেন করে চলেছি। চাংলা পাস থেকে চলে গেলাম ‘হুন্দার’। এখানেই আমাদের এক রাতের বিরতি। এখানকার একটি ক্যাম্পে হয়েছিল আমাদের আশ্রয়। অসাধারণ এক সুন্দর জায়গা। হুন্দারের নুব্রা ভ্যালিতে আছে দুই কুঁজওয়ালা উট। ভারতের আর কোথায় দেখা মিলবে না এই উটের। চেঙ্গিস খাঁর আমলে নাকি এই উট প্রথমবাবের মতো ভারতে এসেছিল। পরের দিন আমাদের গন্তব্য ছিল টরুক টুক গ্রাম। এটা ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানের সীমান্তের শেষ গ্রাম। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলে ভারতীয় সেনাবাহিনী এক রাতের মধ্যে এই গ্রাম দখল করে নেয়। তারপর থেকে এই গ্রাম ভারতীয়দের দখলেই আছে। এই গ্রামে একটা কথা চালু আছে—এই গ্রামবাসী রাতের খাবার খেয়েছিলেন পাকিস্তানে আর সকালের নাশতা করেছেন ভারতে। গ্রাম গ্রামের জায়গায় থাকলেও দেশ বদলে গেছে। পাহাড়ের ওপর অসাধারণ এক গ্রাম টরুক টুক। গ্রামবাসীর জীবনও অন্য রকম। পাহাড়ের ওপরই তাদের সারাটা জীবন কেটে যায়। শীতকালে এরা ঘরবন্দি। কেননা সব রাস্তা বরফে যায় ঢেকে। গ্রামের প্রয়োজনীয় সব রসদ আগে থেকে মজুদ থাকে। আর কর্মজীবী মানুষ শহরে চলে যায় অন্য কাজ করার জন্য। এই গ্রামের মানুষের আয় হয় পর্যটনের মাধ্যমে। নিজেদের বাসাবাড়িটাই হোটেলের মতো ভাড়া দেয়, কেউ বা আবার রেস্টুরেন্ট চালাচ্ছে। গ্রামটা ঘুরে আবার হুন্দার চলে এলাম। সেখান থেকে আবার গেলাম ‘পেঙ্গন লেক’। ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমার শেষ দৃশ্যে যে লেকটা দেখা যায়, এটাই হচ্ছে সেই জায়গা। এই লেকটি যে কী ‘ভয়ংকর’ সুন্দর তা না দেখলে বোঝা যাবে না। পেঙ্গন লেকের পানির রংও অসাধারণ। সূর্যের আলোতে এর রং যায় বদলে। লেক ভ্রমণ শেষে খারদুংলা পাস দিয়ে লেহ শহরে ফিরে আসি। খারদুংলায়ই বরফ পাওয়া যাবে। কারণ খারদুংলায়ই হচ্ছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ উঁচু মটোরেবল রাস্তা। ১৮ হাজার ফুট উঁচুতে। এখানে তুষারপাতও হয়। পরে হিসাব কষে দেখলাম মোটরবাইকে ৮০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছি। লাদাখে ঘোরাঘুরির জন্য মোটরবাইক ছাড়াও চার চাকার গাড়িও ভাড়া পাওয়া যায়। তবে সেই ভ্রমণে মোটরবাইকের মতো আনন্দ হবে না।

কিভাবে যাবেন

বাংলাদেশ থেকে কলকাতা। কলকাতা থেকে দিল্লি কিংবা সরাসরি লাদাখ যাওয়া যায়। বিমানবন্দরটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর হওয়ায় এখানে ছবি তোলা নিষেধ। লাদাখে ঘুরতে অনুমতি লাগে। স্পটের উপর নির্ভর করবে খরচ। সেটা ৭০০-১০০০ রুপি হতে পারে। রয়েল এনফিল্ড বুলেট ৫০০ সিসির প্রতিদিনের ভাড়া ১৩০০-১৬০০ রুপি।



মন্তব্য