kalerkantho


অন্য কোনোখানে

পাখিদের দঙ্গলে

সুমন্ত গুপ্ত   

৮ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পাখিদের দঙ্গলে

তািনভীর ভাইয়ের কাছে পাওয়া গেল সালুটিকর বাজারের খোঁজ। সিলেটের এ জায়গায় নাকি একটি পাখির বাগানই আছে। বিভিন্ন প্রজাতির পাখির দেখা মেলে। শুক্রবার দেখে বেরিয়ে পড়লাম সেই বাগানের উদ্দেশে। সঙ্গী হলেন বাগানের খোঁজ দেওয়া তানভীর ভাই। তিনি আগেই জানিয়েছিলেন, সিলেট শহর থেকে এক ঘণ্টার মতো সময় লাগে ওখানে পৌঁছতে। হিসাব-নিকাশ করে ২টার দিকেই বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। যথাসময়ে শুরু হলো যাত্রা। রাস্তায় তেমন একটা যানজট নেই। জিন্দাবাজার, চৌহাট্টা, আম্বরখানা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের গাড়ি। শহর ছেড়ে লাক্কাতুরা চা বাগানের দিকে ঢুকতেই বেশ ঠাণ্ডা অনুভব করলাম। আমাদের গাড়িচালক পলাশ ভাই হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘দাদা লাক্কাতুরা চা বাগানের পরে মালিনীছড়া চা বাগানে একটি রাবারবাগান আছে। অনেকেই আসেন এটা দেখতে। যাবেন নাকি?’ উত্তরে বললাম, ‘এটার কথা আগেও শুনেছি। কিন্তু সময় আর সুযোগের অভাবে ওখানে যাওয়া হয়নি। ফিরতি পথে সময় থাকলে না হয় ঘুরে যাব।’ দৃষ্টি গেল গাড়ির বাইরে। চাগাছে নতুন পাতা এসেছে। আর তাতেই চা বাগান সেজেছে নতুন রূপে। দেখতে বেশ লাগছে। বিমানবন্দর এলাকা পেরিয়ে ধুপাগুলের দিকে ঢুকতেই মনে হলো এখানকার রাস্তা খুব কষ্টে আছে। বড় বড় পাথরবোঝাই ট্রাক যাওয়া-আসা করে কি না এর ওপর দিয়ে। রাস্তার কষ্টের সঙ্গে আমরাও একাত্মবোধ করলাম। আসলে না করে উপায়ও ছিল না। এই রাস্তা দিয়ে যেতে হচ্ছে কি না। ঝাঁকুনিতে আমাদের বারোটা বেজে যাওয়ার দশা। তবে আশার কথা শোনালেন পলাশ ভাই, ‘রাস্তার কাজ শুরু হয়েছে, শেষ হলে আর কষ্ট পোহাতে হবে না।’ তার নমুনাও দেখতে পেলাম। এরই মধ্যে কিছু কিছু অংশে কাজও শুরু হয়ে গেছে।

খানিক বাদে পৌঁছলাম সালুটিকর বাজারে। জায়গাটা গোয়াইনঘাট উপজেলায় পড়েছে। স্থানীয় একজনকে জিজ্ঞেস করতেই পাওয়া গেল সেই পাখি বাগানের হদিস। অনুমতি নিয়ে পাখি বাগানে ঢুকলাম। ঢুকতেই দেখা পেয়ে গেলাম হরেক রকমের পাখির। ওদের কলকাকলীতে চারপাশটা মুখরিত। খাঁচার ভেতরে কয়েকটি হরিণেরও দেখা মিলল। ওদের পাশের খাঁচায়ই আছে বেশ কিছু বানর। লম্ফঝম্পতে ব্যস্ত। আমাদের মতো অনেকেই এখানে এসেছেন ঘুরতে। এখানকার স্থানীয় রহিম মিয়ার সঙ্গে কথা হলো। তিনি জানালেন, এই বাগানের মালিক নুরুদ্দিন বাজারে গেলেই পাখি কিনতেন। কখনো এক জোড়া, কখনো বা চার-পাঁচ জোড়া। বাড়িতে এনে সেগুলোকে দিতেন ছেড়ে। নুরুদ্দিন বলতেন, ‘পাখির জায়গা খাঁচায় না, আকাশে।’ তবে সব পাখি কিন্তু চলে যেত না। কিছু পাখি তাঁর তিন একর বাড়িসংলগ্ন বাগানে স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে নাম লেখায়। ওদের দেখাদেখি আরো পাখি আসতে থাকে। দিন যত গেছে পাখির সংখ্যা ততই বেড়েছে। নুরুদ্দিনের বাড়ি থেকে পাখিদের খাবারও দেওয়া হয়। পাশাপাশি আছে নিরাপত্তাও। এই বাড়ির কেউ-ই পাখি শিকার করে না। শুধু তাই নয়, বাইরে থেকেও কেউ এই বাড়িতে পাখি শিকার করতে আসে না। তাদের ধারণা, কেউ এ পাখি শিকার করলে এই বাড়ি থেকে বের হতে পারবে না। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে মারা পড়বে! ফলে নিশ্চিন্তে উড়ে বেড়াচ্ছে পাখির দল।

আজ নুরুদ্দিন সাহেব নেই। কিন্তু তাঁর আশ্রয় দেওয়া পাখির বংশধররা বেশ আনন্দেই আছে এই অভয়াশ্রমে। নুরুদ্দিন সাহেবের ছেলে বাড়ির দেখভাল করেন। তাঁকে খুঁজছিলাম কিন্তু আমাদের ভাগ্য খারাপ, বিশেষ কাজে ঢাকায় গিয়েছেন তিনি। পুরো বাগান ঘুরে দেখতে লাগলাম। একেকটি গাছে প্রায় ২০-২৫টি পাখি নিজেদের মতো করে সাজিয়েছে বাসা। কোনো বাসায় ডিমে তা দিচ্ছে মা পাখি। আর কোনো বাসায় ছোট-বড় আকারের ফুটফুটে বাচ্চারা কিচিমিচির করছে খাবারের জন্য। সন্তানের মুখে সরু ঠোঁটের আদর মাখা খাবার তুলে দিচ্ছে পাখিরা। সবই দেশীয় প্রজাতির পাখি।

আকাশের মন ভালো নেই, তাই ছবি তুলতেও বেশ কষ্ট হচ্ছিল। সবুজ পাতা ও বাঁশঝাড়ের ফাঁকে খড়কুটো দিয়ে আপন মনে ঘর সাজিয়ে বসবাস করছে বক, পানকৌড়িসহ বিভিন্ন জাতের ডানামেলা পাখির দল। রহিম মিয়া বলছিলেন, ভোরের সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই দলবদ্ধ হয়ে খাবারের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে পাখিরা। সূর্যাস্তের আগেই বাচ্চাদের জন্য খাবার নিয়ে নীড়ে ফিরে আসে তারা। পাখিদের বংশবিস্তারের সময় (বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত) লতাপাতা আর খড়কুটো দিয়ে গাছের মগডালে তৈরি করা হয় অস্থায়ী বাসা। সেখানেই ডিম পাড়া থেকে বাচ্চাদের যত্ন সহকারে লালন-পালনের কাজগুলো করা হয়ে থাকে। শীতের সময় পাখির সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। অতিথি পাখিরা তখন হাজির হয়। নানা প্রজাতির দেশি-বিদেশি পাখির কলকাকলীতে মুখরিত এই বাগানে প্রতিদিন পাখিপ্রেমী মানুষের ভিড় লেগেই থাকে। আরো খানিকটা সময় কাটিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম। একটু আগেভাগেই রওনা দিতে চেয়েছি। আলো থাকতে থাকতে রাবারবাগানটা ঘুরে দেখতে চাই। কোনো ঝামেলা ছাড়াই মালিনীছড়া চা বাগানে এসে পৌঁছলাম। কিন্তু রাবারবাগানের পথ খুঁজে পাচ্ছি না। শরণাপন্ন হলাম গুগল ম্যাপের। সেখানেও মিলল না কোনো হদিস। আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন স্থানীয় একজন। তাঁর বাতলে দেওয়া পথ ধরে আরেকটু সামনে গিয়ে দুটি গেট পার হয়েই হাজির হলাম রাবারবাগানে। অনুমতি নিয়ে ঢুকলাম বাগানের ভেতরে। তানভীর ভাই বললেন, ‘পাহাড়ি রাস্তা, ভেতরে একা যাওয়াটা ঠিক হবে না। রাস্তা চেনে এমন কাউকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। একজনকে পেয়েও গেলাম। বকশিশের প্রস্তাব দিতেই তিনি রাজি। এবার তাঁকে নিয়ে রওনা হলাম। আমাদের পথপ্রদর্শক সুনীল বাউরি। জানালেন, এই বাগানেই তাঁর বসবাস। রাবারবাগান দেখতে আজকাল অনেকেই আসেন। বাগানের পথ বেশ ভালোই লাগছে। আঁকাবাঁকা পথ ধরে হেঁটে হাজির হলাম রাবারবাগানে। অসাধারণ পরিবেশ। চারপাশে লম্বা লম্বা গাছ আর তার মাঝ দিয়ে হেঁটে চলেছি। এই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমরা যেন হারিয়ে গেলাম অন্য এক জগতে। সুনীল জানালেন, বছরের একেক সময়ে এই রাবারবাগান একেক ধরনের রূপ ধারণ করে। চলার পথে রাবারগাছ থেকে রাবার সংগ্রহের পদ্ধতি দেখলাম। ছোট ছোট পাত্রে সংগ্রহ করা হচ্ছে রাবারগাছের কষ। এটা দিয়েই পরে নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে রাবার তৈরি করা হয়। এদিকে সূর্যদেব বাড়ি ফেরার পথ ধরেছেন। আমরাও আর দেরি না করে শহরে ফেরার পথ ধরি।

ছবি : লেখক

 

কিভাবে যাবেন

সিলেট শহর থেকে মাত্র ১৩-১৪ কিলোমিটার দূরে ছালিয়া গ্রামে এই পাখি বাগানের অবস্থান। এরপর চাইলে মালিনীছড়া চা বাগানে অবস্থিত রাবারবাগান থেকেও ঘুরে আসতে পারেন।



মন্তব্য