kalerkantho


অন্য কোনোখানে

টোকিও ডায়েরি

মোস্তফা মহসীন

১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



টোকিও ডায়েরি

ব্যাংককের সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুবিশাল লবিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। মূল গন্তব্য জাপান। ওখানে যাচ্ছি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবীদের সম্মেলনে, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে। ব্যাংকক টু টোকিও কানেকটিং ফ্লাইট। ব্যাংককে দুই ঘণ্টার যাত্রাবিরতি। সময়টাকে কাজে লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এর মধ্যে ইমোতে ফোনকল। অপরপ্রান্তে দেশি ভাই কাজল মজুমদার। জাপানের নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জাপানি সহধর্মিণীসহ আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। ওখানে তিনি ও জাপানি সহধর্মিণী দুজনই উদ্গ্রীব হয়ে জানতে চাইলেন, কখন পৌঁছাবে আমার উড়োজাহাজ?

শেষমেশ ভোর ৬টায় পৌঁছে গেলাম জাপানে। আমাদের সম্মেলন ভেন্যু টোকিওর হোটেল হিলটনে। থাকার বন্দোবস্তও একই হোটেলে। কিন্তু প্রিয়জনদের আবদার কি আর ফেরানো যায়! অগত্যা উঠতেই হলো কাজলদার বাসায়।

এখন যাচ্ছি টোকিওর বৃহত্তম বাণিজ্যিক এলাকা কিংসশিখোতে। এ জন্য চড়ে বসলাম জেআর সবুলাইনের (টোকিওর মেট্রো ট্রেন) হলুদ রঙের ট্রেনে। সময়সচেতন জাপানিরা যে বর্ণময় জাতি, তা ওদের পোশাক, আভিজাত্য আর ট্রেনে চড়া দেখেই বোঝা যায়। যেমন অঞ্চলভেদে তাদের ট্রেনের রংটাও আলাদা। ফলে ভিন্নভাষী মানুষের বিভ্রান্তিতে পড়ার সুযোগ কম! অল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছে গেলাম কিংসশিখোতে। এই বাণিজ্যিক এলাকায় শপিং কমপ্লেক্স ছাড়াও রয়েছে অসংখ্য নাইট ক্লাব আর বার। কাজলদার সঙ্গে গল্প করতে করতে সেই মধ্য রাতেই ঢুকলাম একটি বারে। বারগার্ল এসে অভ্যর্থনা জানাল। আগন্তুকের রুচি অনুযায়ী টেবিলে টেবিলে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মদ ঢেলে দিচ্ছে। এই বারগার্লরা আবার সাদা চামড়ার দেশ পোল্যান্ড, রুমানিয়া, রাশিয়া থেকে আগত। এখানে খদ্দেরকে যত বেশি টেবিলে বসিয়ে রাখা যায়, তত লাভ! বিশ্বে বিস্তর ইজ্জত আছে জাপানিজদের, অথচ এ দেশের ৪০ শতাংশ বিবাহিত পুরুষ বউকে লুকিয়ে ফুলে ফুলে মধু খেয়ে বেড়ায়! এমনও হয়েছে প্রমোদে মজে সারা মাসের মাইনে দিয়ে যায় বারগার্লদের। তাদের খুব পছন্দ সাদা চামড়ার নারী! এক বুড়ো জাপানিজ আমাকে বুক ফুলিয়ে জানালেন, তাঁর প্রথম বউটা ছিল এক রুশ। বছরখানেক ঘরসংসার করার পর ডিভোর্স দিয়েছে। তবু স্মৃতি তাঁকে তাড়িত করে প্রতিক্ষণ। আর তাই তো মানিব্যাগে যত্ন করে রেখেছেন প্রথম বউয়ের ছবিখানা।

টোকিও স্কাইট্রিতে লেখক 
জাপানিদের সঙ্গে আমাদের কিছু মিলও রয়েছে। বলা যায়, আমাদের মতো জাপানিরাও ‘ভেতো’! তাই বলে ওদের কেউ ‘ভেতো-জাপানি’ বলে না! ভাত খেয়ে আমাদের মতো বোধ হয় ঘুমায় না। তাই বোধ হয় ওদের ভুঁড়িটাও বাড়ে না! আমার সামনেই এক ভারতীয় হোটেলে এক জাপানি অনায়াসে স্টিলের বাটিতে রাখা ১৫০ গ্রামের মতো আঠালো ভাত, একটি সিদ্ধ করা সাগরের মাছ, সঙ্গে পর্যাপ্ত সস, এক টুকরো বেগুন, কিছু শসা-টমেটোর মতো সালাদ চপস্টিক দিয়ে সাপটে দিল! কেউ কেউ খাবার শেষে জুসও নিচ্ছে। সেই তালিকায় দই, আইসক্রিমও বাদ পড়ে না। পাড়ার মোড়ে মোড়ে রয়েছে অল্প পয়সার কয়েনের সাহায্যে নানা জাতের কোমল পানীয়, বিয়ার গলাধঃকরণের সুবিধা। পানির দামের চেয়ে অনেক সস্তা এসব বিয়ার।

আগন্তুক হয়ে থাকার মধ্যে এক ধরনের আনন্দ আছে। জীবনকে উপভোগ্য করে তুলতে বিদেশ-বিভুঁইয়ে ইচ্ছা করেই পথ হারিয়ে ফেলি! পথে যে অচেনা নারী আমাকে দেখে এক গাল হাসে, তার কাছে ছুটি নীড়হারা পাখির মতো। ঠিকানা খুঁজে পেতে পেতে পরিচয়পর্ব সারি। মুগ্ধতা মাখানো সারল্যে আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন একজন, মিচিকো সাকুরা। ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের ছাত্রী। উন্নত জীবনযাপন সত্ত্বেও জাপানিদের মধ্যে অহংকারের মাত্রা অত্যন্ত কম। মানব ধর্মকেই তারা বড় করে দেখে। রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতর ধর্ম যে অচল সে প্রসঙ্গে আলাপ করতে করতেই মিচিকো ওসাকা জানায়, এখানে ধর্মীয় উত্সবের চেয়েও বড় হচ্ছে নববর্ষ উদ্যাপন। নতুন স্যুট-কোট-টাই-জুতা পরে পুরুষরা উন্মাতাল হয়, নারীরা হাল ফ্যাশনের পাশ্চাত্য পোশাক পরে নাচ-গান, আনন্দ-খুনসুটিতে ভাসিয়ে দেয় দিনটাকে। পুরো টোকিও ঘুরলে আপনার কাছে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি দৃশ্যমান হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্যবসায়িক বুদ্ধির সঙ্গে শান্তির বাণী যোগ করে কর্মচঞ্চল এই নারীরাই এগিয়ে নিয়েছে জাপানের অর্থনীতিকে। বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, ফ্যাশন হাউস, কফি হাউস, হোটেল-মোটেল সর্বত্রই নারীদের ব্যাপক পদচারণ। ‘জাপানি নারী’ আজ তাই দুনিয়ায় এক ব্র্যান্ড; যাদের আতিথ্য লাভের জন্য বিদেশি পর্যটক আর আমেরিকান পুরুষরা উন্মুখ। বাঙালি যুবক আমি তো আগে থেকেই জানি সেই প্রবাদবাক্য ‘আমেরিকান বাড়ি, চীনা খাবার আর জাপানি বউয়ের শ্রেষ্ঠত্ব’!

বাংলাদেশে ঈদের দিন ছিল ২ সেপ্টেম্বর। প্রবাসীদের অনেকেই দেখলাম কর্মস্থল থেকে ছুটি নিয়েছেন। কিংসশিখোর স্থানীয় মসজিদে ঈদের নামাজ আদায়ের পর ‘টোকিও স্কাইট্রি’ দেখতে গেলাম। সঙ্গ দিতে হাজির ছিলেন কাজলদা ও তাঁর এক বন্ধু হক রোকন। স্কাইট্রির লিফলেট পড়ে জানলাম, এটি বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম ভবন। মূলত টেলিভিশন সম্প্রচার আধুনিকায়নের জন্য জাপান সরকার ২০০৬ সালে এটি নির্মাণের পরিকল্পনা করে। ২০১২ সাল থেকে পর্যটকদের জন্য এটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বিশ্বের দ্বিতীয় উচ্চতম ভবনের ওপর থেকে টোকিও শহরটা দেখে মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল। নানা দেশের মানুষের জটলা এখানে। কেউ সেলফি তোলার সুযোগ হারাতে চায় না। এই টাওয়ারে হয়তো জীবনে দ্বিতীয়বার আসা হবে না—এটা ভেবে লিফটে প্রতিটি ফ্লোর একবার করে ঢু মেরে আমিও কিছু ছবিও তুলে নিলাম।

চেরি দেখতে শিনজুকু পার্কে
পুরান ঢাকার ওয়ারীর ছেলে কাজল মজুমদার। ২৭ বছর আছেন এই জাপান মুলুকে। জাপানি ভাষা বলেন বাংলার চেয়েও স্বাচ্ছন্দ্যে। তিনি আমাকে জানালেন জাপানিদের ঐতিহ্যবাহী নগ্ন স্নান সম্পর্কে। ‘পাবলিক বাথ’ সম্পর্কে উত্সাহ বেড়ে গেল। এখানে প্রতিটি তিনতারকা থেকে পাঁচতারকা মানের হোটেলে অত্যাধুনিক সুবিধাসংবলিত ‘পাবলিক বাথ’ আছে। হোটেলের বাইরেও প্রতিটি শহরে আছে এ ধরনের পাবলিক বাথ। জীবাণুমুক্ত থাকার জন্য এখানে কেউ কাপড় পরে গোসল করে না। মহিলা আর পুরুষদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা। তবে অনেক জায়গায় দেখেছি ছেলে-মেয়েরাও একসঙ্গে গোসল করে, এমনকি বাপ-ব্যাটা বা পুরো পরিবার একসঙ্গে নগ্ন হয়ে গোসল করে। লকারে পোশাক রেখে ঢুকতে হয় শাওয়ার এরিয়ায়। ঢুকেই শ্যাম্পু, বডি লোশন দিয়ে গোসল করতে হয়। তারপর বিশাল জাকুজি সুইমিং পুলে কমপক্ষে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট থেকে আরেকটি অংশে ৪০ ডিগ্রির অনেক বেশি তাপমাত্রায় বসে থাকতে হয়। এরপর সাউনায় একটি কক্ষে ৮০ থেকে ৯০ ডিগ্রি তাপে আরো ১৫ মিনিট। সবশেষে ঠাণ্ডা পানির সুইমিং পুলে গোসল সেরে আবার শাওয়ার। এসব গোসলে ১৬ বছরের ছেলে থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ পর্যন্ত থাকে। কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। সবাই সাবলীল। তবে এসব কিছুর জন্য কোনো অর্থ খরচ করতে হয় না; শুধু লকারের জন্য ১০০ ইয়েন ছাড়া।

জাপানে এসেছি অথচ চেরিফুল দর্শন হবে না—তা কি হয়? আশ্চর্য! ট্রেনে যেতে যেতে কোথাও চেরিফুল চোখে পড়ল না। জাপানের চেরি দেখতে তাই ঢুকতেই হলো শিনজুকু পার্কে। পৃথিবীর যত রাষ্ট্রনায়ক জাপান সফরে আসেন, তাঁদের সবাইকে নিমন্ত্রণ করে আনা হয় এই চেরির বাগানে। জাপানের জাতীয় অগ্রগতিতে এই চেরি তাই শৌর্য ও সজীবতার প্রতীক। চেরিফুলকে এখানে তুলনা করা হয় ‘সামুরাই’ যোদ্ধাদের সঙ্গে।

এক সপ্তাহের জাপান ভ্রমণ শেষে দেশে ফিরতে হবে। বিমানের সিটবেল্ট বাঁধতে বাঁধতে মনটা বিষণ্ন হলো। প্রাপ্তির হিসাব কষলে টোকিও আমাকে দিয়েছে উজাড় করে। অভিজ্ঞতা, বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক উত্কর্ষ, নিয়মানুবর্তিতা—যা এ জীবনে বিস্মৃত হওয়ার নয়।


মন্তব্য