kalerkantho


অন্য কোনোখানে

দ্যোতংপাড়ায় গয়ালের ঘরে

তুষার কাব্য   

৪ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



দ্যোতংপাড়ায় গয়ালের ঘরে

থানচি থেকে বোর্ডিংপাড়া পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই ছিল। চারজনের ছোট্ট দল আমাদের।

বোর্ডিংপাড়া থেকে শেরকরপাড়া আসার পথে সেই রকম একটা ডেড এন্ড পার হয়ে এসেছি। ওপর থেকে কয়েকটা গাছের তৈরি মইয়ের সিঁড়ি বেয়ে নামতে হয়েছে তখন। সে এক দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা। এভাবেই মধ্য দুপুরে পৌঁছে গেলাম শেরকরপাড়ায়।

ওখানে গিয়ে দেখা করলাম পাড়ার কারবারির সঙ্গে। তাঁর কাছ থেকে দুজন গাইড চাইলাম। কিন্তু তিনি খুঁজে খুঁজে এমন দুজনকে আনলেন যাদের পরে আমাদেরই রাস্তা চিনিয়ে নিতে হয়েছিল। যা হোক, ওদের নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। দিনের আলো ফুটতে তখনো ঘণ্টাখানেক বাকি।

কিছু দূর ওঠার পর বুঝতে পারলাম আজ আমাদের কপালে খুব দুঃখ আছে! পুরো পাহাড়ের ট্রেইলটা ধুলায় মুড়ে আছে। যেখানেই পা রাখছি, সেখানেই পিছলে যাচ্ছি। আর পাহাড়টা এতটাই খাড়া যে একবার পিছলে গেলে সোজা নিচে (নাকি ওপরে!) চলে যেতে হবে। সবচেয়ে ভয়ংকর যে ব্যাপারটা তা হলো, এই পাহাড়ে কোনো গাছ নেই; উপরন্তু ধুলারাজ্য যেন আমাদের জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই ব্যাপারটা যখন সবার মাথায় ঢুকে গেল, তখনই সবার কাঁপাকাঁপি শুরু হয়ে গেল। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম ‘বিড়ালনীতি’ অবলম্বন করব। বিড়ালের মতো দুই হাতে সামনে খামচে ধরে হামাগুড়ি দিয়ে উঠতে থাকব। কিছুতেই সোজা হওয়া যাবে না, তাহলে ব্যাকপ্যাকের ওজনের টানে হাজার ফিট নিচে চলে যেতে হবে। এ অবস্থায় ব্যাকপ্যাকগুলোকে আমাদের শত্রু মনে হতে লাগল। কিছুতেই ওসব নিয়ে ওপরে উঠতে পারছিলাম না। ইচ্ছা করছিল ফেলে দিই সব। সেটা তো আর সম্ভব নয়। একজন গাইডকে পাঠালাম একটা একটা করে ব্যাকপ্যাক ওপরে রেখে আসতে। ওরাও বলতে লাগল, এ রকম ভয়ংকর পাহাড়ে নাকি এর আগে তারাও ওঠেনি। আর রাস্তাটি বেশি ভয়ংকর হয়ে ওঠার কারণে গয়ালরা নাকি ঠিক ওই রাস্তাই ব্যবহার করে তাদের জগিংয়ের রুট হিসেবে! ওরা সদলবলে রেস খেলে রাস্তাটিকে জাহান্নাম বানিয়ে ফেলেছে।

ব্যাকপ্যাক খুলে ফেলার পর ওপরে ওঠা অনেকটাই সহজ হয়ে গেল আমাদের জন্য। মস্ত এক পাথর যেন নেমে গেছে পিঠ থেকে। পাশাপাশি শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণটাও যেন চলে এসেছে। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে শরীর থেকে মনের ওপর আত্মবিশ্বাস থাকা বেশি জরুরি। সেটাও ফিরে পেলাম ধীরে ধীরে এবং একসময় ঠিকই জয় করে ফেললাম সেই দুর্গম পথটাকে। ওপরে উঠে সোজা হতেই অবাক হয়ে গেলাম। আমাকে অভ্যর্থনা জানাতে সেখানে তিন-তিনটি গয়াল অপেক্ষমাণ! আমাদের চেয়ে মনে হয় ওরাই বেশি হতবাক! ওদের দুনিয়ায় এ আবার কোন আজব চিড়িয়া অনুপ্রবেশের ধান্দা করছে! মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না! আস্তে আস্তে ওদের চেহারায় সে রকম পরিবর্তন দেখলাম। বুঝতে পেরে মানে মানে কেটে পড়লাম ওখান থেকে! কিছুটা সামনে দৌড়ে গিয়ে বাকিদের ধরলাম। গয়ালের কথা বলতেই ওরা বেশ অবাক। ওরা নাকি গয়ালদের দেখেইনি!

আরেকটু সামনে এগিয়ে গিয়ে দ্যোতংপাড়াকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পেলাম। ভাঙা ঘরবাড়ি ফেলে সবাই চলে গেছে। কারণটাও পরিষ্কার। আশপাশে কোনো ঝরনা বা নদী নেই যে ওখান থেকে পানি আনা যায়। পরে জানলাম, যে পাড়াটা আমরা পেছনে ফেলে এসেছি ওটাই সাবেক দ্যোতংপাড়া আর বর্তমানে ওটা নতুন পাড়া হিসেবে পরিচিত। সবাই শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। সঙ্গে যা খাবার আছে তা নিয়ে বসলাম। পানি যা ছিল সব শেষ করে ফেললাম। শেষে দুই গাইড গিয়ে নতুন পাড়া থেকে পানি নিয়ে এলো। সেই সঙ্গে উপহার হিসেবে বেশ কিছু কলাও নিয়ে এসেছে ওরা।

পাহাড়ের শেষ চূড়ায় ক্যাম্প করলাম। এরপর ব্যস্ত হয়ে পড়লাম রান্নার কাজে। নুডলস দিয়ে ডিনার সারব আজ। এই নির্জন জনারণ্যে আগুন ধরাতে গিয়ে নিজেদের কেমন যেন ‘বেয়ার গ্রিল-বেয়ার গ্রিল’ মনে হচ্ছিল! চারপাশ অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মোড়ানো। খানিক বাদে রান্না শেষ। আর রান্নাটাও যা হয়েছে না! যা-ই খাচ্ছি তা-ই মনে হচ্ছে যেন অমৃত। শরীর-মন চাঙ্গা করার জন্য সব শেষে ছিল কফি। খাওয়াদাওয়া শেষ। এবার প্রকৃতির দিকে নজর দিলাম। চারপাশ ধবধবে সাদা হয়ে আছে। আমাদের জন্য পূর্ণ যৌবনা চাঁদ যেন তার সবটুকু সৌন্দর্য মেলে দিয়েছে। রাতটা শীতের হলেও খোলা আকাশের নিচে সেই গভীর রাত পর্যন্ত চলল জম্পেশ আড্ডা। এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

বেশ রাত করেই ঘুমাতে গেলাম। মাচার তিন পাশে তিনটি তাঁবু ফেললাম। এরই মধ্যে এক পাশে দুই গাইড তাদের শয্যা প্রস্তুত করে ফেলেছে। ‘শুভ রাত্রি’ জানিয়ে সবাই যার যার তাঁবুতে ঢুকে গেলাম। তাঁবুতে ঢুকলে কী হবে, ঘুম বাবাজির দেখা নেই। সারা দিনের দুর্গম যাত্রার ছবি ভাসতে লাগল চোখের সামনে। চোখের পাতা দুটি একটু লেগে আসতেই হঠাত্ শুনতে পেলাম মানুষের চাপা চিত্কার। নিচু গলায় জানতে চাইলাম ব্যাপার কী? একটা কণ্ঠস্বর বলে উঠল, ‘কথা বলিস না। কেউ মনে হয় আমাদের ক্যাম্পের চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ’ বুঝতে পারলাম না এই নির্জন পাহাড়ে কে বা কারা আসতে পারে! বিষয়টা ভালোভাবে বোঝার জন্য কান পাতলাম। ঠিকই তো। দপদপ পায়ের শব্দের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। অনেকগুলো পা আমাদের চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রথমে মনে হলো ডাকাতের দল বুঝি। আবার ভাবছি এত গভীর পাহাড়ে ওরা আসবে কিভাবে! ফিসফিস করে ডাকলাম বাকিদের। কিন্তু ঘুমের ঘোরে থাকায় সবার সাড়া পাওয়া গেল না। গাইডদের ডেকে তুললাম। একটু পর আর কোনো পায়ের আওয়াজ পেলাম না। মনে হলো কেউ বা কিছু একটা এসেছিল; কিন্তু আবার চলেও গেছে। আমাদের বিজ্ঞ গাইডদের দাবি, নিজেদের আস্তানায় ক্যাম্প করায় বোধ হয় আমাদের দেখতে এসেছিল গয়ালের দল। কেউ যদি রাতে ঘুমাতে এসে দেখে নিজের ঘরে অন্য কেউ ঘুমিয়ে আছে, তাহলে কেমন লাগে বলুন? ভাগ্যিস ওদের মাথা ঠাণ্ডাই ছিল কিংবা ওরা হয়তো খুব উদার প্রকৃতির ছিল। না হলে রেগে গিয়ে আমাদের তাঁবুতে দু-চারটি লাথি চালিয়ে দিলে আমাকে আজ আর এ লেখা লিখতে হতো না। উত্তেজনা খানিকটা কমে এলে আবার ফিরে গেলাম তাঁবুতে। এরপর কোনো ঝামেলা ছাড়াই সেই রাতটা পার করতে পেরেছিলাম।

কিভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে বান্দরবান যাওয়ার অনেক পরিবহন আছে। বাস ছাড়ে কলাবাগান, ফকিরাপুল থেকে বিভিন্ন সময়ে। বান্দরবান নামার পর যেতে হবে থানচির বাসস্ট্যান্ডে। বাজেট কম হলে থানচির বাসে উঠে পড়ুন। প্রতি ঘণ্টায় সেখান থেকে বাস যায় থানচির পথে। ভাড়া ২০০ টাকার মতো। আর বাজেট বেশি হলে একটু দরদাম করে একটা চান্দের গাড়ি ঠিক করে ফেলুন। চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যাওয়ার কথা। থানচি নেমে একজন ভালো গাইড খুঁজে নেওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

ছবি : লেখক


মন্তব্য