kalerkantho


রঙিলা কাঠমাণ্ডু

তারেক অণু   

১৪ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০



রঙিলা কাঠমাণ্ডু

থামেলের সন্ধ্যা, সকালের বাজার, দোকানিদের লম্বা ঝাডু, পূজার ঘণ্টাধ্বনি, তরকারির সুঘ্রাণ, পাটানের নির্জনতা, মন্দিরের বানর, মুখোশ মেলা, মোমো, সাপুড়ের বীণ, জটাধারী সাধু, রাস্তার ভিড় এবং আরো অনেক কিছু মিলিয়ে কাঠমাণ্ডু।

পর্যটকদের জন্য নেপাল খুবই নিরাপদ। মিছিল, হট্টগোল লেগে থাকলেও পর্যটকদের ব্যাপারে নমঃ নমঃ । উপরন্তু আমরা বাংলাদেশি। নেপালিরা বাঙালিদের খুব পছন্দ করে।

উঠেছি থামেলে। এই থামেলকে বিশ্বের সবচেয়ে বর্ণিল স্থান বলেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পর্বতারোহী রেইনহোল্ড মেসনার। সরু সরু সব গলি। প্রতি গলিতেই জাত-বেজাতের পণ্য- ভয়ংকরদর্শন তিব্বতি মুখোশ থেকে শুরু করে হাতির দাঁতের তৈরি জপযন্ত্র। এরপর মসলা, অলৌকিক ধ্বনি সৃষ্টিতে সক্ষম ধাতবপাত্র মানে সিংয়িং, ট্যুর কম্পানির অফিস, টুপি, নেপালি কুকরি, ইয়কের চামড়া, গুপ্তি লাঠি, থাংকা (তিব্বতি নকশিকাঁথা)- কী নেই এখানে। হোটেলের নিচেই দোকানি বসে গেছে আর চলেছে গলি থেকে গলিতে।

ফেলুদার যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে পড়ে পরে কাঠমাণ্ডু এসেছি। জপযন্ত্র, মোমো আর কুকরির খবর তো সেখানেই ছিল। ছিল সেই সংলাপটিও- একই শহরে স্বয়ম্ভুনাথের মতো বৌদ্ধস্তূপ আর পশুপতিনাথের মতো হিন্দু মন্দির- এ এক কাঠমাণ্ডুতেই সম্ভব! আমি বেশি আকৃষ্ট হই কাঠমাণ্ডুর রং দেখে। মনে হয়, এর মোড়ে মোড়ে কী যেন আবিষ্কারের অপেক্ষায় আছে। চলতে চলতে কাঠের তৈরি অপূর্ব দালানটি দেখেই মনে হলো হাজার বছরের ইতিহাস ঠাসা এর ভেতরে।

২০০০ বছরের প্রাচীন উন্নত সভ্যতার হদিস মিলেছে এই উপত্যকা নগরীতে। চলতে চলতে দেখতে পাই হাজার হাজার পুণ্যার্থী আর বানরের পাল। কাঠমাণ্ডু দরাদরির শহর। ৪০০ রুপির টুপি তারা বিক্রি করছে ২০ রুপিতে এবং হাসিমুখে। তবে বইয়ের দামে কিন্তু ছাড় নেই। পিলগ্রিম কাঠমাণ্ডুর সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকান। গেলাম এক বিকেলে। বিশাল তেতলা ভবন। বইয়ে ঠাসা। কম্পিউটারে রেকর্ড রাখা হয় কোন বই কোন তাকে আছে।

খাবারেও কাঠমাণ্ডু কম যায় না। সাততাড়াতাড়ি খাওয়ার জন্য মোমো যেমন আবার, আছে পঞ্চনেন্দ্রিয়হরণকারী কড়া মসলার কাঠমাণ্ডু কারি। আছে বারোভাজা জাতীয় খাবার, পেটের তেরোটা বাজানো জিভে জল আনা খাবারও আছে। বন্ধু পেমবা দরজি শেরপার মোটরসাইকেল, জাপানিজ বন্ধু মায়ার সঙ্গে সান্ধ্য আড্ডা, কল্পনার মনিহারি দোকান, তুর্কি রেস্তোরাঁ আনাতোলিয়া, হনুমান দরবার স্কয়ার আমাকে প্রতিদিনই টানে। ঢাকায় বসেও বিকালে মনে হয় থামেলে একটা চক্কর দিয়ে আসি। ছবি: লেখক

আরো নেপাল

নেপালে মাউন্ট এভারেস্ট, অন্নপূর্ণা যেমন আছে চিতোয়ান, ভক্তপুরও আছে। ট্রেকিং, রাফটিং, জঙ্গল সাফারির স্বর্গরাজ্য নেপাল। নেপালে হিন্দু মন্দির অনেক, বৌদ্ধমন্দিরও কম নেই। আবার পোখারায় স্কাই ডাইভিং, বাঞ্জি জাম্পিং করতে পারবেন। এ ছাড়া সাইকেল চালালে মাউন্টেন বাইকিংয়ের অভিজ্ঞতা পাবেন সারা নেপালেই।

পাটানকে বলা যায় নেপালের সাংস্কৃতিক রাজধানী। এর দরবার স্কয়ারে ঘণ্টাখানেক বসে থাকলে সম্ভবত পৃথিবীর সব দেশের মানুষের দেখা পেয়ে যাবেন। ২৫০ খ্রিস্টপূর্বের অশোক স্তূপও আছে পাটানে।

কাঠমাণ্ডু থেকে নাগরকোট ৩২ কিলোমিটার। হিমালয়ের কোলে একটি গ্রাম। দুই ঘণ্টার পথ। নবদম্পতিরা খুব পছন্দ করে নাগরকোটের নিরিবিলি। থাকতে পারেন ক্লাব হিমালয়া, হিমালয়ান হার্ট, স্পেস মাউন্টেন, স্তূপ রিসোর্ট, পিনাক্যাল মাউন্টেন, স্টেম মাউন্টেন বা ভিউ পয়েন্ট হোটেলে। ভাড়া শুরু হয় এক হাজার রুপি থেকে।

১৫ শতকে মাল্লা রাজার রাজধানী ছিল ভক্তপুর। এখানকার দরবার স্কয়ারে সূর্য, সর্প, ভৈরবনাথ, দুর্গাসহ আরো অনেক মন্দির আছে। এটি ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ। কাঠের ও ধাতুর শিল্পকর্মের জন্য বিখ্যাত ভক্তপুর।

নেপালের তৃতীয় প্রধান শহর পোখারা। অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। পোখারার ত্রিশ কিলোমিটারের মধ্যে আছে ধবলগিরি, অন্নপূর্ণা আর মানাসলু (পৃথিবীর দশটি উঁচু পর্বতের তিনটি)। পোখারার ফিউয়া লেক সারা দুনিয়ায় মশহুর। রাজা কসকি ১৮ শতকে পোখারায় বাণিজ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বিন্ধ্যবাসিনী মন্দিরটিও বিখ্যাত। ওয়ার্ল্ড পিস প্যাগোডা দেখেও আনন্দ পান অনেকে।

কাঠমাণ্ডু থেকে পাটান ৫ কিলোমিটার এবং ভক্তপুর ১৪ কিলোমিটার। কাঠমাণ্ডুতে থেকেই এই দুই জায়গা ঘুরে দেখা যায়। আর পোখারা ২০৩ কিলোমিটার। পোখারায় থাকতে পারেন হোটেল অর্কিড, হোটেল তারা, তুলসী, বাগানবিলাস, বাহারি, টেম্পল ট্রি রিসোর্ট, সম্পদ ইন, ট্রেকার্স ইন, সিলভার ওক বা চেরি গার্ডেনে। দুই বিছানার এক কক্ষের ভাড়া শুরু হয় এক হাজার রুপি থেকে।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে প্রতিদিন কাঠমাণ্ডু বাংলাদেশ বিমান ও ইউনাইটেড এয়ারের বিমান। আকাশপথে ভাড়া লাগে জনপ্রতি সাড়ে ষোলো থেকে আঠারো হাজার টাকা। এ ছাড়া বাংলাবান্ধা ও ভারতের কাকড়ভিটা সড়কপথে কাঠমাণ্ডু যাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে ভারতের ডাবল এন্ট্রি ভিসা লাগে। কাঠমাণ্ডুর থামেলে আছে অনেক হোটেল। মাঝারি মানের দুই বিছানার এক কক্ষের ভাড়া শুরু হয় ৭০০ রুপি থেকে। নেপালায়া, আমারিলিস, সুমিত রেসিডেন্সি, মানাসলু, মানাল, থামেল, প্যারাডাইস, ব্লু ডায়মন্ড, হিমালয় ভিউ ইত্যাদি হোটেল উল্লেখযোগ্য।



মন্তব্য