kalerkantho


ছবির মতো থিম্পু

মাহবুব আলম পল্লব   

১৪ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০



ছবির মতো থিম্পু

ভোরে তখনো অন্যরা ওঠেনি। আকাশ ছিল ঝকঝকে। ফুন্টসোলিংয়ে নদীর পাড় ধরে হাঁটতে থাকলাম। এটি ভুটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, প্রবেশমুখ। কাল বাংলাবান্ধা দিয়ে সীমানা পেরিয়ে জলদাপাড়া হয়ে ভারতের জয়গাঁও পৌঁছেছি। একটা মাত্র গেট দিয়ে ভারত ও ভুটান আলাদা হয়েছে জয়গাঁওয়ে। কাল সন্ধ্যায় ফুন্টসোলিং এসে ভুটান বেড়ানোর ছাড়পত্র নিয়েছি। মামুলি কাজ। অল্পক্ষণেই শেষ হয়েছে। দলে আরো আছে শাকের ভাই, রাহমান ভাই, কামাল ভাই, শাওন, নোভা আর মোর্তোজা। পথে একটা বৌদ্ধমন্দির পেলাম। অনেক বুড়ো মানুষকে দেখলাম প্রেয়ার হুইল ঘোরাচ্ছে।

৮টায় আমাদের জিপ ঠিক হলো। নিয়ে যাবে থিম্পু। ড্রাইভারের নাম জয়। বয়স মেরেকুটে ২২ হবে। নেপালি ছেলে, চটপটে, জয়গাঁও থাকে। অল্প পরেই পাহাড় বাইতে শুরু করল জয়ের জিপ। একটা করে বৃত্ত পূরণ হচ্ছে আর ফুন্টসোলিং নিচে নামছে। বেশ মজা লাগছে দেখতে। মোট আটটি বৃত্ত পূরণ করে আমরা পাহাড়ের ডগায় উঠলাম। এখান থেকে পাহাড়ের পর পাহাড় আর পাহাড়। চোখের সীমাতক পাহাড়, সীমা ছাড়িয়েও। সবুজ ঢেউ আমাদের চারপাশে। মাঝেমধ্যে ওই দূরে চলমান সাদা ফিতা। দুরন্ত চপলা ঝরনা পাহাড় বেয়ে গেয়ে চলেছে। কাছে গেলে ফিতাটি শাড়ির পাড় হয়ে যায়। মুগ্ধ চোখে দেখি। জয়ের জিপে আতিফ আসলাম গেয়ে চলেছেন... ও লামহে, ও বাতে কোই না জানে...। আতিফের আকুতি পাহাড়ে মাতম তুলছে।

পথে বসতি নেই বললেই চলে। দুপুর নাগাদ একটা পেট্রল পাম্পের কাছে মালভূমি মতো জায়গায় পৌঁছলাম। আরো কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। একটা ছোটমোট রেস্তোরাঁও আছে। জয় গেল তেল আনতে। আমরা রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাবার অর্ডার করলাম যে যার মতো। আমি ফ্রায়েড রাইস আর খাসি। শাওন চাউমিন আর মুরগি। শাওন খাবার শেষ করতে পারে না। তাই বাকিটা আমার ভোগেই আসবে ভেবে নিয়ে আগেই শুরু করে দিলাম। আড়াইটা নাগাদ চলা শুরু করলাম। আবার সবুজের ঢেউ আর সাদা ফিতা। একজায়গায় আমাদের নিচে একটা বিরাট পাওয়ার প্লান্ট দেখলাম। কিছু বসতিও চোখে পড়ছে- আলগা আলগা পাঁচ-সাতটা বাড়ি। আরো কিছুক্ষণ পর সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। বেশি ঝক্কি করে না, তবে সময় নষ্ট করে। সন্ধ্যারও কিছু পরে রাস্তা খুব প্রশস্ত হয়ে এলো। কোনো একটা থালার মাঝে ঢুকে পড়েছি মনে হলো। প্রায় ৮টা বাজলে থিম্পুর টাইম স্কয়ারের কাছে পৌঁছি। নোভা, মোর্তোজা, শাওন আর রহমান ভাই গেলেন হোটেল খুঁজতে। আমি মার্কেটে বেড়াতে গেলাম। শাকের ভাই আর কামাল ভাই আড্ডা দিতে থাকলেন। আমি একটা পাঞ্জাবি খুঁজলাম। কাল ঈদ। জামাকাপড়ের মধ্যে আছে খালি জিনস আর টি-শার্ট। একটা টিভির দোকানে মমতাজের গানের সিডি দেখে মজা লাগল। পাঞ্জাবি না পেয়ে মমতাজের সিডি কিনলাম। কাল জয়ের গাড়িতে বাজাব।

হোটেলের মালিক বাঙালি। ছোটাছুটিও করছে বাঙালি ছেলেপুলে। মাঝারি মানের হোটেল। গরম পানির ব্যবস্থা আছে। কষে আধা ঘণ্টা গোসল করলাম। কামাল ভাইও ততক্ষণে প্রস্তুত। দলনেতা রহমান ভাই আমাদের নিয়ে চললেন রাতের খাবার খেতে। রাস্তাঘাট শুনশান। আকাশে চেয়ে চাঁদ খুঁজলাম। ঈদের রেশও নেই থিম্পুতে। একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে উঠলাম। বেশ চকচকে। কিন্তু মাছ-মাংসের ছিটেফোঁটাও নেই, পুরোই ভেজ। অগত্যা এত রাত বলে, রুটি আর তরকা গিললাম। খাওয়া সেরে শাকের ভাইকে সঙ্গে নিয়ে রাতের থিম্পু দেখতে বেরোলাম। দোকানপাট বন্ধ, লোকজনও নেই। একজনকে কোনোমতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, লাউঞ্জ বা ক্যাফে কোনোটা খোলা পাওয়া যাবে? তিনি ডান দিকের সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে যেতে বললেন। মাটির তলে নেমে গেলাম। টানেলে লাল বাতি জ্বলছে। একটা ছোট্ট কাঠের দরজা পেলাম। কাউবয় আমলের স্যালুন মনে হলো। ভেতরে ঢুকে দেখি সব ইয়ং ছেলেপুলে। কফি বা বিয়ার খাচ্ছে। ছোট্ট একটা ডায়াস আছে, একটা মেয়ে ভুটানি ভাষায় গান করছে। আমরা কিছু বিফ নিলাম। তারপর কফি দিয়ে শেষ করলাম। ততক্ষণে পৌনে তিনটি গান শেষ হয়েছে। আমরা দু-তিনবার তালি দিয়ে বেরিয়ে এলাম। রাস্তা খালি। ঘরে ঢুকে দেখি কামাল ভাই নাক ডাকছেন। আমিও পাল্লা দিয়ে কিছুক্ষণ ডাকলাম, তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম। বেড়াতে গেলে ভোরেই বিছানা ছাড়ি। কেমন করে যেন ঘুম ভেঙে যায়। ভারী একটা জামা গায়ে দিয়ে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। দোকানপাট সেই সকালেই সব খোলা। গিয়ে দাঁড়ালাম ক্লক টাওয়ারে। বাতাসটা খুব ভালো। এত পাতলা বাতাস অনেক দিন পাইনি, জোরে জোরে বারবার নিঃশ্বাস নিলাম। পুবের পাহাড় ফুড়ে দিনের প্রথম আলো লাগল এসে গায়ে। এত মোলায়েম, এত সতেজ!

সকালে হোটেলেই ব্রেকফাস্ট পেলাম বেডের সঙ্গে ফ্রি- রুটি বা নুডলস, ডিম আর চা। তারপর দলেবলে চললাম থিম্পু দেখতে। জয় ড্রাইভার ভুটানের পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ে নিয়ে গেল। একটি টলমলে ঝিরির পাশে একটা বড় সবুজ চত্বর। চত্বরে অনেকগুলো পাইন গাছ, তার পরেই দৃষ্টিনন্দন কাঠের ভবনটি। ঝিরির ওপর একটা কালভার্টও আছে। সবুজ চত্বরে অনেক ছোট ছোট নীল ফুল ফুটে আছে। ভবনটির ওপর-নিচে নানা নকশা। মানুষজন নেই বেশি। এটাই পার্লামেন্ট ভবন। আমরা ঘুরে ঘুরে প্রায় দেড় ঘণ্টা থাকলাম সেখানে। এরপর গেলাম হেরিটেজ মিউজিয়াম দেখতে। এটা আসলে খামারবাড়ি। বড় বড় গরুর গাড়ির চাকা, কাস্তে, ধান ভাঙানোর কল, দুধ থেকে মাখন বানানোর কল ইত্যাদি রাখা আছে। কাছে একটা খোলা জায়গায় অনেক পাইন পাতা বিছানো হয়েছে- মানে একটা বেড তৈরি করা হয়েছে। দেখি ঝলমলে জামাকাপড় পরা আধুনিক ১০-১২ জন ছেলেমেয়ে। ভুটানি মনে হলো না। শুধিয়ে জানতে পেলাম, তারা দিল্লি থেকে এসেছে। আগামীকাল রাতে এখানে ফ্যাশন শো হবে।

খামারবাড়ি থেকে গেলাম ভাস্ট ভুটান। ভুটানি শিল্পীদের আড্ডাস্থল এই ভাস্ট ভুটান। টাইম স্কয়ারের কাছেই। সুবীরদার কাছ থেকে কামা ওয়াংদির কথা জেনে এসেছি। কামাদা বাচ্চাকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছেন। তবে আর যাঁরা ছিলেন, তাঁরা অভ্যর্থনা জানাতে কার্পণ্য করলেন না। পনিরের চা এনে দিলেন। একটা বড় কাচের গ্লাসের প্রায় পুরোটায় চা থাকে। ফুন্টসোলিংয়ে দাম ১০ রুপি। পনিরের চা প্রথম দু-চার চুমুক ভালো লাগে, তারপর আর ইচ্ছে করে না। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ঘরে নজর বুলাই। সব জায়গায় ছবি- পাহাড় আর বুদ্ধের বেশি। এর মধ্যে কামাদা চলে এলেন। সঙ্গে শক্তপোক্ত এক ছেলে। নাম বলল, কর্মা। চীন সীমান্ত এলাকার ১০ দিনের ট্রেকিং সেরে সদ্য ফিরেছে থিম্পু। কিছুক্ষণ পর ছবি দেখাতে বসল। পুরোটা পথ পাহাড়ি আর পথজুড়ে বরফ। ছবি দেখেই মাৎ হয়ে গেলাম। কামাদা দুপুরে ভোজ দিলেন- ফ্রায়েড রাইস আর ঝিরির মাছ। ঝাল ঝাল, দারুণ খেতে। খেয়ে ভাস্টেই গড়িয়ে নিলাম। বিকেলে গেলাম থিম্পু পিকে। এখান থেকে পুরো থিম্পু শহর এক নজরে দেখা যায়। পাহাড়ের গায়ে পাইন গাছে অজস্র রংবেরঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ ঝুলছিল। সন্ধ্যার কিছু আগে থিম্পু শহরে বাতি জ্বলে ওঠা দেখতে ভালো লেগেছিল। সন্ধ্যার খানিক পরে পিক থেকে নেমে এসে ক্লক টাওয়ারে বসেছিলাম। হালকা বাতাস ছিল, বাতাসে হিম ভাব ছিল। কামাল ভাই কথা বলতে ভুলে গেলেন, আমিও চুপ। শাওন হঠাৎ বলে উঠল, ওই যে চাঁদ। ঈদের চাঁদ। বাড়ির কথা মনে পড়ল। রাহমান ভাই বললেন, আজ তোমাদের বিরিয়ানি খাওয়াব। আরো পনেরো মিনিট বাতাস খেয়ে দলেবলে আমরা বিরিয়ানি খুঁজতে বেরুলাম।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে দ্রুক এয়ারের বিমান প্রতি মঙ্গল ও শুক্রবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে ভুটানের পারোর উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ভাড়া ২০০০০ টাকা (যাওয়া-আসা)। সড়কপথে গেলে ভারতের ডাবল এন্ট্রি ভিসা লাগবে। উল্লেখ্য, ভুটানে ভারতীয় রুপি চলে এবং মুদ্রামান সমান। ঢাকার কল্যাণপুর থেকে এসআর ট্রাভেলসের বাসে বাংলাবান্ধা গিয়ে শেয়ারের জিপে জয়গাঁও যাওয়া যায়। আবার চেংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি গিয়ে তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাল থেকে জয়গাঁওয়ের বাস পাবেন। কলকাতা থেকেও জয়গাঁও যেতে পারেন। সময় লাগে ছয়-আট ঘণ্টা। ফুন্টসোলিংয়ে থাকতে পারেন প্যারাডাইস, মাদ্রাজ বা হিমালয় হোটেলে। ভাড়া শুরু হয় ৫০০ রুপি থেকে। থিম্পুতে থাকতে পারেন দ্রুক, রিগনাম, কাসাং বা ডেগং হোটেলে। থিম্পু থেকে পারো ৬৫ কিলোমিটার। সময় লাগে দুই ঘণ্টা। পারোতে থাকতে পারেন কেকে, রেভেনস নেস্ট, সোনাম ট্রোফেলে। ভাড়া দুই বিছানার এক কক্ষ এক থেকে আড়াই হাজার টাকা।



মন্তব্য