kalerkantho


মনোহরা সান্দাকফু

জাকারিয়া সবুজ   

১৪ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০



মনোহরা সান্দাকফু

বারো হাজার ফুট ওপরে বসে আছি। পাইন বনের মাথার ওপর দিয়ে বরফের মুকুট পরা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখছি। সান্দাকফুর চুড়ায় আমার সঙ্গী আছে স্ত্রী জিতা, বন্ধু তানভির ও তাঁর স্ত্রী জুহাইনা। এভারেস্ট, লোৎসে, মাকালুসহ আরো অনেক চূড়া আছে কাছাকাছি। এমন অপার্থিব দৃশ্য মনে হয় শুধু এখান থেকেই দেখা সম্ভব।

কষ্ট বেশি হয় না, অ্যাডভেঞ্চারও হয়- এমন ট্যুরের কথা ভাবছিলাম। সান্দাকফুর কথা মনে এলো। তানভির আর জুহাইনাকে বলতে ওরাও রাজি হয়ে গেল। শাহ আলী পরিবহনের রাতের বাসে করে গেলাম বুড়িমারী। সেখান থেকে একটা অ্যাম্বাসেডরে চেপে শিলিগুড়ি। তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। দার্জিলিং মোড় নামের জায়গা থেকে ছাড়ে সুখিয়াপোখরির জিপ। একটা শেয়ারের জিপে উঠে বসলাম। জায়গা পেয়ে গেলাম চারজনের। বিশাল বিশাল সব পাহাড়, চা বাগান আর পাইনগাছের সারির ভেতর দিয়ে জিপ চলল। কোনটা ছেড়ে কোনটার ছবি তুলব, খেই হারিয়ে ফেলি। মিরিক হয়ে সুখিয়া পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এলো। সেখান থেকে আবার একটা শেয়ার মারুতি গাড়িতে গেলাম মানেভঞ্জন। সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কের শুরু এখান থেকেই।

মানেভঞ্জনে হোটেল এক্সােটিকা খুঁজে বের করতে বেগ পেতে হলো না। ছোট্ট ছিমছাম হোটেলটির মালিক জীবন ছেত্রি। সবাই চেনে মাস্টারজি নামে। নেপালি ভদ্রলোক। বিয়ে করেছেন বাঙালি, বাংলাও বলেন চমৎকার। ইন্টারনেট থেকে ফোন নম্বর জোগাড় করে দুটো রুম বুক করে রেখেছিলাম আগেই। তাঁর স্ত্রীর রান্না করা খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে দেরি হলো না।

পরদিন সকালে জোর ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল। কাঁপতে কাঁপতে রেডি হয়ে নিলাম। জ্যাকেট, হাতমোজা, কানটুপি কোনোটাই বাদ রাখলাম না। রুটি-সবজি আর পাঁপর দিয়ে নাশতা সারলাম। সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্ক কর্তৃপক্ষের কাছে নাম রেজিস্ট্রি করলাম। ওরাই একজন গাইড ঠিক করে দিল, নাম ফিঞ্জো তামাং। একটা ল্যান্ডরোভার ভাড়া নিয়ে সকাল ৯টা নাগাদ চলতে শুরু করলাম। আঁকাবাঁকা পথ। চিত্রা পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না। চমৎকার একটা বৌদ্ধমন্দির আছে এখানে। বসলাম কিছুক্ষণ, কফি খেলাম। পরের রাস্তা বেশিই এবড়োথেবড়ো। তবে ড্রাইভার দারুণ সেয়ানা, ঠিকই সামলে নিচ্ছে। ঝাঁকি খেতে খেতে এগোলেও পথের সৌন্দর্য দেখতে ভুল করলাম না কেউ। বিশাল সব মহীরুহ, মাঝেমধ্যে ম্যাগনোলিয়ার শুভ্রতা। ঘোর লেগে যায়।

এরপর গিয়ে থামলাম লামেধুরা নামের একটি গ্রামে। এখানে ট্রেকাররা চাউমিন খেতে ভালোবাসে। মেঘমা হয়ে পরের যাত্রাবিরতি তুমলিংয়ে। উচ্চতা প্রায় ৯৮০০ ফুট। তুমলিং সুন্দর একটা গ্রাম। কটেজগুলো ফুলে ফুলে ভরা। ট্রেকিং করে এলে এটাই রাত কাটানোর ভালো জায়গা। যতই ওপরে উঠছি, ততই মেঘের মেলা, সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। বেশি দেরি না করে আবার যাত্রা শুরু করলাম। কালাপোখারি পৌঁছাতে দেড়টা বেজে গেল। দুপুরের খাবারের বিরতি নিলাম। নেপালি ভাষায় পোখারি মানে পুকুর। প্রায় ১০ হাজার ৫০০ ফুট উঁচুতে একটা ছোট্ট পুকুর। পানি দেখতে কালো বলে এমন নাম। আবার রওনা দিতেই ঝুমবৃষ্টি নামল। গাড়িও চলতে লাগল ধীরে। সান্দাকফু পৌঁছাতে বাজল ৪টা। প্রায় বারো হাজার ফুট উঁচুতে সান্দাকফু। এখান থেকে হিমালয়ের উঁচু চূড়াগুলো যত সুন্দর দেখা যায় আর কোথাও থেকে ততটা যায় না। ফিঞ্জো তামাং একটা সুন্দর কটেজ জোগাড় করে দিল। পাথরের চাঁই আর কাঠের তৈরি। সন্ধে নামতেই ফায়ার প্লেসের পাশে গিয়ে হুড়মুড় করে বসলাম। অসাধারণ লাগল।

পরদিন সকালে হাঁটা দিলাম। ল্যান্ডরোভার কালই ফিরে গিয়েছে। গুড়দুম হয়ে শ্রীখোলা যাব। পথটা ছোট এক রকমের বাঁশ আর রডোডেনড্রনে ভরা। এ পথে মাঝেমধ্যেই ইয়ক, পাহাড়ি ছাগল আর অনেক রকমের পাখি দেখা যায়। গহিন জঙ্গলে আছে ভালুক আর রেড পান্ডা। আরো কয়েকটা গ্রুপ হেঁটে চলেছে। নামতে নামতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর গুড়দুম পেলাম। পাহাড়ের গায়ে একটা দারুণ সুন্দর জিরানোর জায়গা তৈরি করা হয়েছে। দূর থেকে একটা খরস্রোতা নদীর আওয়াজ কানে আসছে। এখানে তাঁবু গেড়ে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা হয়।

দুপুরের খাওয়া সারলাম গুড়দুমে। খুব সুন্দর গ্রাম গুড়দুম। একেবারে যাকে বলে ঝকঝকে-তকতকে, সঙ্গে নিবিড় যত্নে বেড়ে ওঠা একটা বাগান। গুড়দুম থেকে আরেকটু নামতেই পেয়ে গেলাম সেই নদীটাকে, যার আওয়াজ শুনছিলাম অনেকক্ষণ ধরে। এর নাম শিরি। নদী ধরে এগোতে থাকলাম, আরেকটা গ্রাম পেলাম, নাম তিম্বুরে। পুরো গ্রামে একটাই পরিবার। পরিবারের একজন মিলান তামাং। খুবই ভালো মানুষ। একটা লজ গড়ে নাম দিয়েছেন সোয়াম্বো। এটা এককথায় ছবির মতো। তানভির আর জুহাইনা আর এক পাও এগোতে চাইল না। অনেক রকম ফুলে ফুলে ছাওয়া কটেজটা। আসলেই লোভ সামলানো যাচ্ছে না। তাই রাজি হয়ে গেলাম। কটেজের উঠানে এক কাপ ধোঁয়া উঠা চা নিয়ে আড্ডায় বসে গেলাম। মিলানের ছেলে দার্জিলিংয়ে পড়ে। গ্রামের সবাই তাঁদের আত্মীয়স্বজন। পাহাড় ঢালের গম আর মটরশুঁটি সব তাঁদের। সন্ধের পর নদীর ঝিরিঝিরি শব্দটা যেন বেড়ে গেল বহুগুণ! খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাড়াতাড়ি।

পরদিন সকালে আবার আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছালাম শ্রীখোলা। এ এক আরেক স্বগরাজ্য। নদীটা পার হওয়ার জন্য এখানে আছে একটা ঝুলন্ত সেতু। মৃদু বাতাসে তার গায়ে লাগানো প্রেয়ার ফ্ল্যাগগুলো ওড়ে, সেতুটাও একটু দোল খায়, আর নিচে নদীর বুকে শুয়ে থাকে বড় বড় পাথরের চাঁই। নদীর জলে মাছেরা খেলা করে। আরেকটু হেঁটে সেপি পৌঁছালে গাড়ি পেয়ে গেলাম। সাধারণত শেয়ার জিপগুলো ছাড়ে রিম্বিক থেকে। গাইড বলে রাখায় ড্রাইভার আমাদের নিতে চলে এসেছে সেপিতে। রিম্বিক থেকে মানেভঞ্জন হয়ে গাড়িগুলো যায় দার্জিলিং অথবা শিলিগুড়ি। এ রাস্তাটার সৌন্দর্যের কথা আর না-ই বা বললাম। ছবি: লেখক

আরো ভারত

তাজমহল দেখতে গিয়ে দিল্লি, আগ্রা আর জয়পুরের মতো তিনটি ভুবনখ্যাত শহর দেখে নেওয়া যেতে পারে। দিল্লি থেকে শুরু করে আগ্রা ও জয়পুর হয়ে আবার দিল্লিতে শেষ হতে পারে যাত্রা। যাঁরা সড়কপথে যাতায়াত করবেন তাঁরা কলকাতাও দেখে নিতে পারেন। তবে ১০ দিন সময় হাতে রাখলে আরাম পাবেন। আগ্রায় তাজমহল দেখার সঙ্গে সঙ্গে আগ্রা দুর্গও দেখে নেওয়া দরকার। এখান থেকে সম্রাট শাহজাহান শেষজীবনে তাজমহল দেখতেন। জয়পুর যাওয়ার পথে সম্রাট আকবরের রাজধানী ফতেহপুর সিক্রি না দেখে ফেরাটা দুঃখজনক। এখানে তানসেন রেওয়াজ করতেন। আর জয়পুরের পরে জয়সলমীর যাওয়ার ইচ্ছা হবে। জয়সলমীরে আছে সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা। এছাড়া আজমিরে যাওয়ার আগ্রহ অনেকে অনেক দিন ধরেই পোষণ করে থাকেন। খাজা মাঈনুদ্দিন চিশতীর দরগা আজমিরে। এদিকে মোগল শহর দিল্লিতে লালকেল্লা, কুতুব মিনার, হাউস খাস, লোদি গার্ডেন, লোটাস টেম্পল- কোনটা রেখে কোনটা দেখবেন! কলকাতায় কি কম আছে কিছু- কফি হাউস, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা জাদুঘর, নিকো পার্ক ইত্যাদি। কলকাতা থেকে যেতে পারবেন শান্তিনিকেতন, মুর্শিদাবাদ, দীঘা, শঙ্করপুর বা নদীয়ার মায়াপুর।

তামাবিল হয়ে যেতে পারেন শিলং। দেখতে পাবেন দারুণ সব ঝরনা আর বনানী। শিলং তিন দিন থাকলে ভালো হয়। মাঝখানে এক দিন যাবেন চেরাপুঞ্জি। শিলং থেকে টাটা সুমোয় গুয়াহাটি যেতে আড়াই ঘণ্টা লাগে। কামাখ্যাসহ অনেক মন্দির আছে সেখানে। কোনো কোনোটি ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ। এ ছাড়া কাজিরাঙায় হাতির পিঠে বন দেখার ব্যবস্থা আছে। আর গুয়াহাটি নাগাল্যান্ডের রাজধানী কোহিমায় বা মণিপুর।

গ্রন্থনা: সৈয়দ আখতারুজ্জামান

পরিচালক, বিয়ন্ড ট্যুরিজম, ০১৯১৪০৯৯৭০০।

কিভাবে যাবেন

ঢাকার কল্যাণপুর থেকে নন-এসি এস আর পরিবহনের বাসে বুড়িমারী যাওয়ার ভাড়া ৬৫০ টাকা। বুড়িমারী থেকে শিলিগুড়ি রিজার্ভ গাড়ি ১২০০ রুপি। শিলিগুড়ি থেকে শেয়ার জিপে মানেভঞ্জন জনপ্রতি ১৫০ টাকা। ল্যান্ডরোভারের ভাড়া ৪০০০ রুপি। রিম্বিক থেকে দার্জিলিং শেয়ার জিপের ভাড়া জনপ্রতি ২০০ রুপি। সিঙ্গালিলা ন্যাশনাল পার্কের গাইডের খরচ দিনপ্রতি ৫০০ রুপি। আর এ এলাকায় যেকোনো জায়গায় কটেজের রুম ভাড়া দিনপ্রতি ৪০০ থেকে ৫০০ রুপি। মোটামুটি সব গ্রামেই মম, চাওমিন ও ভাত পাওয়া যায়। এ ছাড়া রিম্বিক হয়েও তিম্বুরে বা শ্রীখোলা যাওয়া যায়। যাঁরা দার্জিলিং বেড়াতে যান, তাঁরা গাড়িতে করে চলে যান রিম্বিক অথবা আরেকটু এগিয়ে সেপি। এরপর ৫-৬ কিমি হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন তিম্বুর। অবশ্যই গরম কাপড় সঙ্গে নেবেন। পানিনিরোধক হ্যাভারস্যাক নেওয়া উচিত। এ ছাড়া রেইনকোট, পলিথিন ব্যাগ, টর্চ-ব্যাটারি, হাতমোজা, পাহাড়ি রাস্তায় চলার উপযোগী ভালো এক জোড়া জুতা সঙ্গে নিন। উল্লেখ্য, সান্দাকফু বা তিম্বুরে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো সময় মার্চ-মে।

 

 



মন্তব্য