kalerkantho


মায়াবী লাঙ্কাউই

মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ   

১৪ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০



মায়াবী লাঙ্কাউই

কেদা ফেরিঘাটে দশ মিনিটের লাইন ধরলাম। উঠলাম কোয়াগামী লঞ্চে। লাঙ্কাউইর ফেরিঘাটের নাম কোয়া। সামনের দিকে বসার জায়গা পেলাম। যাত্রীদের বেশির ভাগই পর্যটক। কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় পর্দায় একটি ছবি চালিয়ে দেওয়া হলো। অ্যাকশন ছবিটি চীনা ভাষার। সহযাত্রী মালয় তরুণরা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল।

পৌনে দুই ঘণ্টা লাগল কোয়া পৌঁছাতে। টার্মিনালে প্রসাধনী, গয়না, শোপিস, খেলনা, মেয়েদের পোশাক, ফাস্ট ফুড ইত্যাদির অনেক দোকান। গাইড আমীর হামজা একটা গাড়ি আনিয়ে নিলেন। চালক আমীরের হাতে চাবি গুঁজে দিয়ে বিদায় নিল। বলে গেল, ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ান। আমীর চালায় ভালো। পাঁচ মিনিটে আমাদের আস্থা অর্জন করল। একটা বাঙালি হোটেলে নিয়ে খেতে বসিয়ে দিল। দ্রুত খাওয়া সেরে কাছে মসজিদে জোহরের নামাজ পড়লাম। মসজিদের গম্বুজ স্বর্ণখচিত, দেয়ালে কোরআনের আয়াত খোদাই করা। গাছগাছালি ঘেরা মসজিদটি নয়নাভিরাম। পরে জেনেছিলাম এই মসজিদটি লাঙ্কাউইর অন্যতম দ্রষ্টব্য। এর নাম মসজিদ আল হানা।

হোটেল সুপার ওয়ানে আমাদের থাকার জায়গা ঠিক হয়েছে। এর জানালা দিয়ে কোয়া উপসাগর দেখা যায়। দুই ঘণ্টা বিশ্রাম দিয়ে আমীর হামজা আমাদের চেনাং বিচ নিয়ে যায়। রাস্তা দারুণ উঁচু-নিচু। শহর ছেড়ে গ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে থাকি। অনেক বাড়িতে কলাগাছ দেখি। কোনো কোনো বাড়িতে সবজির আবাদ। কিছু কাঠের দোতলা বাড়িও চোখে পড়ল। ত্রিশ মিনিট পর গাড়ি থামল চেনাং বিচে। সৈকতের দৈর্ঘ্য বেশি নয়, সাগর এখানে শান্ত। তীরঘেঁষে সবুজ বৃক্ষের টিলা সৈকতকে আরো রূপসী করেছে। অন্যরা যখন শপিং মলে গেল আমি, জসিম স্যার ও নওশের ঝাপালাম সমুদ্রে। অনেক বিদেশি এখানে- শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরবি। স্নান শেষে পরিশ্রান্ত দেহ লুটিয়ে দিলাম বেলাভূমে। নওশের ও জসিম স্যার প্যারাসুটে করে আকাশে উড়াল দিল। উচ্চতা ভীতি থাকায় আমি শুয়ে শুয়ে দেখলাম। নওশেররা ফিরে এলো প্রায় এক ঘণ্টা পর।

ফেরার সময় আমীর নিয়ে গেল কোয়ার সবচেয়ে বড় চকোলেট দোকানে। বিক্রয়কর্মীর সংখ্যাই হবে এক শ। পছন্দমতো চকোলেট কিনে গাড়ির পেছনে রাখলাম। তারপর হোটেলে গেলাম নৈশভোজ সারলাম। অল্পক্ষণ জিরিয়ে গেলাম হকার মার্কেটে। প্লাস্টিকের বড় ছাতার নিচে টেবিল। তার ওপর পণ্যসম্ভার। কেউ কেউ রাস্তায় মাদুর পেতে বসিয়েছেন পণ্যের পসরা। বেশির ভাগ দোকানিই মহিলা। রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছিল অনেকেই। কার কিংবা মাইক্রোতে সবাই তুলে নিচ্ছেন নিজেদের সামগ্রী। কথা বলে জানলাম, গাড়িগুলো তাদের নিজস্ব। গাড়ি করেই সকালে আসেন ও রাতে ফেরেন। পরিচিতরা জানায়, লাঙ্কাউইতে জিনিসপত্রের দাম কুয়ালালামপুরের চেয়ে চড়া। তাই বেশি কিছু কিনলাম না।

পরদিন সকালে গিয়েছিলাম ঈগল স্কয়ারে। বারো মিটার উঁচু লালচে বাদামি রঙের ঈগল মূর্তিটি লাঙ্কাউইয়ের অন্যতম আকর্ষণ। নীলাভ জলরাশি আর দূরের পোতাশ্রয়ে পণ্যবাহী জাহাজের আনাগোনা এখানে দাঁড়িয়ে দেখতে ভালো লাগে। সাগরের পানিতে দূর পাহাড়ের ছায়া পড়েছে। এ সৌন্দর্য ভাষার অতীত।

আরো মালয়েশিয়া

নতুন ও পুরনো সব স্থাপনায় সমৃদ্ধ মালয়েশিয়া। সমুদ্র মাঝের দেশটিতে পাহাড় আছে, চিরহরিৎ বনও আছে। রাজার সরকারি বাসভবন ও প্রশাসনিক দপ্তর কুয়ালালামপুরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। বুকিট পেটালিং পাহাড়ের ঢালে নির্মিত প্রাসাদটিতে নতুন ও পুরনো স্থাপনাশৈলীর সম্মিলন ঘটেছে। মালয়েশিয়ার জাতীয় মসজিদটিও দৃষ্টিনন্দন। ইংরেজ আমলে নির্মিত প্রশাসনিক ভবনটি এখন মালয়েশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট ভবন। ইংল্যান্ডের বিগ বেনের মতো এখানেও আছে বিশালাকার কয়েকটি ঘড়ি। ভবনটির আরেক নাম তাই বিগ বেন, মালয়েশিয়া। ঠিক উল্টো দিকেই স্বাধীনতা স্কয়ার; পরিচিত মাদরেকা স্কয়ার নামে। এটি মালয়েশিয়ার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড। টুইন টাওয়ারের কথা তো নতুন করে বলতে হবে না। এ ছাড়া কুয়ালালামপুর বার্ড পার্কে বিরল প্রজাতির সব পাখি দেখার সুযোগ আছে। কুয়ালালামপুরের সগো, টাইম স্কয়ার এবং প্যাভিলিয়ন মার্কেট কেনাকাটার জন্য ভালো। যেতে পারেন চায়না মার্কেটেও।

প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ার ক্যাপসুল টাওয়ারে পোরা আছে মালয়েশিয়ার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। টাওয়ারের চূড়ায় সংরক্ষিত আছে মাহাথির মোহাম্মদের ভিশন ২০২০। অজানা পরিকল্পনাটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর। কুয়ালালামপুর থেকে মাত্রই আধাঘণ্টার পথ।

যেতে পারেন মালয়েশিয়ার বিনোদন শহর গেন্টিং। কুয়ালালামপুরের পুডু বা গোম্বাক বাস টার্মিনাল থেকে বাসে গেন্টিং যাওয়ার ভাড়া জনপ্রতি ১০ রিঙ্গিত। ট্যাক্সিতে লাগে ২০০ রিঙ্গিত। ১ রিঙ্গিত সমান ২৩ টাকা ৪৬ পয়সা।

কিভাবে যাবেন

প্রতিদিন ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর ফ্লাইট আছে। ভাড়া মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস (৪০ হাজার টাকা), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস্ (৪২ হাজার টাকা), ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ (৩২ হাজার টাকা)। কুয়ালালামপুর থেকে বিমান, সড়ক ও রেলপথে যাওয়া যায় লাঙ্কাউই। এয়ার এশিয়া, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস ও ফায়ার ফ্লিজ বিমান প্রতিদিন কুয়ালালামপুর থেকে যায় লাঙ্কাউই। ভাড়া প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। লাঙ্কাউই বিমানবন্দর কোয়া শহর থেকে বারো কিলোমিটার। কুয়ালালামপুর থেকে এক্সপ্রেস লাঙ্কাউই ট্রেনে ছয় ঘণ্টায় কুয়ালা কেদায় এবং সাত ঘণ্টায় কুয়ালা পারলিসে যাওয়া যায়। বাসেও প্রায় একই সময়ে কুয়ালা কেদা ও কুয়ালা পারলিসে পৌঁছা যায়। কেদায় ট্রেনভাড়া সাত শ থেকে দেড় হাজার টাকা, পারলিসে ৯০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা। আর বাসে কেদা যেতে ভাড়া ৮০০ আর পারলিসে এক হাজার টাকা। সেখান থেকে ফেরি করে লাঙ্কাউই। ভাড়া কেদা ও পারলিস থেকে যথাক্রমে ৩৬০ টাকা ও ২৯০ টাকা।



মন্তব্য