kalerkantho


খৈয়াছড়ার ওপরে

এ এস এম জিয়াউল হক   

৭ জুলাই, ২০১৪ ০০:০০



খৈয়াছড়ার ওপরে

অনেক দিন ধরেই সুযোগ খুঁজছিলাম খৈয়াছড়া যাব। চট্টগ্রামের মিরসরাই থানার একটা গ্রাম খৈয়াছড়া। এর গহিন পাহাড়ে আছে এক অপূর্ব ঝরনা। পাহাড়টা সীতাকুণ্ডের অংশ। ঝরনার নামও খৈয়াছড়া। হঠাৎ করেই প্ল্যান করলাম। যাওয়ার কথা তিনজনের, একজন শেষ পর্যন্ত যেতে পারল না। শেষে আমি আর বান্না রাত ১১টার বাসে রওনা দিলাম।

সকাল সাড়ে ৭টায় নামলাম বড়তাকিয়া বাজারে। একটি হোটেলে নাশতা করে সিএনজি নিয়ে পৌঁছলাম রেলগেট। হাঁটা শুরু করলাম। দুই ধারে ফসলি জমি- বরবটি, শাক, কুমড়া বা মরিচের। সামনে বিস্তীর্ণ সীতাকুণ্ড পাহাড়ের সারি। সাড়ে ৮টা নাগাদ পাহাড়ি ঝিরি পেলাম। নুড়ি পাথর আর বালি বিছানো ঝিরিপথ, গ্রামের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে।

ঝিরিপথ গেছে ঝরনায়। ঝিরিতে পানিও বেশি নেই। কিন্তু এই ঝিরিই বর্ষায় ফুঁসে ওঠে। কিছুক্ষণ পরেই গ্রাম ফুরাল। ঝিরির পানি এখানে কিছু বেশি। এখানে এসে দুইভাবে ঝরনায় যাওয়া যায়। ঝিরিপথ ধরে অথবা গ্রামের ভেতর দিয়ে। গ্রামের ভেতরের রাস্তা কোনো কোনো জায়গায় ঘুরে গেছে। সঙ্গে গাইড না থাকায় ঝিরিপথ ধরে এগোনোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ ঝিরি ঝরনা থেকেই নেমে এসেছে। ঘণ্টাখানেক পর খৈয়াছড়া ঝরনায় পৌঁছলাম। চামড়ার স্যান্ডেল কয়েকবার পিছলে যাওয়ায় খুলে ব্যাগের সঙ্গে ঝুলিয়ে নিয়েছিলাম। পানির নিচের নুড়িতে পায়ে ব্যথা লাগছিল; কিন্তু উপায় ছিল না।

খৈয়াছড়া ঝরনায় আছে ১০টি স্টেপ বা বড় বড় ধাপ। পাহাড়ের গা থেকে পানি গড়িয়ে শত শত বছর ধরে খাঁজগুলো তেরি হয়েছে। উৎসটি পাহাড়ের অনেক ওপরে। সাধারণ পর্যটক প্রথম ধাপটি দেখেই ফিরে যান। এর আসল সৌন্দর্য কিন্তু ওপরেই।

পাহাড়ের গা ধরে ঝরনার পাশ দিয়ে খাড়া রাস্তা উঠে গেছে ওপরে। জংলি লতা আর শক্ত গাছের শিকড়-বাকড় ধরে উঠতে লাগলাম। বান্না পণ করেছে, প্রতিটি ধাপের ছবি তুলবে। একেকটা ধাপ উঠছি আর ভাবছি, বর্ষায় এর চেহারা কী হবে! সামান্য বৃষ্টিতেই ফ্ল্যাশ ফ্লাডের জন্য এ অঞ্চলের ঝরনাগুলোর কুখ্যাতি রয়েছে। পাহাড়ে খাঁজে খাঁজে পা রেখে এগিয়ে যেতে থাকলাম।

খৈয়াছড়ার শেষ ধাপটি বেশ সুন্দর। চারপাশে যত দূর চোখ যায় ঘন অরণ্য। ওপর থেকে ঝরনার নিচটা দেখতে সুন্দর লাগছিল। ঝরনার পানিতে গোসল করলাম। এখান থেকে ঝরনার ট্রেইল চলে গেছে পাহাড়ের আরো গভীরে। কিছু দূর পরে পথ ঢুকে পড়ল জঙ্গলের গভীরে। গাছগাছালি না কেটে আর এগোনো যাবে না। ইচ্ছা থাকলেও সময় নেই। নামার সময় দেখলাম, বেশ কয়েকটা জোঁক পা আঁকড়ে ধরেছে, যেন যেতে দিতে চায় না। সঙ্গে লবণ ছিল না, অগত্যা হাত দিয়েই ছাড়ালাম।

নামতে বেশি কষ্ট হলো না। ছয় নম্বর ধাপে গিয়ে ঝরনার ঠাণ্ডা পানিতে আকার গোসল করলাম এবং সঙ্গে আনা শুকনো খাবার খেয়ে নিলাম। তারপর নিচে চললাম। ঝিরিপথ ধরে রেলগেট পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেল। ততক্ষণে আমরা ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। এখান থেকে আবার মূল রাস্তা পর্যন্ত হাঁটতে হবে। বড় রাস্তা পার হয়ে যাব চন্দ্রনাথ পাহাড়ে। গল্পটা জমা রইল।

ছবি : লেখক

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী বাসে চড়ে নামতে হবে মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া বাজার। সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে রেলগেট। ভাড়া ৫০-৬০ টাকা। এরপর ঝিরিপথ ধরে হেঁটে যেতে হবে ঝরনায়। থাকার জন্য মিরসরাইয়ে মধ্যম মানের কিছু হোটেল আছে। তবে তাঁবু নিয়ে ঝরনার কোলে ক্যাম্প করে থাকাটা বেশি আনন্দের। ভালো কিছু ক্যাম্পিং স্পট আছে ঝরনার পাশে। সঙ্গে শুকনো খাবার এবং ছোট চুলা নিয়ে গেলে অনায়াসেই একটি সুন্দর রাত পার করে দেওয়া যায়। তবে রাতের বেলা আচানক বৃষ্টি ও ফ্ল্যাশ ফ্লাডের আশঙ্কা মাথায় রাখতে হবে।

 

 



মন্তব্য