kalerkantho


স্বর্গের কাছাকাছি

চৌধুরী আফতাবুল ইসলাম   

৪ নভেম্বর, ২০১৩ ০০:০০



স্বর্গের কাছাকাছি

সেন্ট মার্টিনের সর্ব দক্ষিণে মিউজিক ইকো রিসোর্ট। ছবি : লেখক

সেন্ট মার্টিনে দুই ধরনের পর্যটক যান। একদল আছেন যাঁরা দিনে দিনে ঘুরে চলে আসেন। ১২টা-সাড়ে ১২টা নাগাদ নেমে দ্বীপের উত্তরে জনাকীর্ণ এলাকায় ঘোরাঘুরি করেন। অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়রা নৌকা বা স্পিডবোটে করে ঘণ্টাখানেক সময় নিয়ে ছেড়াদ্বীপ ঘুরে আসেন। এরপর জেটিঘাটে কোনো একটি রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়াদাওয়া করে আড়াইটার মধ্যে ফিরতি যাত্রা।

এদের কাউকেই নিজের আসল চেহারাটা দেখায় না সেন্ট মার্টিন। রাত ছাড়া সেন্ট মার্টিনের মহিমা বোঝা যাবে না। রাতে থাকার জন্য দ্বীপে এখন অনেক হোটেল-রিসোর্ট আছে। অবশ্য সেগুলোর সবই দ্বীপের উত্তর প্রান্ত ঘেঁষে। তবে সমস্যা হলো জেটিসংলগ্ন ওই অঞ্চলটি সব সময় মানুষের ভিড়ে সরগরম। সেন্ট মার্টিন যাওয়ার মূল উদ্দেশ্যই তো ভিড়-ভাট্টা ঠেলে নির্জনতায় অবগাহন।

মন পাগল করা এই নির্জনতা উপভোগ করতে চাইলে আপনাকে যেতে হবে দ্বীপের একেবারে দক্ষিণে। চমৎকার একটা রিসোর্ট পাবেন। নাম মিউজিক ইকো রিসোর্ট। সেখানে সাগর ছাড়া আর সবই স্তব্ধ। চারদিকে সমুদ্র সফেন। একেবারে কাকচক্ষু স্বচ্ছ, টলটলে পানির সম্ভার। অপার নির্জনতা। শব্দ বলতে উত্তাল সাগরের অবিরাম ঢেউ ভাঙার উল্লাস আর বাতাসের সতেজ ঝাপটার যুগল সিম্ফনি। জেটিঘাট থেকে সাত কিলোমিটার দূরে ছেড়াদ্বীপ লাগোয়া ওই অংশে খুব একটা মানুষের দেখা মিলবে না। দিনের বেলা হঠাৎ হঠাৎ দু-চারজন জেলের দেখা মিলবে, সৈকতে জাল থেকে মাছ ছাড়াতে ব্যস্ত। অবিশ্বাস্য কম দামে সদ্য ধরা সেই মাছ (বেশির ভাগই সামুদ্রিক চাপিলা) কিনে তুলে দিন রিসোর্টের বাবুর্চির হাতে। সেই টাটকা মাছের স্বাদ- না বলব না- নিজেই পরখ করে নেবেন। রিসোর্টটিতে কোনো বিল্ডিং নেই, সবই ন্যাচারাল। কেয়ার বেড়াঘেরা ছায়াময় গাছগাছালির তলে ছাড়া ছাড়া কিছু তাঁবু। সেখানেই থাকার ব্যবস্থা। তিন দিকে ছোঁয়া দূরত্বে সাগর। পশ্চিমে কোরাল বিচ, দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ আর উত্তরে বালুর সৈকত। ওই মিউজিক ইকো রিসোর্টে গেলে আপনিই হবেন বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে থাকার অনন্য গৌরবের অধিকারী। রাত নামলে 'মন খারাপ করা' নির্জনতা আপনাকে গ্রাস করে নেবে। আপনি আর আপনার সঙ্গী- আর কোনো জনমানুষ খুঁজে পাবেন না পুরো তল্লাটে। রাতে বিচে বসে বারবিকিউ পার্টি করুন। হারমোনিয়াম বা গিটারের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলা, ওরিয়েন্টাল, ওয়েস্টার্ন- খাওয়াদাওয়ার সব ধরনের আয়োজনই আছে। শুধু কেয়ারটেকারকে অর্ডার করুন। জোছনা রাতে রিসোর্টের নিজস্ব বোটে করে অপার সাগরে ঘুরে বেড়ান যতক্ষণ খুশি। বিশাল বঙ্গোপসাগরের তখন আপনিই রাজা। স্থানটি সাগরের সর্ব দক্ষিণে হওয়ায় এখান থেকেই দেখতে পাবেন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। রিসোর্টে একসঙ্গে ৩২-৪০ জনের থাকার ব্যবস্থা আছে। মাত্র ১০ মিনিটে আপনি হেঁটে চলে যেতে পারেন ছেড়াদ্বীপ। বোট ভাড়ার বাড়তি খরচ কমলো।

সাগরে মাছ ধরতে চাইলে রিসোর্ট থেকে হুইল ভাড়া নিতে পারেন। দিনে যেমন তেমন, রাতের এই সাগরকন্যা যেন স্বপ্নপুরী। অমাবস্যার রাত হলে ঘটবে তারার সঙ্গে মিতালি। একটি-দুটি নয়, কোটি কোটি তারার ঠাসাঠাসি সাম্রাজ্য। নারিকেল পাতার ঝিরিঝিরি আওয়াজ আর ঢেউয়ের গর্জন আপনাকে করে তুলবে মোহাচ্ছন্ন। ভয়ও লাগবে একটু একটু। আর 'চান্নি' রাতে সেন্ট মার্টিন মানে রোমান্টিসিজমের একশেষ। পরিষ্কার আকাশে চাঁদটা যেন নেমে আসে অনেকখানি। রিসোর্টের বিস্তৃত আঙিনায় রয়েছে ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টন খেলার ব্যবস্থা। রিসোর্টের পাশেই রয়েছে বিশাল বিচ। একেবারে সামুদ্রিক সুইমিং পুল। যেখানে জোয়ারের পানিতে গ্রুপ করে বলও খেলা যাবে। মিউজিক ইকো রিসোর্টের পরিচ্ছন্ন এবং মানসম্মত একটি রেস্টুরেন্ট আছে। দ্বীপের উত্তর প্রান্তে জেটিসংলগ্ন রেস্টুরেন্টটির নাম 'নারিকেল জিনজিরা'। স্পেশালাইজড এই রেস্টুরেন্টে একসঙ্গে বসে অনেকে খেতে পারেন। মুখরোচক নানা স্বাদের সি ফুড, বাংলা, চায়নিজ, বুফে, বারবিকিউ- সব পাবেন। রিসোর্টে বসে অর্ডার করলেও সময়মতো পৌঁছে যাবে সদ্য ধরা সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া, পেল্লাই লবস্টারের সুস্বাদু রেসিপি।

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে বাসে অথবা নিজস্ব পরিবহনে সরাসরি টেকনাফ। ৯টা থেকে সাড়ে ৯টার মধ্যে জাহাজে উঠতে হবে। টেকনাফ টু সেন্ট মার্টিন। আর কক্সবাজারে রাত্রি যাপন করলে সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে টেকনাফে পৌঁছাতে পারলেও হবে। সেন্ট মার্টিন যাওয়ার অনেকগুলো জাহাজ আছে। পছন্দমতো একটিতে চেপে বসুন। তবে আগে বুকিং থাকলে ভালো। পর্যটন মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। বলা ভালো, অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সেন্ট মার্টিন পর্যটকদের জন্য খোলা থাকে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর বন্ধ। রিসোর্ট বুকিং করা না থাকলে দ্বীপে নেমে নারিকেল জিনজিরা রেস্টুরেন্টে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নাশতার সঙ্গে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে মিউজিক ইকো বুকিং-এর কাজটা সেরে নিতে পারেন। তবে সব সময় রিসোর্টটি খালি পাওয়ার কোনো গ্যারান্টি নেই। ঝামেলা এড়াতে ঢাকা থেকেও বুকিংয়ের ব্যবস্থা আছে। ঢাকা অফিস: হোটেল আশরাফি, ১২ আউটার সার্কুলার রোড, রাজারবাগ, ঢাকা।

মোবাইল: ০১৮২১৬৮৬৯১৬, ০১৬১৩৩৩৯৬৯৬, ০১৭৬১৭৭৫১৫৫-৯।

www.musicecoresort.com, www.facebook.com/musicecoresort, www.facebook.com/NarikelJinjira

 

 



মন্তব্য