কামাল হোসেনের রাজনৈতিক সক্রিয়তার উন্মেষ জীবনের গোড়াতেই। চুয়ান্নতে শিকাগোতে যুক্তরাষ্ট্রে আগত পাকিস্তানি ছাত্র সমিতি করতে গিয়ে দেখেন, ২০০ ছাত্রের মধ্যে বাঙালি মাত্র পাঁচ-ছয়জন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তঁর পরিচয় কাকরাইলে মানিক মিয়ার বাসায়, এখন যেটা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের 'মোসাফির ভবন'। সত্তরের নির্বাচনে মুজিব জয়ী হন দুটি আসনে। তেজগাঁওয়ের আসনটি তিনি ছেড়ে দেন কামাল হোসেনকে। জীবনে এই প্রথম কামাল হোসেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন পুরো জীবনটাই যাঁর ইতিহাস। মাত্র ৩৫ বছর বয়সে একটি নতুন দেশের আইনমন্ত্রী। আবার একটি স্বাধীন দেশের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান। আইন পেশায় নিয়োজিত এই কিংবদন্তি এখন ৭৭-এ পা দিয়েছেন। পেশার শুরু থেকেই একজন তুখোড় আইনজীবী হিসেবে সর্বপরিচিত মুখ। জ্বালানি খাতে বিশ্বব্যাপী তিনি একজন সুপরিচিত সালিস নিষ্পত্তিকারী। এ ছাড়া এখনো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নতুন আইন প্রণয়নে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন ড. কামাল হোসেন। বাবা ছিলেন চিকিৎসক। বরিশালের শায়েস্তাবাদের ঐতিহ্যবাহী জমিদারবাড়ির এই চিকিৎসক ভাবলেন, মানুষের খাজনায় বিলাসী জীবন চালানো আর ঠিক নয়। তাই তিনি ডাক্তারি পেশায় মন দিলেন। তাঁর বাসা ছিল কলকাতার চৌরঙ্গীতে। সেখানে ডাক্তারি পেশা জমল ভালোই। ১৯৩৭ সালে তাঁর ঘরে এলো এক শিশু। বেড়ে উঠতে লাগল সে। ১৯৪৩ সালে বাজল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা। কলকাতাবাসীর অনেকে যুদ্ধের ডামাডোলে প্রাণভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের আশায় ছাড়ছিল শহরটি। এমনই একটি দলে আমরা দেখি সেই ছেলেটিকে। অনেকের সঙ্গে তার গন্তব্য বরিশাল। বাপ-দাদার ভিটা। স্বভাবে শান্ত হলেও স্বশিক্ষিত মায়ের চোখে ছেলেটি কিন্তু বেজায় জেদি। মা-বাবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আকাশে দৃশ্যমান জাপানি বোমারু বিমান দেখার দুর্নিবার কৌতূহল ছিল তার। তার চোখে 'আকাশ হয়ে যেত লাল'। সেই ছেলেটিই কামাল হোসেন। কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্সে পড়াশোনা করতেন। সাতচল্লিশে দেশভাগের পর তাঁর বাবা কলকাতার পাট চুকিয়ে স্থায়ীভাবে ঢাকায় আসেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে ইলেকট্রোথেরাপি বিভাগের প্রতিষ্ঠা তাঁর হাতেই। বাসা ছিল বেইলী রোডের 'গুলফিশানে'। আর কামাল হোসেন ঢাকার সেন্ট গ্রেগরী'জ থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন ১৯৫১ সালে। ১৯৫৩ সালে সেন্ট গ্রেগরী'জ থেকে আইএতে প্রথম স্থান অধিকার করে বৃত্তি নিয়ে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। তখন সাধারণত জাহাজে চেপেই মানুষ যেত যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু তিনি গেলেন প্লেনে। যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছার পর ইন্ডিয়ানার নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁর দ্যুতিময় একাডেমিক রেকর্ড দেখে সিদ্ধান্ত নিল, একে তৃতীয় বর্ষে না দিলেই নয়। সুতরাং এ বালক শুরুতেই হলেন তৃতীয় বর্ষের জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থী। তাঁর সহপাঠীদের বয়স যেখানে ১৮-১৯, তিনি সেখানে ১৬। এরপর কামাল হোসেন মাত্র ৩৫ বছর বয়সে একটি নতুন রাষ্ট্রের তুখোড় আইনমন্ত্রী হয়েছেন এবং সেই রাষ্ট্রের নতুন সংবিধান তৈরির জন্য গণপরিষদ গঠিত কমিটির চেয়ারম্যানের পদ অলংকৃত করেছেন। এর দুই বছর পর বিশ্বের অন্যতম কনিষ্ঠ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে উড়িয়েছেন লাল-সবুজে খচিত বাংলাদেশের রক্তিম পতাকা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে : পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের দিনটিতে তিনি ছিলেন টিটোর যুগোস্লাভিয়ায়। সেখান থেকে লন্ডনে। মোশতাক খবর পাঠিয়েছিলেন, তিনি যেন দেশে ফিরে তাঁদের সঙ্গে ভিড়ে যান। ড. কামাল হোসেন বেছে নেন অক্সফোর্ড। এ সময় একটি স্মৃতিকথা (অপ্রকাশিত) লেখেন তিনি। পঁচাত্তরে তাঁর স্ত্রী দুই মেয়েকে নিয়ে ঢাকা থেকে লন্ডন যাওয়ার পথে তেজগাঁও বিমানবন্দরে বাধা পান। কামাল হোসেনের সাবেক পিএস তৌফিক আলী এটা জানতে পেরে জেনারেল ওসমানীকে জানান। তিনি বিষয়টি রফা করেন। এ জন্য প্রায় এক ঘণ্টা বিলম্বে যাত্রা করে বিমান। ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৮ সালের মধ্যে কামাল হোসেন সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সুইডেন, ডেনমার্ক, চীন, মোজাম্বিক, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইনের টেলিযোগাযোগ ও জ্বালানি তেল-সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন প্রণয়নে সহায়তা দেন। জ্বালানি খাতে বিশ্বব্যাপী ড. কামাল হোসেন একজন সুপরিচিত সালিস নিষ্পত্তিকারী। মালয়েশিয়া বনাম সিঙ্গাপুর সাগর ভরাট মামলার সফল সমঝোতায় তিনি ছিলেন অন্যতম সালিস। জার্মান তেল কম্পানির সঙ্গে বিরোধে তিনি জয় আনেন কাতারের পক্ষে। গায়ানা বনাম সুরিনাম সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত যে বিরোধ বিচার হয়েছিল, তিনি এর অন্যতম বিচারক ছিলেন। বাংলাদেশের পক্ষে ড. কামাল হোসেন সিমিটারের বিরুদ্ধে মামলায় সাফল্য আনেন। চট্টগ্রাম বন্দরকে ১৯৮ বছরের জন্য ইজারা দেওয়ার চেষ্টা আদালতের মাধ্যমে ঠেকান। তিয়াত্তরে শেলের কাছ থেকে নামমাত্র দামে গ্যাসের বিশাল মজুদ কেনার গর্বের ভাগীদার তিনি। ২০১০ সালে বিশ্ববিখ্যাত তেল কম্পানি শেভরনের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্যাস-সংক্রান্ত একটি মামলায়ও বাংলাদেশের বিজয় ছিনিয়ে আনেন আন্তর্জাতিক আদালত থেকে। জাতিসংঘের র্যাপোর্টিয়ার হিসেবে আফগানিস্তানের গোলযোগপূর্ণ এলাকা দক্ষিণ গাজা, দক্ষিণ আফ্রিকার নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবনের হুমকি মোকাবিলা করেছেন। ফিদেল কাস্ত্রোর দেশে ২০০০ সালে গিয়ে তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেন তিয়াত্তরে আলজিয়ার্সে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের কথা। ড. হোসেনের বিদেশ সফর বহুল আলোচিত। কিন্তু তিনি কখনো বিদেশে স্থায়ীভাবে থাকার চিন্তা করেননি। বছর কয়েক আগে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক দিন মানবাধিকার আইনের ওপর ক্লাস নিয়েছেন। এখনো মাঝেমধ্যে এ রকম প্রস্তাব আসে। স্থায়ীভাবেও বিভিন্ন দেশে বসবাসের প্রস্তাব পেয়ে তা গ্রাহ্য করেননি তিনি। বাংলাদেশের পাসপোর্ট হাতে এভাবেই তিনি ছুটে বেড়ান বিশ্বময়। ড. কামাল যেন এভাবেই বাংলাদেশের এক ভ্রাম্যমাণ রাষ্ট্রদূত, এক জীবন্ত পাসপোর্ট। অক্সফোর্ডের দিনগুলো : সে যুগে সবাই যেত বিলেতে। অথচ তিনি গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে! কেন? সেন্ট গ্রেগরী'জের অধ্যক্ষ ফাদার মার্টিন ইন্ডিয়ানার নটর ডেমে তাঁকে বৃত্তি পেতে সহায়তা করেন। ইন্ডিয়ানার পাট চুকিয়ে লন্ডনে যাওয়ার আগে কামাল হোসেন ঢাকায় আসেন। তত দিনে সেন্ট গ্রেগরী'জ কলেজের নাম বদলে নটর ডেম হয়েছে। ফাদার মার্টিন তাঁর কৃতী ছাত্রকে বর্তমান নটর ডেম কলেজে সংবর্ধনা দেন। ইন্ডিয়ানার নটর ডেমে অর্থনীতিতে অনার্স শেষ হতে না হতেই তাঁর আবেদন গেল অক্সফোর্ডে। অক্সফোর্ড কিন্তু কোনো একক বিদ্যাপীঠের নাম নয়। অনেক কলেজ নিয়ে অক্সফোর্ড। তিনি আইনে অনার্স ও বিসিএল করেন কুইন্সে, আন্তর্জাতিক আইনে ডক্টরেট করেন নাফিল্ডে। নটর ডেমের সনদের কারণে তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রিতে তিনি এক বছর রেয়াত পান। তখন তিনি ১৮ বছরের তরুণ। লন্ডনে পড়ার খরচ বছরে মাত্র ৫০০ পাউন্ড অর্থাৎ সে সময়ের ছয় হাজার টাকা। এর ওপর ১৯৫৭ সালে অনার্স শেষ হতেই অল্পবয়সী টিউটর হলেন। বার্ষিক ৫০০ পাউন্ড। খুশিতে ডগমগ কামাল হোসেন বাবাকে জানিয়ে দিলেন, আপাতত তাঁর পড়ার খরচের জন্য তিনি নিজেই যথেষ্ট। অক্সফোর্ড মজলিশ নামে একটি সোসাইটি ছিল। সোহরাওয়ার্দী, সর্দার প্যাটেল, ইরানের রাফসানজানি মজলিশে সক্রিয় ছিলেন। কামাল হোসেন এই সোসাইটির নির্বাচিত নেতা হন। ১৯৫৬ সালে অমর্ত্য, জুলিয়াস নায়ারেরে, পরবর্তীকালে যিনি হন তাঞ্জানিয়ার জাতির পিতা। অক্সফোর্ডের ইতিহাসের বিরল ধর্মঘট পালনকালে কামাল হোসেন ছিলেন মজলিশের সভাপতি। সুয়েজ যুদ্ধের প্রতিবাদে ছাত্ররা ধর্মঘটে যান। ড. কামাল এই ধর্মঘটে নেতৃত্ব দেন। ১৬ জুন ১৯৫৯ লিংকনস ইন থেকে বেরিয়ে ব্রিটিশ বারের সদস্য হিসেবে তালিকাভুক্ত হন ড. কামাল হোসেন। তাঁর কুইন্স বন্ধু লর্ড হফম্যান হাউস অব লর্ডসের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ছিলেন। অক্সফোর্ডে তাঁর সুপারভাইজার স্যার হামফ্রি ওয়াল্ডক হেগের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। আইন পেশায় : ড. কামাল হোসেনের প্রিয় বিষয় সমুদ্র আইন, জ্বালানি, তেল ও গ্যাসবিষয়ক আইন ও বিরোধ নিরসন। কামাল হোসেন ঢাকায় ফেরেন ১৬ নভেম্বর ১৯৫৯। বয়স তখন ২২ বছর। যোগ দেন বহুজাতিক ল ফার্ম অরডিগনামে। সেই থেকে ৫৫ বছরের একটি বর্ণাঢ্য ওকালতি জীবন তাঁর বহমান। এখনো আদালতে নিয়মিত যাওয়া-আসা। কামাল হোসেনের জীবনের প্রথম বড় মামলা ইত্তেফাক নিয়ে। ছয় দফার সমর্থক হওয়ার দোষে ইত্তেফাক বাজেয়াপ্ত হলো। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাবা মাহমুদ আলী কাসুরির সঙ্গে তিনি ওই মামলায় প্রথম লড়েন ঢাকা হাইকোর্টে। এতে জিতলে তা যায় সুপ্রিম কোর্টে। তখন কামাল হোসেন ছিলেন এ কে ব্রোহির জুনিয়র। বিখ্যাত আইনজীবী ব্রোহির সঙ্গে আইয়ুব খানের একটি চাতুর্যপূর্ণ পদক্ষেপকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেওয়ার রায় ছিল আরেকটি মাইলফলক অভিজ্ঞতা। ওই রায়ে দেড় ডজন লোক মন্ত্রিত্ব হারান। রাজনীতির হাতেখড়ি : ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন তাঁর খালাতো ভাইয়ের বন্ধু। সেই সুবাদে ভাষা আন্দোলনে ভূমিকা রাখার সুযোগ ঘটে তাঁর। ভাষা আন্দোলনের সময় অন্যরা অনেক কিছু দাবি করতে পারে। কামাল হোসেন ওই সময় শুধু আন্দোলনসংক্রান্ত চিঠির খামে ঠিকানা লিখে ও তা বিলি করার কাজে জড়িত ছিলেন। এ ছাড়া আন্দোলনের নানা কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন। সেই ৯ মাসের জেলজীবন ও বঙ্গবন্ধু : তিনি জেল খেটেছেন দুইবার। একাত্তরের পর ১৯৮৩ সালে। তিরাশিতে চোখ বেঁধে তাঁকে শেখ হাসিনাসহ অন্যদের সঙ্গে আটক করা হয়। ১৫ দিন পর ছাড়া পান। কামাল হোসেন একাত্তরে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদের হরিপুর কারাগারে ছিলেন। একাত্তরের আগস্টে ড. হোসেনের মা-বাবা, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে জেলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ২ সেপ্টেম্বরই তিনি চিঠি পান, বিশেষ সামরিক আদালতে তাঁর বিচার হবে। খেতে পেতেন সকালে নিরেট একটি রুটি ও চা। তাঁর মা হোসনে আরা বেগম ভালো রাঁধতেন। কামাল হোসেন খেতে পছন্দ করেন। কিন্তু জেলে মিলেছে দুপুরে ও রাতে এক বাটি ডাল ও রুটি, কখনো ভাত। ৯ মাসে তাঁকে দেওয়া একটি খাতায় লিখেছেন রাজনৈতিক জীবন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর দেখা হয় ২৮ ডিসেম্বর পিন্ডির সিহালা জেলে। একত্রে ১০ দিন ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাঁর বিচার চলাকালে কামাল হোসেনকেই তাঁর আইনজীবী নিয়োগের কথা বললে বিচারকরা হেসেছিলেন। তাঁকে দেওয়া হয় এ কে ব্রোহিকে। অথচ তাঁকে ব্রোহির সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয়নি। আদালতে একদিন ব্রোহির কথা শুনে তিনি বুঝতে পারেন, কামাল হোসেন বন্দি। সংবিধান ও তাজউদ্দীন : সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সভাপতি হিসেবে ড. কামাল হোসেন ইংরেজিতে সংবিধানের খসড়া লেখেন। ব্রিটিশ লিগ্যাল ড্রাফটসম্যান গার্থি ঘষামাজার কাজ করেন। বাংলাদেশের সংবিধানের ওপর কমনওয়েলথের অর্থানুকূল্যে নাফিল্ডে, তাঁর কলেজেই ব্রিটিশ সংবিধান বিশেষজ্ঞদের দিনব্যাপী একটি সম্মেলন হয়েছিল। এতে অন্যদের মধ্যে বিখ্যাত সংবিধান বিশেষজ্ঞ প্রফেসর কে সি হুয়্যার, হুড ফিলিপস প্রমুখ অংশ নেন। পারিবারিক জীবন : নারী নেত্রী ও মানবাধিকারকর্মী ড. হামিদা হোসেন কামাল হোসেনের সহধর্মিণী। ১৯৬৫ সালে আইনজীবী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে হামিদা হোসেন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান থেকে ঢাকার পরীবাগে তাঁর বোনের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন। এসে জানলেন এখানে নিউ ভ্যালুজ ক্লাব রয়েছে। অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, অধ্যাপক রেহমান সোবহান, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক প্রমুখ শিক্ষাবিদ এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ড. কামাল হোসেন তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়ান। হামিদা হোসেনের বোনের স্বামীও ওই ক্লাবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ। সেই সুবাদে ১৯৬২ সালেই ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা হয় এবং দেখা থেকে প্রেম। এর দুই বছর পর ১৯৬৪ সালে লন্ডনে তাঁদের বিয়ে হয়। ঘটা করে নয়, সাদামাটাভাবে তাঁদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। ড. হামিদা হোসেন পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের একটি শহর হায়দরাবাদে ১৯৩৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। বাবা জেলা জজ ছিলেন। হামিদা হোসেনের মা তুরস্কে বড় হন এবং ১৬ বছর বয়সে বিয়ের পর দেশে ফিরে আসেন। মা-বাবার ছয় সন্তানের মধ্যে হামিদা ছিলেন সবার ছোট। হামিদা হোসেনের শৈশব কেটেছে করাচিতে। জজ বাবা বিভিন্ন জেলায় বদলি হওয়াতে তাঁদের পড়াশোনার ক্ষতি হতো। ১৯৪৬ সালে অসুস্থতার কারণে তাঁর বাবা অবসর গ্রহণ করায় তাঁরা হায়দরাবাদে চলে আসেন। তাঁর অন্য ভাইবোনদের তখন বোর্ডিং স্কুল-কলেজে পাঠানো হলেও সবার ছোট হওয়ায় তাঁকে তাঁর মা-বাবার সঙ্গেই থাকতে হয়েছিল। হায়দরাবাদে এসে তিনি একটি মিশনারি স্কুলে ভর্তি হন। তাঁর পড়াশোনার মাধ্যম ছিল ইংরেজি আর দ্বিতীয় ভাষা ছিল ফারসি। বাড়িতে মায়ের সঙ্গে তাঁরা সিন্ধিতে কথা বলতেন। এই স্কুল থেকে ১৯৫১-৫২ সালে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। হায়দরাবাদে কলেজের প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করার সময় 'নিউ ইয়র্ক হেরাল্ড ট্রিবিউন' আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে তিন মাস যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের সুযোগ পান। সেখানে তিনি এক মার্কিন পরিবারের সঙ্গে থেকে স্কুলে যেতেন। ১৭ বছর বয়সে তিনি বৃত্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েলেসলি কলেজে পড়তে যান। সেখানে তিন বছর পড়ালেখা করেন। এরও অনেক পরে সত্তরের দশকে হামিদা হোসেন অক্সফোর্ডের সেন্ট অ্যান্টোনি'স কলেজ থেকে আধুনিক ইতিহাসের ওপর পিএইচডি করেন। তাঁর থিসিসের বিষয় ছিল 'ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির অধীনে বাংলার বস্ত্রশিল্পের উৎপাদন'। পরিবার-প্রিয়জন : কামাল হোসেন অবসরে উপন্যাস পড়ার পাশাপাশি ছবি দেখেন। সত্যজিৎ রায়, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক-ক্যাথরিন মাসুদের প্রায় সব ছবিই তিনি দেখেছেন। কখনো গান শোনেন। দাবাও খেলেন। কামাল হোসেনের বাবা একাত্তরে মারা যান করাচিতে। তাঁর মায়ের মৃত্যু আশির দশকে। বরিশালের পৈতৃক নিবাস আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। তবে বরিশাল শহরে এখনো একটি বাড়ি আছে। শায়েস্তাবাদে একই গ্রামের ছেলে সার্জেন্ট ফজলুল হক। তাঁরই আগ্রহে ড. হোসেন সেখানকার একটি ট্রাস্টে সক্রিয় হন। শায়েস্তাবাদ থেকে মুর্শিদাবাদ অর্থাৎ তাঁর বাবা ডা. আহমেদ হোসেন ও মা হোসনে আরা বেগমের বাড়ির আত্মীয়স্বজন বংশপরম্পরার বসত ঘুচিয়ে প্রায় সবাই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যান। বিশ্বায়ন, আন্তঃসাংস্কৃতিক মিলমিশ এই পরিবারটিকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। কামাল হোসেনের দুই মেয়ে সারা হোসেন ও দিনা হোসেনের স্বামী ব্রিটিশ। দুই বোনেরই একই ভাগ্য। ব্যারিস্টার সারার স্বামী ডেভিডের বাড়ি লন্ডনে। সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত। এখন ঢাকার দ্য নিউ এজ পত্রিকার বিশেষ প্রতিনিধি ডেভিড। একাত্তরের ঘাতকদের ওপর বিবিসি চ্যানেল ফোরের ডকুমেন্টারির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ডেভিডের ডেন্টিস্ট মা-বাবা রোমানীয় বংশোদ্ভূত। ডেভিড ও সারা- দুজনই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁরা বাংলাদেশেই থাকবেন। ছোট মেয়ে দিনার শ্বশুরবাড়ি আয়ারল্যান্ডে। কিন্তু তাঁদের নিবাস নিউ ইয়র্কে। লন্ডনে বিয়ে হলেও নিউ ইয়র্কের পেশ ইমাম তাঁদের বিয়ে পড়ান। দিনা ও তাঁর স্বামী গ্রাহাম- দুজনই চিত্র পরিচালক। নাইন-ইলেভেনের পর মুসলমানদের ওপর একটি ইতিবাচক ডকুমেন্টারি তৈরি করতে গিয়ে দুজনের পরিচয়। কামাল হোসেনের জীবনে সবচেয়ে বড় অর্জন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি আদায়ের জন্য তিনিসহ বাংলাদেশের অনেকেই প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। সে সময় তিনি ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ড. কামাল হোসেন পাড়ি দিচ্ছেন ক্লান্তিহীন পথ। এই বর্ণাঢ্য যাত্রার পুরোটা স্বল্প পরিসরে স্পর্শ করা সম্ভব নয়। ৭৭ বছর বয়সী এই জীবন্ত কিংবদন্তির পুরো জীবনটাই বর্ণিল ও কর্মময়।