পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানী ছাড়ছে লাখো মানুষ। সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার পর থেকেই বাসটার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে ঘরমুখো মানুষের ভিড়। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ঈদযাত্রায় নতুন করে ভোগান্তি দেখা দিয়েছে। মহাসড়কে যানবাহনের ধীরগতি, টার্মিনালে দীর্ঘ অপেক্ষা, লঞ্চঘাটে যাত্রীদের চাপ এবং ট্রেনের সূচি বিপর্যয়ে দুর্ভোগে পড়েছে যাত্রীরা।
গতকাল রাজধানীর গাবতলী, সায়েদাবাদ, মহাখালী ও আবদুল্লাহপুর বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই বিভিন্ন জেলার যাত্রীদের দীর্ঘ সারি। টিকিট কেটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর বাসে উঠতে হয়েছে অনেককে। বৃষ্টির কারণে টার্মিনালের খোলা অংশে অবস্থান করা যাত্রীদের দুর্ভোগ ছিল বেশি।
গাবতলী বাস টার্মিনালে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বগুড়াগামী বাসের অপেক্ষায় ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী রফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘বাসের সময় ছিল সকাল ৯টা। দুপুর হয়ে গেলেও বাস আসেনি। বৃষ্টির মধ্যে শিশুদের নিয়ে বসে থাকতে হচ্ছে।’
পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ঈদ উপলক্ষে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি যাত্রী রাজধানী ছাড়ছে। ফলে কোথাও সামান্য যানজট তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ছে পুরো রুটে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কয়েকটি অংশে যানবাহনের চাপের কারণে চলাচলে ধীরগতি দেখা গেছে। বিশেষ করে সেতু, টোল প্লাজা ও গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে।
বৃষ্টিতে নৌপথে যাত্রী কমেছে : সড়কপথের পাশাপাশি দক্ষিণাঞ্চলগামী যাত্রীদের বড় অংশ নৌপথ ব্যবহার করছেন। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যাত্রীদের ব্যাপক ভিড় দেখা গেছে। অনেক যাত্রী নির্ধারিত সময়ের আগেই ঘাটে এসে অবস্থান নেয়।
বরিশালগামী যাত্রী আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘বৃষ্টি থাকায় আগে চলে এসেছি। পরে ভিড় বাড়লে পরিবার নিয়ে ওঠা কঠিন হবে।’
তবে দুপুরে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলে যাত্রীর সংখ্যা কমে যায়। ঢাকা নৌযান সংস্থার সভাপতি মামুনুর রশিদ বলেন, ‘বৃষ্টির পর যাত্রী অনেক কমে গেছে। অনেক লঞ্চই হয়তো ছাড়ত না, কিন্তু আগাম কেবিন বুকিং থাকায় যেতে হচ্ছে। বিরূপ আবহাওয়া থাকলে লঞ্চমালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।’
ট্রেনে বেড়েছে চাপ : ঈদযাত্রায় তুলনামূলক নিরাপদ পরিবহন হিসেবে ট্রেনের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে বিভিন্ন রুটে ট্রেন ১০ থেকে ২০ থেকে ২০ মিনিট দেরি করায় যাত্রীদের ভোগান্তি হয়েছে। স্ট্যান্ডিং টিকিটের যাত্রী বাড়ায় অতিরিক্ত চাপও দেখা গেছে। কমলাপুর রেলস্টেশনে দেখা যায়, উত্তরবঙ্গগামী কয়েকটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ের ১০ থেকে ২৫ মিনিট পর ছেড়েছে। এর মধ্যে রংপুর এক্সপ্রেস, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, নীলসাগর এক্সপ্রেস ও পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের যাত্রীদের প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
ঢাকা রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ, বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টিজনিত সমস্যা এবং কারিগরি জটিলতার কারণে কিছু ট্রেনের সময়সূচি সামান্য বিঘ্নিত হয়েছে। গতকাল কিছু সমস্যা থাকলেও আজ পরিস্থিতি স্বাভাবিক।’
আবহাওয়ার প্রভাব : আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, সিলেট ও বরিশাল বিভাগের অনেক এলাকায় মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি হতে পারে। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বৃষ্টির কারণে মহাসড়কে যানবাহনের গতি কমে যায়। একই সঙ্গে দৃশ্যমানতা কমে যাওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ : এরই মধ্যে ঈদযাত্রায় কয়েকটি দুর্ঘটনা উদ্বেগ তৈরি করেছে। রবিবার টাঙ্গাইলে রডবোঝাই ট্রাক উল্টে ১৫ জন নিহত হয়। এ ছাড়া নরসিংদীতে ট্রেনের ছাদে বজ্রপাতে দুজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। যাত্রী অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অতিরিক্ত ভাড়া, পর্যাপ্ত পরিবহনের সংকট ও দুর্বল নজরদারির কারণে অনেক মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতে বাধ্য হচ্ছেন।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘প্রতি ঈদেই দেখা যায়, বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস, ট্রাক বা ট্রেনের ছাদে যাতায়াত করছে। নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে।’
নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে বলেন, ‘প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার পর চালক বা যানবাহনের ত্রুটি নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু কেন মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহনে উঠতে বাধ্য হচ্ছে, সেই প্রশ্ন গুরুত্ব পায় না। গণপরিবহনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর নজরদারি ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।’
নগর ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ঈদযাত্রার চাপ নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে প্রতিবছর একই ধরনের ভোগান্তি দেখা যায়। শুধু যানবাহনের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, যাত্রী ব্যবস্থাপনাও উন্নত করতে হবে।’
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, ‘ঈদের সময় জাতীয় জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন সামরিক ও বেসামরিক সংস্থার যানবাহন ব্যবহার করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার সে পরামর্শ গ্রহণ করেনি।’