English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

ইদলিব অভিযান জঙ্গিগোষ্ঠী এবং মার্কিন হুমকি

ফিনিয়ান কানিংহাম

  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

সিরিয়া সরকার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করলেই সামরিক হামলাআগে এ হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। তখন একটা কারণ দেখানো হয়েছিল। পরে ট্রাম্প কোনো কারণ উল্লেখের প্রয়োজনই বোধ করেননি। সরাসরি বললেন, ইদলিবে জঙ্গিদের ওপর যেন হামলা না হয়। ট্রাম্প টুইটারে সিরিয়া, রাশিয়া ও ইরানকে এভাবেই সতর্ক করেন।

রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের প্রসঙ্গ এখন আর মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের যুক্তি নয়। সিরিয়ার উদ্দেশে তাদের মূলকথা, আর কোনো সামরিক অভিযান নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, ৩০ লাখ লোক-অধ্যুষিত প্রদেশটিতে মাত্র ১০ হাজার জঙ্গির বিরুদ্ধে সিরিয়া ও তার মিত্ররা অভিযান চালালে শত-সহস্র লোকের মৃত্যু হবে।

ট্রাম্পের এই আপাত মানবিক উদ্বেগই বরং প্রকৃত উদ্বেগের বিষয়। এই উদ্বেগ কোথায় ছিল, যখন তাঁরা রাক্কায় অভিযান চালাচ্ছিলেন, যখন মার্কিন বিমানবাহিনী বোমা মেরে সব ধূলিসাৎ করছিল? সেই হামলায় হাজার হাজার লোক মারা গেছে। অথচ ইদলিবে রাশিয়া ও ইরান মানবিক সরণি তৈরি করে বেসামরিক লোকজনের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে।

ইদলিবে সরকারি বাহিনীর জঙ্গিবিরোধী অভিযানের ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি তাঁর পূর্ববর্তী নীতির বিপরীত। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্র যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স বলেছিল, ইদলিব অভিযানে সরকারি বাহিনী রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করলে তারা দ্বিধা না করে পাল্টা সামরিক অভিযান চালাবে।

পূর্ববর্তী হুমকিগুলোর কারণে ধারণা হয়েছিল, পশ্চিমা শক্তি নিজেরাই রাসায়নিক হামলার ঘটনা ঘটাবে, তারপর সরকারি বাহিনীর ওপর দোষ চাপাবে এবং এ অজুহাতে প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাবে।

পশ্চিমাদের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ আসলে ধোঁকা। এ ফর্মুলা গত এপ্রিল মাসেও কাজে লাগানো হয়েছিল, দৌমায় রাসায়নিক হামলার জন্য সিরীয় বাহিনীকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স যৌথ হামলা চালিয়েছিল, ১০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছিল। আসলে তা পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট হোয়াইট হেলমেটসের প্রপাগান্ডা স্টান্ট ছিল।

রাশিয়ার গোয়েন্দাদের বরাতে এবার প্রচুর প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আবারও ফলস ফ্ল্যাগ অপারেশনের জন্য জঙ্গিরা এবং হোয়াইট হেলমেটস ইদলিবে রাসায়নিক অস্ত্রের উপকরণ পাচার করেছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের শোরগোলের উদ্দেশ্য ফাঁস হয়ে গেছে। তারা অভিযানের অজুহাত হিসেবে রাসায়নিক অস্ত্রের প্রসঙ্গ তুলেছে। বাস্তবে জঙ্গিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। প্রপাগান্ডা স্টান্টের বিষয়টি চাউর হওয়ায় তারা হতবাক, তাদের গোপন উদ্দেশ্য মাঠে মারা গেছে। এখন তারা সরাসরি হামলার কথা বলছে, ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্যে তা স্পষ্ট। ইদলিবে অবশিষ্ট জঙ্গিদের নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে সরকারি অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। ওয়াশিংটনের কাছে সরকারি বাহিনীর অভিযান মাত্রই অবৈধ।

ভাবুন তো একবার, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কোনো এলাকা যদি অবৈধ অস্ত্রধারী গ্রুপগুলো দখল করে নিত, আর তাদের প্রতি যদি সিরিয়া, রাশিয়া বা ইরান সরকারের গোপন সমর্থন থাকত, তাহলে বিষয়টি ওই সব দেশের সরকার মেনে নিত কি?

যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর পরিবর্তমান নীতি বিস্ময় জাগায়। তারা আর রাখঢাক করছে না, রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অজুহাত দিচ্ছে না, মধ্যপন্থী জঙ্গিদের রক্ষা করার কথা বলছে না, বেসামরিক লোকদের রক্ষা করার কথাও বলছে না। তারা সরাসরি হামলার কথা বলছে। বিষয়টি পরিষ্কার, ইদলিবের জঙ্গিরা, বিশেষত হায়াত তাহরির আল শাম (সাবেক আল নুসরা ফ্রন্ট) আল-কায়েদাসংশ্লিষ্ট। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ, রাশিয়া এবং আরো অনেক দেশের সরকার একে সন্ত্রাসী সংগঠন আখ্যা দিয়েছে।

পশ্চিমা মিডিয়ায় মধ্যপন্থী বিদ্রোহী বা ফ্রি সিরিয়ান আর্মির প্রসঙ্গ আর নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো-মিত্ররা আগে তাদের মুণ্ডু শিকারিদের চেয়ে আলাদা ভাবত এবং সমর্থন দিত। এই মনগড়া বিভাজন রেখা উবে গেছে, সব বানোয়াট প্রসঙ্গই একসময় হাওয়া হয়ে যায়।

ইদলিবে পাশ্চাত্যের প্রক্সি আর্মির জঘন্য কর্মকাণ্ড চলছে। পশ্চিমা সরকারগুলো সিরিয়ার সরকার পরিবর্তনের ঘৃণ্য উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য গোপনে তাদের অর্থ ও অস্ত্র জোগাচ্ছে। জঙ্গি নির্মূলে সরকারি বাহিনীর আসন্ন অভিযানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে তাদের উদ্দেশ্য গোটা দুনিয়ার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স কার্যত স্বীকার করে নিল, রাসায়নিক অস্ত্র নয়; বরং জঙ্গিদের সর্বশেষ অবস্থানও নিশ্চিহ্ন হতে যাচ্ছেএটাই তাদের মাথাব্যথার আসল কারণ। সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে তাদের নকশা ভেস্তে যাচ্ছে, তাদের প্রক্সি আর্মি চরম অবমাননাকর পরাজয়ের সম্মুখীন।

দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো মিত্ররা সারা বিশ্বে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। সেই যুদ্ধে এই জঙ্গিরা তাদের শত্রু। সভ্যতা রক্ষার নামে মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অনেক দেশকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। লাখ লাখ বেসামরিক লোক প্রাণ হারিয়েছে। সিরিয়ায় সেই শত্রুদেরই তারা রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

সমালোচকরা বলে আসছেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আসলে ধোঁকা; পররাজ্য দখলের লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদী কর্মকাণ্ডকে চাপা দেওয়াই এর উদ্দেশ্য। সিরিয়ায় প্রমাণ হয়ে গেছে, পশ্চিমাদের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। জঙ্গিরা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের ঘুঁটি মাত্র।

লেখক : ব্রিটিশ সাংবাদিক, রয়াল সোসাইটি অব কেমিস্ট্রির সাবেক বিজ্ঞান সম্পাদক

সূত্র : আরটি অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর