English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

মধ্যপ্রাচ্য ও লেবাননের নিরপেক্ষতা

রবার্ট ফিস্ক

  • ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

১৯৪০ সালে ব্রিটেন ও জার্মানিউভয়ের আগ্রাসনের শিকার হতে যাচ্ছিল আয়ারল্যান্ড। কিন্তু আইরিশ সরকার নিরপেক্ষ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। জ্যেষ্ঠ এক মন্ত্রীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িত না হওয়ার বিষয়ে একটি স্মারক তৈরি করার জন্য। মন্ত্রীর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছিলেন, নিরপেক্ষতাও যুদ্ধেরই একটি রূপ, সংক্ষিপ্ত রূপ।

লেবানন হয়তো তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হবে। সাত বছর ধরে তারা প্রতিবেশী সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। ইসরায়েলের হুমকি, সিরিয়ার বন্ধুসুলভ আগ্রহ, যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবাণী, রাশিয়ার অনুরোধ, ইরানের আবাহনী মনোভাবসব এড়িয়ে চলছে তারা।

বৈরুতে কফি খেতে খেতে আমার এক বন্ধু বলছিলেন, লেবানন যদি এক মাস সরকারহীন অবস্থায় থাকে, তার দায় লেবাননেরই। কিন্তু যদি তিন মাস ধরে সরকারহীন অবস্থায় থাকে, তাহলে বুঝতে হবে এর সঙ্গে বিদেশিদের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। লেবানন ইসরায়েলের হুমকি, যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি, রুশদের আলিঙ্গন-চেষ্টা এবং ইরানিদের ভালোবাসার সঙ্গে আট হাজার কোটি ডলার ঋণ মাথায় নিয়ে চলছে। সঙ্গে আছে ১৫ লাখ সিরীয় শরণার্থী ও বিদ্যুত্স্বল্পতা। ১৯৭৫ সাল থেকে এ পরিস্থিতি চলছে।

লেবানন সরকার এবং সরকারসংশ্লিষ্ট সবাই আঞ্চলিক সব সংঘাত থেকে দূরে থাকতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। দূরত্ব রেখে চলাও একধরনের নিরপেক্ষতা। এটা দেখে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো মনে করে, পারস্পরিক সম্মতি ও সম্প্রীতির কারণেই লেবাননের এই ঐক্য। ১৯৭৫-৯০ সাল পর্যন্ত দেশটিতে যে গৃহযুদ্ধ হয়েছে, তেমন দশায় পড়ে ভেঙে যাওয়ার চেয়ে এই ঐক্য ঢের ভালো। ইইউ লেবাননে প্রচুর অর্থ ঢালছে। কারণ তারা যেকোনো পরিস্থিতিতে ইউরোপমুখী শরণার্থীর ঢল থামাতে চায়।

লেবাননের সুন্নি প্রধানমন্ত্রী সৌদি আরবকে ভালোবাসেন। বলা ভালো, ভালোবাসতে বাধ্য হন তিনি। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের পেছনে সৌদি সমর্থন রয়েছে। সৌদি আরবের নাগরিকও তিনি। অন্যদিকে সৌদি আরব মনে করে, সাদ হারিরি লেবাননে তাদের স্বার্থ রক্ষা করবেন। পাঠকদের নিশ্চয়ই মনে আছে, গত বছর সৌদি আরবে যাওয়ার কয়েক দিন পর হঠাৎ সৌদি টেলিভিশনে উপস্থিত হয়ে প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। পরে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁর মধ্যস্থতায় ফ্রান্সে গিয়ে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করেন। প্রসংগত, হারিরি ফ্রান্সেরও নাগরিক।

লেবাননের খ্রিস্টানদের মধ্যেও বিভক্তি রয়েছে। প্রেসিডেন্ট মিশেল আউন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁকে কিছু খ্রিস্টান সমর্থন করেন। বাকিদের মধ্যে এমন আশঙ্কা রয়েছে যে সিরিয়া লেবাননে হস্তক্ষেপ করবে। অন্যদিকে হিজবুল্লাহর অবস্থান হচ্ছে, ইসরায়েল যদি ইরানে হামলা চালায়, তাহলে তারা দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে আবার লড়াই শুরু করবে।

এক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের পাগলাটে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হারিরির প্রশংসা করে বলেছিলেন, তিনি সামনে দাঁড়িয়ে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। তিনি হয়তো জানতেন না, হারিরি হিজবুল্লাহ সদস্যদের তাঁর মন্ত্রিসভায় রেখেছেন। শিয়া হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা বা ভেঙে দেওয়ার জন্য বহুদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। কারণ হিজবুল্লাহকে অস্ত্র সরবরাহ করে ইরান (ইসরায়েলের প্রধান শত্রু) এবং সিরিয়া তাদের মিত্র (দেশটির প্রেসিডেন্ট আসাদকে এখনো গদিচ্যুত করার স্বপ্ন দেখে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব এবং ইসরায়েলও দেখে)। হিজবুল্লাহকে জব্দ করার জন্য লেবাননের সেনাবাহিনীকে অস্ত্র সরবরাহ করে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যাবে না। বরং কয়েক মাস আগে তারা হিজবুল্লাহর সঙ্গে মিলে উত্তর-পশ্চিম লেবানন থেকে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সন্ত্রাসীদের হঠিয়েছে। অর্থকষ্টে থাকার পরও বৈরুতকে অনেক সহায়তা করছে ইরান। কিভাবে তারা এ ব্যবস্থা করছে আমরা জানি না। সিরিয়ার সঙ্গেও সামরিক ও প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে ইরান।

সম্প্রতি বৈরুতে নিযুক্ত সিরিয়ার রাষ্ট্রদূত আলী আবদুল করিম আলী বলেছেন, শত্রুরা এখন মুখ লুকানোর পথ খুঁজছে। শরণার্থী সমস্যার সমাধান থেকে শুরু করে স্থলবন্দরনানা কারণেই লেবাননের সহযোগিতা দরকার সিরিয়ার। করিম আলী বলেন, সিরিয়ার অবশ্যই লেবাননকে প্রয়োজন। লেবাননের সিরিয়াকে তার চেয়েও বেশি দরকার। লেবাননের যদি সিরিয়াকে বেশি প্রয়োজন হয়, তাহলে বলতেই পারি, লেবাননকে যুক্তরাষ্ট্রের যতটা প্রয়োজন, যুক্তরাষ্ট্রকে লেবাননের তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন। ইরানকে লেবাননের যতটা প্রয়োজন, লেবাননকে ইরানের তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন। সৌদি আরবেরও লেবাননকে প্রয়োজন। কারণ তারা হিজবুল্লাহ বা সিরিয়ার বিরুদ্ধে হারিরিকে ব্যবহার করতে চায়। সৌদি আরবকেও লেবাননের প্রয়োজন। তবে রাশিয়ার কাউকে প্রয়োজন নেই। লেবানন এ বাস্তবতার মধ্যে অবস্থান করেই নিরপেক্ষতার নীতি নিয়ে চলছে। আইরিশ মন্ত্রী এবং দেশটির স্বাধীনতার লড়াই ও গৃহযুদ্ধের নায়ক ফ্র্যাংক আইকিন ১৯৪০ সালে সত্য কথাই বলেছিলেননিরপেক্ষতা যুদ্ধেরই একটি রূপ, সংক্ষিপ্ত রূপ।

লেখক : দি ইনডিপেনডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য-বিষয়ক বিশ্লেষক

সূত্র : দি ইনডিপেনডেন্ট

ভাষান্তর : তামান্না মিনহাজ

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর