English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

পাকিস্তান যখন বাংলাদেশ হতে চায়

ফরিদুর রহমান

  • ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ পুরান ঢাকার একটি রেস্টুরেন্টে আপাতদৃষ্টিতে কোনো কারণ ছাড়াই মারামারি বাধিয়ে বসেছিলেন। একজনের একটি মন্তব্যের সূত্র ধরে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা না করে তার নাকে ঘুষি অথবা গালে চড় কষিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রবল প্রতিপক্ষের হাতে বেধড়ক মার খাওয়ার পর তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় থানায় এক রাত হাজতবাসের পর আদালতে তাঁর জামিনের আবেদন করা হলে ম্যাজিস্ট্রেট রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহকে বলেছিলেন, আপনি একজন কবি, একজন শিক্ষিত মানুষ। আপনার নামেই আমরা আপনাকে চিনি। আপনি কেন রেস্টুরেন্টে মারপিট শুরু করেছিলেন?

রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর জবাবের সারকথা ছিল, যে লোকটিকে দিয়ে তিনি মারপিটের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন সেই লোকটি উচ্চকণ্ঠে মন্তব্য করেছিল, কিয়ের বাংলাদেশ! পাকিস্তানই ভালো আছিল! এই কথা শোনার পরে বাংলাদেশের যেকোনো সুস্থ-স্বাভাবিক নাগরিকের দায়িত্ব তাকে উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া এবং তাকে তার মন্তব্য প্রত্যাহারে বাধ্য করা। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী গল্পকার কলামিস্ট ইসহাক খান জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মাটিতে বসে পাকিস্তানের গুণগান করা কাউকে বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়া রুদ্রর মতো তরুণের জন্য ছিল একটি অসম্ভব ব্যাপার।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর থেকে বাংলাদেশের পাকিস্তানপ্রেমীদের মধ্যে যে নবজাগরণের সূচনা হয়েছিল তার রেশ পরবর্তী বহু বছর ধরেই বিদ্যমান ছিল। জিয়াউর রহমানের সামরিক সরকার ১৯৭৭ সালে প্রথম সুযোগেই ১৯৭২ সালের সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ দিয়ে এবং ১৯৮৮ সালে এরশাদের স্বৈরাচারী সরকার ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে প্রকারান্তরে একদল বিভ্রান্ত মানুষকে পাকিস্তানে প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিল। সাধের পাকিস্তানে ফিরে যাওয়া সম্ভব না হলেও কমপক্ষে একধরনের সমঝোতার মধ্য দিয়ে কোনো কনফেডারেশন গঠন করা যায় কি না তা নিয়েও চিন্তাভাবনা করেছেন পাকিস্তানপন্থী রাজনীতিকরা। বাংলাদেশ এবং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুপরিকল্পিত নেতিবাচক প্রচারণার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাংলাদেশের অনাগত দিনের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিয়ে ব্যাপক আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ সামরিক শাসন ও স্বৈরাচারী শাসনের মধ্য দিয়ে যে নৈরাজ্যের সৃষ্টি হয়েছিল আশির দশকের শেষভাগে তারই প্রতিফলন ঘটেছে পাকিস্তানপ্রেমী মানুষের কথায়। সে সময় কিছুসংখ্যক সুবিধাভোগীকে, যাঁদের বেশির ভাগই সরকারের আমলা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, এমনকি সাংবাদিক; পাকিস্তানই ভালো ছিল-জাতীয় কথা প্রকাশ্যে বলতে শুনেছি।

এখন সময় বদলেছে, ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। মাত্র তিন দশক পরে পাকিস্তানের একাধিক বুদ্ধিজীবী যখন টেলিভিশনের টক শোতে খোদা কি ওয়াস্তে হামে বাংলাদেশ বানা দো... বলে আহাজারি করেন, তখন পেয়ারা পাকিস্তানের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার হালহকিকত বুঝতে আর কারো বাকি থাকে না। নির্বাচনে বিজয়ের পরপরই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পিটিআই আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তার দেশকে সুইডেনের মতো উন্নত দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখিয়েছে। তাঁর এই বক্তব্যের সূত্র ধরে সম্প্রতি পাকিস্তানের একটি টেলিভিশন চ্যানেল আয়োজিত টক শোতে সিভিক অ্যাকশন রিসোর্সের নির্বাহী পরিচালক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট জাইঘাম খান আগামী পাঁচ বছর নয়, ১০ বছরে বাংলাদেশের সমকক্ষ হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। জাইঘাম খান বাংলাদেশের উন্নয়নের গতিধারা উল্লেখ করে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের রপ্তানি আয় প্রতিবছর ৪০ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তানের ২২ বিলিয়ন ডলার, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সম্পদের পরিমাণ ৩০০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে পাকিস্তানের স্টক এক্সচেঞ্জের সম্পদ মাত্র ১০০ বিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭.২৮ শতাংশ এবং পাকিস্তানের ৫.২৮ শতাংশ। অর্থাৎ পাকিস্তান যদি উন্নয়নের ক্ষেত্রে পূর্ণোদ্যমে কাজ করে, তাহলেও বাংলাদেশের পর্যায়ে পৌঁছতে ১০ থেকে ১২ বছর লেগে যাবে। কিন্তু তার পরও পাকিস্তান আর কখনোই বাংলাদেশের সমপর্যায়ে পৌঁছতে পারবে না। কারণ বাংলাদেশ তত দিনে আরো এগিয়ে যাবে। সে কারণেই সুইডেন নয়, তিনি পাকিস্তানকে বাংলাদেশ বানানোর আকুতি জানিয়েছেন।

ক্যাপিটাল টিভির আওয়াম শিরোনামের এই টক শোতে উপস্থিত অপর এক বুদ্ধিজীবী জাইঘাম খানের বক্তব্যের সূত্র ধরে মন্তব্য করেন, আজকের বাংলাদেশ সেই বাংলাদেশ, যারা আমাদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবীসহ অনেক বিশিষ্টজনই পূর্ব পাকিস্তানকে আমাদের ওপরে বোঝা মনে করতেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, একে ছেঁটে বাদ দিতে পারলেই আমরা দ্রত উন্নয়নের শিখরে পৌঁছতে পারব!

একাত্তরের গণহত্যার জন্য বাংলাদেশের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনার দাবি তুলে ধরায় এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত অবাঙালি প্রত্যাবাসনসহ দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলায় অতীতে পাকিস্তানের শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতাসহ বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই নিগৃহীত হয়েছেন। বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্পর্কিত সত্য ভাষণের ফলে জাইঘাম খানকে কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে আমরা জানি না। তবে খোদ পাকিস্তানে বিপুলসংখ্যক টেলিভিশন দর্শকসহ সাধারণ মানুষ এরই মধ্যে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। পাকিস্তানের দীর্ঘ সামরিক শাসনের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত, ছদ্ম গণতন্ত্রের আড়ালে অপশাসনে নিপীড়িত এবং পাশাপাশি বেপরোয়া জঙ্গি তৎপরতায় বিপর্যস্ত সাধারণ মানুষের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। বাংলাদেশের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তারা যদি নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, তাহলে বিশ্বসম্প্রদায়ের উদার মানবিকতাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে আমরা আনন্দিত হব। একই সঙ্গে উন্নয়নের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নিজেদের অগ্রযাত্রা অবশ্যই অব্যাহত রাখতে হবে।

বঙ্গবন্ধু ও চার নেতা হত্যা যে ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল, তা পুরোপুরি থেমে গেছে বা ষড়যন্ত্রকারীদের নিশ্চিহ্ন করা গেছে বলে আত্মপ্রসাদ লাভের কোনো সুযোগ নেই। ভুলে গেলে চলবে না, ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় একে একে যুক্ত হয়েছে আহসানউল্লাহ মাস্টার, কমরেড রতন সেন, শাহ এ এম এস কিবরিয়ার মতো অসংখ্য অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হত্যা, ছায়ানট ও উদীচীর অনুষ্ঠানে বোমা হামলা, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, প্রগতিশীল লেখক, প্রকাশক, বুদ্ধিজীবী হত্যা, ব্লগার ও মুক্তচিন্তার মানুষের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণ। একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের আস্ফাালন এবং দেশব্যাপী জঙ্গি তৎপরতার ব্যাপক উত্থানের পেছনে দেশীয় জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশের মাধ্যমে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির কথা বিভিন্ন সময়ে অনেকেই উল্লেখ করেছেন। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতা করা এবং বিচারের জন্য গঠিত ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালকে প্রশ্নবিদ্ধ করার ক্ষেত্রে যাঁরা উদ্যোগী ভূমিকা গহণ করেছিলেন, পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান তাঁদের অন্যতম।

লেখক : সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ টেলিভিশন

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর