English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়নে নতুন ভাবনা

ড. বান্দার হাজ্জার

  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে গৃহীত কর্মসূচি আর উদ্যোগের কারণে নদীবিধৌত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ বাংলাদেশ সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বসম্প্রদায়ের দৃষ্টি কাড়ছে। ১৯৭৪ সাল থেকে দেশটির প্রাণশক্তির উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের প্রচেষ্টায় সহায়তা করে আসছে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রণীত রূপকল্প বাস্তবায়নে সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজে করতে পেরে আমরাও গর্বিত। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল শহর আর যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে চার গুণ বেশি জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি নিয়ে এ দেশ বিশাল সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে। উন্নয়ন সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণাকে নতুনভাবে রূপায়ণের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সাফল্যের চাবিকাঠি।

৫৭টি সদস্য দেশের মধ্যে বাংলাদেশই এই ব্যাংকের অর্থায়ন ও বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উপকারভোগী। বেশ কয়েকটি উন্নয়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি প্রকল্পসহ নানা খাতে এ ব্যাংকের অবদান ২১.৯ বিলিয়ন (দুই হাজার ১৯০ কোটি) ডলারের বেশি। এ অঞ্চলে উন্নয়ন প্রকল্পে অনেক সাফল্যগাথা রয়েছে, যেগুলো কৃষি, শিক্ষা, জ্বালানি, শিল্প, ডিজিটাইজেশন, পরিবহন, পানি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং উন্নত নাগিরক সুবিধাসহ বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক জীবনমানে প্রত্যক্ষ প্রভাব রেখেছে।

চট্টগ্রামে ৫২ হাজার ৫৪৫ আশ্রিত রোহিঙ্গা শিশুর শিক্ষার ব্যবস্থা হোক কিংবা নতুন নতুন জাতের চাল ও সবজি বীজ উদ্ভাবন বা নতুন প্রজন্মের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র অবকাঠামো সম্প্রসারণের কাজই হোকএ ধরনের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল্সএসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে আমরা বদ্ধপরিকর।। শূন্য দারিদ্র্য থেকে মানসম্পন্ন শিক্ষা, শান্তি-ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানপ্রতিটি লক্ষ্যই বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সঙ্গে নিবিড়ভাবে প্রাসঙ্গিক। এসব দিকনির্দেশনামূলক লক্ষ্য জলবায়ু পরিবর্তন, যুব কর্মসংস্থান ও বেসরকারি খাতে প্রবৃদ্ধির মতো বাস্তবানুগ ও অপরিহার্য বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের কাজ সহজ করে দিয়েছে।

এসব লক্ষ্য অর্জনে সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে আমরা এ দেশে আমাদের সম্পদ বাড়ানো এবং ঢাকায় একটি আঞ্চলিক কার্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যেটি স্থানীয় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন ক্ষেত্র তৈরির পাশাপাশি দেশটির সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের নেওয়া প্রেসিডেন্ট ফাইভ-ইয়ার প্রগ্রাম্স-এর আওতায় আমরা প্রতিষ্ঠিত উন্নয়ন অংশীদার ও অন্য অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে এ দেশের সার্বিক অগ্রযাত্রায় আমাদের সহায়তা অব্যাহত রাখব।

এসব কর্মসূচির লক্ষ্য হচ্ছে আরো বেগবান, কার্যকর ও ফলপ্রসূ কৌশল গ্রহণ। সদস্য দেশগুলোতে ব্যাংকের অবস্থান সুদৃঢ় করার বিকেন্দ্রীকরণ গুরুত্বপূর্ণ। বেসরকারি খাত, এনজিও, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদদের সঙ্গে নিয়ে শিগগির আমরা সম্পদ সংগ্রহে ক্রাউড-ফান্ডিংয়ের মতো উদ্ভাবনী পদ্ধতির সূচনা করব। আমরা আশা করি, এর ফলে প্রথাগত ও অপ্রচলিত বিনিয়োগের মাধ্যমে আর্থ-সামজিক উন্নয়নে গতি সঞ্চার হবে এবং ২০২১ সালের মধ্যে এ দেশের মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের রূপকল্প বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত হবে।

বাংলাদেশ তথা বিশ্বের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার নতুনধারা প্রবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন। যুক্ত হও এবং বদলে দাও (এনগেজ অ্যান্ড ট্রান্সফর্ম)আমাদের নতুন এ দুটি গতিশীল উদ্যোগের প্রাণকেন্দ্র রয়েছে এ তিনটি স্তম্ভ। এনগেজ হলো এ ধরনের প্রথম অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, যেটি এসডিজি অর্জন নিয়ে বিশ্বব্যাপী কর্মরত বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তাদের এক সুতায় গাঁথবে। এর জন্য থাকবে ৫০০ মিলিয়ন (৫০ কোটি) ডলারের রূপান্তর তহবিল (ট্রান্সফর্ম ফান্ড)। এটি একটি অনুদান তহবিল, যা বাংলাদেশসহ সদস্য দেশগুলোর টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে তৈরি করা হয়েছে।

এ কাজের অংশ হিসেবে আমরা শিগগির ঢাকায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক প্রতিযোগিতার জন্য একটি ট্রান্সফরমেশন রোড শো করব, যার লক্ষ্য হবে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নযজ্ঞকে বেগবান করা। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে উদ্ভাবক, বিজ্ঞানী ও উদ্যোক্তা, যাঁরা অর্থ সহায়তা, নতুন ব্যবসার সুযোগ অথবা কৌশলগত পরামর্শ খুঁজছেন, তাঁদের সঙ্গে প্রভাবক অথবা সম্ভাব্য ব্যাবসায়িক অংশীদারদের মধ্যে সংযোগ স্থাপিত হবে। আমাদের আশা, নতুন নতুন ধারণার সন্ধান করে সেগুলোকে সহায়তা দেওয়ার মাধ্যমে মানুষকে সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ তৈরির পথে এগিয়ে দিতে পারব।

দুটি উদ্যোগেই সরকারের সমর্থন রয়েছে এবং এ দুটি উদ্যোগই এসডিজি অর্জনের পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন ব্যাংক থেকে উন্নয়ন ও উন্নয়নকারীদের ব্যাংক হিসাবে আমাদের উত্তরণের প্রচেষ্টাকে জোরদার করবে। এর অর্থ হলো, করপোরেট কম্পানি ও ব্যক্তি উদ্যোগও যেমন উন্নয়নকারী হতে পারে, তেমনি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ও এনজিওরাও আমাদের উন্নয়নকারী হতে পারে। উপকারভোগীর জন্য উপযুক্ত উপকরণ, বৈশ্বিক যোগসূত্র এবং অবকাঠামোর জন্য সম্পদ জোগান দেওয়ায় আমাদের ভূমিকা থাকবে, যাতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য নিশ্চিত করা যায়। আমরা কেবল অর্থায়নের পরিমাণের ওপর দৃষ্টি না রেখে এখন বাংলাদেশের অনেক প্রকল্পে কার্যকারিতা, গুরুত্ব ও বিবর্তনকে গুরুত্ব দিচ্ছি।

এসডিজি অর্জনে বছরে আনুমানিক ২.৫ ট্রিলিয়ন (আড়াই লাখ কোটি) ডলারের অর্থ সহায়তা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে আমাদের সদস্য দেশগুলো এক ট্রিলিয়ন ডলার দিতে পারবে। তবে এই বিপুল ব্যবধান ঘোচাতে হলে উন্নয়ন নিয়ে আমাদের ধ্যান-ধারণায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বাংলাদেশ এ পরিবর্তনের মূর্ত প্রকাশ এবং এ পরিবর্তন গতি পাচ্ছে। অংশীজনে সহযোগিতা ও বিস্ময়কর জাতীয় মেধার সমন্বয়ে এ দেশের বিকাশ অব্যাহত থাকবে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর