English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

ভিন্নমত

বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কথা বলে, কিন্তু সই করে না!

আবু আহমেদ

  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

আমরা অনেক দিন থেকেই শুনে আসছি বাংলাদেশ অমুক অমুক অর্থনীতির সঙ্গে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (FTA) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সই করছে, কিন্তু শেষ পর্যায়ে করে না। কেন করে না, তার কোনো ভালো ব্যাখ্যা নেই। একটি কারণ বুঝি, তা হলো বাংলাদেশ মনে করে এমনিতেই তো ভালো করছে, প্রতিবছর ৫-৬ শতাংশ করে রপ্তানি বাড়ছে, সেটাই বা মন্দ কি! কিন্তু ওই ভাবনার মধ্যে মিথ্যা একটি আত্মতৃপ্তি নিহিত আছে। আমরা যেখানে থাকার কথা বা আজ রপ্তানির ক্ষেত্রে যেখানে যাওয়ার কথা, সেখানে থাকতে ও যেতে পারিনি। আমাদের অর্থনীতির আকার এত দিনে ৩৫০ বিলিয়ন ছাড়িয়ে যাওয়া উচিত ছিল, সেটা সম্ভব হতো অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ যদি বাড়ত এবং বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহতভাবে ১০-১২ শতাংশের মধ্যে থাকত। শুধু একটিমাত্র পণ্য নিয়ে আমরা আজও রপ্তানির ক্ষেত্রে আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি; কিন্তু অন্য দেশ বা অর্থনীতিগুলো, যেগুলো একদিন আমাদের পেছনে ছিল বা আমাদের সমান্তরাল ছিল, তারা অনেক আগেই আমাদের পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের কয়েক দশক আগে যে GSP (Generalized System of Preferences) দিয়েছে, তা তারা অন্য অনুন্নত দেশকেও দিয়েছে। একটা পর্যায় পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রও আমাদের তাদের বাজারে রপ্তানি করার জন্য GSP সুবিধা দিয়েছিল; কিন্তু এখন আর নেই, তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আমরা ওই সুবিধার কোনো সুযোগ নিতে পারিনি। কারণ হলো আমরা যে একটিমাত্র পণ্য দিয়ে আমাদের রপ্তানি বাস্কেটের বিরাট অংশ সাজিয়েছি, সে পণ্য মানে RMG (Ready Made Garment) ওই সুবিধার আওতাভুক্ত ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোকে তাদের বাজারে কম শুল্কে বা বিনা শুল্কে পণ্য বেচার জন্য সুযোগ দিয়ে চুক্তি করেছে, অন্য কয়েকটি অর্থনীতির সঙ্গেও বিশেষ সুবিধা দিয়ে চুক্তি করেছে; কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে তেমন কিছু ঘটেনি। বাংলাদেশ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকেও বেশি ট্যাক্স বা রপ্তানি শুল্ক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে RMG বিক্রয় করছে। তাতেও বাংলাদেশ ভালো করছে। ওই ভালো করার পেছনে রয়েছে, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কস্ট কম্পিটিটিভনেস (Cost competitiveness). বাংলাদেশ তাদের শুল্ক দিয়েও কম মূল্যে বিক্রয় করতে পারে বলে ওই বাজারে রপ্তানি বাড়ছে। তবে সেই প্রবৃদ্ধিও থেমে যেতে পারে, ভিয়েতনামসহ অন্য দেশগুলো যদি বিশেষ বাণিজ্য চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রীয় বাজারে RMG পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে RMG-এর জন্য চাহিদা অসীম নয়। ওই চাহিদা একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের। সেই চাহিদা ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়াও পূরণ করতে পারে। আমরাও পারি। ওরা পূরণ করলে আমরা পিছিয়ে পড়ব, আর ওরা না পারলে আমরা সেই শূন্যস্থানকে পূরণ করব।

চীন কিন্তু RMG বা পোশাক খাতের অন্য রপ্তানি দিয়ে আজও এক নম্বরে আছে। চীনের RMG পণ্যের ওপর ট্রাম্প প্রশাসন নতুন করে শুল্ক আরোপ করলে বাংলাদেশের জন্য বাড়তি সুবিধা হবে বটে, তবে সেই সুবিধাটা ভিয়েতনামই বেশি নিতে পারে। মাত্র কয়েক বছর আগ পর্যন্ত ভিয়েতনামের রপ্তানিমূল্য আমাদের পেছনে ছিল, এখন তারা আমাদের থেকে অনেক আগে চলে গেছে। এখন বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো তাদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে ট্রেড পার্টনার বানাচ্ছে। বাংলাদেশকে আজতক এককভাবে কোনো বড় অর্থনীতি বিশেষ সুবিধা দেয়নি। চীন-ভারত যেসব সুবিধা রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দিয়েছে বলে বলা হয়, এমন সুবিধা তারা অন্য দেশকেও দিয়েছে।

বাংলাদেশ শুনেছি কয়েকটি ছোট অর্থনীতির সঙ্গে ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (FTA) করার জন্য আলোচনা করছে। ওই সব অর্থনীতির মধ্যে আছে শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, তুরস্ক আর নেপাল-ভুটান তো আছেই! অতি সম্প্রতি শুনলাম ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গেও FTA-এর কথা ভাবা হচ্ছে। তবে সত্যি হলো, আমাদের অবস্থান এখনো আবছা এবং আলোচনায়ই আছে, বাস্তবরূপ লাভ করেনি।

চীনও আমাদের সঙ্গে একটি FTA সই করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চীনের আগ্রহ দেখানোর অন্যতম কারণ হলো স্ট্র্যাটেজিক অবস্থান, যে কারণে তারা বাংলাদেশকে মূল্য দেয়; কিন্তু আমাদের সরকার এখানেও যেন পিছিয়ে আছে। এক পা আগায় তো দুই পা পেছনে চলে যায়। চীন যে FTA সই করার জন্য অফার দিয়েছে, এটাকে তো আমাদের অতি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া উচিত ছিল। আজকের দিনে বাস্তবতা হলো কোনো বড় অর্থনীতির সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সংযুক্ত না হয়ে কোনো ছোট অর্থনীতিই উন্নতি করতে পারবে না। আমাদের অর্থনীতিতে বিদেশিরা, এমনকি দেশীয় ধনী লোকেরা বিনিয়োগ করবে কেন? বিনিয়োগ করে তারা পণ্য ও সেবা কোন বাজারে বিক্রি করবে? আর সে জন্যই আমাদের অঞ্চল ভিত্তিতে হোক বা দ্বিপক্ষীয়ভাবে হোক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির দিকে যেতে হবে। অতি অনাগ্রহীদের নিয়ে শীর্ষ সম্মেলন করে কোনো লাভ হবে না। যারা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমাদের সুবিধা দিতে চায়, তাদের দিকেই আমাদের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। ভারতও আমাদের এ ক্ষেত্রে সুবিধা দিতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সুবিধা আদায় করতে হলে দক্ষতার সঙ্গে দর-কষাকষিতে যেতে হবে। নিজের অবস্থানকে স্পষ্ট করে তুলে ধরতে না পারলে অন্যরা আমাদের মূল্য দেবে না। ভারতের অবস্থান হলো, কথায় তারা আমাদের অনেক সুবিধা দিচ্ছে; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। আজও ভারতের বাজারে বাংলাদেশ এক বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করতে পারেনি। বাংলাদেশ অনেক বেশি আয় করতে পারত ট্রানজিট সার্ভিস বিক্রি করে; কিন্তু সত্য হলো এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত মূল্য পাওয়া বাংলাদেশ যেন ভুলেই গেছে। মাঝেমধ্যে শুনতে পাই, বাংলাদেশ নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানি করবে। করতে পারলে ভালো হতো; কিন্তু এ ক্ষেত্রেও ভারতের সহযোগিতা লাগবে। ভারত সহযোগিতা করলে এত দিনে নেপাল থেকে হয়তো বিদ্যুৎ আসা শুরু হয়ে যেত।

চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে তারাই হবে এক নম্বরের অর্থনীতি। আজকে তারা চারদিকেই বন্ধু খুঁজছে। তাদের অর্থনীতিতে বিনা শুল্কে পণ্য বেচার জন্য অন্য দেশগুলোকে সুযোগ করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের এই সুযোগ অন্যদের আগেই নেওয়া উচিত ছিল; কিন্তু এক অজানা কারণ বাংলাদেশকে এ ক্ষেত্রেও পেছনে টেনে রেখেছে। আশা করি বাংলাদেশ তার কৌশলগত অবস্থানকে অর্থনীতির কাজে লাগাতে শিখবে। বাংলাদেশ আর কতকাল রপ্তানির ক্ষেত্রে RMG নির্ভর হয়ে বসে থাকবে! অন্য পণ্যের উপযুক্ততা অর্জন করতে হলে অর্থনীতিতে যে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ হওয়া দরকার সেটা হচ্ছে না। সেটাও হতো, আমরা যদি কোনো বড় অর্থনৈতিক জোটের সদস্য হতে পারতাম। WTO (World Trade Organization) এর বহু জাতিক আলোচনার মাধ্যমে বিশ্ব আরো মুক্ত বাণিজ্যের দিকে এগিয়ে যাবে, আর বাংলাদেশ সেই সুবিধা নেবে, তা আপাতত আর হবে না, মুক্ত বাণিজ্যের ক্ষেত্রে WTO-র পথ এখন বন্ধ। সুতরাং বাংলাদেশকে ওই পথের জন্য অপেক্ষা না করে নিজ উদ্যোগে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। ভিয়েতনাম যদি এক ডজনেরও বেশি FTA সই করতে পারে, আমরা কেন পারছি না? মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগ ওই সব অর্থনীতিতেই প্রবাহিত হয়, যেগুলো অন্য এক বা একাধিক বড় অর্থনীতির সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্যের অংশীদার। কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিতে বিনিয়োগ প্রবাহিত হয় না।

বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে, আমরা যদি আমাদের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন না করি, তাহলে অন্যরা এসে সে ক্ষেত্রে পরিবর্তন করে দেবে না। আমরা যতই পেছনের দিকে তাকাব, অন্যরা আমাদের পাশ কাটিয়ে যাবে। বাংলাদেশ বছরে যে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করছে, সেটা অন্যদের তুলনায় মোটেও বেশি নয়। থাইল্যান্ড গত বছর শুধু ট্যুরিজম থেকে ৫৮ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। আর ভারত শুধু স্বর্ণালংকার রপ্তানি করেছে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের। এখন বুঝুন বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর