English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

আফগানিস্তানে অক্ষম মার্কিন সামরিক নীতি

কাশিফ হোসাইন

  • ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

তালেবানের বিরুদ্ধে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে যুদ্ধে লিপ্ত যুক্তরাষ্ট্র। এ যুদ্ধে বিজয় অর্জনই তার আফগানিস্তান-কেন্দ্রিক দক্ষিণ এশিয়া নীতি-কৌশল-এর লক্ষ্য। গত বছর এই সমন্বিত কৌশল অবলম্বন করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যার মধ্যে কূটনীতি, বিত্তবল, গোয়েন্দা কৌশল ও সামরিক শক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আফগানিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি গোলযোগপূর্ণ এবং হতাশাজনক। এ অবস্থা আফগান নিরাপত্তা বাহিনী ও তালেবান বিদ্রোহীদের সংঘাতের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে প্রায়ই আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটছে।

আফগানিস্তানে মার্কিন নীতি ও কৌশল জটিলতার সম্মুখীন; বিজয় দূর-অস্ত্। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, পেন্টাগন এবং আফগানিস্তানের জাতীয় ঐক্য সরকার এক অবস্থানে নেই, বিশেষ করে তালেবানের সঙ্গে শান্তি আলোচনার বিষয়ে। রাজনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে কার্যকরভাবে অগ্রসর করে নেওয়ার জন্য আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশকে (পাকিস্তান, ইরান, ভারত, রাশিয়া ও চীন) সংশ্লিষ্ট করার ব্যাপারে মার্কিন অক্ষমতাও আফগানিস্তানে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধক।

সরকারের সঙ্গে শান্তি স্থাপনে চুক্তি সম্পাদনের শর্ত মেনে নিতে তালেবানকে চাপ দেওয়ার জন্য নতুন কৌশল অবলম্বন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর কিছু বিষয় অস্পষ্ট; যেমনআফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানের সময়সীমা ও সেনাসংখ্যার বিষয়ে বিশ্বকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টে কৌশল ঘোষণার পর পেন্টাগন জানায়, সেনা বাড়ানো হবে; কিন্তু সংখ্যাটি জানায়নি। এ কৌশলের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, প্রতিরক্ষা দপ্তরকে এবং উর্দিধারীদের আরো ক্ষমতা দেওয়া।

কৌশল ঘোষণার পর তালেবানের প্রতিক্রিয়া ছিল ব্যাপক। শুধু অক্টোবরেই তালেবানের হামলায় কয়েক শ লোক নিহত হয়। এসব হামলা মূলত নিরাপত্তা স্থাপনায় চালানো হয়। মার্কিন সামরিক কৌশলে সমন্বয়হীনতার সুযোগে তালেবান কড়া পাহারাধীন স্থাপনাতেও অনুপ্রবেশ ঘটাতে এবং হামলা চালাতে সক্ষম হয়। বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় তৎপরতা বাড়িয়েছে তারা।

আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি শর্ত ছাড়াই তালেবানকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। এতে জাতীয় ঐক্য সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে শুধু। তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার কথা জানিয়েছে এবং বলেছে, বিদেশি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করার শর্ত না মানলে তারা কোনো চুক্তি করবে না।

যুক্তরাষ্ট্র এ প্রস্তাব নাকচ করে বলে, তারা শুধু আফগানদের মধ্যে (সরকার ও তালেবান) আলোচনাকে সমর্থন করবে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, সম্প্রতি মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি এলিস ওয়েলসের নেতৃত্বে মার্কিন কর্মকর্তারা দোহায় তালেবান নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। অন্যদিকে বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগেও আফগানিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন বাহিনীর প্রধান জেনারেল জন নিকোলসন তালেবানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার বিষয়ে অস্বীকৃতি জানান।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ও তালেবানের বৈঠক ব্যর্থ হয়েছে। পররাষ্ট্র দপ্তর ও পেন্টাগনের মধ্যে যে সমন্বয় নেই তার প্রমাণ গত মাসের শুরুতে কুনার প্রদেশে মার্কিন বাহিনীর সহায়তা নিয়ে তালেবানের ওপর আফগান বাহিনীর হামলা। এতে কয়েক ডজন তালেবান বিদ্রোহী নিহত হয়। প্রতিশোধ নিতে তালেবান গজনি শহরে হামলা চালায়। প্রেসিডেন্ট গনির তিন মাসের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করে তারা।

আফগানিস্তানে শান্তি স্থাপনে আঞ্চলিক দেশগুলোর স্বার্থকে বিবেচনায় নেওয়ার অক্ষমতা মার্কিন কৌশলের আরেকটি ত্রুটি। আফগানিস্তানে আঞ্চলিক বিভিন্ন দেশের নিজ নিজ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। আফগানিস্তানে অসফল অভিযানের জের সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনে ভূমিকা রেখেছিল। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও পাকিস্তান নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয়নি। নতুন কৌশল ঘোষণার পর এক বছরে তারা আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ২০১৭ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের স্থবির চতুর্পক্ষীয় গ্রুপটির নামকাওয়াস্তে একটি বৈঠক হয়েছে। যৌথ বিবৃতি ছাড়াই তা শেষ হয়।

আঞ্চলিক পক্ষগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিম্নগামী। তালেরবানের ওপর প্রভাবের কারণে এবং সমুদ্র থেকে স্বল্পতম দূরত্বের কারণে পাকিস্তান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন মার্কিন কৌশল ঘোষণার সময় পাকিস্তানের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। পরে সব নিরাপত্তা সহায়তা স্থগিত করা হয়। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানি সামরিক কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বন্ধ করা হয়েছে।

আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য লাভের ক্ষেত্রে রাশিয়াও গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ; মধ্য এশিয়ায় এখনো তার ব্যাপক প্রভাব। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র নতুন কৌশলে রাশিয়াকে শুধু প্রতিদ্বন্দ্বীই ঘোষণা করেনি, রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপও অব্যাহত রেখেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাশিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।

অন্যদিকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় চীনকে প্রতিপক্ষ ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করেছে। পরমাণু চুক্তি বাতিল করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানোর অবস্থায় পৌঁছেছে তারা। এখন তারা আফগানিস্তান বিষয়ে ভারতের ওপর ভরসা করতে চাচ্ছে। কিন্তু ভারত সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়ক হবে না। ভারত এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ের চেষ্টা চালাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি তার আফগান কৌশলের মূলনীতি না বদলায়, তাহলে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং আফগানিস্তানে তাদের পরাজয়ের ঝুঁকি বাড়বে।

লেখক : গবেষণা সহযোগী, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ ইনস্টিটিউট ইসলামাবাদ (এসএসআইআই)

সূত্র : দ্য ডিপ্লোম্যাট (অনলাইন)

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর