English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

গুজব ও অপপ্রচারের উর্বর ভূমি

তুরিন আফরোজ

  • ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

বাঙালি গুজবে শুধু বিশ্বাসই করে না, বরং গুজবের ওপর বিশ্বাস রাখতে ভালোও বাসে। তাই ষড়যন্ত্রকারীরা বাঙালি চরিত্রের এই দিকটি নিয়ে খেলাধুলা করতে বেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। গুজব ছড়ানোর মাধ্যমে বাঙালি চরিত্রের অপব্যবহার করা নতুন কোনো ম্যাজিক নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ষড়যন্ত্রকারীরা নানা সময়ে নানা গুজব ছড়িয়ে আমাদের দেশ ও জাতির অপরিমেয় ও অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে আসছে।

স্বাধীনতার পর ভারতের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ সফরে এলে ২৫ বছরের বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বলা বাহুল্য, এটা কোনো গোপন চুক্তি ছিল না, ছিল একটি প্রকাশ্য চুক্তি, যা দুটি রাষ্ট্রের পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সহায়তা ও সার্বভৌমত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অথচ এই প্রকাশ্য চুক্তিকেই গোপন চুক্তি বলে অপপ্রচার করা হয়েছিল। ইন্দিরা-মুজিবের চুক্তিকে ২৫ বছরের গোলামির চুক্তি বলে অপপ্রচার চালানো হলো।

গুজব রটানো হলো, বঙ্গবন্ধুর সরকার ভারত সরকারকে যে পরিমাণ নোট ছাপতে দিয়েছিল, ভারত সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দেউলিয়া করে দেওয়ার জন্য তার দ্বিগুণ নোট ছাপিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর সরকার ভারতীয় নোট বাজার থেকে প্রত্যাহারের জন্য এক মাস সময় দিল। শুরু হয়ে গেল আরো অপপ্রচার। গুজব রটানো হলো, আওয়ামী লীগ নেতাদের লাখ লাখ টাকা ভারতে নেওয়া হয়েছে আর তা বদলানোর জন্যই এত দীর্ঘ সময় দেওয়া হয়েছে। মানুষ বিশ্বাসও করল।

নকশালিদের গুজবএর ওপর ভিত্তি করে পাটের গদিতে, ট্রেনের বগিতে আগুন লাগানো হলো। বাসন্তীকে মাছ ধরার জাল পরিয়ে ছবি তুলে সেই ছবি বিশ্বজুড়ে রপ্তানি করা হলো। প্রকৃত উদ্দেশ্য দুর্ভিক্ষের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরা নয়, বরং আওয়ামী লীগ সরকারকে বিশ্বের দরবারে ব্যর্থ হিসেবে উপস্থাপন করা। গুজবে কিছুটা কাজও হলো।

বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে গঠিত রক্ষীবাহিনী নিয়ে ছড়ানো হয়েছে চমকপ্রদ সব গুজব। যেমনরক্ষীবাহিনীর পোশাক ভারতীয় সেনাবাহিনীর পোশাকের মতো, রক্ষীবাহিনীর ট্রেইনার ভারতীয় কর্মকর্তা ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব গুজবের লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনীর ভেতরে অসন্তোষ জাগিয়ে তোলা এবং রক্ষীবাহিনী সম্পর্কে জনমনে ভীতি ও বিভ্রান্তি জাগিয়ে তোলা।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের বিরুদ্ধে গুজব রটানো হলো যে বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সত্য ঘটনাটি কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। খবর ছিল ১৯৭৩ সালের বিজয় দিবসের আগের রাতে ঢাকায় বামপন্থী সশস্ত্র বিপ্লবী সিরাজ শিকদার তাঁর দলবল নিয়ে এসে শহরের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালাতে পারেন। এ অবস্থায় সাদা পোশাকে পুলিশ গাড়ি নিয়ে শহরজুড়ে টহল দিতে থাকে। সর্বহারা পার্টির লোকজনের খোঁজে শেখ কামালও তাঁর বন্ধুদের নিয়ে মাইক্রোবাসে করে ধানমণ্ডি এলাকায় বের হন। সিরাজ শিকদারের খোঁজে টহলরত পুলিশ মাইক্রোবাসটি দেখতে পায় এবং আতঙ্কিত হয়ে কোনো সতর্কতা সংকেত না দিয়েই গুলি চালায়। শেখ কামাল ও তাঁর বন্ধুরা গুলিবিদ্ধ হন। গুলি শেখ কামালের কাঁধে লাগে। তাঁকে তখনকার পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

শেখ কামালের বিরুদ্ধে মেজর ডালিমের স্ত্রী অপহরণের গুজবটিও কিন্তু সমাজে বেশ সুচতুরভাবে প্রচার করা হয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর ডালিমের নিজের লেখা বই, যা দেখেছি, যা বুঝেছি, যা করেছি-তে তিনি নিজেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে রেড ক্রসের সভাপতি ও তৎকালীন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের প্রধান গাজী গোলাম মোস্তফার ছেলেদের সঙ্গে ডালিমের স্ত্রী নিম্মির ভুল-বোঝাবুঝি হয় এবং তা সামরিক-বেসামরিক বহু ব্যক্তির উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু মীমাংসাও করে দেন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। একটি হলো গঙ্গার পানিচুক্তি, অন্যটি হলো পার্বত্য শান্তিচুক্তি। এই দুটি চুক্তি নিয়েও কম গুজব রটানো হলো না। গঙ্গার পানিচুক্তি নিয়ে অপপ্রচার চালানো হলো যে এটিও বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তির মতো একটি গোলামির চুক্তি; এক ফোঁটা পানিও বাংলাদেশ ভারত থেকে পাবে না এই চুক্তির অধীনে। আর পার্বত্য শান্তিচুক্তি নিয়ে অপপ্রচার চালানো হলো যে এই চুক্তির ফলে ফেনীসহ বাংলাদেশের গোটা পার্বত্য অঞ্চল ভারতের অধীনে চলে যাবে। কিন্তু কী আশ্চর্য সেটা তো হলোই না, উল্টো গুজব রটনাকারী দলটির নেত্রী ওই ফেনী থেকেই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নির্বাচিতও হয়েছেন।

এরপর ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলো। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার শিকার হলো আওয়ামী লীগ নেতারা। গুজব রটানো হলো, এই হামলার কথা আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা আগে থেকেই জানতেন। শুধু তা-ই নয়, এই গুজবও রটানো হলো যে শেখ হাসিনা নাকি নিজের ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে সমাবেশে গিয়েছিলেন।

এরপর ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে প্রতিপক্ষ একের পর এক গুজব রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। চাঁদে সাঈদীকে দেখার গুজব, শাপলা চত্বরে কয়েক হাজার হেফাজতি হত্যার গুজব, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিটি রায়ের আগে আওয়ামী লীগ সরকারের টাকার বিনিময়ে আপসের গুজব ইত্যাদি।

সাম্প্রতিককালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে গুজবের পাইকারি ব্যবহার দেশে-বিদেশে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এবার গুজবের এজেন্ট হিসেবে কুরুচিপূর্ণভাবে ব্যবহার করা হয়েছে স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিশুদেরও, যাতে গুজব বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষের কাছে। ফলে গুজব গজব হয়ে নেমে আসে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে।

এই যে গুজব সন্ত্রাস, একে প্রতিহত করার উপায় কী? প্রথমেই সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। চিলে কান নিয়ে গেছে বললেই যে চিলের পেছনে দৌড়াতে হবে, ব্যাপারটি যেন এমন না হয়। যেকোনো ক্ষতিকর তথ্যের বাস্তব ভিত্তি রয়েছে কি না সেটা কিন্তু প্রথমেই যাচাই-বাছাই করে দেখতে হবে। একই সঙ্গে গুজব সৃষ্টিকারী বা গুজব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যথাযথ কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

সব শেষে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলতে চাই। গত ৮ মে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ বিচার নিয়ে এক অভিযোগ তোলা হয়, যা নাকি বর্তমানে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ভালো কথা, অভিযোগ উঠলে তো তার তদন্ত হবেই, হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ১৮ মে একটি ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা বড় করে নিউজ ছাপাল, Tureen Afroz is Now Safely in London. অর্থাৎ তুরিন আফরোজ বর্তমানে নিরাপদে লন্ডনে অবস্থান করছেন। এতে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করা হলো যে তুরিন আফরোজ আসলেই একজন অপরাধী এবং এ কারণে তিনি লন্ডনে পালিয়ে গেছেন। আবার পৃথিবীর এত জায়গা থাকতে লন্ডনেই কেন? ও আচ্ছা, লন্ডনে পালিয়ে গেলে মানুষ বিশ্বাস করবে যে তুরিন আফরোজ প্রকৃতপক্ষে জামায়াত-বিএনপির এজেন্ট আর এ জন্য তারাই তাকে এই দুঃসময়ে তাদের নিরাপদ আশ্রয়ে লন্ডনে নিয়ে চলে গেছে।

কী তাজ্জব কাণ্ড! আমার পাসপোর্ট অনুযায়ী গত ৮ মে থেকে আজ পর্যন্ত আমি দেশের বাইরে পা রাখিনি। তাহলে যে সাংবাদিক এই গুজব ছড়ালেন তিনি যে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এই নিউজ করেছেন, সেটি অত্যন্ত পরিষ্কার। আমার বিরুদ্ধে এ রকম গুজব ছড়ানো মানহানিকর তো বটেই। যেহেতু আমার পাসপোর্ট একটি অকাট্য দালিলিক প্রমাণ, তাই হয়তো আমি ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কঠিন আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারব। কিন্তু সবার পক্ষে এই আইনি লড়াই করা সহজ ব্যাপার নয়। তাই আমাদের উচিত গুজবে গা ভাসিয়ে না দিয়ে গুজবিদের মুখোশ খুলে দেওয়া।

লেখক : আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর