English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

রোহিঙ্গা সংকট তাতমাদো এবং বিচার প্রসঙ্গ

বেরতিল লিনৎনার

  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা গণহত্যার দায়ে বিচারের সুপারিশ নাকি মানবাধিকার লঙ্ঘনে প্ররোচনামূলক তথ্য প্রচারের জন্য ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়াকোন বিষয়টি জ্যেষ্ঠ জেনারেল মিন অং হ্লাইংকে বেশি চিন্তিত করেছে তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ইয়াঙ্গুনের পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত, জেনারেল হ্লাইংয়ের জন্য ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হওয়ার বিষয়টিই বেশি ক্ষতিকর। এ সিদ্ধান্তে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এর জেরে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।

গত ২৭ আগস্ট আংশিকভাবে প্রকাশিত জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রতিবেদনে কড়া কথা বলা হয়েছে। এর আগে জাতিসংঘের কোনো কমিশনের প্রতিবেদনে এমন কড়া কথা বলা হয়নি। এতে গণহত্যার অভিযোগ তোলা হয়েছে, যা খুবই গুরুতর এবং আন্তর্জাতিক আইনে আমলযোগ্য অপরাধ। এর আগে জাতিনির্মূল কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে। এর আইনি অভিঘাত নেই।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) অভিযোগ গঠনের বিষয়টি উত্থাপিত হবেএ কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। বরং বলা যায়, মিয়ানমার চীনের দিকে ঝুঁকতে আরো বেশি আগ্রহী হবে। চীন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে মিয়ানমারের একমাত্র সুরক্ষক।

নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব উত্থাপিত হলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে (তাতমাদো) চীনের শরণাপন্ন হতেই হবে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপসংক্রান্ত পশ্চিমা দেশগুলোর কয়েকটি প্রস্তাবে এরই মধ্যে ভেটো দিয়েছে চীন। তবু শীর্ষ জেনারেলরা চীনের মিয়ানমার সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়ে সন্দিহান। আন্তর্জাতিক বিষয়ে তারা চীনকে মিত্র ভাবে, তবে বাণিজ্য ও কৌশলগত বিষয়ে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বকে প্রাধান্য দেয়। রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউতে গভীর সমুদ্রবন্দর করতে চায় চীন। দ্রুতগামী ট্রেনের সাহায্যে এটিকে দক্ষিণাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করা হবে। তাতমাদো এ ব্যাপারেও সন্দিহান। তাদের ধারণা, চীন মিয়ানমারকে তার আর্থিক সাম্রাজ্যের দাবার ঘুঁটি বানাতে চায়।

অন্যদিকে চীন মনে করে সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) বেসামরিক সরকার তাদের এজাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী, তাদের সঙ্গে সমঝোতা করাও সহজ। অবশ্য আগে চীনের ধারণা ছিল, সু চি পশ্চিমাদের একনিষ্ঠ সুহৃদ। এখন পশ্চিমা মিত্ররা রোহিঙ্গা ইস্যুতে নিষ্ক্রিয়তার জন্য তাঁর সমালোচনা করছে। এ অবস্থায় নিজেকে অবজ্ঞাত মনে করছেন সু চি এবং ভারসাম্য রক্ষার্থে চীনের দিকে ঝুঁকেছেন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে সু চির সমালোচনা খুব একটা করা হয়নি। তবে এ কথা বলা হয়েছে যে রাখাইনে সহিংসতা ঠেকাতে তিনি তাঁর নৈতিক সক্ষমতার প্রয়োগ ঘটাননি। বাস্তবে সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সু চির নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা আইনগতভাবেই সীমিত। প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তবিষয়ক মন্ত্রণালয় সেনাবাহিনীর হাতে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, তিনি সেনাবাহিনীর অভিযানের অনুকূলে কথা বলছেন। এর উদ্দেশ্য শীর্ষ সেনাদের ক্ষুব্ধ না করা এবং দুর্বল বেসামরিক সরকারকে অস্থিতিশীল না করা। তাঁর সরকার জাতিসংঘ প্রতিবেদনকে বাতিলই করেছে বলা যায়।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনের সারাংশ দেখে (পূর্ণ প্রতিবেদন সেপ্টেম্বরে প্রকাশ করা হবে) যুক্তরাষ্ট্র ও নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা মিন অং হ্লাইংসহ মিয়ানমারের সামরিক কর্মকর্তাদের আইসিসিতে বিচারের আহ্বান জানিয়েছেন। এ কথা বলা যত সহজ করা তত সহজ নয়। মিয়ানমার আইসিসির আওতাধীন নয়, দেশটি রোম স্ট্যাটিউটে (যার অধীনে আইসিসি গঠিত) স্বাক্ষর করেনি।

আইসিসি গণহত্যার অভিযোগ গঠন করতে পারে যদি নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া তাদের ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে এ উদ্যোগে বাদ সাধতে পারেএ সম্ভাবনাই বেশি। রোম স্ট্যাটিউটে স্বাক্ষরকারী ১২৩ দেশের একটি বাংলাদেশ। তাতমাদোর অপকর্ম আইসিসির বিচারিক এখতিয়ারে পড়েএ কথার প্রমাণ সাপেক্ষে বাংলাদেশ বিষয়টি আইসিসিতে তুলতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে আইসিসি গত জুনে বাংলাদেশের মতামত চাইলে বলা হয়, আদালতের চাহিদা অনুযায়ী আমরা তথ্য দিয়েছি। তবে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির ফয়সালা করতে চায়। এর পরও যদি আইসিসি শুনানি শুরু করে এবং রায় দেয়, তবুও হ্লাইং ও তাঁর সহকর্মীদের গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা নেই, যদি না তাঁরা রোম স্ট্যাটিউটে স্বাক্ষরকারী কোনো দেশ সফরের ঝুঁকি নেন। তাহলে জাতিসংঘ প্রতিবেদনে যে সুপারিশ করা হয়েছে সেটির কী প্রভাব? একটিই প্রভাবসামরিক জীবন শেষে হ্লাইংয়ের রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের পথে বাধা পড়বে। ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হতে পারেন বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।

তাতমাদো-ঘনিষ্ঠ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী সেনা কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, জাতিসংঘের বিচারের সুপারিশে এবং ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধের বিষয়ে এনএলডির হাত রয়েছে। তারা সেনাবাহিনী ও জেনারেলদের কলঙ্কিত করতে চায়। যা-ই হোক, এই গোলমেলে দশায় সবচেয়ে বেশি লাভ চীনের। কারণ বেসামরিক সরকার ও সামরিক নেতৃত্ব উভয়ই তাদের সমর্থনপ্রত্যাশী। তবে দুই পক্ষের মতভেদ প্রকাশ্যে চলে আসতে পারে আন্তর্জাতিক চাপ ও নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ডামাডোলের কারণে।

লেখক : সুইডিশ সাংবাদিক, এশিয়া বিশেষজ্ঞ

সূত্র : দি এশিয়া টাইমস অনলাইন

ভাষান্তর : সাইফুর রহমান তারিক

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর