English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সাদাকালো

এখনো নিয়মিত মৃত্যু সড়কে কে দায় নেবে

আহমদ রফিক

  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

সংগত কারণে পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটতে হচ্ছে। নিরাপদ সড়কের দাবি পূরণ ও প্রতিশ্রুতি পালনের কোনো ফলাফল দেখা যাচ্ছে না সড়কে, মহাসড়কে। নৈরাজ্য পূর্ববৎ অথবা যেন একটু বেশি মাত্রায়। হতে পারে আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় এমন এক বেপরোয়া ভাব বাস চালকদের, বাস মালিকদেরঅনেকটা বুড়ো আঙুল দেখানোর মতো কিংবা বিদেশিকেতায় ভিক্টরি সাইন। আমরা বিস্মিত, মর্মাহত।

কচি-কাঁচারা রাজপথে নেমেছিল, অবরোধ করেছিল দুই সহপাঠীর মর্মান্তিক মৃত্যুতে, প্রতিবাদ প্রতিক্রিয়ার টানে। শান্তিপূর্ণ সে অবরোধকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকায় কত কী নাটকীয় ঘটনাআশ্বাস, অবিশ্বাস, হামলা, গুজব তৈরি, গ্রেপ্তার-রিমান্ড, ব্যাপক সামাজিক-শিক্ষায়তনিক প্রতিক্রিয়া, ঈদ উৎসব সামনে রেখে কিছু জামিন ও কয়েকটি মুক্তি ইত্যাদি।

এত সব ঘটনার পর কী অবস্থা সড়ক-মহাসড়ক তথা পরিবহনব্যবস্থার? ঈদ উপলক্ষে যাত্রা, ঈদের পর ফিরে আসা এবং আজতক ঘাতক বাসের বেপরোয়া চলাচলে কোনো পরিবর্তন নেই। সড়ক-মহাসড়কে ঝরছে প্রাণ। কোনো প্রতিকার নেই, চরম উদাসীনতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

আর এ সুযোগে, এ উপলক্ষে যে মজার ঘটনা পত্রিকা পাঠকদের জন্য উপাদেয় খবর জোগাচ্ছে তা হলো, থেঁতলানো বাসের শরীর সারাই, রং মাখানো, লাইসেন্স আদায় এবং যথারীতি সড়ক পরিক্রমা। আর হেলপার-চালকদের ছোটাছুটি সনদ জোগাড়ের জন্য। এদের কর্তৃপক্ষ-প্রতিষ্ঠানের দিনরাত্রি একাকারবিশ্রাম হারাম।

একটি খবরে প্রকাশ, মিরপুরের অফিসে মিনিটে-সেকেন্ডে সনদ তৈরি হচ্ছে, হস্তান্তরিত হচ্ছে। আইন রক্ষার যাবতীয় ব্যবস্থার চমকপ্রদ সমাপন। এরপর আর আইনি অভিযোগের সুযোগ নেই, কাগজপত্র ঠিকঠাক যেমন হেলপার-চালকদের, তেমনি তোবড়ানো থেঁতলানো বাসের নতুন চেহারার মালিকদের।

একেই বলে সিন্ডিকেট শক্তির মহিমা। এদের কাছে অসাধ্য কোনো কাজ নেই। হোক তা পরিবহন খাতে, কেনাবেচার বাজারে, ওষুধপত্রের মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্য নির্ধারণে, হঠাৎ হঠাৎ নিত্যদিনের দরকারি কোনো কোনো জিনিসের অবিশ্বাস্য মূল্যবৃদ্ধির মতো ঘটনার কেরামতিতে। আমাদের আলোচ্য বিষয় অবশ্য পরিবহন খাত।

দুই.

এখানে চলছে ঐতিহ্যবাহী নৈরাজ্য অর্থের লোভে বেপরোয়া বাসচালক, শক্তির দম্ভে তার ঘাতক চরিত্রের প্রকাশ, তেমনি উদ্ধত অশিক্ষিত চালক-সহযোগী, যার প্রচলিত নাম হেলপার। বয়সে সে কিশোর বা তরুণ। নেপথ্য শক্তির কারণে তার ঔদ্ধত্যের প্রকাশ আরো বেশি, যাত্রীর প্রাণ তার কাছে কানাকড়ির দামে বিবেচিত। অনায়াসে সে চলন্ত বাসে যাত্রীকে ধাক্কা মেরে রাস্তায় ফেলে দিয়ে চাকার নিচে পিষে মেরে ফেলতে দ্বিধা করে না। যুক্তি, সহিষ্ণুতা, মানবিক বোধএজাতীয় শব্দগুলোর সঙ্গে তার পরিচয় নেই।

তার জগত্টাই আলাদা। সেখানে জেঁকে বসে আছে অশিক্ষা, গ্রাম্যতা, আচরণের স্থূলতা, শক্তির দম্ভ ও ঔদ্ধত্য। চালক মহাশয়ও একই ধারার, তবে একটু উঁচুমাত্রার, তার ঘাতক চরিত্র আরো প্রকট, সেখানে রয়েছে আরো নানাবিধ উপসর্গ, রোগব্যাধি। আমরা তো ভুলে যাইনি বাসযাত্রায় মধুপুর জঙ্গলে হতভাগ্য ছাত্রীর করুণ কাহিনি। জানতে ইচ্ছে করে, কী ঘটেছে সেই বাসচালক ঘাতক ও তার সহযোগীর?

এ নৈরাজ্যিক অবস্থার সব দায় যে বাসচালক ও তার সহকারীদের, তা নয়। নেপথ্যে তাদের বড় শক্তি যেমনতাদের শ্রমিক ইউনিয়ন ও তার নমস্য নেতা, তার চেয়েও মহাশক্তিমান খুঁটি বাস মালিক সমিতির সিন্ডিকেট। তাদের পেছনে আবার রয়েছে রাজনৈতিক শক্তির নানা দলীয় পৃষ্ঠপোষকতা। ফলে তাদের পরিবহন মুনাফাবাজি সীমা-পরিসীমাহীন।

তারা পুরনো অব্যবহারযোগ্য বাস রংচং করে সুদর্শন সাজিয়ে পথে নামায়, এমনকি তা রাজধানীর রাজপথে প্রশাসনের নাকের ডগায়। ট্রাফিক নিয়মনীতি আইন-কানুনের ঊর্ধ্বে তারা। পাঠক বা যাত্রী একটু খোলা চোখে এসব বাসের দিকে তাকালেই এদের হালচাল বুঝতে পারবেন। ট্রাফিক দিবসকালে এরা বিশ্রাম নেয়, তাদের বাসস্থানে বসে।

এখানেই শেষ নয়, চালকদের সঙ্গে মালিকদের চুক্তিভিত্তিক কর্মের যে অনিয়মি ব্যবস্থা চালু, যে কারণে বেপরোয়া চালক অর্থলোভের নেশায় রাজপথ ছেড়ে ফুটপাতে উঠে যায় প্রতিযোগিতার দ্বন্দ্বে কিংবা সড়কের পাশে দোকানে ঢুকে পড়ে মৃত্যু ঘটায় কিংবা মহাসড়কে গাছ; তার-খুঁটিকে ধাক্কা মেরে পার্শ্ববর্তী খালে আশ্রয় নেয় যাত্রীদের সলিল সমাধি ঘটিয়ে। কখনো বা দুমড়ে দিয়ে যায় হালকা যানবাহন যাত্রীদের পিষ্ট করে।

তিন.

এই হলো সাম্প্রতিক ছাত্র-ছাত্রীদের নিরাপদ সড়ক দাবি পূরণের পরিণাম পরিবহন খাতে। যে সহৃদয়তা নিয়ে, যে নমনীয়তা নিয়ে পরিবহন আইন সংস্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তার ফলাফল এমন হওয়াই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক মহলের এক দীর্ঘদিন প্রচলিত শব্দ কায়েমি স্বার্থ এখানে কার পক্ষে, বিপক্ষে ক্রিয়াশীল, তা জানেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক লেখকরা, হয়তো বা ভুক্তভোগী কেউ কেউ।

আমাদের এই বক্তব্য, অভিযোগ যে কল্পিত কিছু নয়, শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরার পর এবং সরকারি বিভিন্ন মহলের বারবার বিবৃতি, এমনকি টিভির টক শোতে সরকারপক্ষীয় বক্তাদের তর্কবিতর্কের পরও যে সড়কে হত্যাকাণ্ড চলেছে, তার প্রমাণস্বরূপ কিছু ঘটনা, উদাহরণ আমরা তুলে ধরব সংবাদপত্র থেকে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অর্থাৎ পত্রিকা পাঠ থেকে বলা যায়, প্রায়ই এমন শোকাবহ ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিকারহীনতার জেরে।

এই তো সেদিন একটি দৈনিক পত্রিকায় দুই কলামের একটি সংবাদ শিরোনাম : আমিনুলের পরিবারে কান্না থামছে না (৩০-৮-২০১৮)। সংবাদ বিবরণে প্রকাশ, কুমিল্লায় বেড়াতে গিয়ে পরিবার-প্রধান আমিনুল ও তাঁর শিশুসন্তান নাবিল নিহত, অন্যরা আহত; প্রতিবেদকের বক্তব্য, চালকের ভুলে।

একই দিনে আরেকটি মারাত্মক ঘটনাশিরোনাম: ওভারটেক করতে গিয়ে বাস কেড়ে নিল তিন প্রাণ। ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন মনিরা আক্তার (১৮)। একটি মাইক্রোবাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে তাঁকে চাপা দিয়ে চলে যায় যাত্রীবাহী একটি বাস। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু। কে এ মৃত্যুর জবাবদিহি করবে?

একই রকম ঘটনায় আরো মৃত্যু। সড়কগুলো যেন মৃত্যু উপত্যকা। উদাহরণনরসিংদীর শিবপুরে আরেকটি বাসকে ওভারটেক করতে গিয়ে একটি মোটরসাইকেলকে চাপা দেয় একটি যাত্রীবাহী বাস। এতে নিহত হন মোটরসাইকেল আরোহী দুজন। একই দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে বেপরোয়া গতির যাত্রীবাহী বাস খাদে পড়ে গেলে মা-মেয়ে ও অন্য এক শিশুসহ নিহত তিনজন।

একই প্রতিবেদনে প্রকাশ, ময়মনসিংহের তারাকান্দায় ট্রাক-অটোরিকশা সংঘর্ষে দুজন এবং কক্সবাজারের চকরিয়ায় জিপের ধাক্কায় মারা গেছেন মোটরসাইকেল আরোহী এক ছাত্রলীগ নেতা। এর পরও নিহতের খবর বাস-ট্রাক সংঘর্ষে। এ প্রতিবেদনের উপশিরোনাম : সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আরো ৯। বলতে হয় মৃত্যুর মিছিল সড়কে।

কেন? ঘটনা বিশ্লেষণে আপাতত কারণ বাসের বেপরোয়া গতিতে চালনা, ওভারটেক করার বৈনাশিক প্রবণতা, চালকের বেহিসেবি চালনা আর সামগ্রিক বিচারে যানবাহন মাত্রেরই চলাচলে গতিসীমা, নিয়মনীতি না মেনে যেমন-তেমনভাবে চলা। না হলে বাস-ট্রাকে সংঘর্ষ হয়? এককথায় আচরণের দিক থেকে চরম ব্যক্তিক নৈরাজ্য যানবাহন চালনায়, মূলত বাসের সর্বাধিক ঘাতক ভূমিকা।

আমাদের প্রশ্ন : আন্দোলনোত্তর পর্যায়েও এই যে প্রাণহানি, এর দায় কার? অবশ্যই প্রত্যক্ষ দায় যানবাহন চালকের, পরোক্ষে মালিকের এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসন অর্থাৎ সরকারের। শাসনযন্ত্র কি ভেবে দেখেছে নিহতদের পরিবারগুলোর বিপর্যস্ত অবস্থার কথা। নাগরিক মাত্রেরই নিরাপত্তা দেওয়ার দায়-দায়িত্বের কথা? না, তারা ভাবে না। ভাবলে এমন আইন তৈরি করত, তাতে এমন কঠোর শাস্তি বিধানের ব্যবস্থা রাখত যে ওভারটেক করার প্রবণতা, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে গিয়ে চালককে দুইবার ভাবতে হতো।

ছাত্র-ছাত্রীদের সাম্প্রতিক আন্দোলন তাই ব্যর্থ। ব্যর্থ তাদের জন্য নয়, ব্যর্থ সরকারি ব্যবস্থার কারণে, ব্যর্থ মালিকদের উদাসীনতার কারণে। উদাসীনতা নিয়ম মানার ক্ষেত্রে, আর মূলত নিয়ম ভাঙা মুনাফাবাজির লোভ-লালসার কারণে। এমন একাধিক কারণে রাজপথে, সড়কে-মহাসড়কে যানবাহন চালনায় বিরাজ করছে চরম নৈরাজ্য।

সংবাদপত্রের দিক থেকে বিন্দুমাত্র ভুল নেই যখন তারা এমন শিরোনাম ছাপে : সড়কে নৈরাজ্য আগের মতোই কিংবা এমন শিরোনাম : গণপরিবহনে শৃঙ্খলার বিষয়টি উপেক্ষিত। লেখে যাত্রী তোলায় রেষারেষি, যত্রতত্র যাত্রী নামানো-ওঠানো, উল্টোপথে চলা, মুঠোফোন কানে চেপে কথা বলতে বলতে গাড়ি চালনার বিশৃঙ্খল আচরণের বিষয়গুলো।

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা চেয়েছিল রাস্তার সর্বপ্রকার যানবাহন নিয়ম মেনে, আইন মেনে চলুক, অদক্ষ চালক বা হেলপার-চালক যেন স্টিয়ারিং না ধরে, লাইসেন্সবিহীন চালককে যেন চালকের আসনে বসতে দেওয়া না হয়। সড়কে-রাজপথে এ সবকিছু চলেছে আন্দোলনের দিনকয়। আন্দোলন শেষ, নিয়মনীতিও শেষ। আবার শুরু সড়কে যানবাহন চলাচলের নৈরাজ্যিক রাজত্ব।

আমাদের সমাজ যে কত অমানবিক ও যুক্তিহীন তার প্রমাণ মেলে যখন আমরা আলাপে-সংলাপে, লেখায়টক শোতে প্রায়ই সড়ক হত্যাকাণ্ডগুলোকে দুর্ঘটনা নামে ঘাতককে ছাড়পত্র দিতে চাই। প্রকৃত দুর্ঘটনার সংখ্যা বাস্তবে খুবই কম। পূর্বোক্ত একাধিক কারণ অসহায় যাত্রীদের মৃত্যুর কারণ। এগুলোকে হত্যাকাণ্ড ছাড়া কী বলা যাবে। রাষ্ট্রযন্ত্র এ বাস্তব ধারায় ভাবে না বলেই তাদের পরিবহন আইন অভাবিত রকম নমনীয়।

এ নমনীয়তার কারণে এক বাস হেলপার কদিন আগে এক যাত্রীকে চলন্ত বাস থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে চাকায় পিষে মারতে দ্বিধা করেনি। কী বীভৎস হত্যাকাণ্ড! যুক্তিসংগত কারণে জনৈক কলামিস্টের লেখার শিরোনাম : দুর্ঘটনা নয়, যাত্রী হত্যা! রেজাউল করিম হত্যার মতো জঘন্য হত্যাকাণ্ড বাসযাত্রায় একাধিকবার ঘটেছে। কিন্তু কঠিন শাস্তির অভাবে হত্যাপ্রবণতা কমছে না, বন্ধ হওয়া তো দূরের কথা।

ক্ষুব্ধ মনে এসব অন্যায়, অপরাধের বিরুদ্ধে আমরা নিয়মিত লিখি, ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করি, সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করেন ঘটনার হৃদয়স্পর্শী শিরোনাম দিয়ে প্রতিবেদন লিখে। তা সত্ত্বেও দেখি নড়বড়ে বাসগুলোর শহরময় দাপাদাপি; দেখি নিয়ন্ত্রণহীন বাস ফুটপাতে উঠে নিশ্চিন্ত পথিককে ধাক্কা মেরে দ্রুত উধাও। আরো দেখি মর্মস্পর্শী ঘটনা : মায়ের কোল থেকে মৃত্যুর কোলে শিশু আচমকা বাসের ধাক্কায় (৩১-৮-২০১৮)। সন্তান হারানো মায়ের সে কী কান্না!

আমাদের শাসনযন্ত্রে কর্মরত নারীঅর্থাৎ মায়েদের কি এসব ঘটনায় মুহূর্তের জন্য হৃদয়স্পন্দিত হয় না? মনে হয় না যে এই মা তাদের কোনো একান্তজন হতে পারতেন। না-ইবা হন স্বজন। মানুষ হয়ে কি নিরপরাধ মানুষ হত্যা সহা যায়? ওই সব ঘাতকের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে কি মন চায় না?

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর