English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

মাঠের লড়াইয়ে লক্ষ্য হোক জয়

ইকরামউজ্জমান

  • ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

দক্ষিণ এশিয়ায় সার্কভুক্ত সাতটি দেশ নিয়ে প্রথমবার সাফ গেমস (সাউথ এশিয়ান ফেডারেশন গেমস) অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালে নেপালের কাঠমাণ্ডুতে। আঞ্চলিক সর্ববৃহৎ ক্রীড়ানুষ্ঠানে অন্যান্য খেলার সঙ্গে ছিল ফুটবল। প্রথমবার সাফ ফুটবলের ফাইনালে বাংলাদেশ নেপালের কাছে ২-৪ গোলে পরাজিত হয়। এরপর দীর্ঘ ১৫ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে ফুটবলে সোনা জয়ের জন্য। প্রত্যাশা বাস্তবায়িত হয়েছে অষ্টম সাফ গেমসে (১৯৯৯) নেপালের বিপক্ষে তাদের মাটিতে (১-০) গোলে পরাজিত করে। ফাইনালে গোল করেছিলেন আলফাজ আহমেদ। ১৯৯৯ সালের ৪ অক্টোবর বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে সব সময় স্মরণীয়।

শুধু ফুটবলের আসর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুভব করেই এর শুরু। সার্কভুক্ত দেশের পৌনে ২০০ কোটি মানুষের আঞ্চলিক ফুটবল উৎসব। ফুটবল শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের সবচেয়ে বড় মঞ্চ। অগণিত ফুটবল প্রেমিকের কাছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ দক্ষিণ এশিয়ার বিশ্বকাপ। তাই সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ঘিরে উচ্ছ্বাস, আবেগ ও প্রত্যাশা অন্য রকম। ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের সম্মানের পাশাপাশি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করা।

ঢাকায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে (২০০৩) প্রথম বাংলাদেশ ফাইনালে মালদ্বীপকে ১(৫)-১-(৩) গোলে টাইব্রেকারে পরাজিত করে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ২০০৩ সালের ২০ জানুয়ারি কখনো ভোলার নয়। এরপর গত ১৫ বছর ট্রফি ছুঁয়ে দেখার সুযোগ মেলেনি। বিগত তিনটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে তো গ্রুপ পর্বের বেড়া অতিক্রম করতে পারেনি। মধ্যে অবশ্য ২০১০ সালে এসএ গেমসের ফুটবলে ঢাকায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় দল।

বাংলাদেশে এবার নিয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের (২০০৩, ২০০৯ ও ২০১৮) এটা তৃতীয় আসর। অর্থাৎ ৯ বছর পর আবার ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সেরা প্রমাণের অনুষ্ঠান। ফুটবল রোমাঞ্চে ভরপুর ১২তম উৎসব। দেশের মানুষ ভালো ফুটবল উপভোগের প্রত্যাশায় আছে।

বিগত ১১ বারের চ্যাম্পিয়নশিপে ভারত ট্রফি জিতেছে সাতবার। এতে এটাই প্রমাণ করে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে তারাই সেরা। তবে এই গণ্ডির বাইরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভারতের অবস্থা ভালো নয়। এই ভারত কিন্তু পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এশিয়ান গেমস ফুটবলে সোনা জিতেছে। এখন এটা শুধু স্মৃতি।

আজ থেকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ১২তম সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ মাঠে গড়াবে বাংলাদেশ ও ভুটানের খেলার মাধ্যমে। এ গ্রুপে বাংলাদেশের অপর দুই প্রতিপক্ষ পাকিস্তান ও নেপাল। বি গ্রুপে আছে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ। দেশের জন্য জাতীয় দল খেলবে উজাড় করে দিয়ে। এশিয়াডে ভালো খেলা আশা জাগিয়েছে। বিশ্বাসকে দৃঢ় করেছে। সিনিয়র-জুনিয়র খেলোয়াড়ের সমন্বয়ে গঠিত দলটি আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলবে। খেলা উপভোগ করবে। অযথা স্নায়ুর চাপে ভোগা উচিত নয়।

দেশের মাটিতে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ দেশের ফুটবলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। গত জাকার্তা এশিয়াডে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব ২৩ (তিনজন সিনিয়র খেলোয়াড়ের খেলার সুযোগ ছিল) আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, ভয়ডরহীন সাহসী নির্ভার ফুটবল খেলে এই প্রথমবার নক আউট রাউন্ডে খেলার সুযোগ করে নিয়েছে। এটা অনেক বড় অর্জন দেশের ফুটবলের জন্য। পাশাপাশি অনুপ্রেরণা ও আত্মবিশ্বাসকে দৃঢ় করার দাওয়াই। আমরা লক্ষ করেছি, এশিয়াডে ভালো খেলা দেশের ফুটবলকে ঝাঁকুনি দিয়েছে। মানুষ বিশ্বাস করছে ফুটবলে তারুণ্যের বিকল্প নেই।

এশিয়াডের পর এবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। এ ক্ষেত্রে মাঠের লড়াইয়ের চরিত্রে পার্থক্য আছে। প্রতিটি দেশ থেকে জাতীয় দলের পুরনো ও অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা দেশের পক্ষে খেলতে নামবেন। তাই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং মেজাজও অন্য রকম। বয়সে তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দল এ ধরনের পরিস্থিতিতে সব সময় অসুবিধার সম্মুখীন হয়, এটা ঠিক নয়। এবারের বিশ্বকাপ জিতেছে ফ্রান্স। সেই দলের খেলোয়াড়দের বয়সের গড় কত ছিল? ফ্রান্সের তারুণ্য কিভাবে তাদের মাঠে এগিয়ে নিয়ে গেছে (সিনিয়র খেলোয়াড়ও সঙ্গে ছিলেন), পুরো বিশ্ব সেটা পর্যবেক্ষণ করেছে। অভিজ্ঞতার অবশ্যই মূল্য আছে। মাঠে সামর্থ্যের সঠিক প্রয়োগ দেশের জন্য শতভাগ উজাড় করে দেওয়ার পাশাপাশি জয়ের ক্ষুধা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলোই একটি দলকে এগিয়ে নিয়ে যায়। খেলোয়াড়রাই সফলতা রচনার আসল সৈনিক। কোচ বাইরে থেকে পরিকল্পনা ঠিক করে দেন।

এশিয়াডের আগে ইংলিশ কোচ জিমি ডে এবং তাঁর সহকারীদের অধীনে বাংলাদেশ দলের ২৩ অনূর্ধ্ব খেলোয়াড় ছাড়াও জাতীয় দলের সিনিয়র খেলোয়াড়রা নিবিড় প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। এটা সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপেরও প্রস্তুতি ছিল। এ ক্ষেত্রে দেশের বাইরে কাতারে ক্যাম্প এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রস্তুতি ম্যাচগুলো খুব কার্যকর হয়েছে। আর এটা এশিয়াডে ভালো দলের বিপক্ষে খেলার সময় লক্ষণীয় হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ফিটনেস। শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে। ফিটনেসের বিষয় আগের বিদেশি কোচ গুরুত্ব দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় জিমিও এ বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন এবং এতে ফলও পাওয়া গেছে। আগের কোচ খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করেছেন। জিমিও বিষয়টি নিয়ে কঠোরভাবে কাজ করেছেন। একটা দলের ফিটনেস ও স্ট্যামিনা বৃদ্ধি নিয়ে কাজ করা ছাড়া (এটা চলমান প্রক্রিয়া) ৮-৯ সপ্তাহে অন্য ক্ষেত্রে পরিবর্তন সাধন সম্ভব নয়। যেটা লক্ষণীয়, খেলোয়াড়রা পুরো বিষয়টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে নিয়েছেন। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের পরপরই দেশের মাটিতে ছয় দেশের জাতীয় দল নিয়ে শুরু হবে ১ অক্টোবর থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তো সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে বেশি।

গত ২৯ আগস্ট নীলফামারীতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ফিফা ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ (স্টেডিয়াম-ভর্তি দর্শক প্রমাণ করে দেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তায় ভাটা পড়েনি) ১-০ গোলে পরাজিত হয়েছে। এই পরাজয় প্রত্যাশিত ছিল না। অবশ্য পরাজয় বড় কিছু নয়। তবে এটা তো ঠিক জয় আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। উজ্জীবিত করে। সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে আরো চাঙ্গা হয়েই নামা সম্ভব হতো। কোচ সিনিয়র খেলোয়াড়দের পরখ করার পাশাপাশি তাঁদের সামর্থ্যতা দেখতে চেয়েছিলেন। কেননা বিদেশে তো তাঁরা খেলার সুযোগ পাননি। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে জাতীয় দল গঠন করতে হবে। তাই এশিয়াডের ৯-১০ জন খেলোয়াড়কে বিশ্রাম দিয়ে দল গঠন করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে দেশের ফুটবলের একটি বাস্তব ছবি পাওয়া গেছে। বিদেশি কোচ যা বোঝার বুঝেছেন। এ খেলায় সিনিয়র খেলোয়াড়দের মাঠে ভূমিকা অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। পাশাপাশি ফুটবল ঘিরে নতুন করে চিন্তাভাবনার বিষয়টি আবার বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য ২০ সদস্যের দলের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। এখানে লক্ষণীয়, কোচ জিমি ডে পুরনো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের গুরুত্ব দিয়েছেন।

স্কোয়াডে নতুনদের পাশাপাশি পুরনোদের গুরুত্ব দিয়ে ২০ সদস্যের স্কোয়াড গঠন করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কোচ এশিয়াডের দলকেই মাঠে গুরুত্ব দিতে যাচ্ছেন। এতে বলা যাবে, বাংলাদেশ জাতীয় দলটা হয়েছে অভিজ্ঞ এবং তরুণ খেলোয়াড়ের সমন্বয়ে গঠিত। প্রকাশ্যেও উচ্চারিত হয়েছে লক্ষ্যভাগে খেলা। দেশে খেলা হবে, মানুষের প্রত্যাশা তো অবশ্যই বেশি, তবে এটা কি অবাস্তব। প্রথম ম্যাচটিই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে এগিয়ে গেলেই মাঠের লড়াই সহজ হবে। খেলোয়াড়দের লক্ষ্য জয়।

২৩ অনূর্ধ্ব দল এশিয়ান গেমসে ভালো ফুটবল খেলেছে। আমরা এ দলের মধ্যে সম্ভাবনার একটা ইতিবাচক শক্তি অনুভব করতে পেরেছি। ফুটবলকে অবদমন থেকে বের করে টেকসই একটা ভবিষ্যৎ গড়তে তারুণ্যের শক্তি, সাহস, দৃঢ়তা, সৃজনশীলতা ও গভীর আবেগের প্রয়োজন। তারুণ্য শক্তিকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের প্রতি আস্থা রাখতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে এরাই পারবে। এরাই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আসল সৈনিক। আমাদের ফুটবল একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফুটবল নিয়ে স্বস্তি নেই। কমবেশি সবাই ফুটবল ঘিরে হতাশ। আর এটাই বাস্তবতা। ফুটবল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে হবে। এর জন্য নতুন উদ্যোগ ও সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে তারুণ্যের প্রাণশক্তি আর তাদের সামর্থ্যতা ছাড়া উপায় নেই। তারুণ্যের দিকে তাকালে, তাদের নিয়ে কাজ করলে আমরা প্রতিদিনই আশাবাদী ও সাহসী হতে পারব। ফুটবলের উন্নয়নে সবাই একই নৌকার যাত্রী। এই যাত্রীর মধ্যে বিভিন্নভাবে বিভাজন তৈরি করা হলে আমরা লক্ষ্যে পৌঁছতে পারব না।

লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর