English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সিডও সনদের দুই ধারার অনুমোদন সময়ের দাবি

দিল মনোয়ারা মনু

  • ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

বিশ্বজুড়ে নারী জেন্ডার ইস্যুটি এখন বহুল আলোচনার বিষয়। সর্বস্তরের দাবি, নারীর প্রতি সব বৈষম্য অবসানের মাধ্যমে জেন্ডার সমতা আনতে হবে।

৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সিডও দিবস। সিডও হলো জাতিসংঘের নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ। ১৯৭৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সিডও সনদ গ্রহণ করে। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকার সিডও অনুমোদন করে। তবে সিডও সনদের দুটি ধারা এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়।

বিশ্ব নারী দিবস প্রবর্তনের পর থেকে নারী প্রগতির আন্দোলন যে নতুন মাত্রা লাভ করতে শুরু করেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় নারীসমাজের আজকের সব অর্জন। বিশ্ব নারী দশক সামনে রেখে নারীসমাজ তাদের প্রতি বিরাজমান সব বৈষম্য শনাক্ত করতে পেরেছিল এবং সেই বৈষম্যের ক্ষতিকর দিক থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার জন্য জোর দাবি তুলেছিল। পরবর্তী সময়ে তারই প্রতিফলন ঘটেছে আন্তর্জাতিক সিডও সনদের ১৬টি ধারায়। যদিও নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি ধারার ওপর থেকে সরকার এখনো সংরক্ষণ তুলে নেয়নি, বিবেচনায় রয়েছে বলে আমরা জানতে পেরেছি।

সমতা, উন্নয়ন ও শান্তিযা আজও নারী প্রগতির আন্দোলনে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে। ১৯৮১ সালে ঘোষিত সিডও সনদ এ ক্ষেত্রে এক শক্তিশালী মাত্রা হিসেবে যুক্ত হলো। এর সঙ্গে আরো উল্লেখ করতে হয় আন্তর্জাতিক চারটি বিশেষ সম্মেলনের কথা। প্রথমটি মেক্সিকো, দ্বিতীয়টি কোপেনহেগেন, তৃতীয়টি নাইরোবি এবং চতুর্থটি বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বিশ্ব নারী সম্মেলন। এই সম্মেলনে নারীর অধিকার ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে এমন ১২টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে বেইজিং প্ল্যাটফর্ম অব অ্যাকশন চূড়ান্ত করা হয়, যা একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে সব দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং ২০১৫ সালে তার ২০ বছর পূর্ণ হয়েছে। নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও নারী ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গে প্ল্যাটফর্ম অব অ্যাকশন একটি সুচিন্তিত পথনির্দেশনার এই সূত্র ধরে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে এসেছে। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যেসব ইস্যু নিয়ে আওয়াজ তোলা হয়েছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক। আজও বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে নারীরা বৈষম্যের শিকার, দেশীয় রীতি-নীতি, আচার-অনুষ্ঠানে নারীকে অধস্তন করে রাখার প্রবণতা বিরাজমান। যদিও যুগে যুগে নারী প্রগতির আন্দোলনের পথ ধরে অর্জনও কিছু কম হয়নি। ভোটাধিকার অর্জিত হয়েছে, দাসপ্রথার অবসান ঘটেছে, আট ঘণ্টা কাজের সময় মেনে নেওয়া হয়েছে, নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে আনা এবং উন্নত বিশ্বে স্বাস্থ্যসেবা সরকারিভাবে দেওয়ার ব্যবস্থাও গৃহীত হয়েছে। সেই সঙ্গে নিশ্চিত করা হয়েছে নারীশিক্ষা। নারীকে রাজনীতিসচেতন ও নারীর কর্মসংস্থানের ব্যাপক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়। বিভিন্ন সময়ের নারীর শক্তিশালী আন্দোলন জাতিসংঘের এই ব্যবস্থাগুলো এগিয়ে নিতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখনো সংগ্রাম চলছে ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড, নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১-এর পূর্ণ বাস্তবায়ন, সম্পত্তিতে নারীর অধিকার, নারী-পুরুষ সমতার লক্ষ্যে জাতীয়, আন্তর্জাতিক সব সনদ, বেইজিং সম্মেলনের ১০টি উল্লেখযোগ্য কর্মপরিকল্পনা এবং সিডও সনদের পূর্ণ ও যথাযথ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে।

এত কিছু অর্জনের পরও কোথায় যেন একটা ফাঁক রয়ে গেছে, সেটি হচ্ছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামো এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। এর ফলে নারীও যে মানবসম্পদ এবং এই অর্ধেক নারীসমাজের কাছে মেধা, মনন, প্রজ্ঞা, দক্ষতা, প্রতিভার অর্ধেক সঞ্চিত আছে এবং এর যথাযথ ব্যবহার না হলে যে জাতির জন্য শুভ কল্যাণকর কিছু হবে না, সেই সত্য পরিপূর্ণভাবে আমরা হৃদয় দিয়ে এখনো অনুধাবন করি না। আমরা জানি, এখনো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর পিছিয়ে পড়া অবস্থানের কারণে তারা প্রতিনিয়ত নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন নারী এখনো নির্যাতনের শিকার এবং দুঃখজনক হলেও সত্যি, ৬০ শতাংশ নারী এই নির্যাতনের ব্যাপারে নীরব থাকে। আমাদের দেশের নারীরা এখনো ন্যায্য অধিকার পাচ্ছে না।

এ অবস্থা কোনোভাবেই জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির সহায়ক হতে পারে না। তাই পুরুষের সমান সুযোগ, মজুরি এবং সম্পত্তিতে নারীর সম-অধিকার নিশ্চিত করা আজ খুবই জরুরি। এই অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় নারী নির্যাতন চলছে নির্বিচারে, শ্লীলতাহানি, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, পুড়িয়ে মারা, বহুবিবাহ, যৌতুকসহ ফতোয়াবাজি, শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা চলছে অহরহ। নির্মম নির্যাতন শেষে হত্যার ঘটনা ঘটে চলছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধী নারীদের ক্ষেত্রেও। নারীর প্রতি সহিংসতা এখন আশঙ্কাজনক পর্যায়ে রয়েছে। সম্প্রতি নারী গণমাধ্যমকর্মীকে কুপিয়ে হত্যা, পারিবারিক বিরোধের জের ধরে তরুণীর গায়ে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে মারার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। এর আগে বাসযাত্রী মেয়েকে নির্যাতন শেষে ঘাড় মটকে মারার মতো ঘটনা সবাইকে আতঙ্কিত করেছে। আইন আছে, কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। ভূমিতে নারীর অধিকার না থাকায় এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে দরিদ্র সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী এখনো ক্ষমতাহীন। অথচ নারীর আজ বাঁধাধরা কিছু ক্ষেত্রে নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের দৃপ্ত পদচারণ ঘটছে, যেমন নানা চ্যালেঞ্জিং পেশায় তাদের অংশগ্রহণ। উচ্চতর পর্বতশৃঙ্গে আরোহণের ক্ষেত্রেও সমান দক্ষতা প্রদর্শন করে দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে তারা। দেশে ও দেশের বাইরে বহু অভাবনীয় পদে নারী দাপটের সঙ্গে কাজ করছে। এখন প্রয়োজন নারী-উন্নয়ননীতির সঙ্গে সাহসী ও অভিনব সামাজিক সব নীতির যোগসূত্র ঘটানো। আমাদের সংবিধানে রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এর জন্য নারীর ক্ষমতায়নের পথ প্রশস্ত করা, গণমাধ্যমসহ সব পর্যায়ে নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং জাতীয় সংসদসহ রাজনৈতিক দলের প্রতিটি স্তরে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধির উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের দাবি প্রতিষ্ঠিত করা দরকার। কারণ জাতিসংঘ মনে করে, কোনো দেশের নির্বাচনে এক-তৃতীয়াংশ নারী নেতৃত্ব না থাকলে সে দেশের নারীরা সামগ্রিকভাবে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। সময় এসেছে এই দাবিকে নিছক নারী ইস্যু হিসেবে বিবেচনা না করে গণদাবিতে পরিণত করার। সিডও দিবস হোক মানবিক হাতিয়ার শাণিত করার এবং নারীর চোখে দেশ, সমাজ ও বিশ্বকে দেখার দিন। কারণ আমরা জানি, বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রের ধারা-উপধারার সঙ্গে সিডও সনদের অনুচ্ছেদ-২ অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি, নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের দাবি অবিলম্বে সিডও-২ ধারা অনুমোদন করা হোক। ২ ধারার অনুমোদন এখন সময়ের দাবি।

একবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে নারী আন্দোলন সিডও সনদ, বেইজিং দশ, আজকের বিশ্ব ও বিশ্বায়নপ্রক্রিয়ার ভালো-মন্দ দিক, জেন্ডার ইকোয়ালিটির নতুন ভাবনা, মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভূমিকা বাস্তবায়নে আজকের নারীসমাজকে কাজ করে যেতে হবে। এভাবেই একদিন বৈষম্যহীন এবং সংখ্যালঘু আদিবাসী সম্প্রদায়সহ সব নাগরিকের জন্য গণতান্ত্রিক মানবিক সংস্কৃতির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও নারী অধিকার কর্মী

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর