English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সাধের রেলগাড়ি চলে না—চলে না রে

ইসহাক খান

  • ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

সারা পৃথিবীতে রেলব্যবস্থাকেই একমাত্র আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে সব দেশেই তারা তাদের কর্মসূচি প্রণয়ন করছে। সব দেশে রেল পরিবহনব্যবস্থা ছড়িয়ে যাচ্ছে নানাভাবে। মেট্রো রেল, পাতালরেল, ইলেকট্রিক রেল আরো কত কি। রেলকে ঘিরেই পরিবহনব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। দেখা যায়, ওই সব দেশে দুই-তিন শ কিলোমিটার দূর থেকে এসে লোকজন অফিস করছে। তাতে শহরে জনসংখ্যার চাপ বাড়ছে না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেকলকাতার বাইরে থেকে এসে অসংখ্য লোক অফিস করছে। আর আমরা রেল নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি রেলের কালো বিড়াল ধরার জন্য। কিন্তু থলের মধ্যে কালো বিড়াল রেখে আমরা চোখ বন্ধ করে লম্ফঝম্প করছিকিন্তু কিছুতেই কালো বিড়াল ধরতে পারছি না।

দেশের জরাজীর্ণ রেলব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এই সরকারের আমলে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় পৃথক রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়েছে। তাতে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। যেই লাউ সেই কদু। রেল চলছে লোকসান দিয়ে ঢিমেতালে।

রেল বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে কালের কণ্ঠ ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করছে ২৭ আগস্ট থেকে। রেলে যে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তাতে পিলে চমকে উঠার মতো।

আর এই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার ঘটনায় অভিযোগের আঙুল উঠেছে বর্তমান রেলের মহাপরিচালক ও তাঁর জামাতার বিরুদ্ধে। রেল ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রেলকে জামাই-শ্বশুরের কম্পানি বলে পরিহাস করে।

অভিযোগ হচ্ছে, জামাই-শ্বশুরের ইশারায় সংশ্লিষ্টরা সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই উন্নয়ন প্রকল্পের ছক তৈরি করেছেন, পরে চলেছে নকশার নামে নীলনকশার বাস্তবায়ন।

সূত্র মতে, বৈরী আবহাওয়ার অজুহাত, দরপত্র আহ্বানে দেরি, গাড়ি ও যন্ত্রপাতি আনতে দেরিসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্প ঝুলিয়ে রেখে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুটিকয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপন সমঝোতার মাধ্যমেই প্রকল্পের কাজ ভাগ-বাটোয়ারা হচ্ছে। ফলে সরকারের দেওয়া বিপুল বরাদ্দ থেকে আশানুরূপ ফল মিলছে না।

জানা গেছে, প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ বিদেশ থেকে নেওয়া হয়েছে ঋণ হিসেবে। ঋণ সহায়তাকারী সংস্থা বা দেশগুলোর মধ্যে আছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকএডিবি, জাপানের জাইকা, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত ও চীন। এডিবি রেলে সবচেয়ে বেশি ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন না হওয়ায় গত বছর একাধিক প্রকল্পের অর্থ ফেরত নিয়ে গেছে। গত বছর প্রকল্পের আংশিক ঋণ বাতিল করে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। সময়মতো ব্যবহার না হওয়ায় চারটি প্রকল্পের ছয় কোটি ডলার বা ৪৮০ কোটি টাকা ঋণ প্রত্যাহার করেছে সংস্থাটি। বিশ্বব্যাংক তার আগেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেওয়া, বদলি, পদোন্নতি, সাজা পাওয়া, কর্মচারীদের শাস্তি কমানো থেকে শুরু করে সব ধরনের কাজে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন মহাপরিচালক। কেউ তাঁর মেয়ের জামাইয়ের বিরুদ্ধে কথা বললেই শাস্তির ভয় দেখানো হয়। রেলের কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রেলের বিভিন্ন বিভাগের ৬০ জনকে ডিঙিয়ে জামাতাকে পদোন্নতি দিয়ে পরিচালকের (সংগ্রহ) মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়েছেন মহাপরিচালক। সব দরপত্র আহ্বান ও মালপত্র কেনা হয় জামাতার দপ্তর থেকে। জানা যায়, দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) সম্প্রতি জামাতার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছিল। মহাপরিচালক নাকি তা ধামাচাপা দিয়েছেন। তাঁকে রেকর্ডসংখ্যকবার বিদেশে ট্রেনিংয়ে পাঠানো হয়েছে। জানা গেছে, জামাতার বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী অপপ্রচার ও বিভিন্ন অনিয়ম ওঠার পর রেল ভবনে এক সভায় স্বয়ং রেলমন্ত্রী ওই জামাতাকে রেল ভবন থেকে পশ্চিমাঞ্চলে বদলি করার তাৎক্ষণিক নির্দেশ দিয়েছিলেন। ওই নির্দেশও বাস্তবায়ন হয়নি।

খুবই তাজ্জবের বিষয় হলো, রেলে ছোট থেকে বড় অপরাধসব ঢেকে রাখা হয় তদন্ত কমিটি করে। তদন্ত কমিটি তদন্তে নামে, কিন্তু অপরাধ হিসেবে গুরুদণ্ড দেওয়া হয় না। কৌশলে দুর্নীতি আড়ালে রাখার সংস্কৃতির কারণে রেলের নিয়োগ বাণিজ্যে ডালপালা বেড়েছে আরো বেশি। নিয়োগ বাণিজ্যের ৭০ লাখ টাকা ধরা পড়ে বিজিবি সদর দপ্তরে। সে কারণে প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের কর্মকর্তা ইউসুফ আলী মৃধার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তার জেল হয়। তার পরও নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি থেমে নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন বিভিন্ন সময় তদন্তে নেমে এসব দুর্নীতির প্রমাণও পেয়েছে। যেমন২০১৬ সালের জুলাইয়ের সহকারী স্টেশন মাস্টার পদে ২৫৭ জনের নিয়োগ ঘিরে দুর্নীতি হয়। তথ্য সূত্র মতে, নিয়োগ পেতে ১২ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে।

এখনো বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১৫ হাজার পদ শূন্য রয়েছে। কিছুদিন আগে পত্রিকায় পড়েছিলাম কোনো কোনো স্টেশনে লোকবলের অভাবে স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। তাতে ওই এলাকার জনগণ যেমন ভোগান্তিতে পড়েছে, তেমনি লোকসান গুনছে সরকার। ভাবতে অবাক লাগে, যে দেশে লাখ লাখ বেকার, সে দেশে লোকবলের অভাবে স্টেশন বন্ধ থাকছে। ভাবা যায়?

রেলের বড় একটি দুর্নীতি হচ্ছে তেল চুরি। যাত্রী ও মালবাহী বিভিন্ন ট্রেন থেকে তেল চুরি হচ্ছে বছরে গড়ে প্রায় দেড় কোটি লিটার। তেল চুরি করে বেচে দিচ্ছে সিন্ডিকেটগুলো। রেলওয়ে সূত্র জানায়, দিনে সাড়ে ৩০০ ট্রেন চলাচল করে সারা দেশে। এসব ট্রেনে পৌনে দুই লাখ লিটার ডিজেল লাগে। বছরে খরচ হয় ছয় কোটি ৩৮ লাখ ৭৫ হাজার লিটার। তা থেকে বছরে দেড় কোটি লিটার তেল চুরি হচ্ছে।

ট্রেনে যাত্রীদের কোনো সেবা নেই। ট্রেনে বাতি জ্বলে না, পাখা ঘোরে না। টয়লেট অপরিষ্কার। আসন ছেঁড়া। এসি বগি কম। তার চেয়ে বড় যে বেদনার বিষয় তা হলো, ট্রেনের টিকিট সংকটকে পুঁজি করে রেল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একটি অংশের টিকিট কালোবাজারি ব্যবসা। এক সপ্তাহ আগে টিকিট চাইলে অনেক সময় টিকিট প্রার্থীকে বলা হয় টিকিট নেই। অথচ গাড়ি ছাড়ার কিছু আগে থেকে ব্ল্যাকে চড়া মূল্যে টিকিট পাওয়া যায়। এ ঘটনার সূত্র ধরে সাংবাদিকরা জানতে পেরেছেন, ভিআইপি ও বিভিন্ন কোটার ট্রেনের টিকিট রাখা হয় প্রায় ৩৮ শতাংশ। ট্রেন ছাড়ার দিন কয়েক ঘণ্টা আগে থেকে এসব টিকিটের বড় অংশ গোপনে বিক্রি করেন বুকিং ক্লার্ক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

এসব সাধারণ অনিয়ম। কখনো কখনো এই সাধারণ অনিয়ম অনেক বড় হয়ে দেখা দেয়। সবাই জানে টিকিট কালোবাজারি হয়হচ্ছে, কিন্তু তাতে যেন কারো মাথাব্যথা নেই।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এসব ছোটখাটো ব্যাপার আপনার দেখার কথা নয়। দেখার সময়ও নেই। কিন্তু আপনার মন্ত্রীরা কী করছে তা তো আপনি মনিটর করতে পারেন। এই অনিয়মগুলো দিনের পর দিন হচ্ছে; অথচ এসব প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। দেশ কি এভাবেই চলবে?

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, গল্পকার ও টিভি নাট্যকার

উপ-সম্পাদকীয়- এর আরো খবর