English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

আবদুল খালেক থ্রি

আন্দালিব রাশদী

  • ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

আপনাদের চেনাজানা যে কয়জন আবদুল খালেক আছে, তাদের চেহারা এক এক করে মনে করুন। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, সবার চেহারাই আবদুল খালেক টাইপের।

এবার একটু ভিসুয়ালাইজ করুন, আমি আবদুল খালেক থ্রি দেখতে কেমন?

অনেকটাই অমিতাভ বচ্চনের মতো। তবে তিনি আমার চেয়ে এক-দেড় ইঞ্চি লম্বা।

আমাদের বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠান লংজাম্প ও হপস্টেপ অ্যান্ড জাম্প আইটেমে গোল্ড মেডেল পেয়েছি, শর্টপুটে ওমপুরি চেহারার একজন ফোরম্যান গোল্ড পেয়েছে, আমি পেয়েছি সিলভার। আজ পর্যন্ত কোনো আবদুল খালেককে হপস্টেপ অ্যান্ড জাম্প দিতে দেখেছেন?

আমাকে দেখুন, আবদুল খালেকদের সম্পর্কে আপনাদের এত দিনের ধারণাই পাল্টে যাবে।

এখানেই শেষ নয়, স্কুলের স্পোর্টসের মতো আমাদের কম্পানির স্পোর্টসেও যেমন খুশি তেমন সাজো ছিল। একজন দইওয়ালা সেজেছে, একজন সেজেছে রাজাকার, একজন হয়েছে র্যাব অফিসার, আমিও সেজেছি। ততক্ষণে আমাদের করপোরেট চেয়ারম্যান প্রধান অতিথি হোসেন আলী হাজির। তিনিই পুরস্কার বিতরণ করবেন।

শামিয়ানার নিচে সবচেয়ে সুন্দর রাজকীয় চেয়ারটায় বসলেন। তখনই ঘোষণা শোনা গেল, আমাদের পুরস্কার বিতরণীতে বিশেষ অতিথি হিসেবে এসেছেন বলিউডের কিংবদন্তি অমিতাভ বচ্চন।

দেখা গেল, মাঠের এক কোণে কালো গগলস চোখে সেই মহানায়ক দুই কিশোরীর হাত ধরে শামিয়ানার দিকে এগোচ্ছেন। হঠাৎ মাঠের চারদিকে করতালি এবং অমিতাভ বচ্চন অমিতাভ বচ্চন ধ্বনি উঠল। চেয়ারম্যান বিড়বিড় করে বললেন, আমাকে তোমরা আগে বলবে না, তিনি আসবেন!

হোসেন আলী সাহেব স্থূলদেহ, পাঁচ ফুট দুই উচ্চতার একজন মানুষ, মাথায় পুরো টাক, হ্যাট পরেন, তিনি দুই কদম এগিয়ে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে হাত মেলালেন। অমিতাভ তাঁর হাতে বেশ ঝাঁকি দিয়ে ভরাট গলায় জিজ্ঞেস করলেন, হাউ ডু ইউ ডু, মিস্টার আলী।

ফাইন, থ্যাংক ইউ ফর কামিংএসব বলে তিনি অমিতাভ বচ্চনকে তাঁর পাশের চেয়ারে বসালেন।

তখনো আরেক দফা হাততালি পড়ল।

আয়োজকরা সিদ্ধান্ত নিলেন, অমিতাভকে দ্রুত হোসেন আলীর কাছ থেকে সরিয়ে আনতে হবে।

আবার মাইক গমগম করে উঠল, আমাদের আকর্ষণীয় ড্রেস অ্যাজ ইউ লাইক ইভেন্টের পুরস্কারের মধ্য দিয়ে পুরস্কার বিতরণী শুরু হতে যাচ্ছে। পুরস্কার দেবেন আজকের প্রধান অতিথি এবং গ্রুপ চেয়ারম্যান জনাব হোসেন আলী। এই ইভেন্টে তৃতীয় হয়েছেন গাঁয়ের বধূ ইসমত আরা খান। দ্বিতীয় হয়েছেন রাজাকার এহসানুল হক। তাঁরা পুরস্কার নিতে এগিয়ে আসছেন।

হোসেন আলী দাঁড়িয়ে আছেন প্রথম পুরস্কার সোনার মেডেল নিয়ে, বিজয়ীকে পরিয়ে দেবেন। তখনই ঘোষণা হলো, প্রথম পুরস্কার গোল্ড মেডেল পেয়েছেন অমিতাভ বচ্চন আবদুল খালেক থ্রি।

হোসেন আলী চিত্কার করে উঠলেন, ইজ দ্যাট ফান?

তিনি বাস্টার্ড এবং আরো কী সব গালাগাল দিয়ে মঞ্চ ত্যাগ করলেন।

এইচ আর ম্যানেজার তেড়ে এলেন, বললেন, স্টুপিড, চেয়ারম্যানের পাশের চেয়ারে বসলে?

আমাদের ডিএমডি পুরস্কার পর্বটি সামলে নিলেন। আমি দুটি স্বর্ণ ও একটি রৌপ্যপদক পেয়েছি। ড্রেস অ্যাজ ইউ লাইক-এর পুরস্কার স্থগিত রাখা হয়েছে। আমাকে যদি পুরস্কার দেওয়া না-ও হয়, তাহলে স্বর্ণপদক দিতে হয় রাজাকার আনসার আলীকে। পরদিনই অন্তত চারটি পত্রিকায় ছাপা হবে : এইচ এ গ্রুপ রাজাকারকে স্বর্ণপদক দিয়েছে, সেই সঙ্গে একাত্তরে হোসেন আলীর ভূমিকা নিয়ে দুটি খোঁচা মারবেই।

অনুষ্ঠানটি ভণ্ডুল হলো আমার কারণে।

হোসেন আলী চটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কর্মচারীরা ফিস ফিস করে বলতে থাকে : বেচারার চাকরিটা এমনিতেই অস্থায়ী।

আমি শামিয়ানা খুলতে ডেকরেটরের লোকদের সাহায্য করছি। এইচ আর ম্যানেজার সৈয়দ তোজাম্মেল আলী এসে খুব সহানুভূতির কণ্ঠেই বললেন, আসলে রসবোধটা খুবই ইম্পর্টেন্ট। তিনি এটিকে ফান হিসেবে নিতে পারতেন। যা-ই হোক, আবদুল খালেক, আমার কোনো উপায় নেই, আমাকে বলতেই হচ্ছে, কাল তোমার শেষ দিন। আমি সকালেই চিঠি রেডি করব। তুমি তোমার পাওনাটা নগদে নিয়ে নিয়ো।

খুবই কাতর হয়ে বলিস্যার, আমার বাবাকে সপ্তাহে দুদিন ডায়ালিসিস করাতে হয়। এটা বন্ধ করে দিলে চোখের সামনে ছটফট করতে করতে অসহায় বাপটা মারা যাবে।

তিনি বললেন, তোমার জন্য কী করা যায়, আমি অবশ্যই দেখব। তা ছাড়া চেয়ারম্যান স্যারের মনটাও তো নরম হয়ে যেতে পারে! তুমি তো আমাদের সঙ্গে প্রায় এক বছর, এটাও তোমার জানা যে আবদুল খালেক নামটাই চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে অ্যালার্জিক। অ্যাকাউন্ট্যান্ট আবদুল খালেক ওয়ান ব্যাংকের সঙ্গে যোগসাজশ করে এমডি ও চিফ অ্যাকাউন্টস অফিসার স্যারদের সই জাল করে ৮১ লাখ টাকা নিয়ে ভেগেছে। আবদুল খালেক টু, ড্রাইভার এখন জেলে। চেয়ারম্যান সাহেবের ছোট মেয়েকে অপহরণ ও যৌন নির্যাতন। সবাই জানে মেয়েটাই তাকে অপহরণ করতে বাধ্য করেছে। এসব হচ্ছে নিয়তি। আবদুল খালেক টু যদি মেয়ের কথায় রাজি না হতো, তাতেও চাকরি যেত। অবাধ্যতার অভিযোগে নয়। যৌন হয়রানির চেষ্টার অভিযোগে। তোমার ব্যাপারটাও নিয়তি।

পরদিন চাকরি থেকে আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হলো, চিঠি পেলাম, একুশ দিনের বেতন তুললাম, মাথা নিচু করে যখন বেরিয়ে যাচ্ছি, ড্রেস অ্যাজ ইউ লাইক ইভেন্টের গৃহবধূ ইসমত আরা খান ছুটে এসে বললেনভাই, এটা রাখুন, আমি আপনার বাবার কথা জানি। ৫০০ টাকার দুটি নোট।

তিনি বললেন, একজনকে দিয়ে আমার মোবাইল ফোনে আপনার পাঁচটি ছবি নিয়েছি। আমার হাজব্যান্ড অমিতাভ বচ্চনের এক নম্বর ফ্যান। কাল রাতে আপনার ছবি দেখে ও বলেছে, অমিতাভকে কোথায় পেলে?

কথা শুনে আমি হেসে উঠি এবং আপনার কথা বলি। আমার হাজব্যান্ড বলেছে আপনাকে একদিন বাসায় দাওয়াত করে খাওয়াতে, আপনার বিপদটা কেটে যাক, আমি আপনাকে অবশ্যই দাওয়াত করব; কিন্তু আপনাকে সেদিন অমিতাভ বচ্চন সেজে আমাদের বাসায় আসতে হবে।

আমি রাস্তায় নামি, চাকরি পেতেই হবে, অন্তত আমার বাবার চিকিৎসার টাকাটা আমাকে জোগাতে হবে। একদিন বায়তুল মোকাররম মসজিদে ঢুকে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ি, যেন আল্লাহ তাআলা হোসেন আলী সাহেবের দিলে রহম এনে দেন। তিনি যেন বুঝতে পারেন, আমার ওপর অবিচার করা হয়েছে।

চাকরি হারানোর পর ১৭তম দিনে ওয়াক-ইন ইন্টারভিউ দিতে ঢুকি একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কম্পানির ঢাকা ডিস্ট্রিক্ট অফিসে। কাজ হচ্ছে ওষুধের হিসাব রাখা, অন্য জেলার চাহিদাপত্র দেখে ভ্যানে ওষুধ তুলে দেওয়া, যেসব ব্যাচের ওষুধের এক্সপায়ারি ডেট কাছাকাছি এসে গেছে, সেগুলো আগে ছেড়ে দাওয়া। বেতন ও সুযোগ-সুবিধা এইচএ গ্রুপের চেয়ে কিছুটা বেশি। চাকরিতে যোগ দিতে হবে আরো এক মাস পর। পদটি প্রকৃত অর্থে শূন্য হওয়ার পর।

আমি ঠিক করি, এই কম্পানির বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দিন আমি আবার অমিতাভ বচ্চন সাজব। অন্তত একজন চেয়ারম্যানের হলেও তো রসবোধ থাকবে।

আমার যখন চাকরি চূড়ান্ত হতে যাচ্ছে, তখনই ফোনটা বাজে, দেখি এইচ আর ম্যানেজার সৈয়দ তোজাম্মেল আলী। আমি তো খুব ভালো করেই জানি, আমাকে চাকরি ফিরিয়ে দিতে ফোন করেননি, তা ছাড়া এখানে আমার বেতন বেশি, আমি দ্রুত সুইচ অফ করে দিলাম।

অন্তত এক ঘণ্টা পর আবার যখন সুইচ অন করি, প্রথম ফোনটাই সৈয়দ সাহেবের। তিনি চেয়ারম্যান সাহেবের পিএ ছিলেন ২৩ বছর। ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠও ছিলেন।

আমি বললাম, স্যরি স্যার, আপনার কলটা আসতে আসতেই চার্জ একেবারে নিল হয়ে গেল।

তিনি বললেন, নো প্রবলেম। তোমার সঙ্গে আমার একটু দেখা করা দরকার। কোথায় দেখা করি, বলো তো?

আমি বললাম, তাহলে স্যার আপনার বাসায় আসি? আমি চিনতে পারব, বাড়ির নম্বর আর রাস্তার নম্বরটা বলুন।

তিনি ধানমণ্ডি সাতাশের একটি রেস্তোরাঁর নাম নিয়ে বললেন, ৭টার দিকে ওটার সামনে থেকো।

আমি জি আচ্ছা বলি।

তিনি বললেন, আমার কাছে চাকরির চেয়েও বড় একটা কিছু আছে। এটা নিয়ে তোমার সঙ্গে আলাপ করব।

আধাঘণ্টা আগে থেকেই আমি সেখানে দাঁড়িয়ে। তিনি এলেন পৌনে এক ঘণ্টা পর। আমার পিঠে হাত দিয়ে বললেন, চলো ডিনার করি।

আমি বলি, এত দামি রেস্টুরেন্টে কোনো দিন ঢুকিনি।

তিনি বললেন, এখন থেকে ঢুকবে, ব্যবস্থা করে দেব। সে আলাপ করতেই এসেছি।

তিনি ওয়েটারকে খাবারের অর্ডার দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, চাকরির কোনো খোঁজ হয়েছে?

জি, স্যার, ওষুধ কম্পানিতে; এক মাস পর জয়েন করব।

ওখানে বেতন কেমন?

আগের চেয়ে এক হাজার ৪০০ টাকা বেশি। দুপুরে সামান্য টাকায় লাঞ্চ দেবে, অফিসের ভর্তুকিতে ক্যান্টিন চলে। চেয়ারম্যান এলে ওখানেই খান, এমডি সাহেব প্রতিদিনই। সবার জন্য এক খাবার।

তিনি বললেন, সমাজতন্ত্র দেখছি। চেয়ারম্যান আর চাপরাশি একই খাবারবেশ। আবদুল খালেক, তোমার জন্য এমন একটি প্রস্তাব দেওয়ার কথাই ভাবছিলাম।

আমি বললামস্যার, আমি ওষুধ কম্পানির চাকরির অফারে সই করে এসেছি, আর ফিরতে চাই না।

তিনি বললেন, তোমাকে ফিরতে কে বলেছে? বিয়েশাদি করবে না, আমি একটা বিয়ের প্রস্তাব দিতে চাচ্ছিলাম। মেয়েটা দারুণ সুন্দর। একবার দেখলে চোখ ফেরাতে পারবে না।

আমি বললাম, সুন্দর বউ নিয়ে বসবাস করার জন্য যে যোগ্যতা লাগে, আমার তা নেই, তা ছাড়া বাবার ডায়ালিসিসের টাকা।

তিনি তাঁর হাতের নোট বইয়ের পাতার ভেতর থেকে পোস্ট-কার্ড সাইজের দুটি ছবি বের করে বললেন, দেখো আমি ভুল বলেছি কি নাবাস্তবে আরো সুন্দর।

আমার সামনে ছবি দুটি বিছিয়ে দেন। আমি থ হয়ে তাকিয়ে থাকিমেয়ে মানুষ এত সুন্দর হয়!

তুমি বস্তির কথা বলছ কেন, লাবণ্যর তো নিজের নামেই ফ্ল্যাট, সাড়ে ১১০০ না ১২০০ বর্গফুট, কেনার সময় আমিই দরদাম ঠিক করে দিয়েছিলাম। কাজেই বাড়িভাড়া লাগছে না।

তিনি কি আপনার কোনো আত্মীয়?

সরাসরি আত্মীয় নয়, অভিভাবক বলতে পারো।

কিন্তু তিনি কোন দুঃখে আমাকে বিয়ে করবেন?

লাবণ্য তোমাকে বিয়ে করার কথা বলেনি, তোমাকে চেনেও না। আমারই মনে হয়েছে, মেয়েটা তোমাকে পছন্দ করবে। আমি গত সপ্তাহে গিয়েছিলাম। দেখি তার ঘরের দেয়ালে অমিতাভ বচ্চনের দুটি ছবিএকটা একেবারে ম্যানসাইজ। তখনই তোমার কথা মনে হলো।

পরক্ষণেই তিনি আমার বাবার কথা জিজ্ঞেস করলেন, একবার ইন্ডিয়ান হাসপাতালে দেখিয়ে আনবে নাকি?

আমি বললামস্যার, আপনি পাগল হয়েছেন, আমি ডায়ালিসিসের টাকা জোগাতে পারি না, আমি বাবাকে ইন্ডিয়া নিয়ে যাব? অবস্থা খারাপের দিকেই যাচ্ছে। বাবা আর বেশিদিন টিকে থাকবেন বলে আমার মনে হয় না।

তিনি বললেন, নাউজুবিল্লাহ। ধরো তোমার হাতে যদি লাখ পাঁচেক টাকা থাকে, তুমি কি বাবার চিকিৎসার টাকার টেনশন থেকে মুক্ত হতে না?

আড়াই লাখ টাকা থাকলেই টেনশন থাকত না।

তিনি বললেন, বেশ তাহলে ধরে নাও তোমাকে পাঁচ লাখ টাকা দিলাম। ক্যাশ চাইলে ক্যাশ, তোমার অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার চাইলে তা-ই করা হবে, কালই।

আমি বললাম, স্যার একসময় লাখ টাকার স্বপ্ন দেখতাম। পরক্ষণেই মনে হয়, আমাকে দিয়ে খুনখারাবি করার প্ল্যান করছেন না তো!

টাকাটা তুমি এমনিই পাচ্ছ না। লাবণ্যকে বিয়ে করলে পাচ্ছ। মেয়েটির একটা খুঁত আছে, সে জন্যই বলতে পারো টাকাটা হচ্ছে কম্পেনসেশন।

আমি ফিক করে হেসে উঠি।

তিনি বলেন, হাসছ যে, এটা ঠাট্টা-মসকরা নয়। এই পাঁচ লাখ তোমার বাবার জন্য। তোমার জন্য আরো পাঁচ!

প্লেটের খাবার চামচ দিয়ে এপাশ থেকে ওপাশে নিচ্ছি। আমি বললামস্যার, আমি গরিব, সে জন্য ঠাট্টা করছেন?

শোনো, আবদুল খালেক থ্রি; তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা মসকরার নয়। তুমি দেখতে অমিতাভ বচ্চনের মতো এবং লাবণ্যের ঘরে অমিতাভের ছবি দেখেছিই বলে তোমার কথা ভেবেছি। নতুবা কোন যোগ্যতায় তুমি?

তিনি যে ক্ষুব্ধ, এটা স্পষ্ট। তবুও বললেন, কালকের দিনটা ভাবো, সন্ধ্যায় ঠিক ৭টায় আমি এখানেই আসব, তুমিও এসো। হ্যাঁ বা না কালই ফাইনাল করতে হবে। আমিও বিকল্প পাত্রের কথা ভাবতে থাকি।

তারপর আমরা বেরিয়ে গেলাম।

আমি লাবণ্যর কথা, তার সৌন্দর্যের কথা, তার খুঁতের কথা একবারও ভাবিনি, ভেবেছি পাঁচ পাঁচ ১০ লাখ টাকার কথা। আমার বাবার কথা।

পরদিন সাড়ে ১২টায় সৈয়দ তোজাম্মেল আলী স্যার আবার ফোন করলেন। বললেন, এখনই গিয়ে তোমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স চেক করো। তোমার অ্যাকাউন্ট ডিটেইলস তো আমাদের কাছে ছিলই। তারপর ফোন কেটে দিলেন।

আমি গনগনে রোদের শহরে আধাঘণ্টা হেঁটে ব্যাংকে গেলাম এবং আইটি সেকশনের অপারেটর বলল, হোসেন আলী সাহেবের অ্যাকাউন্ট থেকে দুটি অ্যাডভাইসে আমার অ্যাকাউন্টে পাঁচ পাঁচ ১০ লাখ টাকা এসেছে।

আমি অনেকক্ষণ থ হয়ে থেকে সৈয়দ তোজাম্মেল আলী স্যারকে ফোন করে বলিস্যার, একি!

তিনি বললেন, স্যরি ইয়ংম্যান, ভেরি বিজি, সন্ধ্যায় দেখা হচ্ছে, সেভেন পিএম শার্প।

এবার আমার দেরি হলো, পৌঁছতে সাড়ে ৭টা। তিনি রেগে যাননি, শুধু এটুকুই বললেন, লাবণ্যকে বিয়ে করার আগেই তুমি আমাকে আধাঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখলে!

তিনি খাবারের অর্ডার দিলেন। ঠিক করলাম আজ খাবোই।

তিনি বললেন, লাবণ্যর খুঁতটা বলি। তোমার যদি মনে হয় তুমি লাবণ্যকে রিজেক্ট করবে, করো। তাহলে কাল সকালে তোমার ব্যাংককে অ্যাডভাইস করে দাও, টাকাটা যেখান থেকে এসেছে সেই অ্যাকাউন্টে ফিরিয়ে দিক।

ইম্পসিবল আবদুল খালেক। এটা তোমার বাবার জীবন-মরণের প্রশ্ন। যত খুঁতই থাক, এমনকি যদি কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত প্যারালাইজড হয়ে থাকে, তবু।

স্যার এক চামচ স্যুপ মুখে দিয়ে বললেন, খুঁতটা শোনো, লাবণ্য প্রেগন্যান্ট, ছয় মাসের বেশি হয়ে গেছে। অ্যাবরশন করা যাবে না। যখন দেড়-দুই মাস ছিল, তখনো লাবণ্য রাজি হয়নি। এই বাচ্চা তার চাই-ই।

আমি জিজ্ঞেস করি, কে প্রেগন্যান্ট করেছে?

তিনি বললেন, যার অ্যাকাউন্ট থেকে তোমার অ্যাকাউন্টে টাকা গেছে?

আমি চাই না তুমি স্যারের নাম উচ্চারণ করো। লাবণ্য ফ্ল্যাট তো আগেই পেয়েছে। আর কখনো যোগাযোগ করবে না এই শর্তে ১০ লাখে রাজি হয়েছে। আজ তাকেও টাকা ট্রান্সফার করা হয়েছে। আমি লাবণ্যকে তোমার কথা বলেছি। সে রাজি। বরং সে বলেছে, তাহলে অমিতাভ বচ্চন আমাকে কেন বিয়ে করবে?

বিড়বিড় করে বললামস্যার, আমি রাজি। টাকার জন্য।

দুই

আমাদের বিয়ের প্রথম বার্ষিকীতে লাবণ্য বলল, আবদুল খালেক তোমার নামটা বড্ড গেঁয়ো। পাল্টানো যায় না?

আরো বলল, তুমি একটা আহাম্মক। মাত্র ১০ লাখ টাকায় রাজি হয়ে গেলে?

আমি বললামলাবণ্য, আমি পাঁচেই রাজি হতাম। অবশ্য আগে তোমাকে দেখলে এক টাকাও চাইতাম না।

তুমি কি জানো আনুষঙ্গিক খরচ মেটানোর জন্য সৈয়দ তোজাম্মেল চেয়ারম্যানের কাছ থেকে নিয়েছেন ১০ লাখ।

আমি আমার আত্মীয় ও পরিচিতজনকে বলি, আসলে গোপনে গোপনে বিয়েটা আগেই করেছি। লাবণ্য প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর তো আর ব্যাপারটা গোপন রাখার উপায় ছিল না।

লাবণ্য বাবুটার নাম রেখেছে অমিতাভ খালেক।

বাবুটা সারা দিনই বাবা বাবা করতে থাকে। আমার কোলে আসতে অস্থির হয়ে যায়।

তত দিনে আমার বাবার শান্তিপূর্ণ মৃত্যু হয়েছে।

বাবুটা ঘুমিয়ে পড়েছে। লাবণ্য, আমার চোখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী নির্বসন হয়ে বলে, চলো আর একটা বাবু বানাই।

আমি বলি, অনেক খরচ। আগে কামাই-রোজগার বাড়ুক। তারপর।

লাবণ্য বলে, টাকার জন্য ভেবো না। অমিতাভ খালেকের পিতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মামলা করব। হোসেন আলীর সম্পত্তির পুরো হিসসা আমি ছেলের জন্য চাই। অস্বীকার করবে? ডিএনএ টেস্ট করার দাবি জানাব। হোসেন আলীর দুই মেয়ে। মনে রেখো, এইচএ গ্রুপের অর্ধেক সম্পত্তির মালিক আমার অমিতাভ। অমিতাভ হোসেন আলীর ছেলে।

আমি বললাম, ইম্পসিবল। অমিতাভ খালেক আবদুল খালেক থ্রির সন্তান।

লাবণ্য বলল, আবদুল খালেকগিরি ছাড়ো তো। আমাদের বাবুদের জন্যও তো টাকা লাগবে।

শিলালিপি- এর আরো খবর