English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

ধারাবাহিক উপন্যাস

বিষণ্ণ শহরের গল্প

সেলিনা হোসেন

  • ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

অঙ্কন : বিপ্লব

সকাল দশটায় পিলখানার গেটে এসে দাঁড়ায় তিনজন। গেটের পাহারায় আছে কয়েকজন সেপাই। একজন চিত্কার করে বলে, আপনারা কেন এসেছেন? কী দরকার এখানে? আপনাদের সাহস তো কম না?

আরমান হক টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে বলে, আমার ছেলে কেমন আছে তা জানতে এসেছি।

খবরদার! এসব কথা বলবেন না। যান এখান থেকে, সরে যান।

পেছন থেকে একজন বলে, সরে যাব কেন? আমি আমার ভাইয়ের খোঁজ নিতে এসেছি।

আলপনাও চেঁচিয়ে বলে, আমিও আমার ভাইয়ের খোঁজ নিতে এসেছি।

এখন খোঁজ নেওয়া যাবে না। সরে যান এখান থেকে।

যতক্ষণ খোঁজ পাব না, ততক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে থাকব আমরা।

আপনাদের ঢোকার পারমিশন আছে?

আরমান হক দ্রুত কণ্ঠে বলে, কার কাছ থেকে পারমিশন নিতে হবে? বলেন, আমি তার কাছে গিয়ে পারমিশন আনি।

এত কথা বলবেন না। ওই দিকে সরে দাঁড়ান।

আমরা সরব না। আমাদের ঢুকতে দেন। পেছনের ছেলেটা চিত্কার করে বলে।

ওই যে দেখেন একটি গণকরব খোঁড়া হচ্ছে। লাশ ওঠানো হচ্ছে।

ওহ! আল্লাহরেচিত্কার করে কেঁদে ওঠে আরমান হক। মহুয়া শক্ত করে চেপে ধরে আলপনার হাত। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে গেছে। কোনো শব্দও বের হয় না। আলপনার কাছ থেকে ফোঁস ফোঁস শব্দ ভেসে আসছে।

পেছন থেকে অন্য আরেকজন অনুনয়ের স্বরে বলে, আমাদের যেতে দেন।

দুজন সেপাই পেছন থেকে দাঁড়িয়ে বলে, যান, আপনারা যান।

গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সাত-আটজন হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে। সবার শেষে আরমান হক মহুয়া আর আলপনাকে নিয়ে ঢোকে। মাঠের মাঝখানের গণকবরটি খোঁড়া হচ্ছে। ওদিকে না তাকিয়ে মহুয়া বলে, আমরা আগে অমিয়র মেসের ঘরটি দেখে আসি।

হ্যাঁ, তাই চলো।

তিনজনে মেসের দোতলায় ওঠে। আরমান হকের মনে হয় প্রতিটি সিঁড়ির ধাপ একেকটি পাহাড়। একটি পাহাড় থেকে আরেকটি পাহাড়ে পা ওঠানো কঠিন। পা যে নড়ে না। আলপনা তার অবস্থা বুঝে বলে, বাবা, তোমার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। তুমি নিচে থাকো। আমি আর মহুয়া আপু ঘরটা দেখে আসি। গিয়ে যদি দেখি ভাইয়া ঘরে লুকিয়ে আছে, তাহলে হাত ধরে টানতে টানতে তোমার কাছে নিয়ে আসব বাবা।

ঠিক আছে, তোমরা যাও মায়েরা। আমার সাধ্য নেই ওপরে ওঠার।

আরমান হক যে দু-তিন সিঁড়ি উঠেছিল, সেখানে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে পড়ে। রেলিংয়ের ওপর শরীরের ভার ছেড়ে দেয়, যেন সোজা হয়ে দাঁড়ানোর সাধ্য নেই। আরমান হক রেলিংয়ে মাথা ঠেকিয়ে বিপন্ন বোধ করে। ভাবতে পারে না যে কিভাবে নিজেকে টেনে নিয়ে যাবে অমিয়র কাছে। শুনতে পায় দোতলায় দুই মেয়ের পায়ের শব্দ। কথাও ভেসে আসছে। আলপনা বলছে, বাহ! ভাইয়ার টেবিলে দেখছি তোমার ছবিতে সাজানো একটি এলবাম। এটা বাড়িতে দেখিনি।

কবে ও এই এলবাম সাজিয়েছে আমি নিজেও জানি না।

তাহলে বোঝো তোমাকে কত ভালোবাসে ভাইয়া। আমি কি তোমাকে হিংসা করব, আপু?

হ্যাঁ, করো। হিংসা করলে আমার ভালো লাগবে। মনে করব প্রেমের খেলায় আমি চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।

কংগ্রাচুলেশনস বিজয়ী আপুকে।

আমাদের ঘর দেখা হয়েছে। অমিয়র কাপড়চোপড়, বিছানা, টেবিলে রাখা নানা কিছু তো দেখলাম। যার জন্য এখানে এসেছি, শুধু তাকে দেখা হলো না।

বিদ্রোহীরা তাকে বন্দি করে রাখতে পারে কিংবা ভাইয়া লুকিয়ে কোথাও চলে যেতে পারেএমন অনেক কিছুই হতে পারে। চলো নিচে যাই।

শুধু একটা কথা বললে না।

কোন কথা, আপু?

গণকবরে খুঁজব না?

আলপনা দুহাতে মুখ ঢাকে। কথা বলে না। দুজনে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। আলপনা দ্রুত নেমে বাবার পাশে দাঁড়ায়।

বাবা, ভাইয়ার শূন্যঘরে তার ব্যবহারের জিনিসপত্র আছে। আর কিছু নেই। পুরো দোতলাই শূন্য বাবা। প্রতিটি ঘরই কারো ছেড়ে যাওয়ার চিহ্ন নিয়ে অপেক্ষায় আছে।

পেছন থেকে মহুয়া ওর ঘাড়ে চাপ দেয়। আলপনা বুঝতে পারে, মহুয়া ওকে এসব কথা বলতে নিষেধ করছে।

ওপরে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আমিও বুঝতে পেরেছি যে কেউ নেই। থাকার কথাও না মায়েরা। তবু তোমরা অমিয়র ঘর দেখে এসেছ, এতেই আমি খুশি। তোমরা কি দরজা বন্ধ করে এসেছ?

না বাবা, বন্ধ করিনি। ঘরটা খোলা ছিল দেখে খোলাই রেখে এসেছি। জানালাও খোলা। বাতাসে ভরে আছে ঘর।

চলো আমরা মাঠে যাই।

তিনজনে সিঁড়ি দিয়ে নেমে সামনে দাঁড়ায়। আরমান হক মহুয়ার দিকে তাকায়। বলে, আমরা অমিয়কে আগে কোথায় খুঁজব মাগো?

মাঠের মাঝখানে ওই গণকবরের কাছে যাই।

আগেই ওখানে যাব?

আমরা তো জানি না কার কাছ থেকে অমিয়র খবর পাব। ওখানে দেখে আমরা বিভিন্ন সিপাইয়ের কাছে জিজ্ঞেস করব অমিয়র খবর।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। চলো কবরের কাছে যাই।

তিনজনে হাঁটতে শুরু করে। তিনজনের কেউ-ই মনে করতে পারে না যে তাদের পায়ে দ্রুত হেঁটে যাওয়ার শক্তি আছে কি না। আরমান হক আলপনার হাত ধরে হাঁটে। বুঝতে পারে শক্তি শরীরে আছে, কিন্তু ক্ষয় গেছে মন। মানসিক শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেছে।

কবরের কাছে গিয়ে তিনজনই দাঁড়িয়ে থাকে। একটি একটি করে লাশ ওঠানো হচ্ছে। বিডিআরের মহাপরিচালকের লাশ ওঠানো হলে মৃদু গুঞ্জন হয়। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই শব্দ করে কেঁদে ওঠে। নানা কথা হয়। ওরা কেউ-ই তেমন কিছু বুঝতে পারে না। সাতটি লাশ ওঠানো হয়। কোনোটিই অমিয়র লাশ নয়। তিনজনে পরস্পরের দিকে তাকায়। মহুয়া একবার ভেবেছিল, প্রিন্টের হাফ শার্ট পরা লাশটি অমিয়র কি না? মুখ দেখে চেনা যাচ্ছিল না বিকৃত হয়ে যাওয়ার কারণে। কিন্তু আরমান হক, আলপনা কোনো লাশ শনাক্ত না করার কারণে ও আর কথা বাড়ায়নি। ভেবেছে, অমিয় ওদের কাছের মানুষ। ওরা ওকে অনেক বেশি চেনে। পরক্ষণে বুঝতে পারে, এতগুলো লাশের সামনে দাঁড়িয়ে বুকের ভেতর কোনো সাড়াশব্দ নেই।

দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন জায়গায় গণকবর খুঁজে পেয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একের পর এক লাশ বের করা হচ্ছে। চলো আমরা অন্যদিকে যাই।

-তুমি হাঁটতে পারবে, বাবা?

পারব মা। ছেলেকে তো পেতেই হবে জীবিত অথবা মৃত।

দুহাতে চোখ মোছে আরমান হক। আবার বলে, এমন একটা ঘটনা দেখা আমার কপালে ছিল! আল্লাহ! এমন কপাল নিয়ে কেন জন্ম হলো আমার। ও আল্লাহ, ও আল্লাহ আমার মরণ দাও।

আরমান হক দুহাতে মাথা চাপড়ায়।

আব্বা, আপনি শান্ত হন।

মহুয়ার শীতল কণ্ঠস্বরে আরমান হক ঘুরে দাঁড়ায়।

মাগো, আমার জীবনে শান্ত হওয়ার সময় শেষ। মাগো...

আব্বা, চলেন ওই গাছের নিচে দাঁড়াবেন। দুপুরে রোদ চড়া হয়ে উঠেছে।

রোদ? রোদ কোথায়? আমি তো চারদিকে আন্ধার দেখি। আমি তো রোদ দেখি না মাগো।

বাবা, তুমি কি পানি খাবে?

না, দরকার নেই। চলো ওই গণকবরের কাছে যাই। ওই দেখো আর একটি কবর খোঁড়া হচ্ছে। তিনজনে দ্রুতপায়ে হেঁটে যায়। আলপনা আর মহুয়া দেখতে পায় ওদের বাবার পায়ে শক্তি ফিরে এসেছে। এতক্ষণ মানুষটি যেসব কথা বলেছে, তার কোনো কিছুই তার মাথায় নেই। তার ছেলেকে যে পেতেই হবে। এক দৌড়ে গণকবরের কাছে পৌঁছে যাওয়া তার লক্ষ্য। শুধু দৌড় দেওয়ার মতো পায়ের গতি হারিয়েছে কোথাও। তারপর তিনজনে পৌঁছে যায় গণকবরের কাছে। প্রতিটি লাশ পরখ করে ওরা। পাশাপাশি রাখা হয়েছে। কিন্তু না, অমিয় নেই। তিনজনে খুঁটিয়ে দেখে সব লাশ। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ঘাসের ওপর রেখে দেওয়া মৃত মানুষগুলো ওদের সামনে ভিন্ন দৃশ্য, যে দৃশ্য সহজে দেখার কথা নয়। এমন দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে স্মৃতি হয়ে থাকা অমিয়কে ওরা আর দেখতে পায় না। অমিয় চেনাজানা ভুবন থেকে হারিয়ে গেছে। কোথায় খুঁজবে আর!

সেপাইদের কেউ কেউ বলতে শুরু করে, আর একটু পরই প্রধানমন্ত্রী রেডিও-টেলিভিশনে ভাষণ দেবেন। তিনজনে দাঁড়িয়ে শোনে বিদ্রোহীদের নানা কথা।

আমাদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

অনেকে হত্যাকাণ্ড শুরুর পরপর পালিয়ে গেছে।

ওরা যেখানে-সেখানে অস্ত্র ফেলে রেখে চলে গেছে।

ভয়ই যদি পাবি শালারা, তাহলে বিদ্রোহী হবি কেন?

আহ! চুপ করো।

আমাদের অনেকে গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে অস্ত্র সমর্পণ করেছে।

এসব কথা এখন বলার দরকার কী?

কোনো দরকার নেই। প্রধানমন্ত্রী কী বলেন, তা শুনতে হবে।

নতুন কথা আর কি-ই বা বলার আছে।

ডিএডি তৌহিদ নিজেকে মহাপরিচালক ঘোষণা দিয়েছে।

দিলেই হলো নাকি, একদম বাখোয়াজি।

আহ, থামো সবাই।

কেন থামব, আমরা কি কাউকে ভয় পাই?

ওই যে গাছের নিচে তিনজন দাঁড়িয়ে আছে, চলো জিজ্ঞেস করি ওরা কাকে খুঁজছে।

আমাদের দরকার কী?

না, কোনো দরকার নেই। জিজ্ঞেস করতে হবে না।

চলো চলো, রেডিওতে ভাষণ শুরু হয়েছে। মাশরুরের কাছে ট্রানজিস্টার আছে।

যেতে যেতে ওরা শুনতে পায় প্রধানমন্ত্রী বলছেন, বিদ্রোহীদের অস্ত্র সমর্পণ করে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে।

দাঁড়িয়ে পড়ে ওরা কয়েকজন। পরস্পরের হাত মুঠি করে ধরে। চারদিকে তাকায়। বিকেল তিনটার মতো বাজে।

অস্ত্র সমর্পণ তো করতেই হবে।

বিদ্রোহ আর কয় দিন চলবে।

কখন অস্ত্র সমর্পণ শুরু হবে, সবাই চলো তা জেনে আসি।

ওরা দল বেঁধে চলে যায়। এতক্ষণ তিনজন ওদের কথা শুনছিল। আরমান হক বলে, হ্যাঁ, অস্ত্র জমা দিতে হবে। ব্যারাকে ফিরতে হবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

শুধু আমাদের দিনগুলো এক রকম থাকবে না বাবা।

হ্যাঁ, তা থাকবে না।

এখন আমরা কী করব? চলে যাব, নাকি বসে থাকব?

আরো কিছুক্ষণ থাকব, মা। অমিয়কে খোঁজা তো আমাদের শেষ হয়নি।

পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন সেপাই বলে, আপনারা কাকে খুঁজছেন?

আমার ছেলেকে।

নাম কী আপনার ছেলের?

মেজর অমিউল হক।

চোখ বড় করে সেপাই।

অমিউল হক?

তুমি চেন ওকে?

হ্যাঁ, চিনি। ভালো করে চিনি।

ওকে তো কোথাও পেলাম না।

লাশ তো শুধু গণকবরে আছে, তা নয়। ড্রেনে, ম্যানহোলে সবখানে আছে।

কী বললেন? চিত্কার করে ওঠে আরমান হক। কেঁদে ওঠে আলপনা, মহুয়া।

আস্তে, থামেন আপনারা। ওই দিকে যান। দেখবেন ড্রেন পাবেন।

কথা শেষ করে সেপাইটি অন্যদিকে চলে যায়। তিনজন মানুষ দুহাতে চোখ মুছে দেখিয়ে দেওয়া পথে পা বাড়ায়। দেখছে গণকবরের কাছে লাশ শনাক্তকরণ চলছে। যারা শনাক্ত করতে পারছে তারা বসে পড়ছে লাশের পাশে। ধপ করে বসে পড়ে আরমান হক। দুজন মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আমরা অমিয়কে ড্রেনে খুঁজতে যাব?

বাবা, আমাদের সব কিছুই করতে হবে। এই জন্যই তো আমরা পিলখানায় ঢুকেছি। এটা এখন একটা বধ্যভূমি।

থাক মা, এভাবে বলো না।

লাশ ম্যানহোল আর ড্রেনে যাবে কেন বাবা?

এ প্রশ্নের উত্তর নেই আরমান হকের কাছে। তিনজনে ড্রেনের কাছে আসে। অনেকে ভিড় করেছে সেখানে। তারাও খুঁজছে আপনজনকে। তিনজনকে দেখে একজন সেপাই ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, আপনারা কাকে খুঁজছেন?

আমার ছেলেকে।

আপনি? আপনি কাকে খুঁজছেন?

আমার ভাইকে।

আপনি?

মহুয়া উত্তর দেয় না। অন্যদিকে তাকায়।

আপনার কেউ না হলে আপনি কেন এসেছেন?

আলপনা খেঁকিয়ে বলে, আপনি এত জেরা করছেন কেন? আপনি এত কঠিন স্বরে কথা বলছেন কেন? উনি আমার ভাইয়ের আজীবনের সঙ্গী।

নাম কি আপনার ভাইয়ের?

অমিউল হক। মেজর অমিউল হক।

ওহ, উনি তো গোয়েন্দা বিভাগে ছিলেন। সকালে ওনাকে মেরে আগুনে ফেলা হয়। তারপর ওই ড্রেনে।

কী বললেন?

চিত্কার করে উঠে পড়ে যায় আরমান হক।

বাবা, বাবা...।

আলপনা দেখতে পায়, বাবা জ্ঞান হারিয়েছেন। মাথাটা কোলের ওপর উঠিয়ে নিয়ে ও মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে। বাবা, বাবা...। সাড়া নেই আরমান হকের। ও বুঝতে পারে, বাবা জ্ঞান হারিয়েছেন। কাঁদতে শুরু করে আলপনা।

আব্বার মুখে পানি দিতে হবে। আমি যাই, দেখি পানি কোথায় পাওয়া যাবে।

মহুয়া এদিক-ওদিক তাকিয়ে অমিয়র মেসের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করে। ওখানে বোতলে পানি দেখে এসেছে। কিন্তু বেশিদূর যাওয়া হয় না ওর। ড্রেনের কাছ থেকে কেউ একজন চেঁচিয়ে বলছে, এই যে মেজর অমিউল হকের লাশ পাওয়া গেছে। আসেন, দেখেন।

অমিয় অমিয় বলতে বলতে ড্রেনের দিকে ছুটে যায় মহুয়া। পুড়ে যাওয়া অমিয়কে দেখে চিনতে কষ্ট হয় না ওর। পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া শরীরের নানা দিক নানা মাত্রায় রয়েছে। অমিয় পড়ে আছে ড্রেনে। ড্রেনের পানিতে ভিজে আছে শরীর। পুড়ে যাওয়া শরীর দগদগে হয়ে যায়।

চিত্কার করে কাঁদতে কাঁদতে মহুয়া দৌড়ে আসে আলপনার কাছে।

বাসররাত, বাসররাত, আমার বাসররাত ড্রেনে পড়ে আছে।

মহুয়া আপু? কী বলছ?

আমি দেখে এসেছি। অমিয়কে দেখে এসেছি। ও বাসরঘরে ঘুমিয়ে আছে। ওর পুরো শরীরে কালো ছায়া...

বলতে বলতে ঘাসের ওপর গড়িয়ে পড়ে মহুয়া। জ্ঞান হারায়।

দুজন মানুষের ওপর দুহাত রেখে মাঝখানে বসে থাকে আলপনা। মৃদুস্বরে বলে, তোমরা জেগে ওঠো। আমরা পুড়ে যাওয়া ভাইয়াকে নিয়ে মায়ের কাছে যাব। মাকে বলব, তোমার ছেলেকে এনেছি। বুকে নাও, মা।

শোনা যায় শহরের কণ্ঠস্বর, তুমি ঠিকই বলেছ। মায়ের এখন ছেলেকে বুকে নেওয়ার সময়। বুকে নিয়ে শেষ ঘুমে ঘুমিয়ে যাওয়া ছেলেকে বলবে, ঘুমপাড়ানি গান গাওয়ার দিন শেষ আমার।

চোখ খুলে তাকায় আরমান হক। আলপনাকে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে।

বাবা, বাবা...

মাগো, মহুয়ার কী হয়েছে?

আমরা ভাইয়াকে নিয়ে বাড়ি যাব।

আল্লাহ আমাকে শক্তি দাও, শক্তি দাও।

ভেসে আসে শহরের কণ্ঠস্বরস্যার, চলুন। আপনাদের সঙ্গে আমিও আছি।

আরমান হক চারদিকে তাকায়। মনে হয়, কোথাও আলো নেই। অন্ধকারে ছেয়ে আছে পিলখানা। প্রবল এক বধ্যভূমিতে হেঁটে যাওয়া মানুষ হয়ে আরমান হক আলপনার হাত ধরে। তখন মহুয়াও উঠে বসে।

তিনজন উঠে দাঁড়ালে আরমান হক নিজেকে বলে, শহরের কণ্ঠস্বর আমার শরীরে এখন বুড়িগঙ্গা নদী। শহরের বিষণ্নতায় মরা গাঙের ঢেউ। তোমরা আমার হাত ধরো, মায়েরা। [সমাপ্ত]

শিলালিপি- এর আরো খবর