English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

‘ইয়াবা পুলিশ’ চিহ্নিত করতে পারছে না সিএমপি

  • এস এম রানা, চট্টগ্রাম   
  • ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

ইয়াবা কারবারে জড়িত ইয়াবা পুলিশ চিহ্নিত করতে পারছে না চট্টগ্রাম নগর পুলিশ (সিএমপি)। ফলে হরহামেশা ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। এতে পুলিশের দুর্নাম বাড়ছে।

পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আন্তনজরদারির অভাবেই এমনটা হচ্ছে বলে মনে করছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আন্তনজরদারিত্ব কম বা নেই বললেই চলে। এ কারণে বাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই মাদক পাচারসহ নানা ধরনের অপরাধে জড়ালেও আগাম তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।

তবে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নজরদারি না থাকার বিষয়টি নাকচ করেছেন সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সিএমপির সাত হাজার সদস্যের ওপর অবশ্যই আন্তনজরদারি আছে। নজরদারি আছে বলেই পুলিশ সদস্যরা মাদকসহ গ্রেপ্তার হচ্ছে।

কমিশনার নজরদারির সুফল হিসেবে পুলিশ সদস্যরা গ্রেপ্তারের দাবি করলেও বলা যায় তা প্রকৃতপক্ষে র্যাব-৭ এর গোয়েন্দাগিরির সুফল। কারণ, সর্বশেষ যে দুই মামলায় সিএমপির দুজন উপ-পরিদর্শক ফেঁসেছেন, সেই মামলা দুটি দায়ের করেছে র্যাব।

দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দেশের সব পুলিশ ইউনিটে চিঠি দেন পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি। ওই চিঠিতে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের কারো বিরুদ্ধে ইয়াবাসহ মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আছে কি না, সেই তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছিল। চিঠির জবাবে সিএমপি সদর দপ্তরকে জানিয়েছিল, সিএমপির সদস্যের বিরুদ্ধে ইয়াবা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ নেই।

পুলিশ সদর দপ্তরে এমন প্রতিবেদন পাঠানোর পর ৩০ জুলাই রাতে র্যাব-৭ বাকলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক খন্দকার সাইফুদ্দিনের ভাড়া করা বাসায় অভিযান চালিয়ে ১৫ হাজার ইয়াবা জব্দ করে। শুধু ইয়াবা পাচারের জন্যই তিনি হাফেজনগর এলাকায় বাসাটি ভাড়া করেছিলেন বলে জানান র্যাব-৭ এর সিনিয়র পরিচালক মিমতানুর রহমান। কিন্তু নগর পুলিশ সাইফুদ্দিনের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে আগাম কিছুই জানতে পারেনি। ওই অভিযানের পর সাইফুদ্দিন আত্মগোপনে চলে যান।

সাইফুদ্দিন কাণ্ডের পর ১ সেপ্টেম্বর ইয়াবা পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন নগর পুলিশের আরেক উপ-পরিদর্শক মো. বদরুদ্দৌজা মাহমুদ। আগের রাতে ঢাকার বাসায় আসবাবপত্র পাঠানোর নামে ইয়াবা পাচার করছিলেন তিনি। তাঁর পাচার করা ইয়াবাগুলো র্যাব জব্দ করে মিরসরাই থানার নিজামপুর এলাকায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ঢাকাগামী মিনি ট্রাকের (ঢাকামেট্রো-ন ১৪-১৮২৯) থাকা আসবাবপত্র তল্লাশি করে র্যাব। সেখানে ২৯ হাজার ২৮৫টি ইয়াবা ছিল।

ওই মিনি ট্রাকের চালক-হেলপারের দেওয়া তথ্যে র্যাব জানতে পারে, আসবাবপত্র সিএমপির উপ-পরিদর্শক বদরুদ্দৌজার। তিনি চট্টগ্রামের খুলশী থানার লালখানবাজার থেকে আসবাবপত্র ঢাকার মোহাম্মদপুরে পৌঁছানোর জন্য মিনি ট্রাকে তুলে দিয়েছিলেন। এই তথ্যের সূত্র ধরে রাতেই র্যাব কর্মকর্তারা নগর পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরক্ষণে খুলশী থানা পুলিশ বদরুদ্দৌজাকে খুলশী থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। শেষে মিরসরাই থানা পুলিশ বদরুদ্দৌজাকে র্যাবের দায়ের করা মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার করে।

এর মধ্য দিয়ে ৩২ দিনের ব্যবধানে নগর পুলিশের দুই কর্মকর্তা ইয়াবা মামলায় আসামি হন। যদিও মধ্য জুলাইয়ে ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদন দিয়ে নগর পুলিশ জানিয়েছিল, সিএমপির পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো ইয়াবা সংশ্লিষ্টতা নেই।

অবশ্যই উল্লিখিত সময়ের মধ্যে সিএমপি ছাড়াও অন্য ইউনিটের পুলিশ সদস্যারাও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন। ১৭ আগস্ট জোরারগঞ্জ থানার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অভিযান চালিয়ে ৩২ হাজার ইয়াবাসহ সহকারী উপ-পরিদর্শক আবুল বাশারকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। বাশার এর আগেও বিজিবির হাতে মাদকসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পুলিশে কর্মরত এই কর্মকর্তা দ্বিতীয় দফা গ্রেপ্তার হন মিরসরাইয়ে। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনে ক্লোজড অবস্থায় ছিলেন।

আবার সিএমপি ঢাকায় প্রতিবেদন পাঠানোর আগে ১৩ জুলাই নগর গোয়েন্দা পুলিশ চান্দগাঁও থানার বহদ্দারহাট এলাকা থেকে এক হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করে সহকারী উপ-পরিদর্শক রিদুয়ানকে। তিনি ২০১৬ সালেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। পরে দ্বিতীয় দফা গ্রেপ্তার হন। ২০১৬ সালে প্রথম গ্রেপ্তারের সময় তিনি বাকলিয়া থানায় কর্মরত ছিলেন।

অর্থাৎ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আবুল বাশার ও সিএমপির রিদুয়ান দুবার করে মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার হন। প্রথমবার গ্রেপ্তারের পর তাঁরা ক্লোজড হন, আর ক্লোজড থাকা অবস্থাতেই পুনরায় মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হন।

এ ছাড়া গত ২৪ ফেব্রুয়ারি পতেঙ্গা থানার ১২ নম্বর ঘাট এলাকা থেকে তিন হাজার ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হন চট্টগ্রাম রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্সের (আরআরএফ) কনস্টেবল ইমাম উদ্দিন। এর আগে ২০১৭ সালের ১৩ এপ্রিল ডবলমুরিং থানা পুলিশ নিশান চাকমা ও সুকৃতি চাকমা নামের দুই কনস্টেবলকে গ্রেপ্তার করেছিল। উল্লিখিত কয়েকজন পুলিশ সদস্যদের মাদক পাচারের কুর্কীতি ছাড়াও আরো অনেক পুলিশ সদস্য ইয়াবাসহ মাদক পাচারের মামলায় গ্রেপ্তার হন।

পুলিশ সদস্যদের মাদকপাচার বন্ধে সিএমপি বা কেন্দ্রীয়ভাবে পুলিশ বাহিনীর আন্তনজরদারিও নেই বললেই চলে। ফলে পুলিশের কোন সদস্য কখন কোথায় যাচ্ছেন, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন কিংবা কোনো অপরাধমূলক ঘটনায় জড়াচ্ছেন কিনা, সে বিষয়ে আগাম কোনো তথ্যই পুলিশ জানতে পারছে না।

মধ্য জুলাইয়ে সিএমপিতে ইয়াবাসহ মাদক সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য নেই প্রতিবেদন দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যেই দুজন পুলিশ সদস্য ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আমেনা বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, যখন প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল তখন কারো বিরুদ্ধে ইয়াবা সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ছিল না। পরবর্তীতে দুজন উপ-পরিদর্শকের বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরপর তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী করা যায় না। যখনই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে, তখনই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযোগ ওঠলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এতে ছাড় নেই।

সিএমপির প্রায় সাত হাজার পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নজরদারি আছে দাবি করে নগর পুলিশ কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান বলেন, বাহিনীর সদস্যদের প্রতি নজরদারি অবশ্যই আছে। আপনারা (প্রতিবেদক) দুজন উপ-পরিদর্শকের ঘটনা জেনেছেন। আরো অনেক অপরাধমূলক ঘটনার চিত্র হয়তো অজানা থেকে গেছে। কিন্তু পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে।

পুলিশ সদস্যদের মাদক তথা অপরাধ থেকে দূরে রাখতে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে কল্যাণসভা হয়। এ সভায় পুলিশ সদস্যদের নৈতিক ও মানবিকতার বিষয়ে তাঁদের দায়িত্ব-কর্তব্য জানানো হয়। সেখানে তাঁরা শপথ নেন। কিন্তু তারপরও দুয়েকজন বিপথগামী হচ্ছেন। যেমনটা চোরে শুনে না ধর্মের কাহিনির মতো। পুলিশ কমিশনার বলেন, পুলিশ সদস্যদের মাদক পাচারের বিষয়ে অভিযোগ পেলে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিন- এর আরো খবর