English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

মুখোমুখি অঞ্জু ঘোষ

হঠাৎ ঝটিকা সফরে বাংলাদেশে অঞ্জু ঘোষ। গত সপ্তাহেই কলকাতার সল্টলেকের বাসায় তাঁর কথা শুনেছেন কালের কণ্ঠ’র অনিতা চৌধুরী

  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

সাক্ষাৎকার তো দূরের কথা, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হননি অঞ্জু ঘোষ। তাঁর বাসায় ঢোকাও সহজ কাজ নয়। বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে সতর্ক প্রহরী। কেন এসেছেন, কোথা থেকে এসেছেন, আগে টাইম নেওয়া আছেএসব প্রশ্ন ধেয়ে আসবেই। উত্তর দিয়ে সন্তুষ্ট করতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে ভাবলে বোকামি হবে। ওপর থেকে সবুজ সংকেত না এলে পেরোনো যাবে না সদর দরজা। আছে আরো বিধি-নিষেধ। ফোন নিয়ে যাওয়ার অনুমতি নেই, বললেন প্রহরী।

বাংলাদেশ, বিশেষত চট্টগ্রামের মেয়ে বলে সব নিয়মের বেড়াজাল টপকে কোনোমতে ঢোকা গেল তাঁর বাসায়। তুমি বাঙাল...তুমি চট্টগ্রামের, তাই কথা বলছি, আঁর সিটাইঙ্গা মানুষরে কুব গম লাগেবললেন হাসতে হাসতে। চট্টগ্রামের প্রতি আলাদা টান কেন? জানালেন সেই কাহিনি। মুক্তিযুদ্ধের আগেই ফরিদপুর ছেড়ে ঘোষ পরিবার চলে আসে চট্টগ্রামে আর কিশোরী অঞ্জু ভর্তি হন কৃষ্ণকুমারী গার্লস হাই স্কুলে। তখন থেকেই শুরু গান আর নাচ। একটু একটু করে সেলিব্রিটি বনে যাওয়া। যেখানে যেতেন, মানুষ ধাওয়া করত আর খবর হতো তাঁকে নিয়ে। সেসব অনেক আগের কথা। এখন আমি কারো সঙ্গে কথা বলি না। একা আছি ভালো আছিবললেন নরম গরম অভিনেত্রী।

তাঁর অন্তরালে চলে যাওয়া নিয়ে অনেক গল্প চালু আছে। জানালেন, সব ভুল। আসলে ২০০২ সালের পর যে ধরনের রোল আসছিল, যে ধরনের সাজপোশাক পরার প্রস্তাব আসছিল, সেগুলো ভালো লাগেনি। তাই সিনেমা করা বন্ধ করে দিলাম।

একসময় দুই বাংলাই তাঁকে সফলতম বাণিজ্যিক হিরোইনের তকমা দিয়েছিল। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে বেদের মেয়ে জোসনা রেকর্ড পরিমাণ ব্যবসা করেছিল। ১৯৯১ সালে সেই ছবির রিমেক টালিউডেও সুপারডুপার হিট। তাঁর হিট ছবির লিস্ট বেশ লম্বাসওদাগর, চন্দনদ্বীপের রাজকন্যা, রাজার মেয়ে পারুল, অর্জন, দুর্নাম, কুরবানি, বেরহম, আবে হায়াত, আশা নিরাশা, নরম গরম, নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, মালা বদল, আশীর্বাদ। অভিনয় করেছেন বড় ভাল লোক ছিল, আয়না বিবির পালা, জাদুমহল, দায়ী কে?র মতো ছবিতেও। টালিউডে বেদের মেয়ে জোসনা করার পর সেখানে করেছেন একে একে বেশ কিছু ছবিটানা ২০০২ সাল পর্যন্ত। এরপর হঠাৎ করেই সিনেমাকে গুডবাই জানিয়ে ফিরে গেলেন যাত্রা মঞ্চে। স্টেজে মানুষের সামনে অভিনয় খুব কঠিন আর চ্যালেঞ্জিং। ভালো লাগত। তবে ২০০৮-এর পর সব ছেড়ে দিয়েছিবললেন অঞ্জু। কথায় কথায় ফিরে গেলেন আরো অতীতে। পাকিস্তানের জামানায় কিভাবে অভিনয় শুরু করেছিলেন, যখন যাত্রাপালায় গান ও নাচ করতেন কিশোরী অঞ্জু। সিনেমায় আগমন তারও অনেক পরে, ১৯৮২ সালেসওদাগর-এ। বলেন, বাবা চাইতেন না সিনেমায় অভিনয় করি। পরে অনেক কষ্টে রাজি হয়েছিলেন।

সল্টলেকের বাড়িতে বসার ঘরে টাঙানো মা-বাবার ছবি, মাঝে অঞ্জু। বসার ঘরটা বেশ বড়। দুটি টিভি, একটি আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম। নিজের প্রডাকশনের ছবি নিষ্পত্তির একটি পোস্টারও আছে ঘরে, আর সেটাই একমাত্র প্রমাণ যে বাড়ির মালকিন একসময় অভিনেত্রী ছিলেন।

কথাবার্তায় মার্জিত, তবে মাঝে মাঝে অনেক প্রশ্ন করেন। কথায় বোঝা যায়, মানুষকে বিশ্বাস একটু কমই করেন। রেগে যান, আবার ভুলেও যান, বয়স হয়েছে। সেই ১৯৫৬ সালে জন্মবলেই হেসে উঠলেন।

জীবনের ৬২ বসন্ত পার করে এসেছেন, চেহারায় তার ছাপ স্পষ্ট। তবে হেসে উঠলে একটা অদ্ভুত আভা ছড়িয়ে পড়ে। কালো শার্ট আর থামি পরে যখন সোফায় বসলেন, শরীরী ভাষায় একটা আত্মবিশ্বাস ফুটে উঠেছিল। হাসি আর শরীরের ভাষা এক করলে বোঝা যায় কেন দুই বাংলার পুরুষরা তাঁর জন্য পাগল হতেন।

বাংলাদেশের রাজ্জাক, ওয়াসিম, ইলিয়াস কাঞ্চন থেকে শুরু করে ওপার বাংলার চিরঞ্জিত, রঞ্জিত মল্লিক, প্রসেনজিৎপর্দায় সবার সঙ্গেই অভিনয় করেছেন অঞ্জু। দুই বাংলার গ্রামে গ্রামে তখন অঞ্জু নাইট হতো আর সেই যাত্রাপালা দেখার জন্য মুখিয়ে থাকত হাজারো মানুষ। সেসব দিন আর এখনকার দিনের তুলনা করলে কী বলবেন? অঞ্জু বলেন, তখনো ভালো ছিলাম, এখনো ভালো আছি। কোনো আক্ষেপ নেই? না। একটু পরই আবার বললেন, আছে। কী? খুব কষ্ট হয় যখন দেখি পত্রপত্রিকায়, ইন্টারনেটে আমাকে নিয়ে ভুল খবর বের হয়। আমি নাকি খেতে পাই না। আমি নাকি কাজ না করেই চলে এসেছি বাংলাদেশ থেকে। আরো কত সব নোংরা নোংরা কথারেগে ওঠেন অঞ্জু ঘোষ।

একটু পর, জানো, আমি এখনো কত মানুষের কাছে টাকা পাই, কিন্তু ওরা দিতে চায় না। কী করব?

কথার ফাঁকে গৃহপরিচারিকা বলে উঠল, দিদিকে কাছ থেকে না দেখলে জানা যায় না উনি কেমন মানুষ আর কিভাবে গরিব মানুষদের সাহায্য করেন। ঘরের এক কোনায় বাঁকুড়া থেকে আসা যে মহিলা অঞ্জু দেবীর ড্রেস বানাচ্ছিলেন, তিনি যোগ করলেন, দিদি আমাদের কতটা খেয়াল রাখেন, সেটা বলে বোঝাতে পারব না।

শুধু ঘরের বা আশপাশের মানুষের খবরই রাখেন না, বাংলাদেশে কোথায় কী ঘটছে, সব খবর রাখার চেষ্টা করেন, পাবনায় সাংবাদিকটাকে মেরে দিল! অঞ্জুর গলায় বিষাদের সুর।

টিভি খুললেই খুন, মারপিট আর ধর্ষণের খবর দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়। তবু টিভি দেখেন, খবরের কাগজ পড়েন।

টিভি সিরিয়াল দেখি না। লাস্ট কোন সিনেমাটা দেখেছি তা-ও মনে নেই, বললেন অঞ্জু। তাহলে দিন কাটে কিভাবে? ঘুম থেকে উঠেই ঈশ্বর আরাধনা, তারপর সংগীতচর্চা, বাড়ির টুকটাক কাজদিন কেটে যায়।

মাঝে মাঝে কেনাকাটার জন্য বাড়ির বাইরে বের হন। তবে সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেন ভাইয়ের বাসায় যেতে আর ওখানে গিয়ে বাচ্চাদের সঙ্গে খেলতে ও গল্প করতে। ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর আর ইচ্ছা নেই। স্টেজও আর টানে না।

অঞ্জু ঘোষের বায়োপিক হলে কেমন লাগবে? বায়োপিকের কোনো দরকার নেই। কারণ আমার জীবনের কোনো গল্প নেই!

রংবেরং- এর আরো খবর