English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

এখানে জীবন যেমন

পুবাইলের নাওগাঁও

  • ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

নৌকায়ই তাদের থাকা-খাওয়া, সংসার। পুরুষদের কেউ কেউ মাছ ধরে। কেউবা তালা-চাবি, ছাতা সারাই করে। মেয়েরা রেশমি চুড়ি, বাসনকোসন, চুলের ফিতা বিক্রি করে গ্রামে ঘুরে ঘুরে। লোকে তাদের বলে সান্দার। তারা নিজেদের পরিচয় দেয় সওদাগর বলে। বালু নদে তাদের জীবনযাত্রা দেখে এসেছেন শরীফ আহমেদ শামীম

গাজীপুরের পুবাইলের পিপুলিয়া। বালু নদের ওপর যে সেতু তার গোড়ায়ই ঠাঁই গেড়ে আছে ৫০টির বেশি নৌকা। সময় বদলাচ্ছে, কিন্তু সান্দাররা আছে সেই আগের মতোই। তাদের ঘরে এখনো কুপি বাতি। সর্দার আব্বাস আলী মাতবর। বয়স ৪৫ বছর। বললেন, বালু নদে আমাদের বাপ-দাদারা ছিল। তাদেরও দাদারা ছিল। ২০০ বছর ধরে আছি আমরা এখানে। সেকালে ব্যবসা তো জলপথেই হতো। বর্ষায় আমরা সান্দাররা কাঁসা, পিতল বা মাটির তৈজসপত্র নিয়ে গ্রামে গ্রামে ফেরি করতাম। খেলনাপাতিও বিক্রি করতাম। এখন আমরা সওদাগরি বেশি করি না। পুঁজি নাই। নানা কাজকর্মে ঢুকে গেছে সান্দাররা।

নৌকা ছাড়া কিছু নেই

পরিবার ৬০-৭০টি। সর্বমোট ২০০ মানুষ। নৌকা ছাড়া তাদের আর সে রকম সম্পত্তি নেই। অনেকের নৌকা ভাঙা। টাকার অভাবে মেরামত করতে পারছে না। নতুন নৌকা গড়তে ৩০-৩৫ হাজার টাকা লাগে। কয়েকটি পরিবার তাই ঘর তুলেছে নদীর পারে। সান্দারদের অল্প কিছু ছেলে-মেয়ে স্কুলে যাচ্ছে। তবে বেশি দূর তাদের পড়াশোনা আগায় না। আগে যারা গিয়েছিল তারা শেষে নৌকায় ফিরে এসেছে। ফিতা-চুড়ি নিয়ে গাঁ ঘুরে মরছে। তবে স্বপ্না আক্তার ব্যতিক্রম। সে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে। তাদের নৌকা বাড়িতে বসে ছিল। বলল, তিন ভাই, দুই বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। আমার বাবার (ফজল আলী) লেখাপড়ার দিকে আগ্রহ আছে। তিনি চাইতেন ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া শিখুক। বাবার ইচ্ছায়ই এত দূর আসছি। পুবাইল কলেজে পড়ি। সমাজকর্ম বিভাগে। ভাইয়েরা খরচ দেয়। নিজে টিউশনি করেও কিছু আয় করি।

গাছের নিচে দুপুর

সূর্য তখন মাথার ওপরে। সান্দারপল্লীর ধারে নদীর পারে একটা গাছের নিচে বসে টেঁটা (মাছ ধরার যন্ত্র) তৈরি করছিল নিয়ামত আলী ও আবদুল কুদ্দুস। জানলাম তারা রাত জেগে মাছ ধরে। ঘুমাতে যায় ভোরবেলায়। বিকেলে আবার কাছের হাটে ছাতা ও তালা-চাবি মেরামতির কাজ করে। ভাঙা ছাতার চিকন লোহা দিয়ে টেঁটা ভালো হয়। ভালো মানের টেঁটা ৮০০ টাকায়ও বিক্রি করা যায়।

নৌকার অন্দরে

পারভীন আক্তারের বয়স ৩৬ বছর। নৌকার গলুইয়ে বসে থালা-বাটি পরিষ্কার করছিলেন। নৌকাটি তাঁর পুরনো; কিন্তু গোছানো। নৌকার (ভেতরের দিকে) ছৈয়ের দুই ধারে কাঠের তক্তা দিয়ে তাক বানিয়েছেন। তাতে বিছানাপত্র, হাঁড়ি-পাতিল, কাপড়-চোপড়, ছেলে-মেয়েদের বই-খাতা, বাজার-সদাই এবং আরো নানা কিছু রেখেছেন। ডান দিকের তাকের মাঝখানে যেমন চাল-ডাল, তেল-নুন রাখার পাত্র দেখলাম। তার ওপরে বই-খাতা। একটা দেয়ালঘড়িও ঝুলতে দেখলাম এক ধারে। আছে একটা পুরনো হ্যাজাক বাতিও। পারভীন বললেন, অল্প বয়সেই আমার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। স্বামী ফালু মিয়ার মাছ ধরার পেশা। রাতে টেঁটা, ঝাঁকিজাল ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরেন। আমার চার মেয়ে, এক ছেলে। ছেলের নাম পারভেজ। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বড় মেয়ের নাম দুলনা আক্তার। আর মেজো মেয়ের নাম দুলিয়া। দুলনার বয়স ২১ আর দুলিয়ার ১৯ বছর। বিয়ে হয়ে গেছে দুজনেরই। তিন নম্বর মেয়ে মুন্নি গার্মেন্টে চাকরি করে। ছোট মেয়েটি প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।

জানলাম দুলনার সন্তান হওয়ার সময় ৪৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। মেয়ের জামাই কোনো টাকা দিতে পারেনি। তাই বেসরকারি সংস্থা থেকে টাকা নিয়েছে। সপ্তাহে এক হাজার ২০০ টাকা কিস্তি দিতে হয়। আগে পারভীন গ্রামে ঘুরে ঘুরে সিরামিকের জিনিসপত্র বিক্রি করতেন। এখন শরীর প্রায়ই অসুস্থ থাকে। তাই বেশি ঘোরাঘুরি করতে পারেন না।

পারভীনের কাছেই জানলাম, সান্দার শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সংসারের কাজের শিক্ষা দেওয়া হয়। মা-বাবা যখন বাজারে তখন তারা নৌকায় থেকে সংসার সামলায়। জামা-কাপড়, বিছানাপত্র গুছিয়ে রাখে। খাবারও তৈরি করে।

এইটুকু বদলেছে

আগে অল্প বয়সেই ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হতো। ছিল যৌতুক প্রথাও। নৌকা যৌতুক দেওয়ারও চল ছিল। অথবা ঘড়ি, সাইকেল, ছাতা, রেডিও ইত্যাদি দেওয়া হতো। সর্দার আব্বাস মাতবর বলেন, কনে দেখা, বকশিশ দেওয়া, গায়ে গলুদ, গেট বাঁধা, পানচিনি, বউভাতসবই হয় আমাদের। বরযাত্রা আগে সেভাবে ছিল না। বিয়ে তো নিজেদের মধ্যেই হতো। তবে এখন নিজেদের মধ্যে বিয়ে-শাদি কম হচ্ছে। আমার ছেলের বিয়ে যেমন ওই নাগরী গ্রামে দিয়েছি।

ছবি : লেখক

অবসরে- এর আরো খবর