English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

শোনো আমার ছেলের গল্প বলি

  • ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

সালমা জাকিয়া বৃষ্টির শিল্পকর্মের নাম অতিমানবীয় উপসর্গ। এতে বলেছেন ছেলে আভিনের গল্প। সাজিয়েছেন আভিনের খেলনা ও ছবি দিয়ে। এবারের এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে গ্র্যান্ড অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে অতিমানবীয় উপসর্গ। গল্পটি পিন্টু রঞ্জন অর্ককে শুনিয়েছেন বৃষ্টি

আমার ছেলের নাম মাশরাফি আভিন। ১২ বছর বয়স। ১৬ মাস বয়সে ওকে একটা ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছিল। দেওয়ার পরপরই ওর গা, হাত-পা ফুলে যায়। ডাক্তাররা বলেছিলেন ভ্যাকসিনটা ওর শরীরে কাজ করেনি। আগে আভিন দু-একটা শব্দ যেমনওয়ান, টু, থ্রি, লাইট ইত্যাদি বলতে পারত। কিন্তু ভ্যাকসিন দেওয়ার পর থেকে দেখলাম সে আর কথা বলছে না। একা একা থাকতে পছন্দ করছে। মানুষজনের সামনে আসতে চাইছে না। দেড় বছরের মাথায় আমরা আন্দাজ করি, আভিন অন্য রকম, মানে স্পেশাল চাইল্ড। তবে ডাক্তাররা তখনই পরিষ্কার কিছু বলছিলেন না। তার পরও গেছি এক ডাক্তার থেকে আরেক ডাক্তারের কাছে। ঘুরে ঘুরে হয়রান হয়ে গেছি। একসময় বুঝলাম ওর জন্য লড়তে হবে। আমাদেরই ওর মতো চলতে হবে। ওকে একটা কমিউনিকেশন স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলাম। থেরাপি দেওয়া শুরু হলো। ওর বড় বোনকে ডাকি টিয়া বলে। আভিনকে এত সময় দিতে হচ্ছিল যে টিয়াকে সময়ই দিতে পারছিলাম না। টিয়াও বুঝি হঠাৎ বড় হয়ে গেল। নিজেই নিজের কাজ গুছিয়ে করতে থাকল।

খেলনা বদলে গেল

আভিন আর টিয়ার দোলনা ছিল, সাইকেল ছিল, প্লাস্টিকের বাঁশি ছিল, বলও কিনে দিয়েছিলাম। আভিন সব রকমের খেলনাই পছন্দ করত; কিন্তু ওই দেড় বছরের মাথায় খেলনার প্রতি আকর্ষণ উবে গেল। ওকে ব্লক আর পাজল সেট কিনে দিলাম। প্রথম প্রথম সেগুলো ও টাচ করতে চাইত না। একপর্যায়ে অবশ্য নিজে থেকে পাজল মেলাতে শুরু করে। ওকে আমরা যে খেলনাই দিই সেটার একটা উদ্দেশ্য থাকে। ওর যেমন থেরাপি বল নামে একটা বড় বল আছে। গায়ে নরম কাঁটা। কাঁটাগুলো ওর গায়ে লাগলে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় আমরা খেয়াল করি। আসলে থেরাপির সরঞ্জামই ওর খেলনা। সাইকেল আর ফুটবলও আছে। সাইকেল চালায় না সে রকম, নিজ থেকে ফুটবলেও কিক করে না। এগুলো তাকে দেওয়া হয়েছে মনোযোগ বাড়ানোর জন্য। আভিন শব্দ পছন্দ করে। গান পছন্দ করে। নানা রকমের বাটি আর চামচ রাখে সঙ্গে। এগুলো দিয়ে শব্দ তৈরি করে।

সমাজ প্রস্তুত নয়

অনেক মা-ই প্রতিদিন এমন শিশুদের নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। সমাজ এই শিশুদের গ্রহণ করতে এখনো প্রস্তুত হয়নি। ধরুন, একটা ফুডকোর্টে গেলাম। সেখানে আমাকেও লাইনে দাঁড়াতে হলো। কিন্তু বাচ্চা তো অধৈর্য হয়ে চিৎকার করছে। সামনের জন বিরক্ত হচ্ছে; কিন্তু সরে গিয়ে আমাকে জায়গা দিতে প্রস্তুত নয়। এটা ব্যক্তি মানুষের দোষ নয়। আসলে সমাজে সচেতনতার অভাব। তাই ঠিক করলাম, মানুষকে সচেতন করার জন্য কিছু করব।

দেয়ালে আটকে থাকব না

গেল বছর ন্যাশনালে (জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী) দ্য অল্টারনেট ইউনিভার্স নামের একটি পেইন্টিং দিয়েছিলাম। তাতেই প্রথমবারের মতো অটিস্টিক শিশুদের কথা বলেছি। সেটিতে আমি ওদের জন্য আলাদা একটি পৃথিবীর কথা কল্পনা করেছি। এবারের এশিয়ানেও শুরুতে পেইন্টিং দেওয়ার কথা ভেবেছিলাম। পরে ভাবলামনা শুধু দেয়ালে আটকে থাকব না। এমন কিছু করব, যার সঙ্গে মানুষ যুক্ত হতে পারবে। ব্যাপারটি অনুভব করতে পারবে।

অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি

কাজটা যেন বাস্তবসম্মত হয়, তার জন্য প্রায় ৩০০ অটিস্টিক শিশু ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছি। আভিন এখন শাহজাদপুরের রেইনবো এ বি এ স্কুলে পড়ে। সেখানকার শিশু ও শিক্ষকদের সঙ্গেও কথা বলেছি। বুঝতে চেয়েছি ওর সমস্যার রকমফের, সমাধানের উপায়। বইপত্রও পড়েছি। ব্যারি নেইল কাউফম্যানের সন-রাইজ : দ্য মিরাকল কন্টিনিউজ বইটি পড়ে দারুণ অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। একবার ভেবেছিলাম, ২০টি বাচ্চার খেলনা নিয়ে কাজটি করব; কিন্তু অভিভাবকরা তাঁদের শিশুদের প্রকাশ্যে আনতে চান না। শেষে আভিনের যা আছে তা দিয়েই করলাম।

অতি মানবীয় উপসর্গ

শিল্পকলা একাডেমির নির্ধারিত জায়গায় শিল্পকর্মটি গড়া শুরু করেছিলাম আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে। সকালে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরতাম। মূলত এটি একটি ভিডিও ইনস্টলেশন। সঙ্গে ক্যানভাস, কাঠ, কাপড়, খেলনা, আয়না, লাইট ইত্যাদি ব্যবহার করেছি। চলচ্চিত্রটির দৈর্ঘ্য সাত মিনিট ১৫ সেকেন্ড। আভিনের বল, খাতা, গাড়ি মানে খেলনাগুলো ১০ ফুট উঁচু থেকে ঝুলিয়ে দিয়েছি। আভিনের একেকটি খেলনা আমার কাছে একেকটি আশার প্রদীপ। আভিন যখন একটি পাজল মিলিয়ে ফেলে, আমার মনে হয় সে এক ধাপ এগিয়ে গেল। যে চলচ্চিত্রটি দেখানো হচ্ছে, সেটি আমার আইফোনেই তোলা। ছবিটিতে দেখা যায় আভিন খেলছে, চিৎকার করছে, খুশি হচ্ছে, দুঃখ পাচ্ছে। মোটকথা এটা আভিনের মানে আমার ছেলের গল্প। সে একজন বিশেষ মানুষ। আরো অনেক আভিন আছে আমাদের ধারে-কাছে। আসুন, আভিনদের জন্য আমরা একটি সুন্দর পৃথিবী বানাই। ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

অবসরে- এর আরো খবর