English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

হয়ে ওঠার গান

মগিনীরা দুই বোন

আনাই ও আনুচিং মগিনী যমজ বোন। অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ গেমসে খেলে সবেই বাড়ি ফিরেছেন। খাগড়াছড়ির সাতভাইয়াপাড়ায় তাদের বাড়ি। বেড়িয়ে এলেন আবু দাউদ

  • ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

নিজেদের আঙিনায় মা-বাবার সঙ্গে দুই বোন

২০১১ সাল। বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা ফুটবল টুর্নামেন্ট। সাতভাইয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আনাই আর আনুচিংও খেলতে গিয়েছিল। সেবার তাদের সুযোগ হয়েছিল বিভাগীয় পর্যায়ে খেলারও। চট্টগ্রামে দুই বোনের খেলা দেখে মুগ্ধ হন রাঙামাটির মগাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বীরসেন চাকমা। তিনি তাদের জন্য আরো সুযোগ তৈরি করে দেন। শেষে ২০১৫ সালে ফুটবল ফেডারেশন তাদের নির্বাচন করে। তারা বয়সভিত্তিক বিভিন্ন টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পায় এবং একপর্যায়ে জাতীয় দলে নাম লিখিয়ে ফেলে। মাঠে আনাই খেলে ডিফেন্সে। মাঝেমধ্যে রাইট ব্যাকেও খেলে। ঠাণ্ডা মাথায় প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের বোকা বানিয়ে দেয়। আত্মবিশ্বাস তার মূল অস্ত্র। কখনোই ঘাবড়ে যায় না। আনুচিং খেলে ফরোয়ার্ডে। এরই মধ্যে তার মার-মার, কাট-কাট খেলা সবার নজর কেড়েছে। প্রতিপক্ষের গোলমুখে দুর্বার ছুটে চলা যেকোনো ডিফেন্সের মাথাব্যথার কারণ। ড্রিবলিং ও গতি দারুণ। দলের ১০ নম্বর জার্সিটা সে-ই পরে। দুজনেই গেল সাফ টুর্নামেন্টে দুটি করে গোল করেছে।

দলে এমন দুজন খেলোয়াড় থাকলে কোচের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন অনেকটা সহজ হয়ে যায়। কোচ গোলাম রাব্বানি ছোটনের কথায়ও তার আভাস মেলে। আনাই স্বল্পভাষী। কিন্তু শোনে মনোযোগ দিয়ে। যখন তার পায়ে বল থাকে আমি নির্ভার থাকি। তার ভুলের মাত্রাটা কম। দলের প্রয়োজনে স্টপার কিংবা রাইট ব্যাক দুই পজিশনেই খেলানো যায়। অন্যদিকে গোল করার অদম্য নেশাই আনুচিংয়ের শক্তি। তার সাইড ভলি দারুণ। বল একটু বাতাসে উঠলেই হলো, সাইড ভলিটা তার মজ্জাগত।

আনুচিং মগিনী

খেলতে ভালো লাগে

অভাবের সংসার। বল কেনার টাকা নেই। কিন্তু দুই বোনের খেলায় খুব মন। ছেলেদের সঙ্গেই নেমে পড়ত মাঠে। সাতভাইয়াপাড়া বিদ্যালয়ের মাঠেই খেলত বেশি। আনাই বলল, ফুটবল কেনার টাকা আমাদের ছিল না। জাম্বুরা দিয়ে খেলতাম। স্কুল মাঠে জায়গা না পেলে আশপাশের মাঠে খেলতাম। ছেলে-মেয়ে তো তখন আমরা বুঝতাম না। আনুচিং বলল, খেলতে খেলতে আমাদের সময়ের কথা মনে থাকত না। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরলে বকুনি খেতাম। অবশ্য বঙ্গমাতা ফুটবলে ভালো করার পর মা-বাবাও উৎসাহ দিয়েছেন।

মগিনীদের ঘরে টিভি ছিল না। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ দেখেছে অন্য বাড়ির জানালার ফাঁক দিয়ে। আর কৌশল শিখেছে ফুফাতো ভাই চাইহ্লা মারমার কাছ থেকে। এখন সে ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। সময় পেলে এখনো রিসিভ করা, হেড করা শেখায়। চাইহ্লাই তাদের পেপারে অংম্রাচিং মারমার ছবি দেখিয়েছিল। অংম্রাচিংয়ের ছবি বেরিয়েছিল পত্রিকায়। সে জাতীয় দলের ফুটবলার। আনুচিং ব্রাজিলের সমর্থক। নেইমারের খেলা পছন্দ করে। আনাই আর্জেন্টিনার সমর্থক। মেসি তার প্রিয় খেলোয়াড়।

আনাই মগিনী

অভাব পিছু ছাড়েনি

জেলা সদর থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে সাতভাইয়াপাড়া; কিন্তু পথ দুর্গম। সাতভাইয়াপাড়া ছড়ার ওপর বাঁশের সাঁকো পার হতে হয়। বাবা রিপ্রু মগ একসময় কবিরাজি করতেন। এখন সেটায়ও তেমন আয় নেই। অন্যের জমিতে চাষ করেন। তাদের এক ভাই রাজমিস্ত্রি। তাদের বড় বোন সানাউ মগিনীর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া হয়নি অভাবের কারণেই। টুর্নামেন্ট শেষে তারা যে টাকা পেয়েছে তা এখন সংসারের কাজে লাগছে।

ট্রফিগুলো রাখার জায়গা নেই

একেবারে নড়বড়ে আনাইদের ঘর। ভেঙে পড়ার আশঙ্কা থাকে সব সময়। বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়ার ভয়ে খেলে পাওয়া ট্রফি ও উপহারসামগ্রী রাখতে হয়েছে পাশের বাড়িতে। বাড়িতে মেহমান ডাকতে লজ্জা হয়। তবে কথা দিয়েছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী। তাদের ঘর ঠিক করে দেবেন। সাফ গেমস খেলে ২৬ আগস্ট ঢাকায় ফিরেছে মগিনীরা। দুই বোনকে নিজের বাসায় ডেকে নিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

ছবি : লেখক ও সংগ্রহ

অবসরে- এর আরো খবর