English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সড়ক-মহাসড়কের অবস্থা পূর্ববৎ

মো. নূরুল আনোয়ার

  • ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

ঢাকা শহরে কিশোর ছাত্রদের ছয় দিনের উত্থানে দেশবাসী তথা ঢাকাবাসী আশায় বুক বেঁধেছিল, এবার কিছু একটা হবে, সড়ক-মহাসড়কে আসবে শৃঙ্খলা, দ্রুত কমে আসবে মৃত্যুর মিছিল। কিন্তু সেই শুভ সম্ভাবনা অঙ্কুরেই নিভে যেতে দেখলাম আমরা। বিভিন্ন সংবাদ সূত্রে জানা যায়, গত ঈদুল আজহার আগে-পরে ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২৫৯ জন এবং গত ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত ৫৬১ দিনে সড়কে প্রাণ হারিয়েছে পাঁচ হাজার ৮৪ জন, আহত বেশুমার। কী করুণ, ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক সংবাদ। একটি নিহত প্রাণের সঙ্গে কত যে জীবিত প্রাণ জড়িত তার হিসাব কে রাখে। তাদের ব্যথাতুর কান্নার কি সান্ত্বনা আছে? সঙ্গে আছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক দিক। এর ওপর কি কোনো গবেষণা হয়েছে?

সড়ক দুর্ঘটনা একটি দিক; কিন্তু সড়কে হত্যা আমরা কিভাবে মেনে নেব? এরই মধ্যে সংঘটিত কয়েকটি ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। গজারিয়ায় চলন্ত বাস থেকে ফেলে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পায়েল হত্যা, চট্টগ্রাম সিটি গেটে গত ২৭ আগস্ট রেজাউল করিম হত্যা, কুষ্টিয়ার চৌড়হাসে পথচারী মেরিনা বেগমকে ধাক্কা দিয়ে কোলের শিশু আকিফা হত্যা, সর্বশেষ দুর্ঘটনাকারী ঈগল পরিবহনের সিজ করা বাস থানায় আনার সময় মিরপুরে এসআই উত্তমের প্রাণহানি ওই বাসের চাপায়। চালকের দাবি, অবশ্য বাসে ব্রেক আগে থেকেই ফেল ছিল। তাহলে এর দায়িত্ব কার, থানার ওসির, না বাস মালিকের? রেকার কেন ব্যবহার করা হয়নি? এর জবাব কে দেবে? সড়কে মৃত্যু ছাড়াও অঙ্গহানি, এমনকি পঙ্গুত্ববরণ করতে হয় অনেক সময়। হত্যা ছাড়া বাসচালকরা আরেকটি জঘন্য অপরাধ করে থাকে, সেটা ধর্ষণ। এর ব্যাখ্যা কী? এই ক্ষমাহীন অপরাধ থেকে পরিবহনকর্মীদের বিরত রাখার দায়িত্ব কার? এটা চড়া মূল্যে বন্ধ করতে হবে।

ঢাকা শহরে এখন শরতের আমেজ অনুভূত হয়। বৃষ্টি স্বল্প, তাই জলজট নেই। ধুলাবালিও কম। চুরি-ছিনতাইও নিয়ন্ত্রিত; অপহরণ, গুম খুনও কম। রাজনৈতিক উত্তাপ, সভা-মিছিল সড়ক অবরোধ খুব একটা হচ্ছে না। দ্রব্যমূল্যও স্থিতিশীল। কিন্তু যানজটে সড়কে শূন্যগতি, বেপরোয়া যান, সর্বত্র বিশৃঙ্খলা, অস্থিরতা, সেই সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, দুর্ঘটনা, অঙ্গহানি, মৃত্যুর মিছিল। প্রশ্ন জাগে, ঢাকা মহানগরীর সড়কের মালিক কে? শহরের যান নিয়ন্ত্রণের কর্তৃপক্ষ কে বা কারা? যানবাহন পরীক্ষণ সনদপত্র প্রদান, চালকের লাইসেন্স প্রদানকারী কে? বিআরটিএ, ডিসিসির কাজ কী? আরটিএতে কারা আছেন, মেট্রো আরটিসি প্রধান কে? পরিবহন মালিক বা শ্রমিক সমিতি কী? ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) কিভাবে সময় কাটায়? এত এত কর্তৃপক্ষ আছে, মাঠে শুধু দেখা যায় মহানগর পুলিশকে। সব ঝামেলা-ঝুঁকি নেয় পুলিশ। নগরের যান চলাচল সচল রাখার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টাও করে অহর্নিশ, ফলে যেটুকু সচল আছে তাদের প্রচেষ্টার ফলে। কিন্তু এটুকুতে জনপ্রত্যাশার বা প্রয়োজনের সামান্যও পূরণ করতে পারছে না। যে কাজ করে, তার সমালোচনাও হয় সবচেয়ে বেশি। অবশ্য ট্রাফিক পুলিশ যে দোষত্রুটি বা ভুলের ঊর্ধ্বে, তা নয়। কী করলে ট্রাফিক ব্যবস্থা সচল ও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে আনা যায়, সেই পরামর্শ কিন্তু আমরা দিই না। শুধু চাই যানজট ও দুর্ঘটনামুক্ত ট্রাফিক ব্যবস্থা। এই মহাসংকট থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে এবং এভাবে আর চলতে দেওয়া যায় না। ওপর-নিচ-পার্শ্ব চাপে নাকাল পুলিশ বাধ্য হয়ে মাঝেমধ্যে কিছু ঝোড়ো পদক্ষেপ নেয় জনজীবনে স্বস্তির জন্য। এর কোনো কোনোটি উপকারের চেয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। যেমনঈদের আগে ১০ দিনের সম্প্রসারিত ট্রাফিক সপ্তাহ প্রথম বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সড়কে বাসের স্বল্পতায় নিম্ন আয়ের মানুষের মহাভোগান্তি ও কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার জন্য চড়া মূল্যে রিকশা বা সিএনজি ভাড়া গোনাএ ছিল মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। সাধারণের এই অর্থনৈতিক ক্ষতির দিকটি আগে মোটেও ভাবা হয়নি। হঠাৎ বাস উধাও হওয়ার কারণ ছিল১. বাসের ফিটনেস না থাকা, ২. চালকদের সঠিক ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকা। এর পরিণতি এই হলো যে বিআরটিএ অফিসগুলো হলো মৌচাক, রানি মৌমাছিকে পাওয়ার জন্য অন্য সব মৌমাছি ভিড় করে অফিসে, তিন-চার গুণ দামে অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে মিলতে লাগল ফিটনেস সনদ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স। এক সংবাদ সূত্র মতে, প্রতি ৪২ সেকেন্ডে একটি করে ফিটনেস সনদ ইস্যু করে বিআরটিএ অফিস। সনদ দিল; কিন্তু প্রসব করল সেই মহা-আনফিট গাড়ি। ফিটনেসের ক্ষেত্রে মোটা দাগে অন্তত ১. ব্রেক সিস্টেম, ২. স্টিয়ারিং বক্স, ৩. চাকা, ৪. দরজা-জানালা ও হ্যান্ডেল, ৫. বাসের ভেতরের আসন বিন্যাস দেখতে হয়। পাঠক, আপনারাই বলুন, আমাদের বিআরটিএ ফিটনেস ইস্যুর সময় এগুলো কোন ভৌতিক বলে করেছিল বিয়াল্লিশ সেকেন্ডে!

কয়েক দিন আগে ডিএমপি কমিশনার ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নতির জন্য মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন, যা ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে। সহায়তা করবে ৩২২ জন রোভার স্কাউট। এই কর্মসূচির প্রধান তিনটি দিক১. ঢাকা শহরে প্রধান সড়কগুলো থেকে চলাচলরত ১৫৯টি রুটের প্রায় ছয় হাজার লেগুনা উচ্ছেদ, ২. পুলিশের নির্ধারিত ১২১টি স্টপেজে বাস থামা নিশ্চিত করা, ৩. ৪০টি স্থানে পুলিশ চেকপোস্ট বসানো।

ট্রাফিক শৃঙ্খলা আনয়নের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জনসাধারণের জীবনযাত্রাকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় রাখা, কোনো অবস্থায়ই জনদুর্ভোগ বাড়ানো নয়। নগরবাসী বলতে কি বিত্তবান গাড়ির মালিকদের বোঝানো হয়? লেগুনায় চলাচলকারী পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ কি ঢাকাবাসীর অন্তর্ভুক্ত নয়? বিকল্প ব্যবস্থা না করে লেগুনা বন্ধের সিদ্ধান্ত কার স্বার্থে? এতে কারা চড়ে তা জানা প্রয়োজন ছিল। অফিস যাত্রী নারী-পুরুষ, ছাত্র-ছাত্রী, মধ্য আয়ের মানুষও এই লেগুনায় চড়ে। এতে তারা পরিকল্পনামাফিক স্বল্পব্যয়ে গন্তব্যে যেতে পারে। লেগুনা চার চাকার গাড়ি, শহরে যানজটের কারণে লেগুনার দুর্ঘটনাও কম।

সমগ্র থাইল্যান্ড, ভারতের দিল্লিসহ বড় শহরগুলোতে লেগুনা, তিন-চার চাকার ইজি বাইকের মতো বৈদ্যুতিক যান চলাচল করে। বিদেশিরাও এগুলোতে ব্যয় সাশ্রয়ের জন্য চড়ে। তবে সেগুলো সুন্দর, আরামদায়ক, রক্ষণাবেক্ষণ ভালো এবং দক্ষ চালক দ্বারা চালিত হয়। পুলিশ কমিশনার আকস্মিকভাবে কার স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নিলেন জানাননি। তাঁর মতে, লেগুনা শুধু বছিলা ও ৩০০ ফুটে চলতে পারে। লেগুনার মালিকরা দাবি করেছে, রুট পারমিট নিয়ে তারা লেগুনা চালায়। তার ওপর পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নিয়মিত চাঁদা দেয়। বিআরটিএর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, রুট পারমিট নিয়েই লেগুনা চলাচল করে এবং এই রুট পারমিট দেওয়ার এখতিয়ার মেট্রো আরসিটির, যার সভাপতি ডিএমপি কমিশনার। লেগুনা বাতিল নয়, দরকার গাড়ির ফিটনেস ও অভিজ্ঞ চালক চালাচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করা। মানুষ রসিকতা করতে শুরু করেছেনগরে গাড়ির গতি যেভাবে নেমে এসেছে, দাবি উঠবে গরু-মহিষের গাড়ি চালু করার, যা একসময় ছিল।

এবার আসা যাক ঢাকা শহরে ১২১টি বাস স্টপেজ নির্দিষ্টকরণ প্রসঙ্গে। যে আদেশটি বাসচালক, মালিক-যাত্রীরা অমান্য করবে, তা একতরফাভাবে চালু করার চেষ্টা কেন? যানজটে শহরে যানবাহনের যে গতি, বলা যায় প্রায় পুরো শহরই বাস স্টপেজ। বাস মালিকরা বলছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা না করেই পুলিশ একতরফাভাবে স্টপেজ নির্ধারণ করেছে। এক সপ্তাহের মধ্যে সাইনবোর্ড লাগানোর পর পুলিশ এটা কার্যকর করবে। একটা কথা আছে, ভূতের পা উল্টা দিকে। আগে যেখানে বাস স্টপেজ ছিল ২০০-এর মতো, যেখানে বাস-যাত্রী উভয় বৃদ্ধির পর বাস স্টপেজের সংখ্যা ২০০-এর বেশি হওয়ার কথা, সেখানে উল্টো হ্রাস করা হলো কোন যুক্তিতে? এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মালিক-শ্রমিক সমিতি, বিআরটিএ, সিটি করপোরেশন, আর কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিলে টেকসই ও গ্রহণযোগ্য হতো। কারণ ঢাকা শহরের ট্রাফিক সচল রাখার দায়িত্ব এককভাবে পুলিশের নয়। প্রয়োগ পুলিশের, এটা ঠিক; কিন্তু এ ক্ষেত্রে অন্যদেরও সহযোগিতা করতে হবে। সব ব্যর্থতার দায় শুধু পুলিশের ওপর চাপানো হচ্ছে, এটা পুলিশকে বুঝতে হবে। এ ধরনের নতুন যেকোনো বড় সিদ্ধান্তে সংশ্লিষ্টদের জড়িয়ে নিতে হবে। যান চলাচলের ক্ষেত্রে পুলিশকে সর্বাগ্রে এলাকার জনস্বার্থ বিবেচনায় নিতে হবে। যেকোনো ব্যবস্থা সাধারণ যাত্রীদের সুবিধার কথা ভেবে নিতে হবে। যান চলাচলের অব্যাহত ধারা রক্ষার জন্য গৃহীত ব্যবস্থার কুফল যে কম নয়, সেই ধরনের দুটি উদাহরণ প্রাসঙ্গিক বলে উল্লেখ করছি। বাড্ডা-গুলশান লিংক রোড মোড়। এই মোড়ে যান চলাচল অব্যাহত রাখার জন্য বর্তমান ব্যবস্থা। উল্টো দিকও দেখা যেতে পারে। পশ্চিম দিক থেকে আসা দক্ষিণগামী যানগুলো মোড়ে এসে ছোট গাড়ি আধা কিলোমিটার, বড় গাড়ি এক কিলোমিটার উত্তরে গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে আবার লিংক রোডের পাশ দিয়ে দক্ষিণে যায়। অন্যদিকে উত্তর দিক থেকে পশ্চিমগামী যানগুলো লিংক রোড পার হয়ে ৪০০ গজ গিয়ে ইউটার্ন নিয়ে লিংক রোড হয়ে পশ্চিমে যায়। বাংলায় একটা কথা আছেলাভের গুড় পিঁপড়ায় খায়। চতুর্মুখী যানগুলো বাধ্য হয়ে রাস্তায় ভিড় করে যানজট সৃষ্টি করে, অধিক সময় ব্যয় হয়, জ্বালানি পুুড়ে অধিক। বাস্তবটি হচ্ছে সবমুখী বাসযাত্রী ওঠানামার জন্য ওই মোড়ে দাঁড়ায়। বাস্তবে দূরবর্তী ইউটার্নগুলো কোনো কাজে তো আসেইনি, দুর্ভোগ বাড়িয়েছে আরো। ঢাকার আরেকটি আবাসন এলাকায় দক্ষিণ দিক থেকে পূর্বমুখী নিজ আবাসনে আসতে পূর্বে একটি সরাসরি মোড় খোলা ছিল। এ ছাড়া আরো তিনটি কাটা ছিল উত্তর দিকে পর পর। হালে সব বন্ধ। ফলে সেই আবাসনের গাড়িগুলোকে চার-পাঁচ কিলোমিটার বেশি ঘুরে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়। ফলে অধিক যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। চার-পাঁচ কিলোমিটারজুড়ে অধিক জ্বালানি পোড়ানো এবং সময় ব্যয় হচ্ছে। অথচ মোড়ে জট সর্বক্ষণ লেগেই থাকে। মানুষ চলমান যানের সামনে দিয়ে হেঁটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হয়। শুধু মাঝের একটি কাটা মুক্ত করে দিলে এ সমস্যা মিটে যায়। এ প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ট্রাফিকের বক্তব্যবিদেশে এত ঘন ঘন রাস্তায় কাটা থাকে না। সে ক্ষেত্রে সদরঘাট থেকে টঙ্গী পর্যন্ত সব রাস্তাই কাটা বা ইন্টার সেকশন বন্ধ করে দিলে (ডিএমপির অফিসের সামনেসহ) ৩০ মিনিটে সদরঘাট থেকে টঙ্গী যাওয়া সম্ভব হবে।

এবার দৃষ্টি দেব মহাসড়কের অবস্থার দিকে, হতাহতের ঘটনাগুলো যেখানে হয় বেশি। এর কারণ অনেক। মহাসড়কে বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, তেলের ট্যাংকার, লং ভেহিকলের পাশাপাশি সিএনজি, ইজি বাইক, লেগুনা, নছিমন, করিমন, ট্রাক্টর সবই চলে। যেখানে বড় গাড়িগুলোর গড় গতি ৭০ কিলোমিটার বা এর বেশি। অনিয়ন্ত্রিত গতিতে গাড়ি চালানো ও ওভারটেকিং যেখানে এটি সার্বক্ষণিক দৃশ্য, সেখানে ধীরগতির গাড়ির সহাবস্থান একটি নিত্যদিনের ঘটনা। প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা তো সেখানে সর্বক্ষণই থেকে যায়।

আমাদের যানবাহনের তুলনায় লাইসেন্সপ্রাপ্ত চালকের সংখ্যা এক-চতুর্থাংশ। বিদেশেও আমাদের চালকরা চাকরি করতে যাচ্ছে। অথচ আজ পর্যন্ত যানচালকের মতো একটি জনশক্তি তৈরির খাতে একটিও সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়নি। সময় এসেছে ঢাকাসহ সব বিভাগীয় শহরে সরকারি মোটর ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করা, যেখান থেকে বছরে অন্তত পাঁচ হাজার চালক (বিভিন্ন ধরনের) তৈরি সম্ভব হয়। সেই সঙ্গে প্রশিক্ষিত মোটর মেকানিকও এখান থেকে পাওয়া সম্ভব। প্রয়োজনে বেসরকারি স্কুলও প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। শিক্ষা, যোগাযোগ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এগুলো নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করতে পারে। বিআরটিএর কাজগুলো করার জন্য বেসরকারি খাতেও অংশত অর্পণ করা যায়। যেমনগাড়ির ফিটনেস দেওয়া, লাইসেন্স ইস্যু ইত্যাদি। এত আন্দোলন, কর্মসূচি, ট্রাফিক সপ্তাহ, ট্রাফিক মাস, আদেশ, নিষেধাজ্ঞা, প্রচেষ্টার পরও মনে হচ্ছে অবস্থার এতটুকু হেরফের হয়নি। মহাসড়কে সব ধরনের যান চলাচল, দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, বিপজ্জনক ওভারটেকিং, নগরে সর্বত্র বাস স্টপেজ, বাঁকা করে বাস দাঁড় করানো, রেষারেষি করে চালানো, দৈনিক ভিত্তিতে চালক নিয়োগসবই চলছে আগের মতো। পুলিশ ব্যস্তসমস্ত হয়ে দৌড়ঝাঁপ দিচ্ছে; কথা শুনছে না সংশ্লিষ্টরা। জেব্রা ক্রসিং নেই যথাস্থানে। সড়কের একটি অংশ বেদখল হয়ে আছে এখনো। এর মধ্য দিয়েই এগোতে হবে। ছয় কম্পানির উন্নত বাস সার্ভিস এবং মেট্রো রেল হচ্ছে টেকসই সমাধান। এর পরও এসব ব্যবস্থা কিছুটা হলেও সড়কে দুর্ঘটনা কমাবে যেমন১. আনফিট গাড়ি বন্ধ, ২. অদক্ষ চালক গাড়ি চালাবে না, ৩. নিয়ন্ত্রিত গতিতে গাড়ি চালানো, ৪. ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধ, ৫. চালকের ক্লান্তি, ৬. চলন্ত চালকের মোবাইলকে না বলা, ৭. যাত্রী নেওয়ার রেষারেষি বন্ধ করা, ৮. যত্রতত্র পথ পারাপার বন্ধ করা, ৯. মহাসড়কে ধীরগতির যান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ, ১০, উড়াল সেতুতে ওভারটেকিং পূর্ণ নিষেধ করা। একটা কথা, পুলিশসহ সবাইকে মনে রাখতে হবে যে সড়কে শৃঙ্খলা ও যানের গতি সাবলীল করা পুলিশের একক দায়িত্ব নয়। পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ও সুবিধাভোগী সবাইকে একযোগে এগিয়ে আসতে হবে। সমাজপতিদের কথা, তাঁরা সুবিধাভোগী হবেন এবং পুলিশ সাধুসন্তের মতো চেয়ে থাকবে এবং সব ঠিক করে দেবে, তা কখনোই হবে না। একটি পুরনো ঘটনা মনে পড়ল। সেটি ১৯৮৬ সাল। এক সেমিনারে বিলেতে বসবাসকারী এক ভদ্রলোক বিলেতের পুলিশের সক্ষমতা ও ভালো কাজের প্রশংসা শেষে বলা শুরু করলেন আমাদের পুলিশের আচরণ সম্পর্কে। সব বিষ উদিগরণ শেষে থামলেন। শেষ বক্তা হিসেবে তাঁকে শুধু স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম যে দুধ ছানলে মাখন হয়। পানি ছানলে কী হয়? শুধুই পানি। বিলেতের পুলিশ বিলেতের জনগণ থেকে এসেছে। আমাদের পুলিশ আমাদের জনগণ থেকে এসেছে। পুলিশের কাছ থেকে প্রত্যাশামতো কাজ পেতে হলে আগে আমাদের ঠিক হতে হবে। উদাহরণ ঢাকা সেনানিবাসের ভেতরে ইউরোপের মতো ট্রাফিক শৃঙ্খলা, জাহাঙ্গীর গেট পার হলে বাংলাদেশি রূপ। সবশেষ বলব, আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন হবে, আমরা বদলাব, সে জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। কারণ প্রিয় ঢাকা আমাদের প্রাণপ্রিয়, বাংলাদেশও আমাদের।

লেখক : সাবেক আইজিপি

মুক্তধারা- এর আরো খবর