English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

কারাগারে আদালত স্থাপন কি অসাংবিধানিক

আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী রাগিব

  • ১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

বিতর্ক আর রাজনীতি যেন দুই হরিহর আত্মা! যেখানেই রাজনীতি, সেখানেই বিতর্ক। বিতর্কের আগুনে হরহামেশাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে রাজনীতির মাঠ। দেশীয় রাজনীতির সাম্প্রতিক বিতর্কের নাম কারাগারে খালেদার বিচার। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় কারাগারে আদালত বসানো নিয়ে চলছে তুমুল বাহাস। প্রকাশ্য বিচারের যুক্তিতে বিএনপি বলছে, কারাগারে আদালত স্থাপন সংবিধানের লঙ্ঘন। বলছে, এ বিচার ক্যামেরা ট্রায়াল। বিপরীতে সরকার বলছে, সংবিধান মেনেই পুরনো কারাগারে অস্থায়ী আদালত স্থাপন করা হয়েছে। কার কথা সত্য? চলুন আইনের চোখে বিষয়টির অলিগলি চেনা যাক। খোলা যাক তর্কের জট!

এটা ঠিক, প্রকাশ্য বিচার লাভ প্রত্যেক নাগরিকের অবিচ্ছেদ্য মৌলিক অধিকার। এ নিয়ে সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদের দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা : ফৌজদারি অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দ্রুত ও প্রকাশ্যে বিচারলাভের অধিকারী হবেন। লক্ষ করুন, প্রকাশ্য বিচারের জন্য এখানে১. আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং ২. স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আদালতের কথা বলা হচ্ছে। আর ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে ওই আইনের উৎসমুখ ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি। ওই বিধির ৯(২) ধারায় বলা হচ্ছে, সরকার সরকারি গেজেটে সাধারণ অথবা বিশেষ আদেশ জারি করে কোন জায়গায় দায়রা আদালত বসবে, তা নির্ধারণ করতে পারে। অর্থাৎ দায়রা আদালতের স্থান নির্ধারণের বিষয়টি সরকারের এখতিয়ারে। তা ছাড়া কখন, কী কারণে কিংবা কোন পরিস্থিতিতে সরকার এ ধরনের সাধারণ বা বিশেষ আদেশ জারি করবে; আইনে তারও কোনো সুনির্দিষ্টতা বা স্পষ্টতা নেই। তার অর্থ দাঁড়ায়, সরকার চাইলে যেকোনো মামলায়, যেকোনো সময়, যেকোনো প্রয়োজনে, যেকোনো স্থানে দায়রা আদালত বসাতে পারে। অর্থাৎ এটা সরকারের একান্ত নিজস্ব বিবেচনা ও ক্ষমতাধীন একটি বিষয়। উল্লেখ্য, খালেদা জিয়ার মামলাটি দায়রা আদালতের ক্ষমতা ও মর্যাদাসম্পন্ন বিশেষ আদালতে বিচারাধীন।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সরকার ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ তারিখের একটি গেজেটে প্রকাশিত বিশেষ আদেশের মাধ্যমে নাজিমুদ্দীন রোডের পুরনো কারাগার ভবনে অস্থায়ী আদালত বসানোর নির্দেশ দেয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৯(২) ধারা ও সংবিধানের ৩৫(৩) অনুচ্ছেদের আইনের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত আদালতের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে কারাগারে আদালত স্থাপনে আইন বা সংবিধানের লঙ্ঘনটা হলো কোথায়? সাত মাস ধরে মামলাটি ঝুলে আছে। কারণ একটিই, খালেদা জিয়ার অসুস্থতাজনিত গরহাজিরা। ৫ সেপ্টেম্বর নতুন আদালতে শুনানির প্রথম দিনেই খালেদা জিয়া নিজেই স্বীকার করেছেন, তিনি অসুস্থ। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। ওই দিন তিনি কারাগারে এসেছিলেনও হুইলচেয়ারে করে। এতে কারাগারে আদালত স্থাপিত হওয়ায় কার্যত খালেদা জিয়ার উপকার হওয়ারই তো কথা। কিন্তু ঘটনা গড়াল অন্যদিকে। এরই নাম বুঝি রাজনীতি!

তবে একটি প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক। কারাগারে স্থাপিত আদালতের বিচার কি প্রকাশ্য বিচার (Public Trial), নাকি রুদ্ধদ্বার বিচার বা ক্যামেরা ট্রায়াল?

প্রকাশ্য বিচার বলতে সাধারণভাবে জনসমক্ষে বা দৃশ্যমান বিচারকে বোঝায়; যেখানে মামলার পক্ষগুলো উপস্থিত ও বিচারিক কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছে। একই সঙ্গে জনগণও সেই বিচারিক কার্যক্রম দেখার সুযোগ পাচ্ছে। প্রকাশ্য বিচারের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে বিচারক প্রয়োজনে আদালত কক্ষে বিচারের সঙ্গে সম্পর্কহীন ব্যক্তিদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না।

বরং, ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৫২ ধারায় বলা হচ্ছে, কোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্ত বা বিচারের সময় ধারণক্ষমতা সাপেক্ষে আদালত কক্ষে জনসাধারণের প্রবেশের সুযোগ থাকতে হবে। তবে আদালত চাইলে যেকোনো সময় আদালত কক্ষে ওই প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করতে পারেন। এটি আদালতের একান্তই নিজস্ব বিবেচনা। তা ছাড়া একটি মামলার রায়ে উচ্চ আদালত বলছেন, কারাগারে বিচার অনুষ্ঠান বেআইনি নয়। তবে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা আইনজীবীদের আদালত কক্ষে প্রবেশ করতে না দেওয়াটা বেআইনি বলে গণ্য হবে। (২ ডিএলআর ৪০)

কারাগারের আদালতে খালেদার মামলার পক্ষগুলো বা সংশ্লিষ্ট লোকজন, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ কমবেশি সবার প্রবেশাধিকার ছিল। শুধু নিরাপত্তার স্বার্থে মামলার সঙ্গে সম্পর্কহীন লোকের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। প্রচলিত যেকোনো অর্থে এবং আইনানুগ বিবেচনায় তা প্রকাশ্য বিচার।

বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা কারাগারে খালেদা জিয়ার বিচারকে বারবার ক্যামেরা ট্রায়াল হিসেবে অভিহিত করে পুরো বিষয়টিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছেন। অথচ প্রকৃত চিত্রটি কিন্তু ভিন্ন।

সাধারণভাবে একজন বিচারক যখন তাঁর নিজস্ব খাসকামরায় (প্রকাশ্য এজলাস নয়) অথবা কোনো রুদ্ধদ্বার কক্ষ বা এজলাসে সাক্ষ্য ও জবানবন্দি এবং জেরা গ্রহণ করেন তথা বিচারকার্য পরিচালনা করেন, সেটিই হলো ক্যামেরা ট্রায়াল। সে সময় বিচার কক্ষে শুধু মামলার পক্ষগুলো ও তাদের আইনজীবী (অনেক ক্ষেত্রে ভিকটিম) উপস্থিত থাকেন। প্রচলিত আইনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ক্যামেরা ট্রায়ালের কথা বলা হয়েছে; যেমনপারিবারিক আদালত অধ্যাদেশ, ১৯৮৫-এর ১১ ধারা এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ২০(৬) ধারায় ক্যামেরা ট্রায়ালের সুযোগ রাখা হয়েছে।

ক্যামেরা ট্রায়ালকে আপাতদৃষ্টিতে ন্যায়বিচারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হতে পারে। কিন্তু ন্যায়বিচারের স্বার্থেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং কার্যকর। যেমনধর্ষণ মামলায় উন্মুক্ত আদালতে জনসমক্ষে জবানবন্দি দেওয়া ধর্ষিত নারীর (ভিকটিম) জন্য প্রচণ্ড অস্বস্তিকর এবং অপমানকর। তা ছাড়া প্রতিপক্ষের আইনজীবীর নানা ধরনের জেরাও ভিকটিমকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দেয়। অন্যদিকে ধর্ষণের বিবরণ শুনতে উত্সুক জনতাও আদালতে ভিড় জমায়। এমন পরিস্থিতিতে ন্যায়বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই এ ক্ষেত্রে ক্যামেরা ট্রায়াল হলেই বরং ভিকটিমের পক্ষে জবানবন্দি দেওয়া সহজ হয়। আইনে উল্লেখ থাকলে এমন ট্রায়াল সংবিধানবিরুদ্ধ নয় [৩৫(৬) অনুচ্ছেদ]। উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট, কারাগারে আদালত বসিয়ে খালেদা জিয়ার বিচার কোনোভাবেই ক্যামেরা ট্রায়াল নয়। একই সঙ্গে তা সম্পূর্ণ বৈধ ও সংবিধানসম্মত। তবে গেজেটটি শুনানির আগের দিন না হয়ে আরো আগে প্রকাশ পেলে বেশি গ্রহণযোগ্য হতো।

লেখক : আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক

aftabragib2@gmail.com

মুক্তধারা- এর আরো খবর