English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য কী?

হীরেন পণ্ডিত

  • ৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

কেন আমরা শিক্ষা গ্রহণ করি? শিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্য কী? এ প্রশ্ন সবার মনে আসাটাই স্বাভাবিক। কেন আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়? এর উত্তর হয়তো বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে দেবেন। আমরা জানি শিক্ষা মানুষকে সমাদৃত করে, মানুষের মধ্যে চেতনাবোধ জাগ্রত করার জন্য কাজ করে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, বাস্তববাদী ও যুক্তিবাদী করে গড়ে তোলা। কিন্তু এ কথা আবার সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না-ও হতে পারে, অনেক ব্যক্তি আছেন, যাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি; কিন্তু বাস্তববাদী ও যুক্তিবাদী হিসেবে সমাজে তাঁরা সমাদৃত হয়ে আছেন সম্মানের পাত্র হিসেবে। তবে এ ক্ষেত্রে স্বশিক্ষাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করার বা খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। কেননা শিক্ষিত হলেই যে একজন মানুষের ভেতরের ভালো ভাবনাগুলো জাগ্রত হবে, সেটিও ঠিক নয়। শিক্ষার আরো একটি কাজ হলো মানুষকে আলোকিত করা, আলোকিত সমাজ গঠন করা। আবার অনেক অশিক্ষিত মানুষের কাছ থেকে আমরা শিক্ষিত একজন মানুষের চেয়েও বেশি মেধা ও মননশীল গুণাবলি খুঁজে পেতে পারি। পৃথিবীতে অনেক মনীষী আছেন, যাঁরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেননি। তবে সব ক্ষেত্রেই ব্যতিক্রমকে অস্বীকার করার উপায় নেই। প্রথাগত যে শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলিত আছে, তাতে প্রকৃত সৃজনশীল প্রতিভাধর মানুষ তৈরি হচ্ছে খুব কম। এর মূল কারণ হচ্ছে, মননশীলতা ও উন্নত চিন্তাধারা সৃষ্টির বিষয়টিকে পুরোপুরি অবহেলা করা হয়েছে বা কম গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। আরেকটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে বলা প্রয়োজন, তা হলো শিক্ষা যে গবেষণার বিষয় হতে পারে সে ধরনের মনোভাব এখন পর্যন্ত আমাদের মধ্যে খুব একটা গড়ে ওঠেনি বা এই প্রবণতা খুব একটা তৈরি হয়নি।

শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। প্রকৃত শিক্ষার মাধ্যমে একজন মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হয়। শিক্ষা হতে হবে মানসম্মত। আর দেশে মানসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু তার পরও শিক্ষা খাতে দুর্নীতির ভূত বারবার গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। শিক্ষানীতির খণ্ডিত বাস্তবায়ন ও শিক্ষা আইন প্রণয়নে অস্বাভাবিক ধীরগতি সেই ঘটনাগুলোকেই বারবার উসকে দেয়। শিক্ষা খাতে দুর্নীতি জাতিকে মেরুদণ্ডহীন করার অপচেষ্টার শামিল। শিক্ষা নিয়ে আর হেলাফেলা করার দিন নেই। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। একটি জাতি শিক্ষায় যত উন্নত সেই জাতির উন্নতির মাত্রাও তত বেশি। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস না করে, তাদের সঠিকভাবে শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব আমাদের সবার। সেখানে শিক্ষকদের যেমন দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি মা-বাবার দায়িত্ব রয়েছে, নাগরিক সমাজের ভূমিকা রয়েছে, তেমনি প্রশাসনেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যে খারাপ পরিস্থিতি আছে তা থেকে আমাদের বের হয়ে আসার রাস্তা খুঁজে বের করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন একটি সম্মিলিত প্রয়াস। আমাদের সমাজে যে অস্থিরতা চলছে, শিক্ষাও কিন্তু এর বাইরে নয়। দিন যত যাচ্ছে পরিস্থিতি ততই নাজুক হচ্ছে। সবাইকে মিলেই এই অস্থিরতা ও ধ্বংসের হাত থেকে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষা করতে হবে।

শিক্ষা খাতে পাসের হার বাড়লেই শিক্ষার গুণগত মান বাড়ে না। গুণগত মান বাড়াতে শিক্ষাকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা, শিক্ষকদের উন্নত প্রশিক্ষণ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, পিছিয়ে পড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ নজর দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণার ক্ষেত্রে যে সম্পর্ক গড়ে তোলা দরকার, তা তারা এক ধরনের অপব্যয় হিসেবে চিন্তা করে। ফলে একমাত্র সরকারই আইনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সম্পর্কের সেতুবন্ধ তৈরি করতে পারে। আর এ ধরনের সম্পর্ক যদি গড়ে তোলা যায়, তবে বাংলাদেশ উন্নত রাষ্ট্রের যে ধারণা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, তা ত্বরান্বিত হবে।

আমরা সৃজনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার কথা বললেও বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হচ্ছে সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধরনের গবেষণা নেই। ফলে লেখাপড়ার চাপে পড়ে একজন শিক্ষার্থী তার পাঠ্য বইয়ের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখছে। পাঠ্য বইয়ের বাইরেও যে শিক্ষা ও জ্ঞানের আরো উপাদান রয়েছে, তা তার অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। ফলে তার মধ্যে কল্পনাশক্তির বিষয়টি গৌণ হয়ে যাচ্ছে। আর যখন কল্পনাশক্তি তৈরি হচ্ছে না তখন প্রকৃত সৃজনশীল মানুষ তৈরির বিষয়টি মুখ্য না হয়ে গৌণ হয়ে পড়ছে। ফলে উন্নত ও উদার চিন্তাধারা না থাকায় এক ধরনের আজগুবি চিন্তাধারার যান্ত্রিক সমাজ গড়ে উঠছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে শিক্ষার্থীর প্রকৃত ও নিজস্ব কল্পনা এবং চিন্তাশক্তি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে বিকশিত হচ্ছে না।

শিক্ষিত হয়ে মানুষ যদি শিক্ষাকে কাজে না লাগায়, নিজের শিক্ষাকে দুর্নীতির অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, সে ক্ষেত্রে শিক্ষা তার সফলতার দ্বার উন্মোচন করতে পারে না। যে শিক্ষা মানুষকে আলোকিত করতে পারে না, মানুষের চেতনাবোধকে জাগ্রত করতে পারে নাএখানেই শিক্ষা গ্রহণের ব্যর্থতা। অবশ্য মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করে কিভাবে তা কাজে লাগায় তার ওপর নির্ভর করে শিক্ষার সফলতা ও ব্যর্থতা।

লেখক : প্রাবন্ধিক

hirenpandit01@yahoo.com

মুক্তধারা- এর আরো খবর