English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

উত্তরাঞ্চলে চিকিৎসা বাণিজ্য

ড. শফিক আশরাফ

  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

রংপুর অঞ্চলে মানুষের তুলনায় চিকিৎসাব্যবস্থা অপ্রতুল; যদিও সারা দেশেই আনুপাতিক হারে মানুষের বিপরীতে যতজন চিকিৎসক থাকা দরকার ততজন নেই। বাংলাদেশের পশ্চাৎপদ অঞ্চল উত্তরবঙ্গ তথা রংপুরে এই চিত্র অনেকটা অমানবিক বলা চলে। বিভিন্ন সময় পত্রিকায় খবর আসে, দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা কেউই ঢাকার বাইরে থাকতে চান না! সরকারের চাপাচাপিতে বিভিন্ন সময় তাঁদের মফস্বল তথা ঢাকার বাইরে বদলি করা হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তাঁরা আবার ঢাকায় ফিরে আসেন। তাঁদের যুক্তি, ঢাকার বাইরে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের চিকিৎসা করার মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে! ফলে একটু ভালো চিকিৎসা পাওয়ার আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার রোগী ঢাকা শহরে ছুটে আসে। সেখানে এসে যথাযথ চিকিৎসা কতটা পায়, সেটি এক গবেষণার বিষয়। আমার এক বন্ধু চিকিৎসক গল্পচ্ছলে একদিন আমাকে বলেছিলেন, চিকিৎসকদের বড় একটা অংশের ভেতর শুধু যে প্রফেশনালিজমের অভাব তা-ই নয়, চিকিৎসক হিসেবে যাত্রা শুরুর কিছুদিনের মধ্যে তাঁদের শপথবাক্যের কথা ভুলে যান! রোগীকে একটা পণ্য ছাড়া আর কিছুই ভাবেন না!

সব চিকিৎসকের ক্ষেত্রে যেমন এ রকম ঢালাও মন্তব্য সঠিক নয়, তেমনি আবার এই মানসিকতা একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যায় না। প্রতিবছর হাজার হাজার রোগী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যাচ্ছে চিকিৎসা করাতে। বিশেষ করে, কলকাতা, ভেলোর, বেঙ্গালুরু যেসব রোগী যায় তার বড় একটা অংশ বাংলাদেশি! এর কারণ কী? কয়েক বছর আগে আমার এক ছাত্রীর হাত-পা হঠাৎ করেই কিছুটা ফুলে যায়। তেঁতুলিয়া থেকে তার মা-বাবা ছুটে আসে রংপুর সদরে তার চিকিৎসার জন্য। এখানকার চিকিৎসক কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, তার ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে! ছয় মাসের মধ্যে সে এক্সপায়ার করবে! চোখের পানি মুছতে মুছতে তার মা-বাবা তাকে ঢাকায় নিয়ে যান। সেখানে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালে একই কথা বলা হয়। এরপর তাঁরা বাংলাদেশি চিকিৎসকদের রিপোর্ট নিয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে চিকিৎসকরা আমার ছাত্রীর বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বাংলাদেশি রিপোর্টগুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁরা জানান, ব্লাড ক্যান্সারট্যান্সার কিছুই হয়নি! দীর্ঘদিন অ্যাজমাটিক ওষুধ গ্রহণের ফলে তার রক্তে অ্যালার্জেন বেড়ে গেছে! ইনহেলারের মাধ্যমে যে ওষুধগুলো সে গ্রহণ করে, তা কিছুদিন বন্ধ রাখলে রোগী ঠিক হয়ে যাবে। তাঁরা তাকে কোনো ওষুধ দেননি। সেই ছাত্রী সামনে মাস্টার্স পরীক্ষা দেবে। ভালোভাবে বেঁচে আছে। তার ওপর দিয়ে কী গেছে, সেটি ভাবলে আমি এখনো দীর্ঘশ্বাস ফেলি! চিকিৎসায় ভুল হতে পারে! কিন্তু যখন চিকিৎসকরা ভালো কমিশনের লোভে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা অনুমোদনহীন কোনো ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীকে পাঠান টেস্ট করাতে তখন তাঁদের প্রফেশনালিজম প্রশ্নবিদ্ধ হয়! আর এটা শুধু ঢাকা বা রংপুর নয়, সারা দেশেরই একই চিত্র! কথায় বলে, ঘ্রাণে অর্ধভোজন অর্থাৎ খাবারের গন্ধেই অর্ধেক ভোজন হয়ে যায়। তেমনি চিকিৎসকদের আচরণে রোগীর অর্ধেক রোগ সেরে যায়। আমার মা এক জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তাঁকে ছয় মাস পর পর ভেলোরের খ্রিস্টান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানকার চিকিৎসকদের আচরণ-আন্তরিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। সেখানে দেখেছি, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা নার্সদের পাশাপাশি প্রতিদিন এসে রোগীর বিছানা ঝেড়ে দেন, চাদর পাল্টে দেন! আর আমরা কী করছি! কিছুদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপককে ধরে পিটিয়েছেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা! সেখানে সমস্যা ছিল, চলতে গিয়ে অধ্যাপকের সঙ্গে এক ইন্টার্ন চিকিৎসকের ধাক্কা লেগেছিল! প্রায়ই পত্রিকায় খবর আসে, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রোগীর আত্মীয়স্বজনকে ধরে পিটান বা কোনো গণ্ডগোলে তাঁরা কর্মবিরতিতে যান। যাঁদের তৈরিই করা হয়েছে মানবসেবার জন্য তাঁদের এসব অমানবিক আচরণ দুর্ভাগ্যজনক। অর্থাৎ চিকিৎসক হিসেবে যাত্রা শুরুটাই একটা অসুস্থ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে! এই অসুস্থতার উৎসমূলটা খুঁজে বের করা জরুরি।

আমার ধারণা, রোগীদের বড় একটা অংশ দেশের বাইরে যায় চিকিৎসকদের আচরণগত সমস্যার কারণে। তাঁরা হয়তো বলবেন, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রোগী সামলাতে হয় বলে তাঁদের মেজাজ-মর্জি সব সময় ঠিক থাকে না! তাহলে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে প্রাইভেট চেম্বারে রোগীদের সঙ্গে তাঁরা তুলনামূলক ভালো আচরণ করেন কেন!

রংপুরে চিকিৎসকের সংখ্যা অপ্রতুল; কিন্তু ডায়াগনস্টিক সেন্টার কিংবা ক্লিনিকের সংখ্যা অপ্রতুল নয়! এখানে চিকিৎসাসেবার জন্য রয়েছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। পার্শ্ববর্তী সব জেলা; যেমনপঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সাধারণ রোগীরা রংপুর মেডিক্যাল কলেজে আসে চিকিৎসাসেবা নিতে। সেখানে তাদের জন্য ওত পেতে থাকে বিভিন্ন ক্লিনিকের দালালচক্র, যদিও প্রায় হাসপাতালজুড়ে দালালচক্র থেকে সাবধান লেখা পোস্টার সাঁটা রয়েছে! কিন্তু গ্রাম থেকে আসা অসহায় রোগী চেনে না কে দালাল আর কে শুভাকাঙ্ক্ষী! শোনা যায়, হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং চিকিৎসকদের একটা অংশ জড়িত এই চক্রের সঙ্গে! ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের চিকিৎসাস্থল। প্রতিবছর গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ চিকিৎসা নেয় এই হাসপাতাল থেকে। প্রতিদিন জরুরি চিকিৎসাসেবা নেওয়ার জন্য আসে আরো প্রায় ৫০০ জন। হাসপাতালের একটি বিভাগে প্রায় ১৫০০ থেকে ১৬০০ রোগী ভর্তি থাকে। কিন্তু মানুষের চিকিৎসাসেবার এই আশ্রয়স্থল নানা সমস্যায় জর্জরিত। হাসপাতালের লিফট কিংবা লাশ সংরক্ষণের ফ্রিজ বেশির ভাগই নষ্ট। বাথরুমগুলো নষ্ট কিংবা পানির কল নেই তা-ই নয়, প্রায় প্রতিটি বাথরুম দুর্গন্ধযুক্ত, নোংরা এবং ব্যবহারের অযোগ্য। রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতির বড় একটা অংশ প্রায়ই নষ্ট থাকে। ফলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরের ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ছুটতে হয়! রোগীকে সাহায্যের অসিলায় কোথায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে, সেটি হাসপাতাল থেকে বলে দেওয়া হয়! আর সাধারণ মানুষগুলো বুঝেও না বোঝার মতো ছুটে যায় নির্দিষ্ট করে দেওয়া ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। চিকিৎসার এই বিষয়গুলোকে চিকিৎসাসেবা না বলে চিকিৎসা বাণিজ্য বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। অন্যদিকে নকল ও ভেজাল ওষুধ, ভুয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ভুয়া চিকিৎসক ইত্যাদি প্রায় প্রতিদিনের পত্রিকার খবর! বাণিজ্যের সঙ্গে যখন সেবা দেওয়া মানুষগুলো জড়িত থাকে তখন সর্বসাধারণ বড় অসহায় হয়।

চিকিৎসা বাণিজ্যের শিকার উত্তরাঞ্চলের এই মানুষগুলো নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। তারা দীর্ঘদিন নানা ধরনের জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত ছিল। বঙ্গবন্ধু সেতু সমগ্র দেশের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ অনেক সহজ করে দিয়েছে। তারা যেমন দেশকে চিনছে, দেশও তাদের নানাভাবে নানা কাজে পাচ্ছে। দেশের চাকা সচল রাখতে তাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়া দরকার। আর এ জন্যই এখানকার চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

লেখক : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

shafiqibs@yahoo.com

মুক্তধারা- এর আরো খবর