English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

জনপ্রতিনিধিদের কাছে প্রত্যাশা

এ কে এম আতিকুর রহমান

  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

লেখাটি শুরু করতে চাই আমাদের পাশের দেশ ভারতের দুটি উদাহরণ উদ্ধৃত করে। আমাদের জানা আছে, এ পি জে আবদুল কালাম ছিলেন ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি (২০০২-০৭)। মূলত তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞানী। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে শিলংয়ে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্ট আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন চিরকুমার। মৃত্যুর পর যে সম্পদ তিনি রেখে যান তা হলোকতগুলো বই, ব্যবহৃত কাপড়চোপড়, তাঁর প্রিয় বাদ্যযন্ত্র বীণা, একটি ল্যাপটপ ও একটি সিডি প্লেয়ার। তাঁর কোনো টেলিভিশনও ছিল না।

এইতো সেদিন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মানিক সরকার। দীর্ঘ ২০ বছর (১৯৯৮-২০১৮) ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি যে বেতন পেতেন সবই দান করে দিতেন তাঁর দল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার তহবিলে। তবে বিনিময়ে পার্টি থেকে তাঁকে ১০ হাজার টাকা মাসিক ভাতা দেওয়া হতো। এ বছরের নির্বাচনে পরাজিত হলে তিনি সরকারি বাসভবন ছেড়ে দেন এবং বর্তমানে দলের অতিথিশালায় থাকছেন। কারণ তাঁর নিজস্ব কোনো বাড়িঘর নেই। এমনকি তাঁর কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোবাইল ফোনও নেই। মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছেড়ে আসার সময় তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে মাত্র দুই হাজার ৪১০ টাকা পাওয়া যায়। তাঁকে কখনো আয়কর হিসাব জমা দিতে হয়নি।

আসলে এই উদাহরণ দুটি উদ্ধৃত করার পেছনে আমার এমন কোনো আশা বা উদ্দেশ্য নেই যে আমাদের জনপ্রতিনিধিরাও তাঁদের মতো হবেন। আমি কেমন করে ভাবব যে আমাদের জনপ্রতিনিধিরা তাঁদের মতোই এতটা কৃপণ ও নিজেদের প্রতি উদাসীন হবেন? বালাই ষাট! স্বপ্নেও যে এমনটা ভাবা যায় না। এমনটা ভাবলে অন্যরা সন্দেহ করতে পারেন যে এ দেশের মাটিতে আমার জন্ম কি না। যা হোক, যাঁরা বাংলাদেশের বাস্তবতাকে বোঝেন এবং ভবিষ্যতে অভাবনীয় কিছু ঘটে যাওয়ার প্রত্যাশা করেন, তাঁদের সঙ্গে আমার অনুভূতিকে ভাগ করা ছাড়া আর কোনো উদ্দেশ্য নেই।

বলতে গেলে, গণপ্রতিনিধিত্ব আমাদের গণতন্ত্রে এক ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ সম্পর্ক হিসেবে দাঁড়িয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের তত্ত্ব ও অনুশীলন কখনো ঘনিষ্ঠভাবে বিন্যাসিত না থাকার কারণে এই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। তত্ত্বগতভাবে, নাগরিকদের তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বিশ্বাস করা উচিত এবং এই প্রতিনিধিদের শুধু নাগরিকদের স্বার্থেই নিজেদের নিয়োজিত রাখা উচিত। কিন্তু বাস্তবে এ রকম চিত্র খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। আসলে তৃতীয় বিশ্বে গণতন্ত্রের দৃশ্যটি সম্পূর্ণ ভিন্নতর। তাই আমরা চিন্তাও করতে পারি না যে আমাদের প্রতিনিধিরা তাঁদের নিজস্ব কল্যাণের পরিবর্তে জনগণের পাশাপাশি দেশের স্বার্থে নিজেদের উৎসর্গ করবেন।

জনপ্রতিনিধিরাও অন্যান্যের মতো এই সমাজের সদস্য। কিন্তু তাঁরা এমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়ে থাকেন, যাঁদের মধ্যে সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি বিদ্যমান। প্রকৃতপক্ষে জনগণ ও দেশকে সেবা করার জন্যই জনগণ তাঁদের নির্বাচিত করে থাকে। ভোটাররা ভোটদানের মাধ্যমে তাঁদেরই প্রতিনিধি নির্বাচন করে যাঁরা তাঁদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন বলে জনগণ বিশ্বাস করে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে খুব কম মানুষই এ রকমটি দেখতে পায়, যেখানে প্রতিনিধিরা জনগণের স্বার্থ পূরণে নিষ্ঠাবান হন। এ দেশে নির্বাচনে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। তাই নির্বাচিত হয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুনাফাসহ বিনিয়োগ করা অর্থ সংগ্রহ করতেই জনপ্রতিনিধিরা সর্বাধিক প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ রাজনীতিকে অনেকটা ব্যবসায় পরিণত করা হয়। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার কয়েক দিনের মধ্যেই জনগণ ওই উদ্দেশ্যটা অনুধাবন করতে শুরু করে।

সাধারণত দেখা যায় যে ভোটাররা যেমন রাজনীতিবিদদের বিশ্বাস করে না, তেমনি রাজনীতিবিদরাও তাঁদের নিজস্ব দল ও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন। স্বভাবতই এ পর্যায়ে খোদ গণতন্ত্রের অস্তিত্ব সম্পর্কেই প্রশ্ন ওঠেরাজনীতিবিদ ও জনগণের মধ্যে বিদ্যমান এ ব্যবধান কি সংশোধিত করার কোনো উপায় নেই? এটি কি তবে একটি প্রয়োজনীয় দুষ্ট ক্ষত হিসেবেই রয়ে যাবে? তা-ই যদি হয়, তাহলে গণতন্ত্রের ঘণ্টা বেঁধে আমরা এত আওয়াজ করছি কেন? এতে তো দুই পক্ষেরই ক্ষতি। সর্বোপরি, দেশের ক্ষতি।

জনপ্রতিনিধিত্বের সঙ্গে জড়িত কয়েকটি জনপ্রিয় অসন্তুষ্টির অন্যতম হচ্ছেজনগণের মধ্যে দেশের গণতন্ত্রের প্রতি যত্নশীল না হওয়ার প্রবণতা এবং নির্বাচিত ব্যক্তিদের গুণগত মান নিয়ে জনগণের উদ্বিগ্নতা। রাজনীতিবিদদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে শুধু নির্বাচনের সময়ই নয়, তাঁদের আচরণকে জনগণ সর্বদাই যাচাই করে যাচ্ছে। আর যাচাইয়ের ব্যাপারে ভোটারদের সন্দিহানই মূলত কাজ করে থাকে। রাজনৈতিক বিশ্বাস শর্ত সাপেক্ষে যেমন সেবা প্রদানের মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে, তেমনি সেবা প্রদানে ব্যর্থ হলে সেই বিশ্বাস আর থাকে না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সত্য যে বাংলাদেশে এ দুটির কোনোটিই ঘটে না, বরং উল্টোটিই ঘটতে দেখা যায়।

সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে, রাজনীতিবিদ ও জনগণের মধ্যে অন্তত কিছুটা হলেও পরীক্ষিত বিশ্বাস থাকতে হবে, যা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। নিজস্ব বিচক্ষণতা অনুসারে রাজনীতি করার জন্য রাজনীতিবিদদের কিছুটা স্বাধীনতা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, বিচক্ষণতা বিশ্বাসেরই একটি সীমিত সহায়ক। তবে বিশ্বাসের সীমা অতিক্রান্ত হলে স্বচ্ছতার সম্মুখীন হতে হয়। আর সেটি মুহূর্তেই ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

সীমিত বিশ্বাস সাধারণ মানুষের মতো একজন জনপ্রতিনিধির ব্যর্থতাকে ভোটারদের কাছে কিছুটা সহনশীল করে তোলে। জনগণ রাজনীতিবিদদের কাছে সরকারি অর্থের হিসাব চাওয়ার অধিকার রাখে। একজন রাজনীতিবিদের সফলতার জন্য গ্রহণযোগ্য বিচক্ষণতার চূড়ান্ত অনুশীলনের প্রয়োজন এবং যদি ভোটাররা কার্যকর রাজনীতিবিদ প্রত্যাশা করে, তবে তাদের আপস, সমঝোতা বা আমলাতান্ত্রিক জট খুলে ফেলার উপায় খুঁজে বের করার বিষয়ে রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। এর অর্থ হচ্ছে, গণতন্ত্রে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা সব সময় কাম্য নয়। জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত সভায় এবং গণমাধ্যমের সামনে রাজনীতির কূটকৌশল নিয়ে আলোচনা অত্যন্ত সীমিত থাকা বাঞ্ছনীয়। একবার রাজনীতিবিদরা জনসাধারণের অবেক্ষণের মধ্যে পড়ে গেলে তাঁদের পক্ষে গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক স্বার্থগুলো আদায় করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাঁদের এমন পরিবেশ দরকার, যেখানে তাঁরা কৌশল প্রয়োগ, সম্মতি এবং আপস করার কাজগুলো করার অবকাশ পান। স্বচ্ছতা রাজনীতিবিদদের বাক্সবন্দি করে রাখার জন্য নয়। স্বচ্ছতা তাঁদের কার্যকর ভূমিকা রাখতে শক্তি ও সাহস জোগাবে। ভবিষ্যতের চলার পথকে কণ্টকহীন করে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।

রাজনীতি করা যেকোনো মুহূর্তেই নৈতিকতার বিচারে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে দুর্নীতি হচ্ছে একটি সর্বদা বিদ্যমান প্রলোভন। ভোটারদের কালেভদ্রে এবং নিয়মিত ঘটে যাওয়া অপকর্মের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। কালেভদ্রে দুর্নীতি করা হলেও তার শাস্তি হওয়া উচিত। কারণ এটিও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। যা-ই হোক, নিয়মিত করা অপকর্ম গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। যে জনপ্রতিনিধিকে কেনা বা বিক্রি করা যায়, তাঁকে জনগণ কেন ভোট দেবে?

গণতন্ত্রে সরকারি অর্থ ব্যবহারে কিছু মৌলিক সততা প্রয়োজন, সত্যের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখানো প্রয়োজন। যদি রাজনীতিবিদরা শুধু সত্যবাদী হওয়ার ভান করেন, তাহলে ভোটাররাও শুধু শোনার ভান করবে এবং গণতান্ত্রিক বিশ্বাস হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। গণতান্ত্রিক বিতর্কের সত্যতা একটি আপেক্ষিক বিষয় হতে পারে এবং গণতন্ত্রের অলংকার হিসেবে বিষয়টিতে সব সময়ই ভণিতা ও অগ্রাধিকার দেখা যায়। একটি মুক্ত গণমাধ্যম প্রতিশ্রুতি ও কর্ম, পরিকল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে বিদ্যমান ফাঁকফোকর জনসমক্ষে তুলে ধরে। একটি মুক্ত গণমাধ্যম সমাজের সমস্যাগুলো সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন তর্কবিতর্ক উপস্থাপনের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সর্বজনীন সত্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

একজন জনপ্রতিনিধি একটি প্রাতিষ্ঠানিক নৈতিকতার মধ্যে কাজ করেন, যা একটি অগ্রাধিকারক্রম অনুসরণে পথ চলে। এ ক্ষেত্রে দল প্রথম, সংবিধান দ্বিতীয় এবং বিবেক তৃতীয় স্থানে। তিনি আর তাঁর নিজের জন্য কথা বলেন না, যারা তাঁকে ভোট দিয়েছে তাদের জন্য কথা বলেন। ভোটারদের কাছ থেকে তাঁর কর্তৃত্ব এসেছেতাঁর আগে অর্জিত অবস্থান বা সম্মান থেকে নয়। স্বভাবতই এটা স্বীকার করতে হবে আপনি জনগণের সেবা করবেন এবং আপনার ব্যক্তিগত লক্ষ্যগুলো তাদের মতামতকেই প্রকাশ করবে। ম্যাক্স ওয়েবারের মহান প্রবন্ধ রাজনীতি একটি অবকাশ মতে, একজন রাজনীতিবিদ অবশ্যই নিজেকে একটি নীতিমালা দ্বারা চূড়ান্ত সমাপ্তির দিকে পরিচালিত করতে পারেন না। যদি তাঁরা ক্ষমতা অর্জন করতে চান, তবে তাঁদের দায়িত্বের একটি নীতিমালা মেনে চলতে হবেদল ও জনগণের সেবা করেই নয়, বরং ব্যক্তিগত বিবেক ও নৈতিক মতাদর্শকে অগ্রাধিকার প্রদান করে।

নির্বাচনের সময় রাজনীতিবিদদের কাছে ভোটাররা সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তি। বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন এ বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হতে পারে। জনপ্রতিনিধি হতে ইচ্ছুকরা এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে নিজ নিজ এলাকায় যাতায়াত করা শুরু করে দিয়েছেন। আমাদের রাজনীতিবিদরা এ পি জে আবদুল কালাম বা মানিক সরকার যেভাবে দেশ ও মানুষের সেবা করে গেছেন তেমন হবেন, তা আশা করার মতো দুঃসাহস আমার নেই। তবে তাঁদের মতো করে কিছুটা পথ এগোলেই আমরা তাঁদের নিয়ে গর্ব বোধ করব। কারণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাঁরাই হতে পারেন দেশ ও মানুষের সেবা করার সব কর্মের অনুপ্রেরণার উৎস, মানসিক শক্তি এবং অদম্য সাহসের জোগানদাতা।

লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব

মুক্তধারা- এর আরো খবর