English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সামগ্রিক উদ্যোগ ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না

  • ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

বিশৃঙ্খলায় ডুবে আছে পরিবহন খাত। সড়ক-মহাসড়ক বেহাল, নিয়ন্ত্রক ও তত্ত্বাবধায়ক সংস্থাগুলোর নজর পকেটের দিকে। ট্রাফিক আইন অকার্যকর। এর ফল হলো প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে, প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। অনেক দুর্ঘটনার খবর গণমাধ্যমে পৌঁছায়ই না। পরিবহন নৈরাজ্যের প্রধান কারণ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্ব পালনে অনীহা। চাঁদাবাজি চলছে দেখার কেউ নেই, রাস্তায় প্রতিযোগিতা চলছে, যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো হচ্ছে, অবৈধ গাড়ি চলছেএসব দেখারও কেউ নেই। সত্যিই যদি গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে হয় তাহলে সরকার ও প্রশাসনকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। ট্রাফিক পুলিশকে আন্তরিক ও সৎ হতে হবে। যারা টাকার বিনিময়ে ছাড়পত্র দেয় তাদের শাস্তি দিতে হবে। রাস্তাঘাটও ঠিক করতে হবে। সামগ্রিক উদ্যোগ ছাড়া শৃঙ্খলা আনা সম্ভব নয়। টেলিফোনে ও ই-মেইলে এ অভিমত জানিয়েছেন কালের কণ্ঠর পাঠকরা

► সড়কে বিশৃঙ্খলায় প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ অথবা পঙ্গুত্ব বরণ করে জীবনের সব স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে বেঁচে থাকছে। এহেন পরিস্থিতিতে স্ত্রীকে হতে হচ্ছে স্বামীহারা, ছেলে-মেয়েরা হচ্ছে বাবাহারা, আর মা হারাচ্ছেন তাঁর সন্তানকে। গোটা পরিবার পতিত হচ্ছে ধ্বংসের মুখে। রাঘব রোয়ালরা নিয়ন্ত্রণ করছে পরিবহন ব্যবসা। সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় যে অবস্থা আজকে, সেখানে উন্নতি আনতে হলে কী করা উচিত? আমার অভিমত, সুচিন্তিত কিছু স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদের কৌশল ও বাস্তবায়ন প্রকল্প হাতে নিতে হবে।

একজন ড্রাইভার কিভাবে ড্রাইভার হয়ে ওঠে, আমরা কি কখনো তা জানতে চেয়েছি? যে শিশুটি শুধুই খেতে পাওয়ার গ্যারান্টিতে কোনো এক গ্যারেজের অমানবিক নোংরা পরিবেশে ততধিক অস্বাস্থ্যকর আর ভারী কাজ নিয়ে জীবন শুরু করে সে-ই কালক্রমে হেলপার থেকে ড্রাইভার হয়। বেশির ভাগ ড্রাইভারের কাহিনিই এমন। তারা যে পরিবেশে কাজ করে সেটা সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি? চড়-থাপ্পড় লাঠির বাড়ি আর গালাগাল খাওয়া যাদের কাছে নিত্য ব্যাপার তাদের কাছে মানবিকতা বোধের কিছু কি অবশিষ্ট থাকে?

আমরা যার কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা আশা করি তার কাছে শব্দগুলো ভীষণ গোলমেলে। স্বল্প মেয়াদে তাদেরই প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। পুরস্কার-তিরস্কারের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের জনগণের চাহিদার কথা বোঝাতে হবে। মধ্য মেয়াদি পদক্ষেপগুলো হতে পারেসব উপজেলায় ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করা, কাজের পরিবেশের মান উন্নয়ন করা, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা প্রভৃতি। চাঁদাবাজ, ঘুষখোরদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করতে হবে। উন্নত দেশে লোকজন সেকেন্ডের হিসাবে চলে। গণপরিবহন তো বটেই ব্যক্তিগত পরিবহন আর মালবাহী পরিবহন ব্যবস্থাও ঘড়ির কাঁটায় মিল রেখে চলে। আমাদের পক্ষেও সম্ভব যদি আন্তরিক থাকি।

প্রত্যেক মানুষকেই মৃত্যুবরণ করতে হবে। কিন্তু দুর্ঘটনার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ কারোরই কাম্য নয়। আমরা সবাই চাই স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি। সড়ক দুর্ঘটনা যত বড় সমস্যা হোক না কেন সবার চেষ্টা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে এটি রোধ করা সম্ভব। যাতে আর কোনো মায়ের কোল খালি না হয় সে জন্য সচেতন হতে হবে সবাইকে।

এ কে এম আলমগীর

ওআর নিজাম রোড, চট্টগ্রাম।

► গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন। একদিকে জনসংখ্যার চাপ, অন্যদিকে গাড়ির স্বল্পতা। যানজট ও ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ রয়েছে। শ্রীপুর থেকে প্রচুর মানুষ চলাচল করত লেগুনায় গাজীপুর পর্যন্ত। লেগুনা বন্ধ হওয়াতে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে, তবে জ্যাম কমেছে। ভোগান্তি হলে গণপরিবহনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। দ্বিতল বাস হলে আরো বেশি ভালো হয়। বন্ধ করতে হবে লেন ভেঙে গাড়ি চালানো। ভাড়ার ব্যাপারটিতেও নজর দিতে হবে। স্কুল ও কলেজের সময়ও কিছু পরিবর্তন করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ঢাকা থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও করপোরেট অফিস স্থানান্তর করতে হবে।

সাঈদ চৌধুরী

শ্রীপুর, গাজীপুর।

► মানসিক পরিবর্তন প্রয়োজন। সেবার পরিবর্তে অর্থের লোভ কাজ করলে যাত্রীসাধারণ বঞ্চিত হবে, আর আইন না মানার দৃষ্টান্ত বাড়তে থাকেবে। একটা বিষয় লক্ষণীয়, সিন্ডিকেটের কাছে প্রশাসনের পরাজয়, প্রশাসন মুক্ত মনে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে অনেক ক্ষেত্রে বাধা পাচ্ছে। সিন্ডিকেটের সঙ্গে রয়েছে প্রশাসনের একটি অংশ। এর শিকড় উচ্চপর্যায়ের নেতা পর্যন্ত বিস্তৃত। গাড়ির মালিক যদি ড্রাইভার, সুপারভাইজর, হেলপারকে নীতিশিক্ষা দিয়ে গাড়ি চালাতে নির্দেশ করে, তাহলে প্রশাসনের ঝামেলা কমে। সড়কে প্রতিযোগিতা, আইন অমান্য করার সংস্কৃতি, জনসংখ্যা বিস্ফোরণএসব ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পার হওয়া বা গাড়িতে ওঠা বন্ধ করতে হবে। নিবন্ধিত গণপরিবহনের অনুপাতে লাইসেন্সধারী চালক নেই। গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সময়মতো পদক্ষেপ নিতে হবে।

নিমাই কৃষ্ণ সেন

বাগেরহাট।

► প্রত্যেকে সচেতন হলে গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। দেখতে হবে পরিবহনটি রাস্তায় চলাচলের যোগ্য কি না, কতজন যাত্রী বহন করতে পারবে, চালক নেশাগ্রস্ত কি না, কানে হেডফোন লাগিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে কি না। যদি চালক যাত্রীদের কথা না মানে তাহলে ট্রাফিক পুলিশকে জানিয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। চালককে লাইসেন্সধারী হতে হবে।

লাইসেন্স পাওয়ায় জটিলতায় যাতে পড়তে না হয় সেদিকে সরকারকে খেয়াল রাখতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী তুললে, রাস্তা পারাপারের জন্য জেব্রা ক্রসিং বা ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার না করলে জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে। ফিটনেসহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচল বন্ধ করতে হবে। গণপরিবহন নিয়ে পত্রিকায় মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচার চালাতে হবে।

মো. মাহী আরেফিন

ঢাকা।

► গণপরিবহনের ব্যবস্থাপনার উন্নতি করতে হলে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। এ জন্য দরকার হলো রুট পারমিটের প্রক্রিয়া সংস্কার করা, দক্ষ ও পেশাদার চালক তৈরির পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা; টিকিট কাউন্টার ব্যবস্থা পুনঃ প্রবর্তন ও অনলাইন টিকিটের ব্যবস্থা প্রবর্তন; বিআরটিএকে শক্তিশালী করে গাড়ির মান যাচাই এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করা; ভালো কম্পানিকে এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং ট্রাফিক আইন মানতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো। আশা করা যায়, এসব পদক্ষেপের ফলে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আসবে এবং জনচলাচল নিরাপদ হবে।

এম আনিসুর রহমান

শেখেরখিল, বাঁশখালী, চট্টগ্রাম।

► শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর ভেবেছিলাম, পরিবহনের লোকজন মনে হয় এবার সোজা পথে চলবে; কিন্তু তারা আরো বেপরোয়া হয়েছে। উদাহরণ কুষ্টিয়ার শিশু আফিফার মৃত্যুর ঘটনাসহ অনেক সাম্প্রতিক ঘটনা। এভাবে চলতে থাকলে গোটা দেশ কবরস্থান হয়ে যাবে। সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে যেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করা হয় তাদের ওপর। নির্দিষ্ট গতিবিধি লঙ্ঘন করলে দ্রুত শাস্তি ও জরিমানার ব্যবস্থা করা; পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে ঘুষ নিয়ে বা দালাল মারফত ড্রাইভিং লাইসেন্স না দেওয়া; গাড়ির ফিটনেস না থাকলে ফিটনেস লাইসেন্স না দেওয়া; অবৈধভাবে লাইসেন্স দেওয়া-নেওয়ার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালালে আজীবনের জন্য ড্রাইভিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা, ভাড়ার ক্ষেত্রে নৈরাজ্য বন্ধ করা, যখন খুশি তখন ভাড়া বাড়ানোর প্রবণতা বন্ধ করাএসবের জন্য যোগ্য কর্তৃপক্ষের ওপর দায়িত্ব দিতে হবে। পরিবহন খাতের জন্য ৯৯৯-এর মতো নম্বরের ব্যবস্থা করা দরকার যাতে যাত্রীরা যেকোনো সময় অভিযোগ করতে পারে, অভিযোগ সত্য হলে তাত্ক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।

আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ যুবায়ের

কল্যাণপুর, ঢাকা।

► গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে সৎ ও নিষ্ঠাবান হতে হবে। যারা শৃঙ্খলা ফেরানোর দায়িত্বে রয়েছে তাদের হতে হবে সৎ-আদর্শবান। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, লোভ-লালসা না ছাড়া পর্যন্ত গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। দেখার দায়িত্বে যারা রয়েছে তাদের মধ্যে যদি সততা না থাকে তাহলে কোনোকালেই গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে না। যারা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবে তারাই যদি বিশৃঙ্খল হয় তাহলে শৃঙ্খলা আশা করা দুরাশা ছাড়া কিছুই নয়। ভালো মানুষের বড় অভাব বলেই আজ চারদিকে নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খল অবস্থা। গণপরিবহনের চালক, হেলপার, শ্রমিকদের তো মালিকের কথায় উঠবোস করতে হয়। মালিক যেভাবে বলবে, সেভাবেই তারা চলে। গণপরিবহন মালিকদের দায়িত্ব হবে ফিটনেস আছে এমন যানবাহন সড়কে নামানো। সঠিক ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে কি না তা দেখে গণপরিবহন চালানোর দায়িত্ব দিতে হবে। নির্দেশ দিতে হবে নিয়মনীতি মেনে সাবধানতার সঙ্গে যানবাহন চালানোর জন্য। যেখানে-সেখানে যাত্রী নামানো-ওঠানো যাবে না, নির্ধারিত স্থানে পরিবহন থামাতে হবে। ভাঙাচোরা রাস্তায় দেখেশুনে এবং ট্রাফিক আইন মেনে চলার জন্য চালককে বলতে হবে। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় গণপরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসতে বাধ্য।

লিয়াকত হোসেন খোকন

রূপনগর, ঢাকা।

► আমাদের গণপরিবহন জনবান্ধব নয়। মালিক-শ্রমিকদের আয় বাড়ানোই এ সেক্টরের মূল উদ্দেশ্য। বাসের বাইরে ট্যাক্সি, সিএনজি অটোরিকশাও যাত্রীদের জিম্মি করে গলাকাটা ভাড়া আদায় করে। মিটারে না গিয়ে বরং বেশি ভাড়া নেওয়ার পাশাপাশি পুলিশ ধরলে বইলেন মিটারেএমন আবদারও করে সিএনজি অটোরিকশার চালকরা। উদ্বেগের বিষয়, রাতে তো নয়ই, দিনের বেলায়ও যাত্রীদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে ট্যাক্সি-সিএনজি অটোরিকশা চালকরা যেতে চায় না। বিশ্বের কোনো দেশে যাত্রীর কাঙ্ক্ষিত স্থানে যেতে চালক দ্বিমত করে, এমন নজির আছে বলে আমার জানা নেই। যেকোনো মূল্যে গণপরিবহনকে যাত্রীবান্ধব করে তোলার উপায় খুঁজে বের করতে হবে এবং শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে।

বিলকিছ আক্তার

হরিশ্বর, কাউনিয়া, রংপুর।

► পরিবহনের ব্যবস্থাপনার উন্নতি করতে হলে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। এ জন্য যা যা করা দরকার : রুট পারমিটের প্রক্রিয়া সংস্কার করা, দক্ষ ও পেশাদার চালক তৈরির জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা, টিকিট কাউন্টার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন ও অনলাইন টিকিটের ব্যবস্থা প্রবর্তন, বিআরটিএকে শক্তিশালী করে গাড়ির মান যাচাই ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা করা, ভালো কম্পানিকে এ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা এবং ট্রাফিক আইন মানতে ব্যাপক প্রচারণা চালানো। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করলে সড়কে শৃঙ্খলা আসবে।

মো. আল-আমিন ইসলাম

হরিশ্বর, কাউনিয়া, রংপুর।

► সাম্প্রতিক নিরাপদ সড়ক আন্দোলন সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সব পক্ষকেই ভাবিয়ে তুলেছে। সড়ক-মহাসড়কে যে চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে, তা শিক্ষার্থীরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অসচেতনতা, অবহেলা আর ব্যাপক দুর্নীতির কারণেই যে এই মহাসংকটের সৃষ্টি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, ট্রাফিক পুলিশের কঠোর ব্যবস্থা, জনগণের দাবি সত্ত্বেও সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হচ্ছে না। সড়ক-মহাসড়কের ক্ষুধা দিন দিন বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থানে দুর্ঘটনা ঘটছে, হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। গড়ে ৩০-৩৫ জন মানুষ দুর্ঘটনার কারণে প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছে এবং অসংখ্য মানুষ আহত হচ্ছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তিকেই নিহত বা আহত করে না বরং একটি পরিবারকেই ধ্বংস করে দেয়। কাজেই দুর্ঘটনাকবলিত প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারকে যুক্তিসংগত আর্থিক সাহায্য দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘদিনের, রাতারাতি এর সমাধান সম্ভব নয়। সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান কোনো সংস্থা বা সংগঠনের কাছে নেই। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ থেকে বোঝা যায় এর তীব্রতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। দুর্ঘটনা একেবারে বন্ধ করা যাবে না, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এর জন্য সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করতে হবে। এখনো আমাদের দেশে সড়ক দুর্ঘটনার জন্য প্রধানত চালককে দায়ী করা হয়ে থাকে। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যানবাহনের ফিটনেসের অভাবকে। অথচ যানবাহনের ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স সঠিক থাকা সত্ত্বেও অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। কোনো চালকই ইচ্ছা করে দুর্ঘটনা ঘটায় না। দুর্ঘটনার কারণে হতাহতদের মধ্যে গাড়ির চালক ও হেলপাররাও থাকে। অনেক দুর্ঘটনাই চালকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চালকের অদক্ষতা ও অবহেলা, যানবাহনের ত্রুটি, সড়ক-মহাসড়কের বেহাল, যাত্রী ও পথচারীদের অসচেতনতা দায়ী। বিআরটিএ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মালিক-শ্রমিকতারাও দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করে না। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা বজায় রাখার পরিবর্তে এ খাত থেকে বিপুল অর্থ উপার্জনই তাদের একমাত্র কাজ। এ কারণে পরিবহনব্যবস্থার অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হলে সব পক্ষকেই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালক বা মালিককে বিচারের আওতায় আনলেই চলবে না বরং বিআরটিএ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়ী তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। জনসচেতনতা বাড়াতে প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রচারণামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে নিজ এলাকার মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারে, সে উদ্যোগও নিতে হবে। সব পক্ষকেই ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। জনসচেতনতা সৃষ্টির দায়িত্ব গণমাধ্যমকেও নিতে হবে।

বিপ্লব বিশ্বাস

ফরিদপুর।

► প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের আগে রাস্তাঘাট সংস্কার করা হয়। এ বছরও করা হয়েছে। ১০ টাকার কাজ করতে খরচ করা হয় ২০ টাকা। সরকারকে দেখানো হয় ৪০ টাকা। অথচ সড়ক -মহাসড়ক বেহাল। বেশির ভাগ সড়ক ভাঙাচোরা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রথম ও প্রধান কাজ হলো টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা। অথচ গণপরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা লেগেই আছে। নিরাপদ সড়কের জন্য এত আন্দোলনের পরও শৃঙ্খলা ফিরছে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায়ও কাজ হচ্ছে না। এত কিছু করার পরও সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ যারা আইন করে, তারাই ভাঙে।

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার জনসচেতনতা। জনগণকে সচেতন করে তুলতে পারলে বিশৃঙ্খলা কমবে। দুর্ঘটনার মূল কারণ শৃঙ্খলা মেনে না চলা। যদি সড়কে নিয়ম মেনে চলে সবাই, তাহলে দুর্ঘটনার হার কমে আসবে। সবাই আগে যাওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করে। ফুট ওভারব্রিজ থাকার পরও তা ব্যবহার করে না। নিজেরাই বিপদ ডেকে আনে। তাই জনগণকে সচেতন করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে।

সাবিনা সিদ্দিকী শিবা

ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ।

► সড়ক খাতে বিশৃঙ্খলা থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব নয়। সড়ক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে মালিক-শ্রমিক সমিতিতে শৃঙ্খলা থাকা আবশ্যিক বলে মনে করি।

মো. মিজানুর রহমান

পাংগা, রাজারহাট, কুড়িগ্রাম।

► প্রতিবছর দেশে গাড়ির পরিমাণ যে হারে বাড়ছে সে অনুপাতে রাস্তাঘাট কিন্তু বাড়ছে না। পুরনো রাস্তা প্রশস্ত করা গেলে যানবাহন চলাচলে আরো সুবিধা হতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাস্তাঘাট প্রশস্ত করার মতো পরিকল্পনা হাতে নেওয়া এবং তা বাস্তবায়ন করার মতো সক্ষমতা আমরা এখনো অর্জন করতে পারিনি। তাই সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পদ্ধতি অবলম্বন করতে পারলে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। প্রথমত, সড়ক-মহাসড়কে ধীরগতির গাড়ির সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে হবে। এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলতে হবে। যেসব জেলায় আঞ্চলিক ট্রান্সপোর্ট কমিটি (আরটিসি) নেই, সেসব জেলায় দ্রুত আরটিসি গঠন করতে হবে। ড্রাইভারদের মাসিক বেতনের ভিত্তিতে নিয়োগ দিতে হবে এবং তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়েও ভাবতে হবে। চালকদের জন্য বিরতির ব্যবস্থা করতে হবে। রাজধানীতে সিটিং সার্ভিসের নাম করে যাত্রীদের জিম্মি করার যে কালচার গড়ে উঠেছে, তা বন্ধ করা প্রয়োজন। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা মানতে সব বাস কম্পানিকে বাধ্য করতে হবে। অন্যথায় রুট পারমিট বাতিল করার পাশাপাশি বাস কম্পানিগুলোর লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। শহরের সব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বাস স্টপেজ তৈরি করতে হবে। প্রয়োজনে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে আলাদা বাহিনী চালু করতে হবে। বিআরটিএর ঘুষবাণিজ্য শক্ত হাতে বন্ধ করতে হবে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে সবার সদিচ্ছা প্রয়োজন।

মোহাম্মদ শোয়েব

ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর।

মতামত- এর আরো খবর