English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

জাপার চমকের পরও আসন উদ্ধারে মরিয়া আ. লীগ

  • আব্দুল খালেক ফারুক, কুড়িগ্রাম   
  • ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে কুড়িগ্রাম জেলার চারটি আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও তত তৎপর হয়ে উঠছেন। জনসংযোগ, উঠান বৈঠক, সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণায় নিজেদের তুলে ধরছেন। মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে চলেছেন। গত নির্বাচনে এই জেলার চারটি আসনের মধ্যে তিনটিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। একটিতে জেপির প্রার্থী জয়লাভ করেন। আওয়ামী লীগ এবার এই চারটি আসনের সব কটি দাবি করলেও জাতীয় পার্টি তাদের আসন ছাড়তে নারাজ। অন্যদিকে বিএনপির সম্ভাবনা ঝুলে আছে জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের পৃথক নির্বাচন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের ওপর।

আওয়ামী লীগ

কুড়িগ্রাম-১ আসনে চারবারের এমপি জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজুর রহমানকে হটাতে মাঠে নেমেছেন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। এ আসনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যাঁদের নাম শোনা যাচ্ছে তাঁরা হলেনশিল্পপতি গোলাম মোস্তফা, সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আছলাম হোসেন সওদাগর, নাগেশ্বরী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোজাম্মেল হক প্রধান, কৃষক নেতা মজিবর রহমান বীরবল ও তাঁর পুত্র মাজহারুল ইসলাম, ভূরুঙ্গামারী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুন্নবী চৌধুরী খোকন, মুক্তিযোদ্ধা ও শিল্পপতি আখতারুজ্জামান মণ্ডল, মুক্তিযোদ্ধা ওসমান গণি ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের সদস্য মাহফুজার রহমান উজ্জ্বল। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মতে, এ আসনে নৌকা প্রতীকের পক্ষে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া পড়লেও নৌকা প্রতীকের প্রার্থী না থাকায় ভোটাররা তাদের পছন্দের প্রার্থী ও প্রতীকে ভোট দেওয়া থেকে বঞ্চিত। জোটের কারণে যাঁকে তারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে আসছে আওয়ামী লীগের প্রতি তাঁর বিমাতাসুলভ আচরণে ক্ষুব্ধ দলের নেতাকর্মীরা। সে কারণে তারা নৌকা প্রতীকে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে চায়।

কুড়িগ্রাম-১ আসনে ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও মহাজোটের কারণে আসনটি ছেড়ে দিতে হয় সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আছলাম হোসেন সওদাগরকে। তিনি বলেন, সুখে-দুঃখে নির্বাচনী এলাকার মানুষের পাশে থাকায় তারা চায় আমাকে মনোনয়ন দেওয়া হোক। এখন বিষয়টি নির্ভর করছে দলীয় নেত্রীর বিবেচনার ওপর।

কুড়িগ্রাম-২ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাফর আলীর নাম আলোচনার শীর্ষে। এ ছাড়া সাবেক জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল আমসাআ আমিন (অব.), জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিনুল ইসলাম মণ্ডল, সহসভাপতি চাষী করিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমান উদ্দিন মঞ্জু ও অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন, সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ হাসান লোবান, চলচ্চিত্র পরিচালক আবু সুফিয়ান, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন দুলাল ও ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. হামিদুল হক খন্দকারের নাম শোনা যাচ্ছে। তাঁদের অনেকে নিয়মিত গণসংযোগও করছেন। গত নির্বাচনে জাফর আলী মনোনয়ন পেলেও মহাজোটের কারণে আসনটি জাপা প্রার্থী তাজুল ইসলাম চৌধুরীকে ছেড়ে দিতে হয়। তাঁর মৃত্যুতে এবার আসনটিতে জোটের মনোনয়ন পাওয়ার আশা করছেন জাফর আলী। তবে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি পনির উদ্দিন আহমদের নাটকীয়ভাবে জাতীয় পার্টিতে যোগদান নির্বাচনী প্রেক্ষাপটকে জটিল করে তুলতে পারে বলে মনে করছে নেতাকর্মীরা।

কুড়িগ্রাম-৩ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে অধ্যাপক এম এ মতিন, উলিপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতি শিউলি, সাবেক সংসদ সদস্য আমজাদ হোসেন তালুকদার ও তাঁর পুত্র সাজেদুর রহমান তালুকদারের নাম শোনা যাচ্ছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মতি শিউলি দলের মনোনয়ন পেলেও মহাজোটের কারণে মাঈদুল ইসলামকে আসনটি ছেড়ে দিতে হয়। সম্প্রতি মাঈদুল ইসলামের মৃত্যুতে উপনির্বাচনে দীর্ঘদিন পর জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের মুখোমুখি লড়াই হয়। আওয়ামী লীগের প্রার্থী অধ্যাপক এম এ মতিন জাতীয় পার্টির ডা. আক্কাছ আলীর কাছে দুই হাজার ৭০০ ভোটে পরাজিত হন। এবারও এই আসনে মনোনয়ন দৌড়ে এম এ মতিন এগিয়ে আছেন। তবে এবারও আসনটি জাপাকে ছেড়ে দিতে হয় কি না তা নিয়ে দলের নেতাকর্মীরা শঙ্কিত।

কুড়িগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন চিলমারী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও চিলমারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শওকত আলী সরকার বীরবিক্রম, রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. জাকির হোসেন, রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল ইসলাম মিনু, রৌমারী মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল কাদের, সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর আলম, চরশৌলমারী ইউপি চেয়ারম্যান কে এম ফজলুল হক, চিলমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রহিমুজ্জামান সুমন, রৌমারী উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বঙ্গবাসী, রাজিবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিউল আলম ও অধ্যক্ষ ফজলুল হক মনি। ২০১৪ সালে জাকির হোসেন জেপি প্রার্থী রুহুল আমিনের কাছেন হেরে যান। এবার জেপি জোটগতভাবে আসনটি চাইলে আওয়ামী লীগ বঞ্চিত হতে পারে।

জাতীয় পার্টি

আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে জাতীয় পার্টি কুড়িগ্রাম জেলার চারটি আসনই দাবি করবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। সম্প্রতি দলের দুজন এমপির মৃত্যুতে প্রার্থী সংকট ঘোচাতে স্বল্প সময়ে প্রভাবশালী প্রার্থী দলে ভেড়াতে মুনশিয়ানা দেখায় দলটি।

কুড়িগ্রাম-১ আসনটি নানা কারণে জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত। এ আসনে তিনবারের সংসদ সদস্য আ খ ম শহিদুল ইসলাম বাচ্চুর পর তাঁর ভাগ্নে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এ কে এম মোস্তাফিজুর রহমান চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কুড়িগ্রাম-১ আসনকে নিজেদের দখলে রেখেছেন। এবারও এ আসন ধরে রাখতে প্রচারণা চালাচ্ছেন তিনি।

কুড়িগ্রাম-২ আসনের সাতবারের সংসদ সদস্য বিরোধী দলের চিফ হুইপ ও সাবেক মন্ত্রী তাজুল ইসলাম চৌধুরীর মৃত্যুতে এই আসনে জাপার মনোনয়ন নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হয়েছে। তাজুল ইসলামের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ বিমানের সাবেক পরিচালক ও জাতীয় পার্টির ভাইস প্রেসিডেন্ট মেজর আব্দুস সালাম (অব.) মনোনয়ন পাচ্ছেন বলে ধরে নেওয়া হলেও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও শিল্পপতি পনির উদ্দিন আহমেদ ঢাকায় জাতীয় পার্টিতে যোগদান করায় হিসাব পাল্টে যাচ্ছে। মেজর সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি যোগদানের পর থেকে জাতীয় পার্টিতে আছি। দল বদল করিনি বা অন্য দল থেকে ফিরেও আসিনি। এলাকার মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে ছিলাম, মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী। পনির উদ্দিন আহমেদও মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।

কুড়িগ্রাম-৩ আসনের এমপি মাঈদুল ইসলামের মৃত্যুর এক দিন পরই রংপুরের শিল্পপতি সনিক প্রাইম গ্রুপের চেয়ারম্যান ডা. আক্কাছ আলীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করায় চমক সৃষ্টি হয়। পরে উপনির্বাচনে ডা. আক্কাছ আলী বিজয়ী হয়ে এরশাদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হন। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী নির্বাচনেও তিনি দলের প্রার্থী হচ্ছেন।

কুড়িগ্রাম-৪ আসনে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে রাজীবপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ইউনুছ আলীর নাম সর্বাধিক আলোচিত হলেও হঠাৎ করে সাবেক রাষ্ট্রদূত আশরাফ-উদ দৌলা তাজ দলে যোগ দেওয়ায় হিসাব পাল্টে গেছে। কিছুদিন আগে পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদ তাজের বাসায় আসেন।

বিএনপি

কুড়িগ্রাম-১ আসনে বিএনপির একক প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুর রহমান রানা। কুড়িগ্রাম-১ আসনের পাশাপাশি কুড়িগ্রাম-২ আসনেও তিনি মনোনয়ন চাইবেন বলে জানালেও শেষ পর্যন্ত তিনি কুড়িগ্রাম-১ আসনেই প্রার্থী হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সাইফুর রহমান রানার বিজয়ের পথে বড় বাধা আওয়ামী লীগ ও জাপার মহাজোট। ত্রিমুখী লড়াই হলে তাঁর জয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে আশাবাদী বিএনপির নেতাকর্মীরা।

কুড়িগ্রাম-২ আসনে কেন্দ্রীয় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীর প্রার্থী হওয়ার কথা শোনা গেলেও তিনি এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন দলের জেলা কমিটির একাধিক নেতা। জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল হোসনাইন কায়কোবাদ ও কুড়িগ্রাম পৌরসভার সাবেক মেয়র আবু বকর সিদ্দিক এই আসন থেকে প্রার্থী হতে চান।

কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি তাসভিরুল ইসলামের মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত হলেও সাবেক ছাত্রনেতা আব্দুল খালেক মনোনয়ন চাইতে পারেন। উলিপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত কুড়িগ্রাম-৩ আসন। উলিপুর পৌরসভার মেয়র ও উপজেলার চেয়ারম্যান পদে বিএনপির বিজয়ের কারণে এই আসনটিতে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী দলের নেতাকর্মীরা। তবে মহাজোট হলে কঠিন চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে তাদের প্রার্থীকে।

কুড়িগ্রাম-৪ আসনটিতে রয়েছে জামায়াতের ভোট ব্যাংক। এ আসনে জামায়াতের মোস্তাফিজার রহমান মোস্তাককে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনী মাঠে দেখা যেতে পারে। এ ছাড়া বিএনপি থেকে নির্বাচনমুখী রয়েছেন চিলমারী বিএনপির সভাপতি আব্দুল বারী, চিলমারী বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ও নয়ারহাট ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু হানিফা, মমতাজ হোসেন, রৌমারী বিএনপির সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান, রৌমারী বিএনপির সহসভাপতি ইমান আলী, রাজীবপুর বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান।

রাজীবপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক মোখলেছুর রহমান জানান, গত নির্বাচনে জোটগতভাবে জামায়াতকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও ভালো ফল আসেনি। এবারের নির্বাচনে তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীদের দাবি যেন বিএনপি থেকে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী করা হয়। এবারের নির্বাচনে তিনি বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন।

অন্যান্য দল

কুড়িগ্রামে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপির পর শক্তিশালী দল ইসলামী আন্দোলন। তারাও চারটি আসনে প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া কুড়িগ্রাম-১ আসনে জাসদের আনছার আলী ইনু, ইসলামী আন্দোলনের আনছার আলী রয়েল ও আব্দুর রহমান, কুড়িগ্রাম-২ আসনে সাবেক সেক্রেটারি মাওলানা মোকছেদুর রহমান, জাসদের এমদাদুল হক এমদাদ, ছলিমুল্লাহ ছলি, কুড়িগ্রাম-৪ আসন থেকে বাসদের আবুল বাশার মঞ্জু পোস্টার ও বিলবোর্ড দিয়ে প্রার্থিতার কথা জানান দিচ্ছেন।

► চারটি আসনই আমরা চাই ► মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি

শেষের পাতা- এর আরো খবর