English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

অভয়নগরে ঘুমন্ত কৃষককে পেট্রল দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা

অভিযোগের তীর পুলিশের দিকে

  • অভয়নগর (যশোর) প্রতিনিধি    
  • ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

যশোরের অভয়নগরে তৈয়ব শেখ (৫৫) নামের এক কৃষককে ঘুমন্ত অবস্থায় গায়ে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে পেট্রলের আলামত ও আগুন দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত একটি মশাল পেয়েছে পুলিশ।

পরিবার ও গ্রামবাসীর অভিযোগ, কয়েক মাস আগে একটি সাজানো মাদক উদ্ধারের ঘটনায় ফাঁসিয়ে তৈয়ব শেখের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করেছিলেন পুলিশের স্থানীয় ভাটপাড়া ক্যাম্পের সদ্য সাবেক এএসআই কবির। এ নিয়ে জেলা পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেছিলেন তৈয়ব শেখ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। এএসআই কবির ভাটপাড়া ক্যাম্প থেকে বদলি হওয়ার এক মাসের মাথায় এ ঘটনা ঘটল।

নিহত তৈয়ব শেখের ছেলে সাগর শেখ কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁরা দরিদ্র পরিবার। ছোট ঘর। ঘরে ঘুমানোর জায়গা কম। তাই তাঁর বাবা তৈয়ব শেখ দীর্ঘদিন ধরে বারান্দায় ঘুমাতেন। প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার রাতের খাবার শেষে তৈয়ব শেখ ঘরের বারান্দায় ঘুমিয়ে পড়েন। রাত আনুমানিক ২টার সময় তাঁর বাবার আর্তচিৎকারে তাঁদের ঘুম ভেঙে যায়। ওই সময় বাবার গায়ে লাগা আগুন নিভিয়ে দ্রুত তাঁকে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেয়। রাতেই তাঁকে সেখানে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল শুক্রবার সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।

গ্রামবাসীরা অভিযোগ করে, ছয়-সাত মাস আগে স্থানীয় ভাটপাড়া পুলিশ ক্যাম্পের এএসআই কবিরের সঙ্গে মাদক উদ্ধারের একটি সাজানো ঘটনা নিয়ে বিরোধ বাধে কৃষক তৈয়ব শেখের। গ্রামবাসীর অভিযোগ, তৈয়বের বাড়িতে গাঁজা রেখে তাঁকে আটক করেছিলেন এএসআই কবির। এ সময় মামলার ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা আদায় করেন কবির। এ ঘটনায় তৈয়ব ও গ্রামের লোকজন এএসআই কবিরের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এর পর থেকে অভিযোগটি প্রত্যাহার করতে বারবার চাপ দিয়ে আসছিলেন কবির। তাঁদের সন্দেহ, এই ঘটনার সূত্র ধরে তৈয়েব শেখকে পুড়িয়ে হত্যা করা হতে পারে।

এ ব্যাপারে স্থানীয় ভাটপাড়া ক্যাম্পের আইসি এসআই আবদুল মান্নান বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে এই হত্যার অভিযোগটি সত্য নয়। তবে কে বা কারা কৃষক তৈয়েব শেখের গায়ে পেট্রলজাতীয় দ্রব্য দিয়ে আগুন ধরিয়ে হত্যা করেছে তার তদন্ত শুরু হয়েছ। ঘটনাস্থলে গিয়ে আমরা পেট্রলের গন্ধ এবং আগুন দেওয়ার কাজে ব্যবহৃত মশালজাতীয় একটি বস্তু পেয়েছি। অভয়নগর থানার ওসি আলমগীর হোসেন বলেন, সংবাদ পেয়ে আমি খুমেক হাসপাতালে গিয়েছিলাম। দুপুরে ঘটনাস্থলেও গিয়েছি। এই ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আসামি গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এএসআই কবিরের বিরুদ্ধে সাজানো মাদক উদ্ধারের ঘটনায় তৈয়ব শেখের অভিযোগ প্রসঙ্গে ওসি বলেন, উনি জেলা পুলিশ অফিসে অভিযোগ দিয়েছিলেন। তখন ওসি আনিসুল হক ছিলেন। আমি মাত্র এ থানায় যোগ দিয়েছি। বিস্তারিত বলতে পারব না। তিনি জানান, তৈয়ব শেখ হত্যার ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। আসামি অজ্ঞাতপরিচয়। নিহতের ছোট ভাই শাহাদত শেখ গতকাল বিকেলে মামলাটি দায়ের করেন।

তৈয়ব শেখ সম্পর্কে জানতে চাইলে বাঘুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল আক্তার বলেন, তৈয়ব কোনো ধরনের মাদকের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তিনি কোনো মাদক ব্যবসাও করতেন না। ছয় থেকে সাত মাস আগে আশপাশের কয়েকজন উদ্দেশ্যমূলকভাবে তাঁর বাড়িতে গাঁজা রেখেছিল। ওই সময় এএসআই কবির একটি মিথ্যা অভিযান চালিয়ে তাঁর কাছ থেকে ১০ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করেন। চেয়ারম্যান বলেন, তৈয়ব শেখের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তাঁদের জানা নেই। তাঁকে নিয়ে কোনো সালিস বিচারও করতে হয়নি। তৈয়ব কৃষিকাজের পাশাপাশি বিএনপির কর্মী ছিলেন।

নিহতের প্রতিবেশী ও স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ জানান, ভাটপাড়া ক্যাম্পের তৎকালীন টু-আইসি কবিরের বিরুদ্ধে একটি মারাত্মক অভিযোগের সাক্ষী ছিলেন তৈয়ব শেখ।

অভিযুক্ত এএসআই কবির বলেন, আমি গত ৬ আগস্ট অভয়নগর থেকে যশোর কোতোয়ালি থানাধীন ফুলবাড়ী ক্যাম্পে বদলি হয়ে আসি। চলে গেলে কারো বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করতেই পারে। আমি চলে এসেছি বলে সন্দেহ করে অনেকেই আমার বিরুদ্ধে বলতে পারে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের কাছে সাজানো মাদক উদ্ধার এবং ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগটি তিনি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে তৈয়ব শেখ কোনো অভিযোগ করেননি। তবে তাঁর প্রতিবেশীরা অভিযোগ করেছিল, একটি ক্যারম বোর্ড খেলা উঠানো নিয়ে।

এ ব্যাপারে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি-অভয়নগর সার্কেল) গোলাম রব্বানী বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে গ্রামবাসী যে অভিযোগ করেছিল এটা ভুয়া। তিনি দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তারাই এই অভিযোগ করেছে।

শেষের পাতা- এর আরো খবর