English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সাকার অনুসারী, বিএনপি নেতা মান্নান একাধিক সরকারি কমিটিতে?

  • নূপুর দেব, চট্টগ্রাম   
  • ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

কয়েক বছর আগে তিনি জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হন, এ বছর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটিতেও স্থান পেয়েছেন। তিনি সরকারের আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি) চট্টগ্রাম জেলারও সদস্য। অভিযোগ উঠেছে, আব্দুল মান্নান নামের এই পরিবহন নেতা নিজের বিতর্কিত ভূমিকা লুকিয়ে কলকাঠি নাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশাসনিক কমিটিতে জায়গা করে নিয়েছেন। বিভিন্ন পরিবহন মালিক সংগঠনের নেতাদের অভিযোগ, মান্নান মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়া আসামি সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন। জানা যায়, আবদুল মান্নান রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে আন্দোলনের নামে সড়কে যখন জ্বালাও-পোড়াও চলছে তখন আওয়ামী লীগ সমর্থিত পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা রাস্তায় ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালায়। অন্য দিকে ওই সময় আবদুল মান্নান চট্টগ্রাম-হাটহাজারী-নাজিরহাট-খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে গাড়ি চালাতে বাধার সৃষ্টি করেছেন। দুই বছর আগেও তিনি ছিলেন ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি। সংগঠনটি মূলত বিএনপি ঘরানার হিসেবে পরিচিত ছিল।

আগামী সপ্তাহে আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, আবদুল মান্নানের গ্রামের বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার ইসলামপুরে। মান্নান প্রথমে চাঁদের গাড়ি (জিপ) এবং পরে ট্রাক চালাতেন। রাঙ্গুনিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মান্নান কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামের হাটহাজারী-রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতির পদ পান। অভিযোগ রয়েছে, ওই কমিটিতে থাকার সময়ে মান্নান বিভিন্ন জনকে ম্যানেজ করে বছর পাঁচেক আগে চট্টগ্রাম জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য হন। চট্টগ্রামের পরিবহনব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রক বিভিন্ন মালিক সংগঠনের মধ্যে অনেকেই আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাও আছেন। তাঁদের ডিঙিয়ে সাবেক এই বিএনপি নেতা শুধু জেলা নয়, ছয় মাস আগে চট্টগ্রাম বিভাগীয় আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সদস্য পদও বাগিয়ে নেন। এ ছাড়া তিনি আঞ্চলিক পরিবহন কমিটি (আরটিসি) চট্টগ্রাম জেলার সদস্য। এই কমিটির সভাপতি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক। আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক বিভাগীয় কমিটির সভাপতি, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা কমিটির সভাপতি হলেন জেলা প্রশাসক।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী সদস্য ও জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের সভাপতি মঞ্জুরুল আলম চৌধুরী মঞ্জু গত বুধবার সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, আবদুল মান্নান বর্তমান সরকার বিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। আমাদের শ্রমিকরা যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সড়কে গাড়ি চালাচ্ছেন তখন তিনি ও তাঁর অনুসারীরা বাধা দিয়েছেন। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরুর পর থেকে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সড়কে শৃঙ্খলা আনার জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তাঁর কোনো ধরনের ভূমিকা নেই। তিনি সাকা চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন।

মঞ্জু আরো বলেন, চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও জেলা দুই আইন-শৃঙ্খলা কমিটিতে বর্তমানে আবদুল মান্নান সদস্য। এটাই অনেকের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুটি কমিটিতে প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেখানে কিভাবে এবং কাকে কাকে ম্যানেজ করে বিএনপির সাবেক এই নেতা পরিবহনের প্রতিনিধি হিসেবে ঢুকে পড়েছেন? আমরা মালিক গ্রুপ ও শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আগামী রবিবার বা সোমবার লিখিত অভিযোগ দেব। আমি ইতিমধ্যে বিষয়টি চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে অবহিত করেছি। তাঁদের কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার নয় বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশ সুপার হিসেবে আমি চট্টগ্রাম জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির একজন সদস্য। কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। সিভিল কোন লোক এই কমিটিতে থাকতে পারবে তা জেলা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার স্যার বলতে পারবেন। চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীর কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি চট্টগ্রামে আসার (যোগদান গত বছরের ২৩ অক্টোবর) আগে উনি (আবদুল মান্নান) এই কমিটিতে। আসার পর থেকে তো উনাকে কমিটিতে দেখছি। এই বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ মাশহুদুল কবীর বলেন, আমার কাছে এই ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি।

রাঙ্গুনিয়ার একাধিক জনপ্রতিনিধি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ট্রাকচালক আবদুল মান্নান উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর এলাকায় তাঁকে ধাওয়া দেওয়া হয়। তাঁর লেখাপড়াও বেশি নেই।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি কখনো বিএনপির রাজনীতি করিনি। সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীরও অনুসারী ছিলাম না। কমিটিতে ছিলাম, তা কেউ দেখাতে পারবে না। পরিবহন প্রতিনিধি হিসেবে প্রায় পাঁচ বছর আগে আমি জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটি এবং প্রায় পাঁচ-ছয় মাস আগে বিভাগীয় আইন-শৃঙ্খলা কমিটিতে সদস্য হই। এ ছাড়া চট্টগ্রাম পণ্য পরিবহন মালিক ফেডারেশন এবং চট্টগ্রাম জেলা ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান-মিনি ট্রাক মালিক গ্রুপেরও সভাপতি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি আগে সভাপতি (ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়ন) ছিলাম। এই বছর সেখানে নতুন কমিটি হয়েছে। আপনি কোন মান্নানের কথা বলছেন? এলাকায় আরেকজন মান্নান আছে। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিউজের জন্য এত বেশি কিছু কেন জানতে চেয়েছেন। আমি তো শ্রমিক লীগের রাজনীতিতে যুক্ত আছি। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িত থাকার অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।

চট্টগ্রামে পরিবহনব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রায়ই নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সরকারি দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের। এর মধ্যে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা আছেন। তাঁদের ডিঙিয়ে কিভাবে মান্নান গুরুত্বপূর্ণ কিছু জায়গা দখল করলেন তা অনেকের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁদের উদ্বেগের আরো একটি কারণ হচ্ছে, সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আইন-শৃঙ্খলা কমিটিতে আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সভাপতি মোহাম্মদ মুছা ও সাধারণ সম্পাদক অলি আহমদ বলেন, আমাদের আওতাধীন ৪৫টি সংগঠন রয়েছে। সংগঠনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমাদের কাউকে জেলা ও বিভাগীয় আইন-শৃঙ্খলা কমিটিতে রাখা হয়নি। একইভাবে চট্টগ্রাম জেলা মালিক গ্রুপের আওতাধীন ১৫টি সংগঠন রয়েছে। এসব সংগঠন থেকেও কাউকে ওই দুই কমিটিতে (আইন-শৃঙ্খলা) রাখা হয়নি বলে জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের নেতারা জানান।

শেষের পাতা- এর আরো খবর