English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

মনোনয়ন নিয়ে আ. লীগে কোন্দল জামায়াত নিয়ে সংকটে বিএনপি

  • এমদাদুল হক মিলন, দিনাজপুর    
  • ৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

দুই মেয়াদে টানা ১০ বছর রাষ্ট্রক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বর মাসে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দিনাজপুর জেলা আওয়ামী লীগ বর্তমানে নির্বাচনী প্রচারণায় অত্যন্ত সরব। দলীয় মনোনয়ন পেতে বিভিন্ন স্তরের নেতারা ভীষণ ব্যস্ত। দলীয় এই মনোনয়ন নিয়ে চলছে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কোন্দল। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা বর্তমান সংসদ সদস্যদের কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা সমালোচনায় সরব। দিনাজপুর জেলায় আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা এত বেশি, যেন সব নেতাই সংসদ সদস্য হতে চাইছেন। এ কারণে প্রতিটি আসনে বর্তমানে অনেকগুলো গ্রুপ সৃষ্টি হয়েছে। সব মিলিয়ে দলটি বর্তমানে নির্বাচন নিয়ে মাঠে বেশ সরব।

তবে দিনাজপুর জেলায় এর বিপরীত অবস্থা বিরাজ করছে বিএনপিতে। খালেদা জিয়ার পারিবারিক আসন হিসেবে পরিচিত সদর আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত না হলেও অন্য পাঁচটি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। রেজিস্ট্রেশন বাতিল হওয়া জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের নিয়েও কিছুটা সংকটে রয়েছে বিএনপি। ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় নির্বাচন করবে, নাকি শেষ সময়ে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেওয়া হবে, বিষয়টি পরিষ্কার নয় বিএনপি নেতাদের কাছে। যদি জামায়াতের সঙ্গে জোট রেখে নির্বাচন হয় তাহলে এই জেলায় বিএনপি চারটি আসন এবং জামায়াতকে দুটি আসন দিয়ে নির্বাচন করবে বিএনপি। কিন্তু এদের কাউকেই বর্তমানে নির্বাচনী মাঠে দেখা যাচ্ছে না।

দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনটি ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে চলে যায় জামায়াতের দখলে। এরপর জায়ায়াতের সংসদ সদস্য আব্দুল্যাহ আল কাফির মৃত্যু হয়। সতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে এ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মনোরঞ্জন শীল গোলাপ। পরে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। পর পর তিনবার নির্বাচিত হয়ে প্রায় ১২ বছর এই আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল। মনোরঞ্জন শীল গোপাল ছাড়াও বীরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ জাকারিয়া জাকা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু হুসেইন বিপু, সাবেক এমপি ও বর্তমান বীরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট হামিদুল ইসলাম একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী। অধিকসংখ্যক মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় এই আসনটিতে আবারও ২০০১ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছে আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা। ২০০১ সালের নির্বাচনে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী আব্দুর রৌফ চৌধুরীকে প্রচারণা চালাতে দেননি মনোনয়নপ্রত্যাশী জাকারিয়া জাকা ও বর্তমান বীরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম। এই সুযোগে জামায়াতের প্রার্থী আব্দুল্যাহ আল কাফি জয়লাভ করেন। এবারও যদি তেমন ঘটনা ঘটে তাহলে আবারও বিএনপি-জামায়াতের কবজায় চলে যেতে পারে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত দিনাজপুর-১ আসনটি।

অন্যদিকে বিএনপি থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী বীরগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি শিল্পপতি মনজুরুল ইসলাম মঞ্জু। তাঁর মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত। তবে জামায়াতের বীরগঞ্জ শাখার উপজেলা আমির ও পৌর মেয়র মাওলানা মোহাম্মদ হানিফ নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।

দিনাজপুর-২ (বোচাগঞ্জ-বিরল) আসনটিতে গত দুই মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। তবে এবার এ আসন থেকে মনোনয়ন চাইবেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী সতিশ চন্দ্র রায়ের ছেলে কেন্দ্রীয় উপকমিটির স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা বিষয়ক সহসম্পাদক ডা. মানবেন্দ্র রায় মানব। তিনি এলাকায় ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন।

শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমীতে একদিকে খালিদ মাহ্মুদ চৌধুরী এমপি অপরদিকে মানবেন্দ্র রায় মানব পৃথক কর্মসূচি পালন করেন, যা ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

অন্যদিকে এ আসনে বিএনপির তিনজন প্রার্থীর মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক এমপি লে. জেনারেল (অব.) মাহাবুবুর রহমানের মনোনয়ন একপ্রকার নিশ্চিত। এ ছাড়া শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি সাদিক রিয়াজ চৌধুরী পিনাক মনোনয়নপ্রত্যাশী। আবার বোচাগঞ্জ উপজেলায় বিএনপির সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব অত্যন্ত প্রকট। এখানে দুটি গ্রুপ কেউ কারো নির্দেশ মানতে রাজি নয়।

দিনাজপুর-৩ (সদর) সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম এমপির মনোনয়ন নিশ্চিত বলে মনে করছে দলীয় নেতাকর্মীরা। এর বাইরে আরো কজন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও তাদের মাঠে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু দলের সাধারণ কর্মীরা মনে করে, মূল দলের সঙ্গে হুইপ ইকবালুর রহিমের দূরত্ব অনেক। আগামী নির্বাচনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বিপরীতে এ আসনে বিএনপির অবস্থা টালমাতাল। খালেদা জিয়ার বড় বোন সাবেক মন্ত্রী খুরশীদ জাহান হকের মৃত্যুর পর এ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল অত্যন্ত প্রকট হয়ে ওঠে। তার জের এখনো চলছে। দলীয় কার্যালয়ে নিয়মিত নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এ কারণে এ আসনে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেই প্রার্থী হতে পারেন। অথবা প্রয়াত মন্ত্রী খুরশীদ জাহান হক চকলেটের ছেলে শাহরিয়ার আকতার হক ডন প্রার্থী হবেন। এ আসনে বিএনপির আরো দুজন মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন।

দিনাজপুর-৪ (খানসামা-চিরিরবন্দর) আসনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এ আসনে আওয়ামী লীগে কোনো কোন্দল নেই। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি এ আসনে মনোনয়ন পাবেন এটা সবাই নিশ্চিত। তার পরও তিনজন মনোনয়নপ্রত্যাশী রয়েছেন। এ তিনজন এলাকায় গণসংযোগও চালাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে ডা. আমজাদ আলী প্রচারণা চালাতে গেলে খানসামা থানা পুলিশ তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে অবশ্য ছেড়ে দেয়।

এ আসনে বিএনপির প্রার্থী তারেক রহমানের লোক হিসেবে পরিচিত জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাবেক সংসদ সদস্য আখতারুজ্জামান মিয়া ও শিল্পপতি হাফিজুর রহমান। মাঠে না থাকলেও শিল্পপতি হাফিজুর রহমান যদি মনোনয়ন পেয়ে যান অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে জোটগত নির্বাচন হলে এ আসনে জামায়াতের শক্ত প্রার্থী রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক উপজেলা চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন মোল্লাকে নিয়ে বিপাকে পড়তে পারে বিএনপি।

দিনাজপুর-৫ (পার্বতীপুর-চিরিরবন্দর) আসনটিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ফিজারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মাঠে আছেন জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া জাকির। এই দুজনকে কখনো এক মঞ্চে দেখা যায়নি। জাকারিয়া জাকিরকে বিভিন্ন সময় শোডাউন করতে দেখা যায়।

এ আসন থেকে বিএনপির একক প্রার্থী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শিল্পপতি সাবেক সংসদ সদস্য এ জেড এম রেজওয়ানুল হক। আর কোনো মনোনয়নপ্রত্যাশী আলোচনায় নেই।

দিনাজপুর-৬ (নবাবগঞ্জ-হাকিমপুর-ঘোড়াঘাট ও বিরামপুর) আসন এই জেলার সবচেয়ে বড় সংসদীয় আসন। বর্তমানে এ আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হলেও নেতাকর্মীরা যেন নিজ দলেই বিরোধী দলের কর্মী। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেও এ আসনে ছোট ছোট গ্রুপে বিভক্ত দলের নেতাকর্মীরা। এর মূলে রয়েছেন বর্তমান এমপি শিবলী সাদিক, সাবেক এমপি আজিজুল হক চৌধুরী, মনোনয়নপ্রত্যাশী নবাবগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলতাফুজ্জামান মিতা। শেষের তিনজন বর্তমান এমপির বিপক্ষে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেতে আগ্রহী দুজন। চিকিৎসক নেতা বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও দিনাজপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক লুৎফর রহমান মিন্টু ও জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল ইসলাম।

জাতীয় পার্টি : জেলা জাতীয় পার্টির একটি সূত্র জানায়, তারা এখনো নিশ্চিত নয়, নির্বাচন ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে হবে; নাকি এককভাবে। তবে দলটি এককভাবে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত। তার পরও শেষ পর্যন্ত দলের চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যে নির্দেশনা দেবেন সেভাবেই নির্বাচন করবেন তাঁরা।

দলটি দিনাজপুর-১ আসনে বীরগঞ্জ উপজেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহিনুর ইসলাম, দিনাজপুর-২ আসনে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার চৌধুরী জীবন, দিনাজপুর-৩ আসনে জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক আহম্মেদ শফি রুবেল, দিনাজপুর-৪ আসনে চিরিরবন্দর উপজেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক আলীম হাওলাদার, দিনাজপুর-৫ আসনে জেলা কমিটির সহসভাপতি অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম এবং দিনাজপুর-৬ আসনে দিনাজপুর জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি ও স্বপ্নপুরীর স্বত্বাধিকারী দেলওয়ার হোসেনকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে।

জামায়াত : দলীয় একটি সূত্র জানায়, দিনাজপুর জেলায় জামায়াত ছয়টি আসনেই তাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি হিসেবে প্রার্থী চূড়ান্ত করে রেখেছে। দলটি ভেতরে ভেতরে নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগও শুরু করেছে। জোটগত নির্বাচন হলে তারা দিনাজপুরের ১, ৪ ও ৬ এই তিনটি আসন চাইবে। দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিল হলেও বিকল্প উপায়ে নির্বাচন করবে দলটি। তা ছাড়া সতন্ত্র প্রার্থী হতে যেসব শর্ত রয়েছে তা পূরণেও কাজ করছে দলটি। দিনাজপুর-১ আসনে পৌর মেয়র মাওলানা হানিফ, দিনাজপুর-২ আসনে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আফজালুর রহমান, দিনাজপুর-৩ আসনে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা মজিবর রহমান, দিনাজপুর-৪ আসনে চিরিরবন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন মোল্লা, দিনাজপুর-৫ আসনে পার্বতীপুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন, ও দিনাজপুর-৬ আসনে জেলা জামায়াতের আমির আনোয়ারুল ইসলামকে প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। দিনাজপুর জেলায় অন্য দলগুলোর কোনো তৎপরতা নেই।

► উন্নয়নের জন্যই ভোট পাবে আওয়ামী লীগ ► জোট ও জোট ছাড়া দুভাবেই বিএনপি প্রস্তুত

শেষের পাতা- এর আরো খবর