English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

সাভারে স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা

যুবলীগ নেতা ইতালি যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে আটক

  • নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)    
  • ৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যায় অভিযুক্ত আসামি উচ্চ আদালত থেকে অস্থায়ী জামিনে বের হয়ে আসা সেলিম মণ্ডলকে গ্রেপ্তার করেছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। ইতালির উদ্দেশে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মঙ্গলবার গভীর রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেলিম সাভার থানা যুবলীগের বহিষ্কৃত সভাপতি ও ঢাকা জেলা পরিষদের সদস্য।

পুলিশ জানায়, পারিবারিক কলহের জের ধরে গত ২ আগস্ট রাতে সেলিম মণ্ডল সাভার পৌরসভার মজিদপুর মহল্লার বাসায় তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী আয়শা আক্তার বকুলকে (২৫) হত্যা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে লাশ গুম করার জন্য মরদেহটি সিংগাইর উপজেলার বায়রা ইউনিয়নের স্বরূপপুর গ্রামের একটি রাস্তার পাশের জঙ্গলে ফেলে আগুনে পুড়িয়ে ঝলসে দেওয়া হয়। পরদিন ৩ আগস্ট পথচারীরা ওই জঙ্গলে আংশিক ঝলসানো অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর মরদেহ দেখতে পেয়ে সিংগাইর পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে মরদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে লাশটি মানিকগঞ্জ পৌরসভা কবরস্থানে দাফন করা হয়। সেদিনই সিংগাইর থানা পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে সিংগাইর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।

এদিকে, আয়েশা আক্তারের বড় ভাই বশির হোসেন জানান, গত জুলাই মাসের ২৮ তারিখে তাঁর বোন আয়শা আক্তার বকুল এলাকার একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যায়। এরপর বকুলের স্বামী সেলিম মণ্ডল তার প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়। এ নিয়ে সেলিম মণ্ডলের সঙ্গে বকুলের কথাকাটাকাটি হয়। তখন সেলিম মণ্ডল আয়শাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। এ ঘটনার চার দিন পর গত ২ আগস্ট বকুল নিখোঁজ হয়। সেলিম মণ্ডল এ ঘটনায় ১৪ আগস্ট সাভার থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করে। ডায়েরিতে সে উল্লেখ করে, তার দ্বিতীয় স্ত্রী আয়শা আক্তার বকুল গত ৬ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে বাসা থেকে চলে গেছে। তাকে কোথাও খোঁজাখুঁজি করে পাওয়া যাচ্ছে না।

আয়শা আক্তার বকুল নিখোঁজ হওয়ার পর তার আত্মীয়স্বজন বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে তাকে না পেয়ে সিংগাইর থানায় গত ৩ আগস্ট উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় আগুনে পোড়া তরুণীর মরদেহের ছবি দেখে সেটি নিখোঁজ বকুলের বলে শনাক্ত করে। পুলিশও নিহতের ছবি দেখে সেটি আয়শা আক্তার বকুলের বলে অনেকটাই নিশ্চিত হয়।

এ ব্যাপারে সিংগাইর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইমাম হোসেন জানান, আগুনে পোড়া এক নারীর মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল গত ৩ আগস্ট। মরদেহটি সাভার থানার নিখোঁজ হওয়া আয়শা আক্তার বকুলের বলে শনাক্ত করেছে তাঁর নিকটাত্মীয় ও পরিবারের লোকজন। তবে নিহতের ডিএনএ পরীক্ষার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে যে সেটি আয়শা আক্তার বকুলের মরদেহ কি না। এ ঘটনার পর সিংগাইর থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে যুবলীগ নেতা সেলিম মণ্ডলকে আটক করতে না পারলেও তার ছোট ভাই স্থানীয় বিরুলিয়া ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক জুয়েল মণ্ডলকে অস্ত্রসহ আটক করে। এ ছাড়া স্ত্রীকে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠায় কেন্দ্রীয় যুবলীগ সেলিম মণ্ডলকে যুবলীগ থেকে বহিষ্কার করে।

এ ঘটনার পর সেলিম মণ্ডলকে প্রধান আসামি করে সিংগাইর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন নিহত আয়শার ভাই উজ্জ্বল হোসেন। এ মামলায় প্রধান অভিযুক্ত সেলিম মণ্ডল বেশ কিছুদিন পালিয়ে থেকে গত ২৮ আগস্ট উচ্চ আদালতে জামিনের আবেদন করে। শুনানি শেষে আদালত তাকে অস্থায়ী জামিন দেন। অস্থায়ী জামিনে থাকা অবস্থায় সেলিম মণ্ডল মঙ্গলবার রাতে দেশ থেকে পালিয়ে ইতালি যাওয়ার সময় বিমানবন্দর থেকে আটক হয়। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। পরে সিংগাইর থানা পুলিশের কাছে আটক সেলিম মণ্ডলকে হস্তান্তর করা হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিংগাইর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনায় সেলিম মণ্ডলের ছোট ভাই জুয়েল মণ্ডল এখনো জেলহাজতে রয়েছেন।

আয়শা আক্তার বকুল সাভারের বিরুলিয়া ইউনিয়নের সামাইর গ্রামের সোরহাব হোসেনের মেয়ে। গত প্রায় চার বছর আগে আয়শার সঙ্গে সেলিম মণ্ডলের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে সাভারের পৌর এলাকার মজিদপুর মহল্লায় তাঁরা ভাড়াবাসায় বসবাস করতেন। পারিবারিকভাবে তাঁদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছিল। এরই সূত্র ধরে প্রায়ই সেলিম মণ্ডলের সঙ্গে আয়শা আক্তার বকুলের কলহ লেগেই থাকত। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, সেলিম মণ্ডল নানা অপকর্মে জড়িত। তার অত্যাচারে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ। অবিলম্বে তার বিচার দাবি করেন ওই নেতা। এর আগেও হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে সেলিম মণ্ডলের বিরুদ্ধে। গত ১৯ জুন সাভারে নির্মাণাধীন একটি কারখানায় মালামাল সরবরাহসহ এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের মধ্যে গুলিবিনিময়নের ঘটনা ঘটে। এই গোলাগুলি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে সেলিম মণ্ডলসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তখন গ্রেপ্তারকৃতদের কাছ থেকে লাইসেন্স করা তিনটি শটগান জব্ধ করে পুলিশ। পরবর্তী সময়ে সেলিম মণ্ডল জামিনে মুক্ত হয়ে আসে।

শেষের পাতা- এর আরো খবর