English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

‘মুচি জসীমের’ এখন শত কোটি টাকা

  • হায়দার আলী   
  • ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

মুচি জসীম

জুতা তৈরির কারখানায় একসময় পিয়নের চাকরি করতেন। সেই থেকে এলাকার মানুষের কাছে পরিচিতি মুচি জসীম নামে। সেই জসীম ইকবাল আজ শতকোটি টাকার মালিক। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিনি এক মূর্তিমান আতঙ্ক! বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংসদ নামে এক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন পুলিশের এই সোর্স। ১৭টি পরোয়ানাভুক্ত মামলা মাথায় নিয়েও পুলিশের সঙ্গে তাঁর নিত্য উঠবোস। সরকারের ৩০০ বিঘা জায়গা দখল করে বন কেটে গড়ে তুলেছেন নতুন এক গ্রাম। টাকার বিনিময়ে চুক্তিভিত্তিক জমি জবরদখলেও তিনি সিদ্ধহস্ত ।

জানা গেছে, একটি হত্যা মামলায় পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করতে গিয়ে গোটা জীবনটাই বদলে নিয়েছেন জসীম। তাঁর কাছে যেন কেউই নিরাপদ নয়। স্বার্থের পরিপন্থী হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ওপর হামলে পড়েন তিনি। একে একে ১৭টি মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও প্রকাশ্যেই তিনি ঘুরে বেড়ান। তাঁর কুকর্মের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়েছে অসংখ্য নিরীহ মানুষ। বাদ যাননি সরকারি কর্মকর্তাও।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের আশীর্বাদপুষ্ট জসীম ইকবালের রয়েছে শক্তিশালী ক্যাডার বাহিনী। কালিয়াকৈর উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় বনের অন্তত ৩০০ বিঘা জমি দখল করে পৃথক বেশ কয়েকটি সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন তিনি।

গাজীপুরের চন্দ্রা বন বিভাগের বিট কর্মকর্তা খন্দকার মাহমুদুল হক মুরাদ এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, জসীমের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন আমাদের বিট কর্মকর্তা সজীব কুমার মজুমদার, জীবন দেওয়ান, নিজাম উদ্দিনসহ অনেকেই। আমরা যখনই জসীমের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করতে যাই তখনই আমাদের সরকারি কর্মকর্তাদের নারী নির্যাতন, ডাকাতিসহ বিভিন্ন মামলার আসামি বানানো হয়। আর এসব অপকর্মে পুলিশ প্রত্যক্ষভাবে তাঁকে সহযোগিতা করছে।

মুরাদ বলেন, আমরা জসীমের অপকর্মের বিষয়ে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছি। সব শুনে তাঁরা দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। ১৭ মামলার পরোয়ানা মাথায় নিয়ে একজন আসামি এভাবে এলাকা দাপিয়ে বেড়ানোর খবরে পুলিশ সুপার ক্ষোভও প্রকাশ করেন।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ করলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, জসীম ইকবালের বিরুদ্ধে বেশ কিছু অভিযোগ আমরা পেয়েছি। বনের জমি দখলসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলাও রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই তার বিরুদ্ধে বড় ধনের অভিযান চালানো হবে।

জানা যায়, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর গ্রামের মৃত তোফাজ্জল হোসেনের ছেলে জসীম ইকবাল ১৫ থেকে ২০ বছর আগে চন্দ্রা এলাকায় এসে জুতা তৈরির একটি কারখানায় পিয়ন পদে চাকরি নেন। এর আগে কিছুদিন টোকাইয়ের কাজও করেন। পরবর্তী সময়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নিজেই জুতা বানিয়ে ওই কম্পানিতে সরবরাহ করতে শুরু করেন। এ জন্য এলাকায় মুচি জসীম নামে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।

২০১৫ সালের ২১ আগস্ট চন্দ্রায় জাতির পিতা কলেজ মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে কালিয়াকৈর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলামকে সন্ত্রাসীরা কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। আর এই হত্যার ঘটনায় কপাল খুলে যায় মুচি জসীমের। রফিকুল হত্যার আসামিদের ধরিয়ে দিতে থানা পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। অল্প সময়ের ব্যবধানে পুলিশের বিশ্বস্ততা অর্জনের সুযোগে হত্যা মামলায় আসামি করার ভয় দেখিয়ে এলাকার মানুষজনকে জিম্মি করে ফেলেন জসীম। তাঁর সহযোগিতায় কালিয়াকৈর থানার পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় শুরু করে। হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কিছুই জানে না এমন মানুষজনকেও ধরে নিয়ে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে আর জসীম মধ্যস্থতা করে তাদের ছাড়িয়ে আনেন। আর থানা থেকে ছাড়িয়ে নিতে তিনি প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০-১৫ লাখ করে টাকা আদায় করেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক যুবক জানান, পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। পরে জসীমের মধ্যস্থতায় সাত লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পান। আদায় করা টাকার বড় একটা অংশ চলে যায় জসীমের পকেটে। এর পর থেকেই শুরু হতে থাকে তাঁর বেপরোয়া জীবন। এবার জসীমের দৃষ্টি পড়ে ভাওয়াল গড়ের দিকে। বড় বড় শাল ও গজারিগাছ কেটে তিনি দখল করতে থাকেন বিঘার পর বিঘা জমি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চন্দ্রা জোড়া পাম্প এলাকায় মহাসড়কঘেঁষা বিশাল এলাকাজুড়ে বন বিভাগের জায়গা দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে নতুন পাড়া নামে একটি মহল্লা। নতুন পাড়ায় প্রবেশ করতেই কথা হয় সোহেল নামের স্থানীয় একজনের সঙ্গে। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নতুন পাড়া নিয়া আমি কী কমু? যাইয়া দেখেন গা জসীমের নতুন পাড়া। কত পুলিশ, সাংবাদিক আইতাছে-যাইতাছে। জসীমের কিছুই করবার পাইতাছে না!

মহাসড়ক থেকে ইটের সলিং ধরে এগোলে প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল মসজিদ। বনের জায়গায় গড়ে তোলা মসজিদটি জসীম তাঁর মায়ের নামে করেছেনচান্দরা নতুন পাড়া রাশিদা জামে মসজিদ। আর মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন পুলিশের বড় এক কর্মকর্তা। কয়েক মাস আগেও জায়গাটি ছিল গজারির গভীর অরণ্য। সেসব গাছ কেটে ২৬১ বিঘা জমি জবরদখল করে নতুন পাড়া নামে একটি গ্রাম গড়ে তুলেছেন জসীম। সেখানে রয়েছে মার্কেট, দোকান, মসজিদ, রাস্তা। শ্রমিকরা প্রকাশ্যে মাটি কেটে মাঠ তৈরি করছে, তৈরি করছে নতুন নতুন ভিটা।

বনের জমি জবরদখল করে গড়ে তোলা সাম্রাজ্যে জসীম প্লট বিক্রিও শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে অন্তত ৩০০ পরিবারের কাছে প্লট বিক্রি করা হয়েছে। প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা। বন বিভাগের জায়গা জসীমের কাছ থেকে কিনে লোকজন সেখানে বসবাসও শুরু করেছে। টিনের তৈরি নতুন ঘরগুলো পুরনো হিসেবে দেখানোর জন্য আলকাতরার প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। আর বসবাসকারী পরিবারগুলো ভূমিহীন বলে প্রচার চালায় জসীম ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা।

চন্দ্রা বিট কর্মকর্তা মাহমুদুল হক মুরাদ আরো জানান, জসীম ইকবাল এলাকার চিহ্নিত ভূমিদস্যু। তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে ১৯টি মামলা করেছে বন বিভাগ। সাধারণ মানুষ থানায় জিডি করেছে আটটি। ১৯টি মামলার মধ্যে ১৭টিতেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। দুটি মামলায় আদালত ছয় মাস করে সাজা দিয়েছেন। তবে জসীম দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে থানায় কোনো জিডি নেই। আর আদালতে করা বন বিভাগের মামলাগুলোতে জামিনে আছেন।

বিট কর্মকর্তা বলেন, বন বিভাগের জমিতে ওই মসজিদ নির্মাণ নিয়ে ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি সংঘর্ষ হয়। বাধা দেওয়ায় চন্দ্রা বন অফিসের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালায় জসীমের লোকজন।

অভিযোগ রয়েছে, চন্দ্রা এলাকায় চলাচল করা ৮০০ ইজি বাইক ও অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন ৩০-৫০ টাকা করে চাঁদা আদায় করেন জসীম। আর প্রতিটি ইজি বাইক ও অটোরিকশা তাঁকে এককালীন এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা না দিলে সড়কে কোনো গাড়ি উঠতে পারে না।

সরকারি জমি দখল ও নানামুখী অপকর্ম সম্পর্কে জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে জসীম ইকবাল বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। আমি কোথাও চাঁদাবাজি করি না। বিট কর্মকর্তাদের অপকর্মের প্রতিবাদ করায় তারা আমার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। আর কালিয়াকৈরে বনের জমিতে ২৬টি মসজিদ রয়েছে। আমি একটি মসজিদ করেছি, এটাই অপরাধ!

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই অভিযোগ করে বলেন, চন্দ্রা এলাকায় মানুষের জমি জবরদখলে মুচি জসীমের জুড়ি মেলা ভার। লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে তিনি চুক্তিভিত্তিক জমি জবরদখল করে দেন।

জসীমের বিরুদ্ধে পুলিশের সঙ্গে পরস্পর যোগসাজশে গ্রেপ্তার বাণিজ্য চালানোরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ওসমান পালোয়ান নামের এক কৃষক জানান, তাঁর ভাতিজা রাজীবের পকেটে কৌশলে ইয়াবা ঢুকিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেন জসীম। পরে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে তাঁকে ছাড়িয়ে আনা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ কালিয়াকৈর উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সবুজ আল মামুন বলেন, আমার কেনা ১৮ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল করে নিয়ে যায় জসীম ও তার লোকজন। ওই সময় থানায় অভিযোগ করলেও পুলিশ উল্টো পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আমাকেই জেলে পাঠায়। জসীমের মতো দুর্ধর্ষ লোকের বিরুদ্ধে এলাকার কেউ মুখ খুলতে সাহস করে না।

কালিয়াকৈর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, হরিণাহাটী এলাকায় দীর্ঘদিন তাঁদের দখলে থাকা ১৯৬ শতাংশ জমি ২ আগস্ট জসীম ও তার লোকজন জবরদখল করে নিয়ে যায়। মার্কেট ভাঙচুর করা হয়। উচ্ছেদ করা হয় ৪৩টি পরিবারকে। এভাবে ওই এলাকায় আরো ১৭টি কলোনিতে বসবাস করা পরিবারগুলোকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সরিয়ে দেন জসীম। এমনকি জমি জবরদখল করে নেওয়ার পর আবার আজাদুর রহমান খান নামের একজনকে বাদী সাজিয়ে কালিয়াকৈর থানায় তাঁদের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজির মামলা করান জসীম। এভাবে মুচি জসীম, আজাদুর রহমান বাবু, আজমল, সুমন, জুলহাস সিন্ডিকেটের কাছে কমপক্ষে ৫০০ মানুষ জিম্মি হয়ে আছে। তারা ভুয়া ডিবি পুলিশ সাজিয়ে মানুষকে হয়রানি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কালিয়াকৈর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা বের করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেষের পাতা- এর আরো খবর