English

অনলাইন

আজকের পত্রিকা

ফিচার

সম্পাদকীয়

রাজধানীতেই ১০০ নারী মাদক কারবারি

প্রিয়জনের ‘প্ররোচনায়’ মাদক কারবারে নারী

  • এস এম আজাদ   
  • ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে স্বামী জয়নাল আবেদিন পাঁচুর সঙ্গে মিলে ইয়াবার কারবার করছিল ফারহানা আক্তার পাপিয়া। এই দম্পতিকে ২০ হাজার ইয়াবা বড়িসহ গত ৭ জুন লালবাগ থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের কাছে দেওয়া তাদের জবানবন্দি এবং জেনেভা ক্যাম্পের কয়েকজন বাসিন্দার বর্ণনা থেকে জানা গেছে, বাবা ও স্বামীর হাত ধরেই বেপরোয়া মাদক কারবারি হয়ে ওঠে পাপিয়া। মোহাম্মদপুরের আজিজ মহল্লার কোয়ার্টারের বাসিন্দা আবু হানিফের মেয়ে পাপিয়া দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই প্রেম করে বিয়ে করেছিল জেনেভা ক্যাম্পের কামরুল হাসানের ছেলে পাঁচুকে। দারুণ স্মার্ট পাপিয়ার বাবা হানিফ আগে ক্যাম্পে মাদকের কারবার করত। একসময় স্বামী পাঁচু ও ভাশুর রাহীকে নিয়ে একই কারবার শুরু করে পাপিয়াও। প্রথমে হেরোইন ও গাঁজা বিক্রি করলেও পরে ইয়াবার ডিলারে পরিণত হয়। অল্পদিনেই সে বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাটের মালিক বনে যায় মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেখেরটেকে শ্যামলী হাউজিং সোসাইটিতে। চড়ত দামি এসইউভি গাড়িতে। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য সঙ্গে থাকত আগ্নেয়াস্ত্র। তবে এসব অস্ত্র-সম্পদ রক্ষা করতে পারেনি তাকে।

মাদকবিরোধী অভিযানের মধ্যে গত ১৭ জুন ময়মনসিংহে রেহানা আক্তার নামের এক মাদক কারবারির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। কোনো নারী মাদক কারবারি নিহত হওয়ার ঘটনা সেটিই প্রথম। তবে পুলিশের দাবি, অভিযানে নয়, রেহানা নিহত হয় নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার বিরোধের কারণে। ময়মনসিংহ সদরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল-আমিন বলেন, রেহানার পুরো পরিবার মাদক কারবারে জড়িত। অভিযানে তার ছোট বোন শরীফাসহ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পাপিয়া ও রেহানার মতো আরো অনেক নারী মাদকের ভয়ংকর কারবারে জড়িয়ে পড়েছে স্বামী, প্রেমিক, বাবা, ভাইসহ প্রিয়জনের সঙ্গে মিলে বা তাদের প্ররোচনায়। একবার এতে জড়ালে বেরিয়ে আসার উপায় থাকে না কিছু নারীর। এমনকি মাদকাসক্ত হলে পুনর্বাসনেরও সুযোগ হয় না।

কয়েকটি সংস্থার তথ্য মতে, দেশে মাদক কারবারিদের অন্তত ৩০ শতাংশ নারী। রাজধানীর এলাকাভিত্তিক মাদক বিক্রেতাদের মধ্যে নারীই অর্ধেক। পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকাভুক্ত দুই শতাধিক মাদক বিক্রেতার মধ্যে অন্তত ১০০ নারীর নাম আছে। এদের প্রায় সবাই ঘনিষ্ঠজনদের মাধ্যমে মাদকে জড়িয়েছে। পরিবহন ও বিক্রি সহজ হওয়ায় শীর্ষস্থানীয় মাদক কারবারিরা নারীদের ব্যবহার করে। আবার অনেক নারীকে টাকার লোভ দেখিয়ে সহজেই নামানো হয়েছে এই অপকর্মে। নারীদের সহজেই মাদকাসক্ত করে কারবার প্রসারিত করার ফাঁদও পেতেছে অনেক মাদক কারবারি।

ডিএনসির ঢাকা মেট্রো উপ-অঞ্চলের উপপরিচালক মুকুল জ্যোতি চাকমা কালের কণ্ঠকে বলেন, স্বজনদের মাধ্যমে নারীরা মাদকে জড়াচ্ছে। অনেকে আবার ফুসলিয়ে বা লোভ দেখিয়ে নারীকে মাদকদ্রব্যের বাহক হিসেবে ব্যবহার করে। ঢাকায় অন্তত ৩০ শতাংশ মাদক কারবারি নারী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাকিম সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, আমাদের দেশে নারীদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা সুবিধাজনক। এ কারণে অভাবী নারীরা টাকার প্রলোভনে জড়িয়ে পড়ে। প্রথমে বহন করে আসক্ত হয়, পরে কারবার শুরু করে। মূলত মাদকের কারবারের অন্ধকার জগতে গিয়েই তারা মোটিভেটেড হয়। কেউ কেউ শখেও শুরু করে। আসলে একটা সার্কেলে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আরো বলেন, অভিযানের পাশাপাশি নারীরা কোন কোন ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ছে তা শনাক্ত করে সচেতনতামূলক কাজ করলে তাদের রক্ষা করা সম্ভব বলে মনে করি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কৃষ্ণপদ রায় বলেন, মাদক কারবারি নারীদেরও শনাক্ত করা হয়েছে। অভিযানে নারীরাও ধরা পড়ছে। যারা মাদকে জড়িত সে নারী না পুরুষ তা বিবেচ্য নয়।

বের হওয়ার সুযোগ মেলেনি : ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন তিন তরুণীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তাদের মধ্যে দুজন প্রেমিকের মাধ্যমে এবং অন্যজন ছেলে বন্ধুর মাধ্যমে মাদকাসক্ত হয়। দুজন পরে ইয়াবা বিক্রিও শুরু করে। তবে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর পরিবার থেকে তাদের পুনর্বাসন বা চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে এক আত্মীয় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। অন্য দুজন সহায়তা পেয়েছে একটি এনজিও থেকে।

স্বামীর হাত ধরে স্ত্রীরা : গোয়েন্দা সূত্রে এবং এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সবুজবাগ থানার ওহাব কলোনির আইয়ুব আলীর স্ত্রী সুফিয়া আক্তার শোভা ঢাকার শীর্ষস্থানীয় মাদক কারবারিদের একজন। ১৬টি মামলার আসামি শোভা মাদকবিরোধী অভিযানের মুখে গা-ঢাকা দিয়েছে। স্বামী আইয়ুব আলীর হাত ধরেই মাদকে জড়িয়ে পড়ে সে। এরপর তানিয়াসহ পরিবারের সবাইকে জড়িয়ে কারবারের নিয়ন্ত্রক হয়। সবুজবাগ থানার ওসি আবদুল কুদ্দুস ফকির জানান, চার মাস আগে শোভাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। জামিনে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে এখন।

মিরপুরের রূপনগরে ঝিলপার বস্তির শীর্ষস্থানীয় মাদক কারবারি নজরুল ইসলাম সরদার ওরফে নজু গত ২৭ মে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। তার স্ত্রী হাজেরা খাতুনও মাদক কারবারে আসে স্বামীর হাত ধরে। স্বামী নিহত হওয়ার পর পালিয়ে আছে হাজেরা। মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের শীর্ষস্থানীয় মাদক কারবারি ইশতিয়াক তার কারবারের সহযোগী হিসেবে নিয়েছে স্ত্রী পাখি বেগমকে। স্বামীর সঙ্গে সেও এখন এলাকা ছাড়া। গেণ্ডারিয়ার দয়াগঞ্জ রেললাইনের পাশে ছোবাপট্টি বস্তির রহিমা বেগম স্বামী হযরত ও সহযোগী ফাতেমাকে নিয়ে মাদকের কারবার করে ১০টি বাড়ির মালিক হয়েছে। রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল গাড়িও। ছয়টি মামলার আসামি রহিমা এখন গা-ঢাকা দিয়ে আছে। জেনেভা ক্যাম্পের এ ব্লকের মাদক কারবারি রিয়াজুলের হাত ধরে মাদকে জড়িয়েছে স্ত্রী জেরিনা। এই দম্পতিও এখন পলাতক। সবুজবাগ থেকে নন্দীপাড়া এলাকায় মাদক কারবার শামসুন্নাহার চম্পার। স্বামী বাবুল ওরফে ফর্মা বাবুল তার এই কারবারের গুরু। সায়েদাবাদ ওয়াসা কলোনিতে মাদক কারবারি সুফিয়া আক্তার সুফিরও হাতেখড়ি স্বামী আক্তার হোসেনের কাছে। ছয় মামলার আসামি সুফিয়া এখন কারাগারে। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন বস্তি এলাকায় মাদকের কারবার জমিলা খাতুনের। সাত মামলার আসামি জমিলা এই কারবারে জড়ায় কয়েকজন আত্মীয়র মাধ্যমে।

ঢাকার আরো যত নারী মাদক কারবারি : ডিএনসির তথ্য মতে, ঢাকার ১৮টি বড় স্পট ও কিছু এলাকায় ২০০ মাদক কারবারির মধ্যে ৮১ জন নারী। পুলিশের তালিকায় আছে ৩৯ জনের নাম, যাদের অনেকের নাম ডিএনসির তালিকায়ও আছে। এরা পারিবারিকভাবেই এ কারবার করে। কারওয়ান বাজারের মাদক বিক্রেতা হিসেবে শনাক্ত হওয়ার পর যারা পালিয়েছে তাদের ৯০ শতাংশই নারী। এদের মধ্যে শিল্পী, আকলিমা আক্তার, শহিদা, সেলিনা, পারভিন, পিয়ারা বেগম, মিনা, মনোজা, সালেহা, লীনা, রোজিনা, খাদেজা আক্তার খুদি, জাহানারা, লিজা, রেশমা, আজেদা, মহসিনি, রোকেয়া, মাহমুদা, শান্তি, সেলিনা, পারুলি, রিপা, শামসুন্নাহার, পাসি ও সিমু উল্লেখযোগ্য। তালিকায় আরো আছে ভাসানটেক ধামালকোটের স্বপ্না, মোর্শেদা; শাহআলী নিউ সি ব্লকের ফাতেমা; রূপনগর দুয়ারীপাড়ার সালেহা বেগম; মিরপুরের জাহানারা বেগম; মিরপুর মিল্লাত ক্যাম্পের জামিলা, কালী, আক্তার, গোলাপী; কাফরুলের জ্যোত্স্না বেগম; কামরাঙ্গীর চরের শাহিনুর রহমান; কলাবাগানের শাহানাজ; কোতোয়ালির পারুলী রানী; মোহাম্মদপুর শিয়া মসজিদের পাশের মনিরা বেগম মনি; খিলক্ষেত বেপারীপাড়ার নাজমা ইসলাম; হাজারীবাগের বীণা, নূর নাহার নুন্নী, জমিলা ওরফে জামেলা বেগম; গণকটুলীর রোখসানা, সেনিয়া, আফসানা, সুফি, রিনা, সাবানা, রুমালা, পারভীন, বুড়ী; আনন্দবাজার লাভলুর বস্তির তারা বানু, সোমা, জলি, শোভা, রাহেলা, রোখসানা, সখিনা; চানখাঁরপুলের নার্গিস ওরফে নাগিনা, পিরু, সগুমী আক্তার; নিউ মার্কেটের শাহিনুর বেগম ওরফে মিনারা; নয়ানগর তালতলা বস্তির খুরশীদা খুশি, লিলি শিল্পী; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার রাশিদা; পোস্তগোলার শেফালী; গোপীবাগ টিটিপাড়ার তছলিমা, জোছনা; খিলগাঁও রেলগেটের রাবেয়া ওরফে রাবি, রাশিদা; নন্দীপাড়া ক্যাম্পের জোছনা, মিনু আক্তার; কদমতলীর মুরাদনগরের রমজানের বউ; শ্যামপুরে রানী, মিতু; যাত্রাবাড়ী ওয়াসা কলোনির সুফিয়া আক্তার, রহিমা বেগম; সেগুনবাগিচার সেলিনা আক্তার কেয়া; ভাটারার নার্গিস ওরফে সকার বউ ও সাহিদা বেগম ইতি।

দুই বোনের সিন্ডিকেট : গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, কামরাঙ্গীর চর আশ্রাফাবাদের আলোচিত মাদক কারবারি খুরশিদা বেগম ওরফে খুশি ও তার বোন হাসি বেগমের কারবার নিউ মার্কেট, মিরপুরের কালাপানি ও পল্লবী পর্যন্ত বিস্তৃত। খুশির স্বামী মিজান মোল্লা ওরফে গোল্ডেন মিজান একসময় নিউ মার্কেট কাঁচাবাজারে মাছের ঝুড়ি টানতেন। আর খুশি কাগজ কুড়াতেন। ১০ বছর আগে তারা নিউ মার্কেট ১ নম্বর গেট, পোস্ট অফিস গলি ও কাঁচাবাজারে মাদক কারবার শুরু করেছিলেন। সঙ্গে নিয়েছিলেন বড় বোন হাসিকে। অভিযোগ আছে, হাসির স্বামী ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা শাহ জালালের প্রভাব খাটিয়ে মাদক কারবারিদের ছাড়িয়ে নিত দুই বোন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই প্রতিবেশী জানায়, কামরাঙ্গীর চর থানার সুলতানগঞ্জ ইউনিয়নের আশ্রাফাবাদ এলাকায় দুটি বাড়ি আছে দুই বোনের। নিয়মিত মাসোয়ারা নেওয়ার কারণে স্থানীয় পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করতে যেত না। তবে সম্প্রতি ডিএমপির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম অভিযান চালিয়ে ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ হাসিকে গ্রেপ্তার করে। গা-ঢাকা দিয়েছে খুশি। মাদকে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে শাহ জালাল বলে, আমি মাদক ব্যবসা করি না। হাসি-খুশি করে। আমি তাদের আত্মীয় হওয়ায় আমার বিরুদ্ধেও মামলা দিয়েছে।

ঢাকার বাইরেও তালিকাভুক্ত নারী কারবারি : জানা যায়, ঢাকার বাইরের শীর্ষস্থানীয় মাদক কারবারির তালিকায়ও আছে অনেক নারীর নাম। কিশোরগঞ্জের তালিকাভুক্ত ১০ জনের মধ্যে প্রথম নামটি হলো খায়রুনন্নেসা ওরফে খায়রুনী। রাঙামাটির ১০ কারবারির ১ নম্বরে আছে মঞ্জুয়ারা বেগমের নাম। কক্সবাজারের ইয়াবা কারবারি আয়েশা বেগমকে বড় আম্মা বলে ডাকে সহযোগীরা। তার সিন্ডিকেটের সদস্য হলো চট্টগ্রামের নূর আয়শা, বার্মার সুলতানা রাজিয়া ও টেকনাফের মুন্নী তাহের। কক্সবাজারের নারী মাদক কারবারিদের মধ্যে সানজিদা বেগম, তার বোন লায়লা বেগম, স্থানীয় বাবুল মেম্বারের স্ত্রী সালেহা বেগম ও শামসুননাহার উল্লেখযোগ্য। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বড় মাদক কারবারি মরিয়ম বেগম ওরফে কুট্টি তার স্বামী আক্তার হোসেনের হাত ধরে কারবার শুরু করে। একই এলাকার জরিনার পরিবারেও আছে মাদক কারবারি।

শেষের পাতা- এর আরো খবর